ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ চৈত্র ১৪২৬, ৩১ মার্চ ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

হেমিংওয়ে : বিদগ্ধ এক সাহিত্যিক

রুহুল আমিন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৭-০৭-২১ ১২:০৬:১৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৭-২১ ১২:০৬:১৬ পিএম

রুহুল আমিন : আধুনিক মার্কিন সাহিত্যের প্রবাদপ্রতিম পুরুষ আর্নেস্ট মিলার হেমিংওয়ে। সাহিত্যে তার নির্মেদ ও নিরাবেগী ভাষা পরবর্তীতে অনেকের ওপর প্রভাব ফেলেছে।

‘মানুষ কখনোই পরাজয় বরণ করে না, প্রয়োজনে লড়াই করতে করতে ধ্বংস হয়ে যাবে।’ তার বিখ্যাত ‘দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’  উপন্যাসে সংগ্রামরত জেলের মাধ্যমে ঠিক এমন মানুষের চরিত্রই নির্মাণ করেছিলেন তিনি।

তার প্রকাশিত গ্রন্থের অনেকগুলো আমেরিকান সাহিত্যের চিরায়ত গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৫৪ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। পেয়েছেন পুলিৎজারসহ আরো বেশ কিছু পুরস্কার।  হেমিংওয়ে শিকাগোর ইলিনয়ের ওক পার্কে ১৮৯৯ সালের এ দিনে (২১ জুলাই) জন্মগ্রহণ করেন। জন্মদিনে তার প্রতি রইল শ্রদ্ধা।

হেমিংওয়ের নাম তার নানার নাম অনুযায়ী রাখা হয়। যদিও পরবর্তীকালে হেমিংওয়ে এই নাম পছন্দ করেননি। কারণ অস্কার ওয়াইল্ডের নাটক দি ইমপোর্টেন্স অব বিং আর্নেস্ট (The Importance of being Earnest) এর প্রধান চরিত্রের নাম ছিল আর্নেস্ট। যে ছিল সাদাসিধে, বোকাসোকা টাইপের।

হেমিংওয়ে ওক পার্কেই  বেড়ে ওঠেন। তার বাবা পেশায় চিকিৎসক ও মা সঙ্গীতবিশারদ। মায়ের পীড়াপীড়িতে সেলো বাজানো শেখেন। হেমিংওয়ের মা প্রায়ই গ্রামে গ্রামে কনসার্ট করে বেড়াতেন। এই কারণে যখন হেমিংওয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হলেন তখনই তিনি তার মাকে ঘোষণা দিয়ে ঘৃণা করতে আরম্ভ করলেন। অবশ্য সেলো বাজানো কেন্দ্র করে আগেই দুজনের মধ্যে সংঘাত বাধে। তবে এটা ঠিক যে গান শেখার কারণেই ‘ফর হুম দ্য বেল টুলস’ বইটি লেখা তার জন্য সহজ হয়।

গ্রীষ্মকালীন আবাস উইন্ডমেয়ারে বালক হেমিংওয়ের শিকার, মাছ ধরা ও ক্যাম্প করা শেখা। এ সব অভিজ্ঞতা তাকে অ্যাডভেঞ্চারে আগ্রহী করে তোলে। ১৯১৩ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত ওক পার্ক অ্যান্ড রিভার ফরেস্ট হাই স্কুলে পড়ালেখা করেন তিনি। সেখানে সাংবাদিকতার কোর্সও নিয়েছিলেন। স্কুলের দেয়াল পত্রিকাতে লেখা ও সম্পাদনার কাজ করতেন। স্কুল পেরোনোর পর শিক্ষানবিশ সংবাদদাতা হিসেবে ‘দি আরকানসাস সিটি স্টার’ পত্রিকায় কাজ শুরু করেন।

১৯১৮ সালের প্রথম দিকে হেমিংওয়ে কানসাস সিটিতে রেড ক্রসের নিয়োগ কার্যক্রমে সাড়া দেন। পরে ইতালিতে অ্যাম্বুলেন্স চালক হিসেবে নিয়োগ পান। একই বছর জুনের মধ্যে তিনি ইতালির যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে যান। মিলানে প্রথম দিনেই একটি যুদ্ধোপকরণ কারখানায় উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে নারী শ্রমিকদের লাশের টুকরো উদ্ধারকালে মর্টারের আঘাতে আহত হন। দুই পায়ে মর্টারের অনেকগুলো টুকরো ঢুকে যায়। জরুরি অপারেশনের পর ফিল্ড হাসপাতালে পাঁচদিন কাটাতে হয়। তারপর মিলানের রেডক্রস হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এ বীরত্বপূর্ণ কাজের জন্য পরবর্তীতে ইতালিয়ান সিলভার মেডেল অব ব্রেভারি লাভ করেন তিনি। এ অভিজ্ঞতাই তার বিখ্যাত ‘আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’ উপন্যাস রচনায় সাহায্য করে।

