ঢাকা, সোমবার, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬, ১৪ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

সুর || শাহ্‌নাজ মুন্নী

: রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৫-০৭-১০ ৬:০৬:৩৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৬-০৯-০৫ ৩:০৯:০৫ এএম

অলংকরণ : অপূর্ব খন্দকার

কালো রঙের গোলাকার গ্রামোফোন রেকর্ডে বার বার ঘুরে ঘুরে বেজে চলছে নাহিদের গাওয়া গান- ‘আকাশের ওই মিটিমিটি তারার সাথে কইবো কথা, নাইবা তুমি এলে...।’ বাংলা উচ্চারণ নিখুঁত ভাবেই করেছে নাহিদ, অনেক সময় দিয়ে, অনেক কষ্ট করে বাংলা ভাষা আয়ত্ব করেছে সে। গানের মেজাজ বুঝে সেই মতো গলায় যথাসাধ্য আবেগ ঢালারও চেষ্টা করেছে, তবু মুসলেহউদ্দিনের কেন যেন বার বার মনে হচ্ছে যদি নাহিদ বাংলাভাষী হতো তাহলে গানটায় হয়তো আরো নতুন কিছু মাত্রা যোগ হতো।

‘...তোমার স্মৃতির পরশ ভরা অশ্রু দিয়ে গাঁথবো মালা নাইবা তুমি এলে...।’ নাহিদের কণ্ঠ সুমিষ্ট, তাছাড়া ওর কণ্ঠে এক ধরনের বলিষ্ঠতাও আছে, মুসলেহউদ্দিন সেটা পছন্দ করেন। নূরজাহান, আইরিন পারভীন বা সুরাইয়া, যারা এখন পাকিস্তানের সংগীত জগতে গান করে বেশ নাম করেছে, তাদের পাশাপাশি  নাহিদের নাম সমীহের সঙ্গেই উচ্চারণ করা হয় আজকাল। অন্য সব গানের মতো এই গানটাও নিজের সাধ্য অনুযায়ী খুব দরদ ঢেলেই গেয়েছে নাহিদ। মুসলেহউদ্দিন চোখ বন্ধ করে আরাম কেদারায় গা এলিয়ে আবার নাহিদের গাওয়া গানের দিকে মনোযোগ দেন।

‘সেই শেফালিরও সনে চুপি চুপি কথা, মন বাতায়নে সুরের জাল গাঁথা, আধো লাজে আধো ভয়ে, আমি কিছু বলিনি তো, তুমি কিছু জাননি তো... না জানা না বলার ব্যথা, রয়ে গেল অগোচরে।’ পূর্ব পাকিস্তানে খুব জনপ্রিয় হয়েছে গানটা। রেডিও পাকিস্তানে প্রায়ই শ্রোতারা এই গান শোনার জন্য অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠায়। অনেক দিন ধরে কত গানই তো লিখেছেন আর সুর দিয়েছেন মুসলেহউদ্দিন। কিন্তু এই গানটা লিখে আর সুর করে অন্য রকম একটা তৃপ্তি পেয়েছেন তিনি।
‘সেই হারানো দিনগুলি যদি মনে পড়ে, ভুলে যেয়ো ওগো সবই চিরতরে, আমার গোপন ব্যথা, তুমি কভু জেনো না গো, আমায় কভু চেয়ো নাকো, না জানা, না চাওয়ার কথা, মুছে যাবে কোন ক্ষণে...।’  
কিন্তু স্মৃতি কি সত্যি মুছে যায়? ব্ল্যাকবোর্ডে সাদা চকের লেখা যেমন সহজেই মুছে ফেলা যায় তেমন করে?  নইলে, জানালার ফাঁকে উঁকি দেওয়া লাহোরের মেঘাছন্ন আকাশের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ ঢাকার আকাশের কথা মনে পড়বে কেন মুসলেহউদ্দিনের? সেই কবেই তো ঢাকাকে পেছনে ফেলে এসেছেন তিনি, কিন্তু আসলে তো ফেলতে পারেন নাই বরং বুকের ভেতরে করে এই লাহোর পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন। ঢাকার গান পাগল বন্ধুদের কথাও মনে পড়ে তার। সুরকার রবিন ঘোষ, বংশীবাদক শওকত আলী, বুদ্ধিমান মওদুদ আহমেদ, সিনেমা পাগল জহির রায়হান আরো কত তুখোড়, চৌকশ, উজ্জ্বল সব মুখ।

