ঢাকা, সোমবার, ৫ কার্তিক ১৪২৬, ২১ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

সংবাদপত্রের কাছের মানুষ ছিলেন বঙ্গবন্ধু

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৮-৩১ ৫:২৫:২১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৯-০১ ৮:৩১:০৩ এএম
১৯৭২ সালে আলোকচিত্র শিল্পীদের সাথে ছবিটি তোলেন বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত আলোকচিত্রী মোহাম্মদ আলম

হাসান মাহামুদ : সংবাদপত্রকে বলা হয় একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ৷ তবে সেই দেশে অবশ্যই সংবাদমাধ্যম পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতে হয়। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে সংবাদপত্র বা সংবাদমাধ্যমগুলো পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করে আসছে। এর পেছনে অনেকেই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ মনে করেন শেখ মুজিবুর রহমানের সংবাদপত্রের প্রতি ভালবাসা এবং আত্মীক সর্ম্পককে।

স্বাধীনতার আগে থেকেই বঙ্গবন্ধু যখন ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তখন থেকেই তিনি ছিলেন সংবাদকর্মীদের ‘মুজিব ভাই’। পরবর্তীতে ‘বঙ্গবন্ধু’, ‘স্বাধীনতার স্থপতি’, ‘জাতির জনক’ এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হলেও, সংবাদপত্রের সাথে তার সর্ম্পক তেমনই ছিল। এমনকি শেখ মুজিবুর রহমান যখন কারাগারে বন্দি থাকতেন, তখনও তিনি নিয়মিত এই অঞ্চলের সংবাদপত্রগুলোর খোঁজ রাখতেন। বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মচজীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে বিষয়টি বেশ কয়েকবার উঠে এসেছে।

স্বাধীনতার আগে চরম বৈরি পরিবেশেও শেখ মুজিবুর রহমান সংবাদপত্রের সাথে ছিলেন, তার কোনো ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য প্রকাশের কারণে কোনো গণমাধ্যম সমস্যায় পড়লেও শেখ মুজিব সবার আগে এগিয়ে এসেছেন এবং সত্যের পথে অটল ছিলেন। এসব কারণে গণমাধ্যমগুলোও শেখ মুজিবকে সবসময় খুব কাছের মানুষ ভাবতো।

বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট কর্তৃক প্রকাশিত ‘নিরীক্ষা’র জুলাই-আগস্ট (২০১৩) সংখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে- ‘শেখ মুজিব রাজনীতির মঞ্চে দৃপ্ত কণ্ঠে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বক্তব্য দেন, পাকিস্তানি শাসকদের সাংবাদিক ও গণমাধ্যম নির্যাতনের ঘটনার কঠোর প্রতিবাদ জানান, আবার মঞ্চ থেকে ফিরে পত্রিকার কার্যালয়ে বসে লেখালেখিও করেন’।

এ রকমভাবে সংবাদপত্রের সাথে বা সংবাদকর্মী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর নাম বিভিন্ন ভাবে লেখা হয়েছে।

তবে তিনি সংবাদপত্রের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন, তা তার লেখনি থেকেই পাওয়া যায়। হয়তো অনেকেই অবাক হবেন শুনে, জীবনের শুরুর দিকে শেখ মুজিবুর রহমান সংবাদপত্রের সাথে পেশাগতভাবেই জড়িত ছিলেন।

এ বিষয়ে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু  লিখেছেন- ‘আমি ইত্তেহাদ কাগজের পূর্বপাকিস্তানের প্রতিনিধি ছিলাম। মাসে প্রায় তিনশ টাকা পেতাম। আমার কাজ ছিল এজেন্সিগুলোর কাছ থেকে টাকাপয়সা আদায় করা, আর ইত্তেহাদ কাগজ যাতে চলে এবং নতুন এজেন্ট বিভিন্ন জায়গায় নিয়োগ করা যায় সেটা দেখা।’

সংবাদপত্রের সাথে জড়িত থাকার কারণেই হয়তো তিনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন। কারাগারের রোজনামচায় বঙ্গবন্ধু সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা অনেকবার বলেছেন। ৮ জুন ১৯৬৬ সালে লিখেছেন, ‘ধর্মঘটের কোনো সংবাদ নাই। শুধু সরকারি প্রেসনোট। ইত্তেফাক, আজাদ, অবজারভার সকলেরই একই অবস্থা। একেই বলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা! ইত্তেফাক মাত্র ৪ পৃষ্ঠা।...খবরের কাগজগুলি দেখে আমি শিউরিয়া উঠলাম। পত্রিকায় নিজস্ব খবর ছাপতে দেয় নাই। ‘১৭ জুনের রোজনামচায় তিনি লিখেছেন, ‘ইত্তেফাক কাগজ আসে নাই। এর পরিবর্তে আমাকে দৈনিক পাকিস্তান দিয়েছে। কারণ জিজ্ঞাসা করলে বলল কাগজ বন্ধ। সরকার নাকি বন্ধ করে দিয়েছে। আর খবর পেলাম রাতে মানিক ভাইয়ের কাছে একটা নোটিশ দিয়ে গিয়েছে। আমরার মনে হলো সরকার নিশ্চয়ই কাগজ বন্ধ করে দিয়েছে। মোনায়েম খান সব পারে। বানরের হাত শাবল।’

৩০ জুনের রোজনামচায় আছে, ‘আজ ইত্তেফাক ও ইত্তেফাকের সম্পাদকের বিরুদ্ধে হামলা, কাল আবার অন্য কাগজ ও তার মালিকের উপর সরকার হামলা করবে না, কে বলতে পারে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বলতে তো কিছুই নাই। এখন ব্যক্তিগত সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করা শুরু করেছে। পাকিস্তানকে শাসকগোষ্ঠী কোন পথে নিয়ে চলেছে ভারতেও ভয় হয়। আজ দলমত-নির্বিশেষে সকলের এই জঘন্য অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো উচিত।’

কারাগারের রোজনামচা থেকে আমরা আরও জানতে পারি, সে সময় সংবাদপত্র দলনের বিরুদ্ধে সাংবাদিক সমাজ জোরালো ভূমিকা নিয়েছিল। সরকার ইত্তেফাক বন্ধ করে দেওয়ার পর সাংবাদিক ইউনিয়ন ধর্মঘটও পালন করেছে। তখন সাংবাদিক ইউনিয়ন ছিল অভিন্ন; যেকোনো ইস্যুতে তারা ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত নিতে পারত।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন অর্জন বা সবশেষে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত নানাভাবে তিনি ইত্তেহাদ, মিল্লাত, ইত্তেফাক, নতুন দিন, স্বদেশ ইত্যাদি পত্রিকায় কখনো মালিক, কখনো প্রতিনিধি, কখনো পরিবেশক, কখনো উৎসাহদাতা, কখনো বিক্রেতা, কখনো উদ্যোক্তার ভূমিকায় গণমাধ্যমের বান্ধব হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। দেশে, জনগণ, রাষ্ট্রের কল্যাণে রাজনৈতিক নেতাদের মাঝে রাজনৈতিক জীবনের সূচনালগ্ন থেকেই সংবাদপত্তের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সেতুবন্ধন রচনা করে হয়ে ওঠেন সংবাদবান্ধব। ফলে তিনি প্রায় সন্ধ্যায়, রাতে আড্ডা দিতেন সংবাদপত্র অফিসে। সাংবাদিক এবং সংবাদপত্রের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল সার্বক্ষণিক এবং পূর্ণমাত্রায়।


রাইজিংবিডি/ঢাকা/আগস্ট ২০১৯/হাসান/এনএ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন