ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ শ্রাবণ ১৪২৬, ২৩ জুলাই ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

‘সমাজতন্ত্র মোকাবিলা করতে সাম্রাজ্যবাদীরা ধর্মকে উৎসাহিত করেছে’

শ্যামল চন্দ্র নাথ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৬-০৫ ৪:৩৩:১৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৭-০১ ৭:২১:৩৬ পিএম
‘সমাজতন্ত্র মোকাবিলা করতে সাম্রাজ্যবাদীরা ধর্মকে উৎসাহিত করেছে’
Voice Control HD Smart LED

সাহিত্যের সমালোচনা কি সম্ভব? আমরা যখন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাহিত্যসংশ্লিষ্ট প্রবন্ধগুলো পড়ি তখন আমাদের মনে হয়, সাহিত্যের সমালোচনা শুধু সম্ভবই নয়, সাহিত্যের সমালোচনা নিজেই সাহিত্যের একটি ধারা তথা ‘সমালোচনা-সাহিত্য’ হয়ে উঠতে পারে। বাংলা প্রবন্ধ-সাহিত্যের পাঠকপ্রিয়তা অর্জন ও সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি যার অবদান তিনি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। স্বাধীনতার প্রায় একযুগ আগে থেকেই তিনি লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। অধ্যাপক, লেখক, সাহিত্যিক, সম্পাদক, শিক্ষাবিদ, মার্ক্সবাদী দার্শনিক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ক্রমে পরিণত হয়েছেন আমাদের চিন্তার বাতিঘরে। নানা সামাজিক আন্দোলনেও তিনি  পুরোধা ব্যক্তিত্ব। ছোটগল্প, উপন্যাস ও অনুবাদ সাহিত্যেও রয়েছে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তরুণ কবি শ্যামল চন্দ্র নাথ।

শ্যামল : কথোপকথনের শুরুতে আপনার শৈশব সম্পর্কে জানতে চাই। আপনার জন্মদিন ২৩ জুন, ১৯৩৬।  

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : আমি গ্রামে বড় হয়েছি। আমি যে এলাকায় ছিলাম ওটা ছিল নিচু এলাকা। আমরা যে এলাকা দিয়ে স্কুলে যেতাম এর পাশেই নানা বাড়ি। ওই বাড়ির কাছেই ছিল পদ্মা নদী। এই নদী আমার স্মৃতিতে জেগে আছে। এখন গেলে মন হাহাকার করে ওঠে। আমরা যখন রাজশাহী গেলাম ওখানেও পদ্মা নদী ছিল। প্রকৃতির একটা আকর্ষণ সব সময় আমাকে আকৃষ্ট করেছে।

শ্যামল : আপনি লেখালেখিতে এলেন কীভাবে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : আমার পড়তে ভালো লাগত। আমরা বই পুরস্কার পেতাম। যেভাবে পড়ার প্রতি আমি আকৃষ্ট হলাম সেটা একটা দুর্ঘটনা। আমি খেলাধুলা করতাম। খেলতে গিয়ে একবার পা ভেঙে গেল। প্রায় দেড় মাস তখন আমার বই পড়ে কাটাতে হলো। রবীন্দ্রনাথের বই এবং শরৎচন্দ্রের বই পড়ে প্রাণিত হলাম। এক সময় লিখতেও শুরু করলাম। রাজশাহীতে তখন ‘আজাদ’ পত্রিকা আসত। এরপর আমরা কলকাতা গেলাম এবং ওখানে ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকা পড়তাম। এর মধ্যে দিয়ে আমার সাহিত্যের প্রতি একটা আকর্ষণ তৈরি হয়। 