‘শুনছো, ইউনুস ভাই ফোন করে জানালো, তুমি এইবার প্রেসিডেন্ট প্রাইড অফ পারফরমেন্স অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছো... কি খুশির খবর, বলো...।’
নাহিদের গলা শুনে আকাশ থেকে মাটিতে নেমে আসে মুসলেহউদ্দিন। নাহিদের মুখ আনন্দে ঝলমল করছে। এমনিতেই সে দারুণ সুন্দরী। তার সেই সুন্দর মুখে হরিণীর মতো টানা টানা চোখ দুটিতে খুশির ঝিলিক। ফর্সা গালে ছড়িয়ে পড়েছে গোলাপী আভা। নাহিদ ছুটে এসে মুসলেহউদ্দিনকে জড়িয়ে ধরে, কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে, ‘কেয়া, তুম খুশ্ নেহি হো ...।’
পুরস্কার পাওয়ার সংবাদে নয় বরং মুসলেহউদ্দিনের ভাল লাগে নাহিদের আনন্দ দেখে। তিনি দুষ্টুমী করে গেয়ে উঠেন, ‘তুমি হেসে হেসে কথা বলো যবে, মনের গহনে এক মাধুরী জাগে...।’
স্বামীর সাথে তাল মিলিয়ে নাহিদও গুণগুন করে, ‘কোন মধুর লাজে আমি চুপটি বসে শরমে লুকাই আঁখি অনুরাগে।’
মুসলেহউদ্দিন গানের সুর করা নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকেন। কণ্ঠ দেন খুব কম। তবে এই বাংলা গানটা দু’জন মিলে ডুয়েট করেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের তরুণ চিত্রপরিচালক সুভাষ দত্তের অনুরোধ রাখতে গিয়ে। ‘ওগো সোনার মেয়ে, যাও গো শুনে মৃদু কাঁকনেরও রিনিঝিনি বাজিয়ে’- এই ছিল গানের প্রথম কলিগুলো। এই গানটাও পূর্ব পাকিস্তানে খুব জনপ্রিয় হয়েছে।

‘আমি আব্বুজিকে খবরটা জানিয়ে আসি।’ বলেই ছুটে বেরিয়ে যায় নাহিদ।
নাহিদের আব্বুজি মুসলেহউদ্দিনের শ্বশুর পাকিস্তানের নামজাদা কবি সাজ্জাদ সারোয়ার নিয়াজি। রেডিও পাকিস্তান, করাচির এক সময়কার জাঁদরেল ডিরেক্টর। এই মানুষটার প্রতি কৃতজ্ঞতার সীমা-পরিসীমা নেই মুসলেহউদ্দিনের। পশ্চিম পাকিস্তানের গানের জগতে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য লড়াইরত পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা এক অপ্রতিষ্ঠিত কপর্দকশূন্য তরুণ সুরকার আবুল কাশেম মোহাম্মদ মুসলেহউদ্দিনকে পিতৃস্নেহে নিজের বুকে আশ্রয় দিয়েছিলেন তিনি। সব সময় বলতেন, ‘মুসলেহ তুমহারি ম্যুজিকি মে যাদু হ্যেয়্, তুম বহুত দূর যাও গি।’
তার দুই মেয়ে নাহিদ আর নাজমা তখন ভাল গান করে। মেয়েদের তিনি পরিচয় করিয়ে দিলেন মুসলেহউদ্দিনের সাথে। বললেন, ‘দুই মেয়ের গলায় গানগুলো একটু ধরিয়ে দিতে।’ আর সব বাবাদের মতোই সাজ্জাদ চাইতেন, তার মেয়েরা সুরের আকাশের অনেক উঁচুতে পাখির মতো ডানা মেলে মুক্তভাবে উড়ে বেড়াক। অবশ্য নাহিদের চমৎকার সুরেলা কণ্ঠ প্রথম শুনেই মুগ্ধ হয়েছিলেন মুসলেহউদ্দিন। নাহিদ ততদিনে  খুরশিদ আনোয়ারের সুরে দু’য়েকটা ছবিতে প্লেব্যাক করে খানিকটা পরিচিতি পেয়েছে।

