ঢাকা, সোমবার, ৪ ভাদ্র ১৪২৬, ১৯ আগস্ট ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

স্মৃতিকথা || মীরা দেবী

: রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৬-০৬-২৬ ৫:৩১:২৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৬-০৯-০৫ ৩:০৯:২৯ এএম
Walton E-plaza

মাকে আমার স্পষ্ট মনে না থাকলেও আবছায়ামতো মনে পড়ে। খানিকটা হয়তো বাস্তবে ও কল্পনায় মিশে গেছে, যেটুকু মনে আছে তাই বলছি।

 

মায়ের সুনাম ছিল রান্নার। বাবা তাঁকে দিয়ে নানারকম রান্না ও শরবতের পরীক্ষা করাতে ভালোবাসতেন। এক সময় বাবা শিলাইদায় পদ্মার চরে আমাদের নিয়ে ‘পদ্মা’ নামে বজরাতে ছিলেন। তখন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ও নাটোরের মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায় প্রায়ই শিলাইদায় যেতেন। তাঁরা পদ্মার উপর বোটে থাকতে খুব ভালোবাসতেন। আমাদের দুটি বজরা ছিল, তাই তাঁরা গেলে কোনো অসুবিধা হত না। একটি বোটের নাম আগেই উল্লেখ করেছি, অপরটির নাম ছিল ‘আত্রাই’। আমাদের আর একটি পরগনাতে আত্রাই নদী ছিল, তার থেকে আত্রাই নামকরণ করা হয়েছিল।

 

মনে পড়ছে আচার্য জগদীশচন্দ্র কচ্ছপের ডিম খেতে খুব ভালোবাসতেন। পদ্মার চরে বালির মধ্যে গর্ত করে কচ্ছপ ডিম পেড়ে রেখে দিত। বালির উপর তাদের পায়ের দাগ অনুসরণ করে যে লোকে ধরে ফেলবে তারা কোথায় ডিম পেড়ে গেছে- বেচারিরা কী করে আর বুঝবে? কচ্ছপের ডিম জগদীশবাবুর এত প্রিয় ছিল যে কলকাতায় যাবার সময় অনেকগুলো করে ডিম নিয়ে যেতেন। জগদীশচন্দ্র ও জগদিন্দ্রনাথ যখন শিলাইদায় যেতেন, বাবা তখন মাকে দিয়ে নতুন নতুন রান্না করাতেন। মায়ের হাতের রান্না খেয়ে তাঁরা খুব খুশি হতেন। পরে বড় হয়ে তাঁদের মুখে মায়ের রান্নার প্রশংসা অনেক শুনেছি। মায়ের যে শুধু রান্নার সুনাম ছিল তা নয়, তাঁর ভাগনে, ভাগনিরা, ভাসুরপো ও তাদের বউরা সকলে তাঁকে খুব ভালোবাসতেন। আমার এক পিসতুতো বোন দুঃখ করে আমার কাছে বলেছিলেন যে, মামি গিয়ে মামাবাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ঘুচে গেছে।

 

শিলাইদা থেকে আমরা শান্তিনিকেতনে ফিরে এলুম। সেখানে অতিথিশালায় ছিলুম। সেখানকার একটা ছবি মনে পড়ে- সরু এক ফালি বারান্দায় একটা তোলা উনুন নিয়ে মা বসে রান্না করছেন আর তাঁর পিসিমা রাজলক্ষ্মী-দিদিমা তরকারি কুটতে কুটতে গল্প করছেন। আর একটা ছবি মনে পড়ে- শান্তিনিকেতন-বাড়ির দোতলার গাড়ি-বারান্দার ছাতে একটা টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে, মার হাতে একটা ইংরেজি নভেল, তার থেকে বাংলায় অনুবাদ করে দিদিমাকে পড়ে শোনাচ্ছেন। গল্প শোনবার লোভে কোনো কোনো সময় তাঁদের গল্পের আসরে গিয়ে বসতুম। তাই বারবার শুনতে শুনতে বইটার একটি মেয়ের নাম কী করে যে মনের মধ্যে গাঁথা থেকে গেছে খুবই আশ্চর্য লাগে। আমার তখন ইস্টলিনের রোমান্সে আকৃষ্ট হবার বয়স নয়। তবু বোধ হয়, মার গল্প বলার ধরনে ও তাঁর কণ্ঠস্বরে যে বেদনা ফুটে উঠত, তাতে আমার শিশুমনে একটা ছাপ রেখে গিয়েছিল। তাই বারবারা নামটা মনে রয়ে গেল।