শ্যামল : আপনি বলছেন, সামাজিক বিপ্লব না ঘটলে ব্যক্তি হয়তো ধর্ম নিরপেক্ষ হবার চেষ্টা করবে, ক্ষেত্রবিশেষে সফলও হবে, কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্রে ধর্মনিরপেক্ষতা আসবে না। মেরুদণ্ড সোজা হবে না। আপনার এমন মনে হওয়ার কারণ কী এবং সামাজিক বিপ্লব কীভাবে ঘটানো সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : সামাজিক বিপ্লব তো রাজনৈতিক ঘটনা। এটা রাজনৈতিকভাবেই ঘটবে। এবং এ জন্য যেটা প্রয়োজন সমগ্র জনগণের চেষ্টা। সেই প্রচেষ্টা গণতান্ত্রিক হতে পারে আবার অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে হতে পারে। সামাজিক বিপ্লব কীভাবে ঘটতে পারে তা আমরা মুক্তিযুদ্ধের সময় দেখেছি। সেখানে নির্বাচন একটা রায় দিয়েছিল স্বাধীনতার পক্ষে। যখন স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল তখন এটাকে আমরা মুক্তিযুদ্ধ বললাম। তখন আমাদের সামগ্রিক জনগোষ্ঠী যে জেগে উঠলো সেটা কেবল পাকস্তানীদের পরাস্ত করা নয়, পাকিস্তানী রাষ্ট্র থেকে বেরিয়ে আসা এবং একটি স্বতন্ত্র বাঙালি সত্তা নির্মাণ। এর চেয়েও বড় কথা, সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। রাষ্ট্র তার শুধু কাঠামোগত নয়, চরিত্রগতভাবেও পরিবর্তিত হবে। তখন আমরা ওই সম্ভাবনা দেখছিলাম। যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে একটা অভ্যুত্থান ঘটেছিল এবং এটার মধ্যে দিয়ে একটা সামাজিক বিপ্লব ঘটেছিল। ওই বিপ্লবকে কিংবা চেতনাকে আমরা যদি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতাম এবং ওই যে পাকিস্তানীদের পরাজয়ের মূহূর্ত এবং ওই মুহূর্তকে যদি আমরা আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতাম তাহলে আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার দিকে অগ্রসর হতে পারতাম। কিন্তু আমরা সেটা পারিনি। আমরা যেটা করলাম-একটা জাতীয়তাবাদী চেতনা নিয়ে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলাম। কিন্তু এই রাষ্ট্রের যে চরিত্রগতভাবে পরিবর্তন হওয়ার কথা ছিল তা হলো না। এখন আমাদের যেটা প্রয়োজন, আমাদের সমাজ রূপান্তরের দিকে যাওয়া এবং সমাজে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা। একেই আমরা সমাজ বিপ্লব বলবো। বৈপ্লবিক পরিবর্তন মানে হচ্ছে সমাজে মানুষের সাথে মানুষের যে সম্পর্ক; সে সম্পর্ক বৈষম্যমূলক থাকবে না। সক্ষমতা এবং সুযোগের সম-অধিকার এবং রাষ্ট্র ক্ষমতা এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত থাকবে না। এতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হবে। প্রত্যেক জায়গায় এবং প্রত্যেক ক্ষেত্রে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা থাকবে। আর এই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাজের জবাবদিহিতা থাকবে। আমরা যে অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলি সেটাও সম্ভব না যদি আমরা সমাজে বৈষম্য দূর করতে না পারি। ফলে সামাজিক বিপ্লব অবশ্যই প্রয়োজন।

শ্যামল: স্যার, আপনি বৈষম্যের কথা বললেন; আমার প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমান সময়ে সাম্রাজ্যবাদ যেভাবে দ্বিমুখী চেতনা নিয়ে কাজ করে, ফলে ওরা কী ধরনের প্রভাব ফেলছে বলে আপনি মনে করেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : সব সময় প্রভাব ফেলে। তাদের সমস্ত লক্ষ্যই হচ্ছে বৈষম্য সৃষ্টি করা। তারা একটা শ্রেণী তৈরি করবে। এটা করবে তাদের নিজেদের স্বার্থে। এবং এরাই দেশ শাসন করবে। ওই সাম্রাজ্যবাদের মধ্যে এখনও আমরা রয়ে গেছি। ঔপনিবেশিক যুগে যেটা ঘটলো ক্ষমতার হস্থান্তর ঘটলো কিন্তু যে দেশগুলো স্বাধীন হলো বলে আমরা মনে করলাম, সে দেশগুলোতে আসলে ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটেছিল।

