ঢাকা, রবিবার, ২০ আষাঢ় ১৪২৭, ০৫ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

সুমনার বৈচিত্র্যের মাঝে ‘বৈচিত্র্য’

স্টার্লিং ডি মামুন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৪-২৪ ৪:২৬:৪৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৪-২৪ ৪:২৬:৪৭ পিএম
রোকেয়া পারভীন সুমনা

যদি ইচ্ছাশক্তি থাকে, তবে কঠিন সব বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়া যায়। প্রকৃতির বৈচিত্র্যময়তার সাথে সাথে মানুষের জীবনটাও বৈচিত্রে ভরপুর। সেই বৈচিত্রময় জীবনকে আরও সুন্দর অর্থবহ করতেই আমাদের নানা প্রচেষ্টা৷ জীবনের ক্যানভাসে বৈচিত্র্য সব ছবি আঁকা তো শিল্পীর কাজ। তেমন একজন স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদান করা তরুণী রোকেয়া পারভীন সুমনা।

সুমনা পদ্মার পাড়ের শহর, সুন্দর ও পরিচ্ছন্নতার এক মায়াময় শহর রাজশাহীতে জন্ম। দাদা বাড়ি আর নানা বাড়ি দুটোই রাজশাহীতে। বাবা-মায়ের ঢাকায় বসবাসের সুবাদে ঢাকাতেই বেড়ে ওঠা। যাদুর শহরে দেখেছেন নানা বৈচিত্র। জীবনকে যদি কেউ কাছ থেকে দেখতে চান৷ ঢাকা তার সব চেয়ে সুন্দর জায়গা। যেখানে পাশাপাশি জীবনের এপিঠ-ওপিঠ দেখতে পাওয়া যায়।

খুব অল্প বয়সে পারিবারিক সিদ্ধান্তে বিয়ে করেন সুমনা। অদম্য ইচ্ছা আর নিজেকে শিক্ষিত করে বড় করার দৃঢ় প্রত্যয়ে চালিয়ে গেয়েছেন সংসার জীবনের পাশাপাশি পড়া লেখাটাও। বিয়ে করেছিলেন যৌথ পরিবারে তাই অনেক ঝামেলা সংগ্রাম করেই পড়াশোনা চালাতে হয়েছে। চেষ্টা আর ধৈর্যের ফলস্বরূপ শেষ করেছেন অনার্স, তারপর ইন্টেরিয়রের উপর চার বছর ডিপ্লোমা।

স্বপ্নবাজ রোকেয়া পারভীন সুমনার পরিবার সংস্কৃতিমনা। তার বাবা খুব ভালো ছবি আঁকতেন, আর মা গান গাইতেন। তাই পারিবারিকভাবেই ছবি আঁকা আর গান শেখা দুটোই বাধ্যতামূলক ছিল বাসায়। তবে সময়ের সাথে সাথে গানটা বন্ধ হয়ে যায়। আঁকাআঁকি থেকে যায় জীবনে।

পঁচানব্বই-ছিয়ানব্বইয়ের দিকে এখনকার মতো কম্পিউটার-ল্যাপটপ এতটা সহজলভ্য ছিল না, তখন জীবনও এত সহজ ছিল না। তখন তার বাবা হাতের কাজ শেখানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের বই আনতেন, ভিডিও ক্যাসেট আনতেন। ম্যাগাজিন আনতেন সেগুলো দেখে দেখেই প্রাথমিকভাবে আঁকতে শিখেছেন। সেই সূত্রেই খুব ভালো লাগতো হাতের কাজ শেখাটা। প্রচনণ্ড রকমের নেশার মতোই কাজ করতো সেগুলো।

এরপর বিয়ে, পড়াশোনা, চাকরি এসবের ভিড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলেন। চাকরি করতেন ইন্টেরিয়র ফার্মে। নিজে কিছু করবেন সেরকম চিন্তা থেকেই চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় আশা।