পরে, পশ্চিম পাকিস্তানের ফিল্মী জগতের রুক্ষ মাটিতে যখন মুসলেহউদ্দিন ব্রেক পেলেন, ‘আদমী’ছবিতে সুর করার জন্য, তখন গায়িকা হিসেবে নাহিদকেই বেছে নিলেন তিনি। আর অসাধারণ গেয়ে চারপাশে তাক লাগিয়ে দিল নাহিদ। গান আর ফিল্ম দু’টোই সুপার হিট হলো।  এরপর ‘জামানা কেয়া কাহেগা’ছবিতে আহমেদ রুশদির সঙ্গে ‘রাত সালোনি আয়ে, বাত আনোখি আয়ে’ ডুয়েট করলো নাহিদ। গানে ঠোঁট মেলালেন নায়িকা শামীম আরা। যথারীতি গানের কমপোজার, সুরকার মুসলেহউদ্দিন। পাকিস্তানের পত্র-পত্রিকাগুলোতে নাহিদ সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে লেখা হলো, ‘তার চমৎকার উপভোগ্য তুলনাহীন কণ্ঠ শ্রোতাদের সম্মোহন আবেশে ভরিয়ে তুলেছে।’
কিন্তু পাঞ্জাবি মেয়ে নাহিদ নিয়াজি সম্ভবত সম্মোহিত হয়েছিল বাঙালি সুরস্রষ্টা মুসলেহউদ্দিনের অপূর্ব সুরের মায়ায়। মুসলেহউদ্দিন ছিলেন সেই সময়কার একজন অসাধারণ প্রতিভাবান সঙ্গীতকার। প্রাচ্য আর পাশ্চাত্য দু’ধরনের সংগীত সম্পর্কেই তার ছিল অগাধ জ্ঞান। একই সঙ্গে হারমোনিয়াম, পিয়ানো আর একোর্ডিয়ান বাজাতে পারতেন মুসলেহউদ্দিন।  তাঁর রূপ, গুণ, রুচি, ব্যক্তিত্ব সব কিছুর প্রতিই তুমুল আকৃষ্ট হয়েছিল তরুণী নাহিদ। আর মেধাবী সুরস্রষ্টা মুসলেহউদ্দিন, যে ছিল সুরের দুনিয়ার পথভোলা এক পথিক কিংবা ঘরছাড়া এক উদাস, নাহিদের সেই অমোঘ উজ্জ্বল আকর্ষণ উপেক্ষা করার শক্তি তার’ও হয়তো ছিল না। এই দু’জন যখন জোড় বাঁধলো তখন তাকে মণি-কাঞ্চন যোগ বলেই মনে করলো সবাই। আর যোগ্যের সঙ্গে যোগ্যের সার্থক মিলনে পাকিস্তানের সংগীত জগতে সৃষ্টি হলো নতুন আলোড়ন। নাহিদের কণ্ঠের মাধুর্য আর মুসলেহউদ্দিনের অপূর্ব সুরের কারুকাজে নির্মিত হতে থাকলো অসাধারণ সব হৃদয় মাতিয়ে দেওয়া গান।

