ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

সুরক্ষা মেলেনি আইনে, বেড়েছে গ্রেপ্তার

এম এ রহমান মাসুম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-০১ ৮:৩৯:৫৬ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০১-০২ ৬:১৯:৪৬ পিএম

যে কোনো পর্যায়ের সরকারি কর্মচারীকে গ্রেপ্তারে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমতি লাগবে এমন নতুন বিধানে উৎসাহিত হয়েছিল দুর্নীতিবাজরা। তাদের ধারণা ছিল ঘুষ-দুর্নীতির সাথে জড়িত হলেও অন্তত গ্রেপ্তার হতে হবে না। তবে সেই খুশি বেশিদিন স্থায়ী হতে দেয়নি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

সরকারি চাকরি আইনের নতুন ধারাকে অনেকটা চ্যালেঞ্জ করে ফাঁদ পেতে ঘুষখোর ধরা কিংবা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করেছে নিয়মিত।

বছর শেষে এক হিসাবে দেখা গেছে ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে আসামি গ্রেপ্তার ও ঘুষের ফাঁদে আটকের সংখ্যা বেড়েছে। বছরজুড়ে বিভিন্ন দু্র্নীতি মামলা ও ঘুষসহ হাতে-নাতে গ্রেপ্তারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মোট ১২৩ জন। যার মধ্যে ফাঁদে আটকে যায় ২৫ ঘুষখোর। যেখানে ২০১৮ সালে ফাঁদে ১৫ জনসহ মোট গ্রেপ্তার ছিল ৫৭ জন।

যদিও বাংলাদেশে সরকারি চাকরি আইনে ৪১(১) ধারা ২০১৯ সালের ১ অক্টোবর কার্যরকর হওয়ার পর সংস্থাটির চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘ঘুষ আদান-প্রদান কি সরকারি দায়িত্ব? ঘুষ খাওয়া কি সরকারি দায়িত্বের মধ্যে পড়ে? আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ঘুষ খাওয়া সরকারি দায়িত্ব নয়। এখানে ভুল বোঝাবুঝির কোনো অবকাশ নেই। মহান সংসদে যেসব আইন পাস হয়, তার প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা রেখেই দায়িত্ব পালন করছে কমিশন।’

২০১৮ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশে সরকারি চাকরি আইন ২০১৮ প্রণীত হওয়ার পর কার্যকর হয় ২০১৯ সালের ১ অক্টোবর। এ আইনের ৪১(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব পালনের সহিত সম্পর্কিত অভিযোগে দায়েরকৃত ফৌজদারি মামলায় আদালত কর্তৃক অভিযোগ গৃহীত হইবার পূর্বে, তাহাকে গ্রেপ্তার করিতে হইলে, সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি নিতে হইবে৷'

আইনটি কার্যকর হওয়ার ছয় দিনের মাথায় ঘুষের টাকাসহ ঠাকুরগাঁওয়ে সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আনিছুর রহমান ও ওই কার্যালয়ের অফিস সহকারী জুলফিকার আলীকে দিনাজপুর দুদকের সমন্বিত কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আবু হেনা আশিকুর রহমানের নেতৃত্বে একটি আটক করে। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় দুদক চেয়ারম্যান দাবি করেছিলেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া তাদের আটকে আইনের ব্যত্যয় ঘটেনি।

দুদকের গ্রেপ্তার অভিযান ও ফাঁদ পেতে ঘুষখোর আটকের বিষয়ে এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত তিন বছরে বিভিন্ন দুর্নীতি মামলার মোট গ্রেপ্তার হয় ৭৪৯ জন আসামি। এর মধ্যে ২০১৬ সালে সর্বাধিক ৩৮৮ জন আসামিকে গ্রেপ্তার হয়। এরপরই গ্রেপ্তার সংখ্যার বিচারে ২০১৭ সালে মোট আসামি গ্রেপ্তার হয়েছিল ১৮২ জন।

২০১৮ সালে ওই সংখ্যা অনেকটা হ্রাস পেলেও ২০১৯ সালে আবার বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৯ সালে দুর্নীতির বিভিন্ন মামলায় মোট আসামি গ্রেপ্তার হয় ১২৩ জন। যেখানে সব মিলিয়ে বিভিন্ন দুর্নীতির মামলায় ২০১৮ সালে ৫৭ জন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছিল। ২০১৯ সালে গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ব্যাংক কর্মকর্তা, ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সাব-রেজিস্ট্রার, কর কর্মকর্তার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি রয়েছে।

সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে ফাঁদের মাধ্যমে ঘুষখোর আসামি গ্রেপ্তারের সংখ্যা কমলেও ২০১৯ সালে এই সংখ্যা বেড়েছে। ফাঁদের মাধ্যমে ঘুষসহ গ্রেপ্তার হয় ২৫ জন। যেখানে ২০১৮ সালে ফাঁদ পেতে ১৫ জন ও ২০১৭ সালে ২৪ জন সরকারি বিভিন্ন কর্মকর্তা পর্যায়ের ঘুষসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে সংস্থাটির বিভিন্ন টিম।

এ বিষয়ে ইকবাল মাহমুদ রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘দুর্নীতি সর্বগ্রাসী, সর্বভূক এবং ধ্বংসাত্মক অপরাধ। এটি এমন অপরাধ যার প্রভাব সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির ঘটনা ঘটলে, অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে এর প্রভাব পড়ে। কমিশন মামলা করছে, গ্রেপ্তার করছে এবং কোনো কোনো মামলায় সাজাও হচ্ছে। এগুলোকে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের প্রদর্শন বলা যেতে পারে। যাতে অন্যরা দুর্নীতি করতে সাহস না পায়।’

বিতর্কিত আইনটি নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) শুরু থেকেই কিছু বিষয় নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে। টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, সরকারি চাকরি আইন নামটিই সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আইনে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব কর্তৃত্ব সরকারের কাছে রাখা হয়েছে, যা ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী-এই সাংবিধানিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

ব্যাপক সমালোচনার মুখে সরকারি চাকরি আইন ২০১৮ কার্যকর হওয়ার কিছুদিন পর জনস্বার্থে উচ্চ আদালতে রিট হলে ৪১(১) ধারায় ২০১৯ সালের ২১ অক্টোবর রুল ইস্যু করা হয়। রুলে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এর ৪১(১) ধারা কেন বেআইনি ও বাতিল ঘোষণা করা হবে না এবং সংবিধানের ২৬(১) (২),২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চায় আদালত।

মন্ত্রীপরিষদ সচিব, রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের সচিব, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, আইন সচিব এবং জাতীয় সংসদের স্পিকারকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়। যা এখন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে বলে জানা গেছে।

২০১৮ সালের ১৪ নভেম্বর সরকারি চাকরি আইনের গেজেট জারি হয়। এরপর ২০১৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর এক গেজেটে বলা হয়-১ অক্টোবর থেকে এ আইন কার্যকর হবে।



ঢাকা/এম এ রহমান/সনি

     
 
রাইজিংবিডি স্পেশাল ভিডিও