শ্যামল: স্যার, আপনি ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বারবার বলেছেন। যেখানে সকল ধর্মের, সকল মতের মানুষের সম-অধিকার এবং স্বাধীনতা থাকবে। রবীন্দ্রনাথ ধর্ম-নিরপেক্ষতা নিয়ে বলেছিলেন: ‘নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস, শান্তির লালিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস- বিদায় নেবার আগে তাই ডাক দিয়ে যাই দানবের সাথে যার সংগ্রাম তরে প্রস্তুত হইতে হবে ঘরে ঘরে।’ রবীন্দ্রনাথের এই কথার সঙ্গে আপনি কি একমত?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : রবীন্দ্রনাথ সাম্রাজ্যবাদ বা পুঁজিবাদ নিয়ে তেমন কিছু বলেননি। কিন্তু তিনি অনুমান করেছিলেন। তখন তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখেছেন। তিনি মানুষের মধ্যে এই সংকট দেখতে পেয়েছিলেন। তাই তিনি তাঁর লেখায় এর প্রতিবাদ করতে চেয়েছিলেন। তুমি ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা এনেছ; এই বিষয়টি  গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মনিরপেক্ষতা হলো রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। আর আমরা যখন ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ বলি এর প্রধান ভিত্তি ভাষা। আসলে জাতীয়তাবাদের প্রধান ভিত্তি ধর্ম নয়। ফলে জিন্নাহ বলেছিলেন ১৯৪৮ সালের ১১ আগস্ট গণপরিষদে আমরা আলাদা না, আমরা সবাই পাকিস্তানী। কিন্তু আমরা ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়টিকে রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের একত্রিকরণ করছি। যেমন ভারতেও বুঝানো হচ্ছে যে, সকল ধর্মের মানুষের সমান অধিকার। ধর্মনিরপেক্ষতা হচ্ছে ‘ধর্ম ব্যক্তিগত, প্রত্যেকের নিজস্ব চেতনা এবং রাষ্ট্রের নিজস্ব কোনো ধর্ম নাই।’ সমাজতন্ত্রকে মোকাবিলা করার জন্যই সাম্রাজ্যবাদীরা ধর্মকে উৎসাহিত করেছে। ওরা আস্তিক ও নাস্তিকের বিষয়টি তুলে আনতে পেরেছে যাতে মানুষের মধ্যে বৈষম্য এবং ভেদাভেদ তুলে আনা যায়।

শ্যামল : পৃথিবীর প্রায় ১৬ ভাগ মানুষ নাস্তিক। আস্তিকরা বলে, নাস্তিকরা ধর্ম বিশ্বাস করে না-এরা কাফের। বিশ্বব্যাপী ওরা এই যে প্রভাব ফেলছে, এর প্রভাব সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশেও পড়েছে। সেটা সূদুর ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকেই। না হলে প্রায় ৭ কোটি ভিন্নধর্মাবলম্বী মানুষকে দেশত্যাগ করতে হতো না। আপনি এই বিষয়টি কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : দেশ ভাগ তো রাজনৈতিক ব্যাপার। কিন্তু ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করাটা ওই পুঁজিবাদীদের কাজ। এবং ধরো, এই উপমহাদেশে ধর্মের ভিত্তিতে যে রাজনৈতিক বিভাজন ছিল সম্প্রদায়গত। শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্তের সাথে মুসলিম মধ্যবিত্তের একটা দ্বন্দ্ব ছিল। তখন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব শুরু হয় এই বলে যে, ওরা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, আমরা মুসলমান, আমরা প্রতিষ্ঠিত হতে পারিনি। এই দ্বন্দ্বটাকে ইংরেজরা উৎসাহিত করেছে। ১৮৮৫ সালে তাদের উৎসাহে ভারতে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তখন বুঝানো হয়েছিল- এটা হবে মধ্যবিত্ত মানুষের মুখপত্র। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস কখনো মেহনতী মানুষের কথা বলেনি। এরপর সাম্প্রদায়িকতাকে একটি ধর্মীয় চেহারা দেওয়া হলো। এবং এই চেহারাকে উৎসাহিত করলো ইংরেজরা। এবং ১৯০৬ সালে এই ঢাকা শহরে মুসলিম লীগ গঠিত হলো; ওই ইংরেজদের পরামর্শে। মুসলমানরা যদি আলাদা একটা সংগঠন করে তাহলে তোমাদের সুবিধা হবে। ফলে ইংরেজ বিরোধীতার পরিবর্তে তখন মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস বিরোধীতা শুরু হলো। যেটা হওয়া উচিত ছিল সেটা হলো না। শুরু হলো সাম্প্রদায়িকতা। শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছালো যে দেশটা ভাগ হয়ে গেল। না হলে দেশটা ভাগ হওয়ার কোন কারণ ছিল না। ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধে আমাদের পরাজয়ের পর; আমাদের সবচেয়ে বড় পরাজয় হল ১৯৪৭ সালের দেশভাগ।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে শ্যামল চন্দ্র নাথ