মুসলেহউদ্দীন বাংলা ভালবাসেন, বাংলা গান লেখেন, সুর করেন, সেই কারণে অনেক আগ্রহ নিয়ে, অনেক পরিশ্রম করে বাংলা শিখলো নাহিদ। কণ্ঠ দিলো বাংলা গানেও। সে ক্ষেত্রেও বাজিমাৎ করলো তাদের জুটি।
বিয়ের পরই প্রথম মুসলেহউদ্দিনের সঙ্গে পূর্ব বাংলায় যায় নাহিদ। তাদের হানিমুনের জন্য করাচি, মুম্বাই বা গোয়া বীচ নয় মুসলেহউদ্দিন পছন্দ করেছিলো কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত। নাহিদের পাকিস্তানি বান্ধবীরা তা শুনে নাক কুঁচকে বলেছিল, ‘ওখানে আছেটা কি? একটা ভাল হোটেলও তো নেই শুনেছি।’
কিন্তু মুসলেহউদ্দীনের পছন্দকে অসম্মান করেনি নাহিদ। পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতে ঢেউয়ের শব্দ শুনে আর ফেনীল নোনা পানিতে পা ভিজিয়ে নাহিদের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে মুসলেহউদ্দিন বলেছিল, ‘এখানকার এই নিরাভরণ আর অকৃত্রিম সৌন্দর্যটাই আমার খু-উ-ব পছন্দ।’
ওরা উঠেছিল দু’কামরার একটা সাধারণ গেস্টরুমে। অথচ কি অসাধারণ দু’টো দিন তারা কাটিয়েছিল সেখানে।  

মুসলেহউদ্দিনের টেবিলে ঝনঝন করে টেলিফোন সেট বেজে ওঠে। অভিনন্দন জানিয়ে ফোন করছেন সবাই। মুসলেহউদ্দিন অভিনন্দন গ্রহণ করছেন ঠিকই কিন্তু মনের কোণায় জমে ওঠা কালো মেঘটা কিছুতেই কাটছে না তার। দু’দিন আগে তার আর্মি বন্ধু খাদিম হোসেনের সাথে কথা হচ্ছিলো, খাদিম কিছুদিন আগে ঢাকা থেকে ফিরেছে। কথায় কথায় সে বলছিলো, ‘‘বুঝলে ইয়ার, পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অবস্থা আমার ভাল ঠেকছে না। হালত বহুত খারাব হ্যায়! তুমি কি জানো, বাঙালিরা পশ্চিম পাকিস্তানিদের ‘শালা পাঞ্জাবি’ আর বিহারিদের ‘শালা বিহারি’বলে ডাকে।’’
খাদিম আরো বলছিলো, পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি যে কোন সময় বিস্ফোরণের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিব বাঙালিদের সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখিয়ে খেপিয়ে তুলছে।
এমনিতে রাজনীতি নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামান না মুসলেহউদ্দিন, নিজের সুরের ঘোরেই সারাক্ষণ বুঁদ হয়ে থাকেন। কিন্তু খাদিমের সেদিনকার কথাগুলো কাঁটার মতো বুকের কোণায় বিঁধে আছে তার। সামনে কি তাহলে কোন বিপর্যয় ঘনিয়ে আসছে? খাদিমের কথার আড়ালে কোন বিধ্বংসী ঝড়ের পূর্বাভাস কি লুকিয়ে ছিল?

এমনিতে সবকিছুই তো কত সুন্দর। কত স্বাভাবিক! নাহিদ ভোর বেলা রেওয়াজ শেষ করে তাদের ছেলে ফয়সালকে কোলে নিয়ে আদর করছে। মুসলেহউদ্দীনের চঞ্চল সৃষ্টিশীল আঙুল খেলা করছে পিয়ানোর রীডে, সূর্যের আলোকচ্ছটার মতো ছড়িয়ে পড়ছে সুরের রেণু। সেই সুরের রেণু ছেয়ে ফেলেছে সমস্ত ভুবন, সেই সুরের রেণু ঢেকে দিয়েছে সমস্ত গগন।  নিজেকে ‘সুরের কাঙাল’বলে মনে করেন মুসলেহউদ্দিন, তিনি জানেন শুদ্ধ সুরের কোন রাজনীতি নেই, ধর্ম নেই, বৈষম্য নেই, বিদ্বেষ নেই, ঘৃণা নেই। আর সম্ভবত সেজন্যই চারপাশে সুরের জাল বুনে নিজেকে সমস্ত কিছু থেকে আড়াল করে রাখতে চান তিনি। তার অস্থির মনে আপন মনেই গেয়ে উঠে, ‘যা কিছু দীর্ণ আমার, জীর্ণ আমার, জীবন হারা, তাহারি স্তরে স্তরে পড়ুক ঝরে সুরের ধারা।’