 

কিছুদিন পরে মার অসুখ করলে তাঁকে কলকাতায় আনা হল। এখন যেটাকে বিচিত্রা বলা হয়, আমরা ওইখানে থাকতুম। তখন আমরা ওই বাড়িকে হয় লালবাড়ি নয় নতুন বাড়ি বলতুম। লালবাড়ির ঘরের বিশেষত্ব ছিল। এক ধারে দেয়াল অবধি মস্ত বড় আলমারি প্রায় ছাত-সমান উঁচু। আলমারির কাচের পাল্লায় টুকটুকে লাল রঙের শালু আঁটা। আর এক ধারে একটু ফাঁক ছিল, সেখানে পাতলা কাঠের দরজা, তার মাথার উপর এবং নিচের দিকে ফাঁকা। অনেক সময় রেস্তোরাঁয় এরকম দরজা দেখা যায়। হাত দিয়ে ঠেলা দিলে খুলে গিয়ে তখনি আবার বন্ধ হয়ে যেত। একটা বড় ঘরকে এইভাবে তিন ভাগে বিভক্ত করে তিনটি ঘরে পরিণত করা হয়েছিল। একটা ঘরে আমরা থাকতুম। সবচেয়ে শেষের পশ্চিমের ঘরে মাকে রাখা হল নিরিবিলি হবে বলে। আমাদের বাড়ির সামনে গগনদাদাদের বিরাট অট্টালিকা থাকাতে নতুন বাড়ির কোনো ঘরে হাওয়া খেলত না। সে বাড়িতে তখন বৈদ্যুতিক পাখা ছিল না, তাই একমাত্র তালপাতার পাখা দিয়ে বাতাস করা ছাড়া গতি ছিল না। ওই বাতাসহীন ঘরে অসুস্থ শরীরে মা না জানি কত কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু বড় বউঠান হেমলতা দেবীর কাছে শুনেছি যে বাবা মার পাশে বসে সারারাত তালপাখা নিয়ে বাতাস করতেন।

 

এবার আমার ছোট ভাই শমীর কথা বলি। শমী যখন স্কুলে যেত গান গাইতে গাইতে যেত। তার গলা মনে হয় যেন বাড়ির আশেপাশে এখনও দূর থেকে শুনতে পাচ্ছি। তার গলা ছিল ভারি মিষ্টি। শরীরটা তার বেশি সবল ছিল না। আমরা যখন মেজমা জ্ঞানদানন্দিনীর কাছে ছিলুম, তখন নতুন-জ্যাঠামশায় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তাকে ‘পুরাতন ভৃত্য’ আবৃত্তি করতে শিখিয়েছিলেন। যখনি নতুন-জ্যাঠামশায়ের বন্ধুবান্ধব আসতেন, শমীকে দিয়ে ‘পুরাতন ভৃত্য’ আবৃত্তি করিয়ে তাঁদের শোনাতেন। শমী যখন হাতের ভঙ্গি করে ‘কেষ্টা ব্যাটাই চোর’ বলত, তখন তাঁরা তার অভিনয়ভঙ্গি দেখে না হেসে পারতেন না। তাছাড়া ‘বিসর্জন’ নাটকের কিছু কিছু পাঠ তার মুখস্থ ছিল। শান্তিনিকেতনে দাদারা একবার ‘বিসর্জস’ নাটকে অভিনয় করেছিলেন। সেই অভিনয় দেখে শমী একাধারে দু-তিনটা পাঠ আয়ত্ত করে নিয়েছিল। শমী কতকটা বাবার গুণ পেয়েছিল। মনে হয় বড় হয়ে ও বাবার মতো ভালো অভিনয় করতে পারত। শমী মুঙ্গেরে বেড়াতে গিয়ে কলেরা হয়ে অসময়ে চলে গেল।

 

বাঁয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মৃণালিনী দেবী, ডানে পদ্মা বোট

 