শ্যামল : আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। এবং আপনি পরপর দুই বার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু আপনি কেন তা গ্রহণ করলেন না।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : না, আমি সব সময় নিজেকে শিক্ষক হিসেবে দেখার চেষ্টা করেছি। আমি প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করব কখনও মনে করিনি। যেমন ধরা যাক; আমি বিভাগের চেয়ারম্যান হয়েছি; আবার বিভাগীয় ডীন হয়েছি। কিন্তু ভাইস চান্সেলর হওয়ার পুরোপুরি যে দায়িত্ব তার প্রতি আমার আগ্রহ ছিল না। তাহলে জিজ্ঞেস করা যেতে পারে, কেন আপনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন? আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলাম একটা আদর্শগত কারণে। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে স্বায়ত্তশাসন, সে শাসনের প্রধান একটা বিষয় হলো নির্বাচন। আমি ওই কাঠামোর সাথে জড়িত ছিলাম না। আমি সব সময় প্রতিষ্ঠানবিরোধী যে ধারা সে ধারার সাথে যুক্ত ছিলাম। উপাচার্য নির্বাচনের জন্য যে প্যানেল তৈরি হয় সে প্যানেলে আমার নাম ছিল। আমরা তো সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিনি। আমরা সংগ্রাম করেছিলাম স্বায়ত্তশাসনের জন্য। বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে এই স্বায়ত্তশাসন আসতো না কখনও। আমরা আশা করেছিলাম, গণতান্ত্রিক একটা ধারা দেশে তৈরি হবে; বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি হবে। আমরা ওই গণতান্ত্রিক ধারার সামনে একটা দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে চেয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কীভাবে নির্বাচিত হবেন বা হন। তবে তাদের মধ্যে মতাদর্শাগত পার্থক্য থাকবেই। শিক্ষকদের যদি মতাদর্শ না থাকে তবে কাদের থাকবে? আমাদের চিন্তা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বায়ত্তশাসন। এর মূল দাবিই হবে শিক্ষাগত যোগ্যতা। এজন্য আমার মধ্যে উপাচার্য হওয়ার চিন্তা ছিল না।

শ্যামল : আপনি অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনায় বিশ্বাস করেন। আপনি বিভিন্ন সময় বাক-স্বাধীনতার কথা বলেছেন; মানবাধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের কথাও অনেকবার বলেছেন। কাজগুলো করতে গিয়ে আপনাকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা মনে পড়ে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : এটা তো আমরা পাকিস্তান আমল থেকেই শুরু করেছি একজন শিক্ষক হিসেবে। আমাদের অবস্থানটা তখন ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো ২০০১ সালে পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন। এটি আমার জীবনের একটি স্মরণীয় আন্দোলন। যাতে আমরা সফল হয়েছিলাম। এটি হয়েছিল ওসমানী উদ্যানে গাছ বা বৃক্ষ রক্ষা আন্দোলন হিসেবে। ওখানে একটা মিলনায়তন তৈরি করা হয়। কিন্তু এখন ওখানে চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র। আমরা যেটা বলতে চেয়েছি-  প্রত্যেক বড় শহরে একটা উদ্যান থাকে। ওই আন্দোলনটা সফল হয়েছিল।

শ্যামল : একটু পিছনের দিকে যাচ্ছি; ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানে কংগ্রেসের যে জাতীয় গণপরিষদের সম্মেলন হয়েছিল সেই সম্মেলনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রথম বাংলা ভাষার দাবি তোলেন। এরপর ১৯৪৯, ৫০, ৫১ এবং ১৯৫২ সালের যে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল এর সাক্ষী আপনিও ছিলেন।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : আমরা ১৯৪৭ সালে ঢাকা চলে আসি। এরপর ১৯৪৮ সালে জিন্নাহ যখন ঘোষণা দিলেন উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। আমি তখন ছোট। এবং আমিও ওখানে উপস্থিত ছিলাম। কথাটা বলেই তিনি স্টেজ থেকে দ্রুত নেমে গেলেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকেই বোঝা গেল- বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। সব দিক থেকে তারা শোষণ এবং শাসন করতে লাগলো। সামরিক বাহিনীর পুরোটাই ছিল পাকিস্তানীদের হাতে। ফলে আমরা আর কোথায় স্বাধীন হলাম দেশভাগের ফলে!