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে ১৯১৯ সালের জানুয়ারিতে হেমিংওয়ে আমেরিকা ফিরে যান। পরে ১৯২০ সালে অন্টারিওর টরেন্টোতে ‘টরেন্টো স্টার’ পত্রিকায় ফ্রিল্যান্সার, স্টাফ রিপোর্টার ও বিদেশি সংবাদদাতা হিসেবে কাজ শুরু করেন। ওই সময়ে পরিচয় হয় একই পত্রিকার সাংবাদিক কানাডার এক বিখ্যাত সাহিত্যিক মরলে কালাঘানের সঙ্গে। তিনি হেমিংওয়ের লেখনীর প্রশংসা করেন এবং তার নিজের কিছু লেখা তাকে দেখান। হেমিংওয়ে সেগুলোর প্রশংসা করেন। পরবর্তীতে আরেক লেখক জেমস জয়েস তাকে খানিক প্রভাবিত করে। তাদের মধ্যে অল্পদিনের বন্ধুত্বও ছিল। ১৯২২ সালে প্রকাশিত জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’ আমেরিকায় নিষিদ্ধ হয়। হেমিংওয়ে বন্ধুদের সাহায্যে গোপনে বইটির কপি পাচার করতেন। পরে ওই বছরই প্যারিসে চলে যান তিনি। সেখানে বিদেশি সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেন। ওই দশকের প্যারিসের প্রবাসী আধুনিক লেখক ও শিল্পীদের সাহিত্যিক ধারা ‘লস্ট জেনারেশন’ তাকে প্রভাবিত করে।

১৯২৩ সালে প্যারিস থেকে প্রকাশিত হয় তার প্রথম বই ‘থ্রি স্টোরিজ অ্যান্ড টেন পয়েমস’। ওই বছর সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য টরেন্টোতে ফিরে আসেন। প্রথম সন্তান জন জন্ম নিলে পরিবারকে সময় দিতে পত্রিকার চাকরি ছেড়ে দেন। এই সময় অস্থির হয়ে পড়েন হেমিংওয়ে। নিরানন্দময় জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্যারিসে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। এখান থেকেই ১৯২৪ সালে তার রচিত ‘ইন আওয়ার টাইম’ এবং ১৯২৬ সালে ‘দ্য টরেন্টস অব স্প্রিং’ প্রকাশিত হয়। এরপরই ১৯২৬ সালে তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য সান অলসো রাইজেজ’ প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি সর্বপ্রথম বিশ্ব সাহিত্য মহলে আলোচনায় আসেন।

১৯২৭ সালে আরেকটি বিখ্যাত উপন্যাস ‘ম্যান উইদআউট উইমেন’ প্রকাশিত হয়। কিন্তু প্যারিসে এই কয়েক বছর অবস্থান করেই তার সেই নিরানন্দময় জীবনের অধ্যায় পুনরায় শুরু হয়। এর মধ্যে স্ত্রী হ্যাডলি রিচার্ডসনের সঙ্গেও মানসিক বিবেধ দেখা দেয়। ফলে ১৯২৭ সালে হ্যাডলির সঙ্গে ডিভোর্সের মাধ্যমে হেমিংওয়ে আলাদা হয়ে যান। বিষণ্ন হেমিংওয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আবার ফিরে আসেন।

পরবর্তী সময়ে তিনি ক্রমাগত বাসস্থান পরিবর্তন করেন। যেমন ১৯৩০ এর দশকে ফ্লোরিডার কি ওয়েস্ট, ১৯৪০ ও ৫০ এর দশকে কিউবা এবং ১৯৫৯ সালে আইডাহোর কেটকুম।  এর আগে ১৯৫২ সালে ‘দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ প্রকাশের পর স্বল্প সময়ের জন্য আফ্রিকায় শিকারে যান। এ সময় দুইবার বিমান দুর্ঘটনায় পড়েন। এতে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। যার আঘাত পরবর্তীতে সামলে উঠতে পারেননি। সে ধকল তার মনেও প্র্রভাব ফেলে। এ ছাড়া ১৯২৮ সালে হেমিংওয়ের বাবা ডায়াবেটিস ও আর্থিক সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে আত্মহত্যা করেন। এই ঘটনা তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। ব্যক্তি জীবনে কোথাও স্থির হতে পারছিলেন না। চারটি বিয়ে করেন। কিন্তু কোথাও যেন স্বস্তি পাচ্ছিলেন না। তার তিন সন্তান রয়েছে। অস্থির হেমিংওয়ে ১৯৬১ সালে ২ জুলাই ভোরের দিকে নিজের প্রিয় শর্টগান দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

হেমিংওয়ে জীবদ্দশায় সাতটি উপন্যাস, ছয়টি ছোটগল্প সঙ্কলন ও দুইটি নন-ফিকশন বই প্রকাশ করেন। মৃত্যুর পরে আরো তিনটি উপন্যাস, চারটি ছোটগল্প সঙ্কলন ও তিনটি নন-ফিকশন বই প্রকাশিত হয়। তার উল্লেখযোগ্য লেখার মধ্যে রয়েছে- উপন্যাস: দ্য টরেন্টস অব স্প্রিং, দ্য সান অলসো রাইজেস, আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস, ফর ‍হুম দ্য বেল টুলস, দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি , দ্য গার্ডেন অব ইডেন ও আন্ডার কিলিমানজারো ।

অন্যান্য: ডেথ ইন দি আফটারনুন , হেমিংওয়ে, দি ওয়াইল্ড ইয়ার্স, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে সিলেক্টেড লেটার্স ও ডেডলাইন: টরেন্টো । ছোটগল্প সঙ্কলন: থ্রি স্টোরিজ অ্যান্ড টেন পয়েমস, ইন আওয়ার টাইম, উইনার টেক নাথিং এবং দ্য ফিফথ কলাম অ্যান্ড দ্য ফার্স্ট ফোর্টি-নাইন স্টোরিজ। তার উপন্যাস ও গল্প থেকে পনেরটির মতো চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২১ জুলাই ২০১৭/রুহুল/তারা