ঢাকা, রবিবার, ১০ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

হাওরবাসীর ‍দুঃখ ঘোচেনি ৪০ বছরেও

রুহুল আমিন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৭-০৪-২৩ ৭:৩৫:৩৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৪-২৩ ৭:৩৫:৩৩ পিএম

রুহুল আমিন : বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের সাতটি জেলা কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়ে হাওর এলাকা। এই সাত জেলার প্রায় ৩৪ উপজেলায় ৪১১টি ছোট বড় হাওর এলাকাকে ভাটি এলাকা বলা হয়ে থাকে।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই হাওর এলাকা দেশের অন্য এলাকা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। জীবনযাত্রা, ভূ-প্রকৃতি, জলবায়ু, ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, যোগাযোগ ব্যবস্থা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি সব কিছুই অন্য এলাকা থেকে ব্যতিক্রম। পুরো এলাকা বছরে প্রায় চার মাস পানির নিচে তলিয়ে থাকে। বিগত ৪০ বছরে হাওরে এই সমস্যার স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি।

হাওরাঞ্চলের মানুষের প্রধান দুটি সম্পদ হচ্ছে ধান ও মাছ। বেশিরভাগ জমিই এক ফসলি। উজান থেকে পলি নিয়ে পানি এসে ভাটির জমিকে করে উর্বর। এতে কৃষকের শ্রম ও সার কম লাগে। জমিতে পলি জমায় হাওরে সোনা ফলে যেন। উজানের দুই থেকে তিন ফসলের তুলনায় ভাটিতে এই এক ফসলেই তার চেয়ে অনেক বেশি ফলন পাওয়া যায়। এই এক ফসলি জমিতে অক্টোবর থেকে চাষাবাদ শুরু হয়। এপ্রিলের শেষদিকে এসে কৃষকরা ধান ঘরে তুলে। বাকি চারমাস বিভিন্ন জলাশয়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে হাওরবাসী।অবশ্য জলাশয় বরাদ্দ দেয় সরকার। এলাকায় কিছু উন্মুক্ত জলাশয় আছে যেগুলো অনুমোদন ছাড়াই মাছ চাষ করে অনেক।

 



কিন্তু দুঃখের বিষয় প্রায় প্রতি বছর ভয়ে আর শঙ্কায় কাটে হাওরাসীর। খেতের ফসল ঘরে তোলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। এই যেমন এবার মার্চের মাঝামাঝিতে ঢল নেমেছিল হাওরের বুকে। এপ্রিলে এসে তা প্রবল আকার ধারণ করে। পুরো হাওরে এখন অসময়ের বন্যার থৈ থৈ পানি। এই বন্যা অকল্পনীয়। বিগত ৪০ বছরে এমন বন্যা দেখেনি হাওরবাসী। হাওরে আগে বন্যা আসতো এপ্রিলের শেষ থেকে মে মাসের শেষের দিকে। কিন্তু এখন পানি আগেই এমনকি মার্চের শুরুতেই চলে আসছে।

এবার এপ্রিলের শুরুতে উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢল ও অতিবৃষ্টিতে বাঁধ ভেঙে বন্যার পাশাপাশি সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার, সিলেট ও হবিগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলের সমস্ত বোরো ধান তলিয়ে যায়। এরপর পানি বিষাক্ত হলে মাছ মরা শুরু হয়, তারপর মরতে থাকে হাঁস।

সুনামগঞ্জ সীমান্তসংলগ্ন ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়ে ইউরেনিয়ামের উন্মুক্ত খনিতে গত বছরের শেষ দিকে খনন শুরু হয়। পানির ধারার সঙ্গে সেখান থেকে ইউরেনিয়াম এসে মিশে গিয়ে হাওরে দূষণ সৃষ্টি করে থাকতে পারে বলে এলাকাবাসীর এমন শঙ্কার কথা গত কয়েকদিন ধরে গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। তবে আজ বাংলাদেশ পরমানু শক্তি কমিশনের প্রতিনিধি দলের প্রাথমিক পরীক্ষায় হাওরের পানিতে তেজস্ক্রিয়তার প্রমাণ মেলেনি।