কিন্তু সুর আর সংগীত সংঘাত বন্ধ করতে পারে না। নানা ধরনের খবর আসতে থাকে। কেউ বলে, ইন্ডিয়া পাকিস্তান যুদ্ধ লেগে গেছে। কেউ বলে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে। অপারেশন সার্চলাইটের মধ্য দিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমন করা হচ্ছে বলে জানায় মুসলেহউদ্দিনের সামরিক বন্ধুরা। পশ্চিম পাকিস্তানের পত্রিকাগুলোতে সম্পাদকীয় লেখা হয়, শেখ মুজিবের ‘ঘৃণা ও বিভক্তির ছয় দফা’ পাকিস্তান ভেঙে দিচ্ছে। কেউ লেখে, মুজিব আর ভুট্টোর অনমনীয় রাজনৈতিক অবস্থান, তাদের লাগামহীন অসংযত উচ্চাকাঙ্খা সংঘাত সৃষ্টির জন্য দায়ী। মুসলেহউদ্দিন আকুল হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের আত্মীয়-বন্ধুদের টেলিফোন করে। অনেক সময় কেটে যায়, ওপাশ থেকে কেউ রিসিভার তোলে না, আর তুললেও তাদের ভয়ার্ত আতঙ্কগ্রস্ত অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর শুনে মুসলেহউদ্দিনকে আন্দাজ করে নিতে হয়, না-বলা অনেক কিছু। একটা গুমোট দমবন্ধ করা অবস্থা। মনে হয় তার চারিদিকে ধোঁয়া আর ধূলার ভারি পর্দা, সেই অস্বচ্ছ পর্দা সরিয়ে কিছুতেই আলোর রেখা দেখতে পাচ্ছে না মুসলেহউদ্দিন। কেমন একটা নিরুপায় অসহায়ত্ব তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরে রাখে। খাঁচায় বন্দী মানুষের মতো ছটফট করেন তিনি।

স্বামীর এই উদ্বেগ-উদভ্রান্তি-ঘুমহীন লাল চক্ষু, সংগীতহীন বিষণ্ন দিন-যাপন নাহিদের দৃষ্টি এড়ায় না। সে বোঝে এখন কোনো কথা দিয়ে মুসলেহউদ্দিনকে শান্ত করা যাবে না, বরং তার সাথে একাত্ম হয়ে নিঃশব্দে এই বেদনা অনুভব করতে হবে। নাহিদ তাই করে। সে ভালবাসার উষ্ণতা দিয়ে মুসলেহউদ্দিনকে নীরবে জড়িয়ে রাখে, ছায়ার মতো মুসলেহউদ্দিনের পাশে পাশে থাকে, স্বামীর যন্ত্রণা নিজের মধ্যে উপলব্ধি করার চেষ্টা করে। কত রকম উদ্ভট গুজব ছড়ায় বাতাসে, পূর্ব পাকিস্তান কয়লা হয়ে গেছে, পূর্ব পাকিস্তানীরা সব হিন্দু হয়ে গেছে, ভারতের মদদে বিদ্রোহ করছে বাঙালিরা, মুক্তি নামে নতুন গুণ্ডাবাহিনী পয়দা হয়েছে, ভারত তাদের ট্রেনিং দিচ্ছে ... এমন আরো কত কিছু।  

এ রকম একটা অস্থির-অসুস্থ সময়ে, জুন মাসের এক বিকেলে নাহিদের বান্ধবী আসমা বকশি বেড়াতে আসে নাহিদ-মুসলেহ দম্পতির বাসায়। এটা সেটা বলার পর চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে গলার স্বর এক ধাপ নামিয়ে সে জানতে চায়, ‘মুসলেহউদ্দিন কাঁহা গেয়ি?’
‘অনেক দিন পর আজকে ষ্টুডিওতে গেল। একটা গানের রেকর্ডিং আছে। কিঁউ?’
‘না, এমনি। মানে আমি জানতে চাইছিলাম তোমাদের সম্পর্ক ঠিক আছে তো?’
‘মানে, কি বলতে চাও তুমি?’
নাহিদের গলার স্বর চড়া শোনায়। আসমা তখন আমতা আমতা করে, ‘আসলে আমি শুনেছিলাম, এখন নাকি পূর্ব পাকিস্তানি পুরুষরা তাদের পশ্চিম পাকিস্তানি বউদের তালাক দিয়ে দিচ্ছে। তো মুসলেহউদ্দিন তো বাঙালি, তাই না? সেইজন্য আমি ভাবলাম তোমরা ঠিক আছো কিনা?
   