চাকরি ছেড়ে কেন ব্যবসায় আসা প্রশ্ন করা হলে সুমনা বলেন, ‘এক কথায় যদি বলি স্বাধীনভাবে নিজেকে পরিচালিত করতে ও নিজেকে উপলব্ধি করার জন্যই ব্যবসায় আশা।’

চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর অনেকগুলো প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, যাতে ব্যবসার জন্য নিজেকে ভালোভাবে প্রস্তুত করা যায়। এরপর পরিকল্পিত ব্যবসায়ীক পরিকল্পনা করে ব্যবসা শুরু করেন তিনি।

জীবন মানেই বৈচিত্র্য তাই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম দেন ‘বৈচিত্র্য’। স্বপ্নবাজ সুমনার আছে একটা নিজস্ব ফ্যাক্টরি। কোনো শো-রুম নেই। তারা প্রডাকশন করেন মূলত যাদের শো-রুম আছে তাদের জন্য। বৈচিত্র্যপূর্ণ কারুকার্য করেন সোনালী আশ পাটের ব্যাগ এবং বিভিন্ন পোশাকে। দেশের বিভিন্ন শো-রুম মালিক ও বায়ারদের অডার্র বেসিস কাজ করেন।

‘বৈচিত্র্য’ যাত্রা শুরু করে ২০১২ সালে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানে ৬ জন কর্মচারী আছেন। তবে, অর্ডারের উপর ভিত্তি করে চুক্তিভিত্তিক অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয় মাঝে মাঝেই। বর্তমানে তিনি একদিকে যেমন একজন উদ্যাক্তা, সাথে সাথে একজন প্রশিক্ষকও। রোকেয়া পারভীন সুমনা পাটমন্ত্রণালয় (জেডিপিসি), মাইডাস এবং বাংলাদেশ সরকারের কিছু প্রজেক্টে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন সুনামের সাথে।

স্বপ্নবাজ এই তরুণী বলেন, ‘বৈচিত্র্য হলো আমার ভালোবাসা আর প্রশিক্ষণ হলো আমার ভালো লাগা। তাই এই দুটোই আমার জন্য অনেকটা সন্তানের মতোই। আমি যখন বিভিন্ন জেলায় প্রশিক্ষণ দিয়ে আসি, আমার ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্য থেকে যখন কেউ নিজের একটা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে পারেন, তখন অনেক বেশি ভালো লাগা কাজ করে। আমি সব চেয়ে বেশি আনন্দ পাই।’

‘উদ্যোক্তা যখন তার প্রতিষ্ঠানকে সন্তান ভাবে, তখন সে সফল হয় এজন্য যে, সন্তান জন্ম দেওয়ার পর যেমন একা একা বড় হতে পারে না। সুস্থ্য থাকতে পারে না। তাকে অনেক আদর যত্ন করে আমরা লালন-পালন করি। ঠিক সেভাবে ব্যবসাকেও লালন পালন করতে হয়। এক লাফে কেউ বড় হতে পারে না’, বলেন সুমনা।

একজন উদ্যোক্তার প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে অনেক চিন্তা-ভাবনা করে পা ফেলতে হয়, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারাটাই ব্যবসার জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি মনে করেন, একজন উদ্যোক্তার সব চেয়ে বড় সম্পদ তার মনোবল, ধৈর্য ও লেগে থাকার মানসিকতা। তাই যত বাঁধাই আসুক না কেন, মনোবল হারানো যাবে না।

মনে রাখবেন আপনি যখন এক পা এক পা করে সিঁড়িতে উঠতে থাকবেন, তখন আপনার পেছনের মানুষগুলো আপনাকে টেনে ধরে রাখতে চাইবে। তাই পেছনে টেনে ধরে রাখার মানুষগুলোর সঙ্গে সময় নষ্ট না করে আপনি এগিয়ে যান। দেখবেন, সফলতা ধরা দেবে। জীবন মানেই যুদ্ধ, তাই যুদ্ধ করেই এগিয়ে যেতে হবে।

লেখক: তরুণ উদ্যোক্তা।



ঢাকা/হাকিম মাহি