মার্চ মাসের অকাল বন্যায় ২৫ সহস্রাধিক হেক্টর জমির বোরো ধানের পাশাপাশি হাকালুকি হাওরের ছোটবড় ২৩৭টি বিলও তলিয়ে গেছে। অকালবন্যায় তলিয়ে যাওয়া ধান রোদে পঁচন ধরে। এতে পানি দূষিত হয়ে ব্যাপক হারে মাছে মড়ক লেগেছে। নেত্রকোনার হাওরে মরে ভেসে উঠেছে মাছ। অসময়ের পানি গ্রাস করেছে জমির ফসল, আর সেই ফসল পানির নিচে থাকায় পঁচে গিয়ে বিষাক্ত গ্যাসের সৃষ্টি হয়েছে।সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশাখের প্রচণ্ড উত্তাপ। এতে অক্সিজেনের স্বল্পতায় মাছের মড়ক দেখা দিয়েছে।

অসময়ে ধেয়ে আসা বন্যায় হাওরের কৃষকের হলো সর্বনাশ। ভরসা ছিল জলাশয়ের মাছ। সেই মাছও মরে পঁচে যাচ্ছে। দেশের ২৫-৩৫ ভাগ দেশীয় মাছের চাহিদা মেটায় যারা আজ তারাই বড় দুঃসময়ে আছে। এবার হাওরের চার জেলায় প্রায় দেড় লাখ হেক্টর বোরো ফসল বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। ঋণের টাকা আর কঠোর শ্রমে আবাদ করা ফসল কদিন পরই ঘরে তোলার কথা। কিন্তু  সেই ফসল এখন পানির নিচে। সব মিলিয়ে দিশেহারা কৃষক।

৫২টি হাওরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের কাজ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। ৭০৪ কোটি টাকায় এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে প্রায় দুই লাখ ৯০ হাজার হেক্টর জমির ফসল বন্যার কবল থেকে রক্ষা পেত। ২০১১ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের মেয়াদ গত ডিসেম্বরে শেষ হয়। এই পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ১৭ দশমিক ৯ ভাগ। প্রকল্পের মেয়াদ দুই বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে পাউবো। আর স্থানীয়রা পাউবোর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করেছে বিভিন্ন সময়ে। দুর্নীতির প্রতিবাদে বিক্ষোভও হয়েছে। এরই মধ্যে দুদকের নেতৃতে এই দুর্নীতির অনুসন্ধানে একটি টিম মাঠে নেমেছে।

 



এদিকে পানি বিশেষজ্ঞরা এই বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করেছেন। জলবায়ুর কারণেই এখন আগে আগে বন্যা হচ্ছে। আর এর জন্য সার্বিকভাবে প্রস্তত থাকতে এবং হাওরের কৃষি ব্যবস্থাপনার সংস্কারকে গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা। এ ছাড়া হাওর এলাকার নদী, নালা, খাল বিল, ডোবা ও জলাশয় বছরের পর পর উজান থেকে নেমে আসা পলিতে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু খননের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। হাওর অঞ্চলের নদী, নালা, ডোবা ও জলাশয় খনন অতি জরুরি বলে মনে করছেন তারা। যা যা করার দরকার সবই যেন জলবায়ু পরিবর্তনকে মাথায় রেখে করা হয় তার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

এরই মধ্যে দেশের হাওরাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত তিন লাখ ৩০ হাজার পরিবারকে মাসে ৩০ কেজি করে চাল ও ৫০০ টাকা করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এই ঘোষণা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু এই সাহায্য তাদের জীবনে স্থায়ী কোনো সমাধান এনে দিবে না। হাওর অঞ্চলের মানু্ষের দরকার স্থায়ী সমাধান। যেসব প্রকল্প চলমান সেগুলো দ্রুত সমাপ্ত করতে হবে। নদী, নালা, ডোবা ও জলাশয় খননের জন্য দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া যেতে পারে।

উত্তরবঙ্গে এখন আর মঙ্গা নেই। বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে মঙ্গাপীড়িত মানুষের জন্য কর্ম সংস্থানের সুযোগের পাশাপাশি দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা। প্রশাসনের সদিচ্ছার ফলে মঙ্গা দূর করা সম্ভব হয়েছে। হাওর অঞ্চলের জন্যও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। না হয় সমগ্র দেশের যে অগ্রগতি তা একটি বিশেষ অঞ্চলের জন্য কিছুটা হলেও বাধাপ্রাপ্ত হবে।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৩ এপ্রিল ২০১৭/এনএ