আমরা যখন পদ্মার চরে বোটে ছিলুম তখন বোধ হয় আমার আট-নয় বছর বয়স হবে। আমরা যখন বোটে থাকতুম, পাচক ও ভৃত্যদের থাকবার জন্য একটা পানসি ভাড়া করা হত। বাজার-হাট করার জন্য ওপারে শিলাইদায় যেতে হত, তাই ওপারে যাতায়াতের জন্য একটি ছোট ডিঙিনৌকা ছিল, তাতে করে দাদা অনেক সময় আমাদের অনেক দূর অবধি নিয়ে যেতেন। শুনেছি ছোটবেলায় দাদা রোগা ছিলেন। দাদার শরীর যাতে বলিষ্ঠ হয় সেইজন্যে বাবা তাঁকে নানারকম ব্যায়াম, সাঁতার কাটা, দাঁড় টানা ইত্যাদি করিয়েছিলেন। তার ফলে দাদার শরীর ফিরে গেল। শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ে পড়বার সময় কুয়ো থেকে জল তুলে স্নান করতে হত। তাছাড়া ঘর ঝাঁট দেওয়া, নিজেদের থালা বাটি মাজা প্রভৃতি সব কাজ অন্য ছাত্রদের যেমন করতে হত, দাদাও তাই করতেন। রামকৃষ্ণ মিশনের কয়েকজন সন্ন্যাসী তীর্থ করতে কেদারনাথ ও বদরিকাশ্রমে যাচ্ছেন শুনে বাবা দাদাকে তাঁদের সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। কেদার-বদরি যাওয়ার বিষয় দাদা তাঁর ‘পিতৃস্মৃতি’ বইয়ে সবিস্তারে লিখেছেন, তাই আমি আর বেশি লিখলাম না। সাধুদের সঙ্গে দাদা সমানে হেঁটে গেছেন- কম পরিশ্রমের কথা নয়! কষ্টসহিষ্ণু হবেন বলে বাবা ইচ্ছে করে খুব অল্পবয়সে দাদাকে সাধুদের সঙ্গে পাঠিয়েছিলেন। হেঁটে যাওয়ার পরিশ্রম তো ছিলই, তার উপর রাত্তিরে যে আরামে ঘুমোবেন তারও উপায় ছিল না। যেসব চটিতে রাত কাটাতে হত সেখানে পিসু বা এক রকমের উকুনে কাপড় ছেয়ে যেত। চটিতে নানারকম যাত্রীর সমাবেশ হত, শীতের ভয়ে তারা স্নান করত না। তারা এত নোংরা কাপড় পড়ে থাকত যে তাদের গায়ে উকুন চলে বেড়াত। পথ হেঁটে যাত্রীরা অত্যন্ত ক্লান্ত থাকতেন; অত পিসু বা উকুনের কামড়েও তাদের ঘুমের ব্যাঘাত হত না। দাদা যখন কেদার-বদরি থেকে ফিরে এলেন তখন শান্তিনিকেতনে না গিয়ে সোজা দিদির কাছে গিয়েছিলেন। আমি তখন দিদির কাছে মজঃফরপুরে ছিলুম। দাদার কালিবর্ণ চেহারা দেখে আমাদের খুব খারাপ লেগেছিল। দাদা আসামাত্র দিদি তাঁকে ময়লা কাপড় ছাড়িয়ে ছাতের এক কোণে কাপড়গুলো ফেলে রাখলেন, যাতে কাপড় থেকে ওইসব উকুন আমাদের কাপড়ে না আসে।

 

বোটে বাস করার সময় মাঝে মাঝে বড় বড় স্টিমার যেত; তখন তার ঢেউ লেগে আমাদের বোটকে দুলিয়ে দিয়ে যেত। সেইটিতে আমার বড় ভয় ছিল। কোনোরকম দোলানি আমি সহ্য করতে পারি নে, গা বমি-বমি করে। সেজন্য আমি কখনো দোলনায় চড়তে রাজি হতুম না। স্টিমার যতক্ষণ না চলে যেত আমি ঢেউ লাগার ভয়ে বোট থেকে নেমে ডাঙায় গিয়ে বসে থাকতুম।

 