শ্যামল : আপনি তো ১৯৫৭ সালে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন। শিক্ষা জীবনের কোনো ঘটনা মনে পড়ে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে আসি তখন আমাদের অভিভাবকরা ভাবতেন অর্থনীতি হচ্ছে সবচেয়ে ভালো বিষয়। আমাদের সময় এখনকার মতো চাকরির সমস্যা হতো না। আমি অর্থনীতিতে প্রায় ভর্তি হয়ে গিয়েছিলাম। পরে সিলেবাসে দেখলাম যে, আমাকে কী কী বিষয় পড়তে হবে। আমার যারা সহপাঠী তারা সায়েন্স থেকে এসেছে। আমি ওই সিলেবাস দেখে ঘাবড়ে গেলাম। আমি তো সায়েন্স পড়িনি। তখন আমরা দেয়াল পত্রিকা করি, লেখালেখি করি। আমি বাবাকে বললাম, আমি বাংলা সাহিত্য পড়বো। কিন্তু বাবা বললেন, না, তুমি ইংরেজি পড়ো। ইংরেজি পড়তে এই কারণে বললেন যে, তাঁর ধারণা ইংরেজি পড়লে চাকরিতে সমস্যা হবে না। আমি বাবার কথা মেনে নিলাম।

শ্যামল : আপনি শিক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আমি জানতে চাচ্ছি যে, আমাদের যে তিন স্তরবিশিষ্ট শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, এটা সমাজে কেমন প্রভাব ফেলছে বলে আপনি মনে করেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : এটা মোটেও কাম্য ছিল না। যেহেতু রাষ্ট্রভাষা বাংলার জন্য আন্দোলন করেছি, সেহেতু শিক্ষা হবে একমুখী বা এক ধরণের শিক্ষাব্যবস্থা। এর বাইরে যে শিক্ষা চলবে এটা আমরা ভাবতেই পারিনি। মাতৃভাষার কোনো বিকল্প নেই। বাঙালি যেখানে একটা রাষ্ট্রভাষা গঠিত করলো সেখানে বাঙালির শিক্ষা কাঠামো হবে মাতৃভাষার উপর ভিত্তি করে। এই যে তিন স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে এর মূল কারণ হলো শ্রেণী বিভাজন। যারা উচ্চবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত তাদের ছেলেমেয়েরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়ছে। আর মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তরাই নিচ্ছে সাধারণ শিক্ষা, আর মূলত গরিবরাই নিচ্ছে মাদ্রাসা শিক্ষা। মাদ্রাসা শিক্ষায় সরকারি যে অনুদান তা সাধারণ শিক্ষার চেয়ে বেশি। আবার উচ্চবিত্ত শ্রেণীর কিছু মানুষেরা এখানে টাকা দেন এবং তারা মনে করেন, তারা ভালো কাজ করলেন। কিন্তু তাদের ছেলেমেয়েরা ঠিকই ইংরেজি মাধ্যমে পড়ছে। এই যে শ্রেণী বিভাজন, এটা মারাত্মক। বাংলাদেশে যে শ্রেণী বিভাজন থাকবে এটা কল্পনাতীত। মানুষে মানুষে মেধার পার্থক্য থাকবে। সকল মানুষের জন্য সমান সুযোগ থাকবে, সমান স্বাধীনতা থাকবে। শিক্ষার মূল্য উদ্দেশ্য হলো ঐক্য। কিন্তু শিক্ষার মাধ্যমেও আমরা শ্রেণী বিভাজন করে ফেলছি। আমরা যদি মাতৃভাষার প্রতি মনোযোগী হতাম তা হলে আর এই সমস্যা হতো না।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৫ জুন ২০১৯/তারা

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       

Walton AC
Marcel Fridge