নাহিদের পেটে তখন তাদের দ্বিতীয় সন্তান। তার ভারী হয়ে ওঠা শরীরজুড়ে যখন তখন নেমে আসে রাজ্যের আলস্য আর ক্লান্তি। রাত বাড়ছে, মুসলেহউদ্দিন এখনো ফিরছে না। সোফায় বসে তার জন্য অপেক্ষা করতে করতে কেমন যেন ঢুলুনি আসে নাহিদের আর তখনই মুসলেহউদ্দিন বাড়ি ফিরে আসে। তার মুখ থমথমে। বিধ্বস্ত চেহারায় বিষাদের কালো ছাপ। স্বামীর চোখের দিকে তাকিয়ে অজানা আশংকায় নাহিদের বুক কেঁপে উঠে।
মুসলেহউদ্দিন গম্ভীর গলায় বলে, ‘একটা খুব কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে আমাকে নাহিদ।’
‘কী সিদ্ধান্ত?’ জিজ্ঞেস করতে গিয়ে নাহিদের গলা কেঁপে যায়।
‘আমি পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে যাচ্ছি।’
‘আর আমি।’
‘তোমাকে তো এখন সাথে নিতে পারবো না, নাহিদ। আই এম স্যরি। তোমাকে এখানেই থাকতে হবে।’
‘কী বলছো এসব? নাহিদ আর্তনাদ করে ওঠে। এটা কীভাবে সম্ভব? আমি তোমাকে কিছুতেই যেতে দেব না। এটা হতে পারে না। প্লিজ মাৎ যাও, মুঝে ছোড় কর মাৎ যাও.. প্লিজ...।’

কষ্টের কান্নায় নাহিদের গলা বন্ধ হয়ে আসে।
মুসলেহউদ্দিন সোফায় গা এলিয়ে ঘুমিয়ে পড়া নাহিদকে ধরে আস্তে আস্তে নাড়া দেয়। নরম গলায় বলে, ‘কী হয়েছে নাহিদ? স্বপ্ন দেখছিলে? .. ওঠো, বিছানায় চলো .. ওঠো, আমার হাত ধরো।’
নাহিদ বাস্তবে ফিরে আসে। বুঝতে পারে এতক্ষণ দুঃস্বপ্ন দেখছিলো। সে চোখ বড় বড় করে মুসলেহউদ্দিনের দিকে তাকিয়ে থাকে।
‘কী হয়েছে? মুসলেহউদ্দিন আবার জানতে চায়। নাহিদ বিড়বিড় করে, ‘ম্যায় বহুত ডর গেয়ি!’
‘কিসের ডর?’
‘তুম হামকো একলা ছোড়কে নেহী যাওগে তো?’
‘কী! কোথায় যাবো? কেন যাবো? কী কি স্বপ্ন দেখছিলে, বলো তো?’
নাহিদ কান্না জড়ানো কণ্ঠে বলে, ‘আমার মাথায় হাত রেখে বলো তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না।’
মুসলেহউদ্দিন এবার স্ত্রীকে বুকে জড়িয়ে ধরে। বলে, ‘বুঝতে পেরেছি, তোমার কানেও উল্টা পাল্টা কথা এসেছে, তাই না?’