আমাদের বোটের পাশ দিয়ে যখন মাল বোঝাই-করা বড় বড় বজরাতে দেখতুম বারো-চৌদ্দো জন মিলে একসঙ্গে দাঁড় টেনে চলেছে, কারোর দাঁড়-টানা আগে-পরে হচ্ছে না, দেখতে ভারি ভালো লাগত। এসব নৌকো অনেক দূর থেকে মালমসলা বাংলাদেশে বিক্রি করতে আসত। বিক্রি হয়ে গেলে আবার দেশে ফিরে যেত। তখন নদীপথে বেশিরভাগ ব্যবসা-বাণিজ্য চলত। এদের অধিকাংশ পশ্চিম থেকে আসত, চেহারা দেখলেই বোঝা যেত। মাঝে মাঝে রাত্রিতে তাদের একঘেয়ে সুরে সবাই মিলে খঞ্জনি বাজিয়ে গান ধরত। আর এক দল আসত পূর্ববঙ্গ থেকে খড় ও ধান বোঝাই করে। দেখলে মনে হত জলের উপর ভাসছে, একটু ঢেউ দিলে ডুবে যাবে। ইলিশ মাছের সময় জেলেরা যখন জল থেকে জাল তুলত রুপালি মাছগুলি রোদ পড়ে ঝকঝক করত। কোনো কোনো সময় ওদের কাছ থেকে মাছ কিনে নেওয়া হত- তখন কী সস্তা ছিল। গরিব-দুঃখী সকলেই দুবেলা মাছভাত খেয়েছে।

 

বাবা ভালো সাঁতার জানতেন। সাঁতরে নদী পার হতে পারতেন। বাবা যখন নদীতে স্নান করতে নামতেন, শুধু তাঁর গৌরবর্ণ পিঠটি জলের মধ্যে দেখা যাচ্ছে সেই কথা মনে পড়ে। তিনি ভালো সাঁতার জানতেন বলে ঝড়ের সময় বোটে থাকতে ভয় পেতেন না। দাদাকেও সাঁতার শিখিয়েছিলেন; শুধু পারেননি আমাদের দুই বোনকে শেখাতে। দিদিমা কোনোরকমে ডুব দিতে শিখিয়েছিলেন। আমাদের স্নানের জন্য অনেক দূর অবধি দরমা দিয়ে ঘিরে তার ভিতরে একটা বড় পাটাতন পাতা থাকত, যাতে সেটার উপর বসে মুখ ধোয়া যেত বা স্নান করে পরবার কাপড়চোপড় রাখা যেত। আমাদের স্নানের ঘরটি গরমের সময় কী সুন্দর ঠান্ডা লাগত। গল্পগুজব, পান সাজা সবই হত, আর যখন খুশি জলে নেমে পড়তুম। গলা-জলে নেমে স্নান করতে ভয় পেতুম না। কিন্তু পা মাটি থেকে তুলতে হলে বিষম ভয় লাগত। তা হলে আর কী করে সাঁতার শেখা হয়?

 

রাত্তিরে বোটে শুয়ে বোটের গায়ে ছলক্ ছলক্ ঢেউয়ের শব্দ শুনতে শুনতেই ঘুমিয়ে পড়তুম। বোটে থাকতে বাবার কাছে অনেক প্রজা হোমিয়োপ্যাথি ওষুধ নিতে আসত। হোমিয়োপ্যাথিতে বাবার বেশ হাত ছিল, যাকে যাকে ওষুধ দিতেন বেশ সেরে যেত। পদ্মার চরে মাঝে মাঝে ছোট ছোট গ্রাম দেখা যেত, এরা সেখান থেকে আসত। ওখানে বেশিরভাগ প্রজা মুসলমান। মুসলমান মেয়েরা বড় একটা পুরুষের সামনে বেরোয় না, কিন্তু ওখানে দেখতুম অনেক মুসলমান মেয়ে বাবার কাছে ওষুধ নিতে আসত। আমাদের প্রজারা বাবাকে বাপের মতো ভক্তি করত এবং তাঁর কাছে তাদের যত কিছু নালিশ জানাতে কিছুমাত্র দ্বিধা করত না, কেন না জানত যে তাঁর কাছে সুবিচার পাবে।

 

পরিচিতি : মীরা দেবী (১৮৯২-১৯৬৯), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মৃণালিনী দেবীর কনিষ্ঠা কন্যা

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৬ জুন ২০১৬/এএন/তারা

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       

Walton AC
Marcel Fridge