নাহিদ এবার আরো জোরে ফুঁপিয়ে ওঠে। মুসলেহউদ্দিন নাহিদকে দুই হাতে সোজা করে ধরে নিজের মুখোমুখী করে। তার চোখে চোখ রেখে দৃঢ় গলায় বলে, ‘শোন নাহিদ, আমি আমার দেশকে ভালবাসি, এটা ঠিক। এখন পূর্ব পাকিস্তানে যা চলছে, তা এখানে বসে যতটুকু জানতে পেরেছি, তাতে সত্যি আমার বুকটা ভেঙে গেছে, বহুতই খারাপ লাগছে আমার, কিন্তু নাহিদ, সত্য তো এটাও যে, আমি তোমাকেও ভালবাসি। তোমাকে ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ, অসহায়। জানি খুব খারাপ সময় পার করছি আমরা। কিন্তু তবু, তুমি কী করে ভাবলে আমি তোমাকে ছেড়ে চলে যাবো? এটা কখনো হয় না, কখনো হবে না।’
নাহিদ এবার খানিকটা শান্ত হয়। চোখ মুছে নেয়। তারপর আসমার কথা বলে।
মুসলেহউদ্দিন ম্লান হাসে, ‘আজকে ষ্টুডিওতে সরফরাজ খানও আমাকে বলছিল, তাকে নাকি কেউ কেউ বলেছে, আমি তোমাকে ছেড়ে চলে গেছি। কয়েকজন সাংবাদিকও নাকি এসব নিয়ে খোঁজ খবর করছিলো।’
নাহিদ হতভম্ভ হয়ে যায়, ‘কী বলছো এসব!’
‘হ্যাঁ। যত্তোসব বাখোয়াজি। যাই হোক। শোনো, আমি একটা ফায়সালা নিয়ে ফেলেছি।’মুসলেহউদ্দিন বলে।

‘ক্যায়সা ফায়সালা’ নাহিদ জানতে চায়।
‘ফায়সালাটা হচ্ছে, এই দেশে আমি আর থাকবো না। থাকা সম্ভব না।’
‘মানে? কোথায় যাবে, তুমি ? পূর্ব পকিস্তানে? আমাকেও সাথে নিয়ে যাও তাহলে।’
মুসলেহউদ্দিনের ঠোঁটের কোণায় ম্লান হাসি ফুটে উঠে, ‘তুমি কি জানো, পাকিস্তান ইষ্টার্ণ কমান্ডের কমান্ডারের নাম কী?’
‘না। জানি না্’
‘‘জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি। তুমি কি তার সৈন্যদের কাণ্ডকীর্তি শোনো নাই? শোনো নাই, সৈনিকদের বাঙালি মেয়েদের গর্ভে ‘পাকিস্তানি সন্তান’পয়দা করার নির্দেশ দিয়েছেন উনি।’’
মুসলেহউদ্দিনের গলা ধরে আসে। কিছুক্ষণ মাথা টিপে ধরে চুপচাপ বসে থাকে সে। তারপর বলে, ‘নিয়াজি নামটাকে আমার দেশের লোকজন স্বাভাবিক ভাবে কখনো নিতে পারবে বলে মনে করো তুমি?’
নাহিদের গলা শুকিয়ে আসে। সে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলে, ‘তাহলে? এখন কী হবে?’
‘আরে, আগে শোনই না, বলছি। আমি ঠিক করেছি, পশ্চিম বা পূর্ব পাকিস্তান না, আমরা তৃতীয় একটা দেশে চলে যাবো। সেই দেশে নতুন করে জীবন সাজাবো। হতে পারে সেটা আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া বা ইংল্যান্ডে। তুমি রাজি আছো তো?’

নাহিদ নিয়াজি রাজি হয়েছিল।
পরবর্তী জীবনটা এই দম্পত্তি তাদের দুই সন্তান ফয়সাল মুসলেহ আর নিরমিন মুসলেহকে নিয়ে লন্ডনেই কাটিয়ে দেয়। মুসলেহউদ্দিনের নতুন গানে সুর করার কথা আর শোনা যায়নি। বরং অনেকেই বলেন, বৃটেনে তিনি মন দিয়েছিলেন রান্নাবান্নার দিকে, কথিত আছে, বিখ্যাত ‘চিকেন টিক্কা মাসালা’নাকি তিনিই বৃটেনে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১০ জুলাই ২০১৫/তাপস রায়

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন