ঢাকা, শুক্রবার, ১ কার্তিক ১৪২৬, ১৮ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

১২ বছরেও কিবরিয়া হত্যার বিচার হয়নি

মামুন চৌধুরী : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৭-০১-২৭ ১২:২৬:৫৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০২-১৫ ১১:৪২:১২ এএম
শাহ এ এম এস কিবরিয়ার জীবনের শেষ বক্তৃতা

মো. মামুন চৌধুরী, হবিগঞ্জ : ছাত্র হিসেবে তিনি তুখোড় মেধাবী। পেশাগত জীবনে অন্যদের থেকে এগিয়ে। রাজনীতিরও শুরু শীর্ষ থেকে। জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে চেষ্টা করতেন সবার পাশে থাকার। ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি শীতের বিকেলে তিনি এসেছিলেন প্রিয় মানুষগুলোর কাছে। কিন্তু গ্রেনেড হামলায় তাকে চলে যেতে হয়েছে পৃথিবী ছেড়ে। দেশ হারায় সূর্য সন্তান শাহ এ এম এস কিবরিয়াকে।

আজ থেকে ১২ বছর আগের এ ঘটনা এখনো নাড়া দেয় সবাইকে। আলোচিত বৈদ্যের বাজার ট্র্যাজেডির কথা ভুলতে পারেননি কেউ। সেইদিনের হামলায় আহতরা এখনো কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। বিভাষিকাময় সেই দিনের কথা মনে করে আঁতকে উঠেন তারা।

২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি বিকেলে হবিগঞ্জের সদর উপজেলার বৈদ্যের বাজারে ঈদ পরবর্তী এক জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন তৎকালীন হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া। বিশাল মাপের এ মানুষটি জনগণের সঙ্গে সহজেই মিশতে পারতেন বলে তার জনসভা ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। বক্তব্য শেষে যখন তিনি মঞ্চ থেকে নেমে সহকর্মীদের নিয়ে বৈদ্যের বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গেটে আসেন, তখন দিনের আলো নিভে প্রায় সন্ধ্যা। হঠাৎ করেই বিকট শব্দ। হুড়োহুড়িতে চারদিকে গগনবিদারী চিৎকার। আর্জেস গ্রেনেডের আঘাতে অনেকেই ক্ষতবিক্ষত। কারো দিকে কারো নজর দেওয়ার সময় নেই। এমন সময় দূরের লোকজন ছুটে আসেন ঘটনাস্থলে। কিবরিয়াসহ আহতদের নিয়ে ছুটে যান হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে। মুখে মুখে খবর ছড়িয়ে পড়ে গোটা শহরে। হাসপাতালে তখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ঘটনার আকস্মিকতায় চিকিৎসকরাও তখন হতবিহ্বল।

শাহ এ এম এস কিবরিয়া ও তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. আবু জাহিরের প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছিল না। নেতা-কর্মীরা তখন দিশেহারা। স্থানীয় প্রশাসন ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় হেলিকপ্টারের জন্য। কিন্তু দ্রুত তা ব্যবস্থা করতে না পেরে সিদ্ধান্ত হয় অ্যাম্বুলেন্সে রওয়ানা দেওয়ার। একই অ্যাম্বুলেন্সে করে কিবরিয়া ও আবু জাহিরকে ঢাকার উদ্দেশে পাঠানো হয়। পথিমধ্যে আরো একটি অ্যাম্বুলেন্স পেলে তাদের আলাদাভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ঢাকায় পৌঁছানোর পর চিকিৎসক শাহ এ এম এস কিবরিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন। তার মৃত্যুতে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে গোটা জাতি। হরতাল অবরোধে হবিগঞ্জ শহর কার্যত অচল হয়ে পড়ে। গ্রেনেড হামলায় শুধু শাহ এ এম এস কিবরিয়া নন, তার ভাতিজা শাহ মনজুরুল হুদা, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রহিম, আবুল হোসেন ও সিদ্দিক আলী প্রাণ হারান। আহত হন কমপক্ষে ৭০ নেতা-কর্মী।

এ ঘটনার পর দিন ২৮ জানুয়ারি তৎকালীন হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমান সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল মজিদ খান বাদী হয়ে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তে কাজ করে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা। কিন্তু মামলাটির স্বাভাবিক তদন্ত না হয়ে দলীয় বিবেচনায় পরিচালিত হতে থাকে।

সিআইডি’র তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার মুন্সী আতিকুর রহমান মামলাটি তদন্ত করে ১০ জনের বিরুদ্ধে ওই বছরের ২০ মার্চ ১ম অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ওই অভিযোগপত্রে তৎকালীন জিয়া স্মৃতি ও গবেষণা পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আবদুল কাইয়ুম, জেলা বিএনপির কর্মী ও ব্যাংক কর্মকর্তা আয়াত আলী, কাজল মিয়া, জেলা ছাত্রদলের সহ-দপ্তর সম্পাদক সেলিম আহমেদ, জিয়া স্মৃতি গবেষণা পরিষদ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সাহেদ আলী, বিএনপি কর্মী তাজুল ইসলাম, বিএনপি কর্মী জয়নাল আবেদীন জালাল, ইউনিয়ন বিএনপির নেতা জমির আলী, ওয়ার্ড বিএনপি নেতা জয়নাল আবেদীন মোমিন ও ছাত্রদল কর্মী মহিবুর রহমানকে অভিযুক্ত করা হয়। আব্দুল কাইয়ুমকে স্বীকারোক্তির জন্য ৪৭ দিন রিমান্ডে নেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।

অভিযোগপত্র দেওয়ার পর মামলার বাদী অ্যাডভোকেট আবদুল মজিদ খান ২০০৬ সালের ৩ মে সিলেট দ্রুত বিচার আদালতে না-রাজি আবেদন করেন। আদালত তার আবেদন খারিজ করলে ১৪ মে তিনি হাইকোর্টে আপিল করেন। আপিলের প্রেক্ষিতে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ সরকারের প্রতি ‘কেন অধিকতর তদন্ত করা যাবে না’ মর্মে রুল জারি করেন। এ রুলের বিরুদ্ধে ২০০৬ সালের ১৮ মে লিভ টু আপিল করে সরকার। আপিল বিভাগ সরকারের আপিল খারিজ করেন। এরপর ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ মামলার অধিকতর তদন্ত শুরু হয়। দায়িত্ব দেওয়া হয় সিআইডি’র সহকারী পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলামকে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে তিনি ২০১১ সালের ২০ জুন আরও ১৪ জনকে আসামি করে এ আলোচিত মামলার অধিকতর তদন্তের অভিযোগপত্র দাখিল করেন। কিবরিয়া হত্যার সাড়ে ছয় বছর পর লুৎফুজ্জামান বাবর, মুফতি হান্নানসহ ২৪ জনকে আসামি করে অধিকতর তদন্তের অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছিল।

সম্পূরক চার্জশিটে ১ম ১০ জনের বাইরে অভিযুক্তরা হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান, লস্কর ই তৈয়বা সদস্য আব্দুল মজিদ কাশ্মীরি, সাবেক প্রতিমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু’র ভাই মাওলানা তাজ উদ্দিন, মহিউদ্দিন অভি, শাহেদুল আলম দিলু, সৈয়দ নাঈম আহমেদ আরিফ, ফজলুল আলম মিজান, মিজানুর রহমান মিঠু, মোহাম্মদ আব্দুল হাই, মোহাম্মদ আলী, মুফতি সফিকুর রহমান, বদরুল এনায়েত মো. বদরুল, বদরুল আলম মিজান।

২০১১ সালের ২৮ জুন কিবরিয়ার স্ত্রী আসমা কিবরিয়া চার্জশিটের উপর হবিগঞ্জ জুডিশিয়াল আদালতে না-রাজি আবেদন করেন। আবেদনে আসমা কিবরিয়া উল্লেখ করেন, যেহেতু তদন্তকারী কর্মকর্তার দাখিলকৃত অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, চারদলীয় অন্যান্য মন্ত্রী ও নেতা কর্মীদের পরস্পর যোগসাজশে হরকাতুল জিহাদ সদস্যদের সহায়তায় ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, সিলেটের মেয়র বদর উদ্দিন কামরানের উপর দুই দফা হামলা, আওয়ামী লীগের এমপি জেবুন্নেছা হকের বাসায় গ্রেনেড হামলা, ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর উপর গ্রেনেড হামলা, সুরঞ্জিত সেনের জনসভায় গ্রেনেড হামলা ও কিবরিয়ার উপর বৈদ্যের বাজারে গ্রেনেড হামলা সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু অন্য কারো নাম অভিযোগপত্রে নেই। তাই তা যথাযথভাবে তৈরি হয়নি। এ ছাড়া তৎকালীন জেলা প্রশাসক এমদাদুল হককে নিবিঢ়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলে মূল তথ্য উদঘাটন হবে বলে আসমা কিবরিয়া দাবি করেন। তিনি আরও দাবি করেন, অভিযোগপত্রে দণ্ডবিধি ১১৪ ধারা সংযুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এই ধারা কার উপর বর্তায় তা পরিষ্কার ভাবে সামনে আসেনি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, অভিযোগপত্রে যাদের নাম এসেছে, তার বাইরেও আরও অনেকেই জড়িত রয়েছেন।

আবেদনের প্রেক্ষিতে মামলার মূল নথি সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে থাকায় বিচারক রাজিব কুমার বিশ্বাস উপনথির মাধ্যমে আবেদনটি সিলেটে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি হত্যাকাণ্ডের অধিকতর তদন্তের অভিযোগপত্রের নারাজি আবেদন গ্রহণ করেন সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক দিলীপ কুমার বণিক। তিনি সিনিয়র পুলিশ অফিসারের মাধ্যমে মামলার অধিকতর তদন্তের জন্য নির্দেশ দেন।

২০১৪ সালের ১৩ নভেম্বর হবিগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রোকেয়া আক্তারের আদালতে কিবরিয়া হত্যা মামলার ৩য় সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করেন সিআইডি সিলেট অঞ্চলের সিনিয়র এএসপি মেহেরুন নেছা পারুল। অভিযোগপত্রে নতুন ১১ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এ পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত আসামিরা হলেন- সিলেট সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জ পৌর মেয়র জি কে গউছ, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা হারিছ চৌধুরী, মুফতি আব্দুল হাই, মুফতি তাজ উদ্দিন, মুফতি সফিকুর রহমান, মোহাম্মদ আলী, বদরুল, মহিবুর রহমান, কাজল আহমেদ, হাফেজ ইয়াহিয়া।

একই সঙ্গে পূর্বের চার্জশিটভুক্ত ইউসুফ বিন শরীফ, আবু বক্কর আব্দুল করিম ও মরহুম আহছান উল্লাহকে চার্জশিট থেকে অব্যাহতির আবেদন করেন। ৩ ডিসেম্বর মামলার শুনানিকালে অভিযোগপত্রে ত্রুটির কথা উল্লেখ করে সংশোধিত অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। এ প্রেক্ষিতে ২১ ডিসেম্বর সংশোধিত অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন আদালত। একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেওয়া হয়। ২৭ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রে ৩৫ জনকে আসামি ও ১৭১ জনকে সাক্ষী করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা মেহেরুন নেছা পারুল।

হত্যা মামলাটি সিলেটের দ্রুত বিচার আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। হবিগঞ্জে আদালতে থাকা বিস্ফোরক মামলাটিও বিচারের জন্য প্রস্তুত হয়েছে।

বৈদ্যার বাজার ট্র্যাজেডিতে অনেকে এখনো পঙ্গু অবস্থায় জীবন যাপন করছেন। সেই ভয়াল স্মৃতি এখনো তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আবু জাহির এমপি বলেন, ‘আমি বেঁচে থাকার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। ভারতে গিয়ে চিকিৎসা করে সুস্থ হলেও এখনো আমার গায়ে গ্রেনেডের স্প্লিন্টার। পায়ে স্টিল লাগানো। তবে আল্লাহর রহমতে বেঁচে আছি এটাই বড় কথা।’ তিনি দ্রুত বিচার কাজ শেষ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

স্ক্র্যাচে ভর দিয়ে চলাফেরা করেন আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল্লাহ সরদার। তিনি বলেন, ‘সেদিন বিকট শব্দের পর আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি। কিছুই মনে ছিল না আর।’ দীর্ঘ চিকিৎসায় সুস্থ হলেও কোনোভাবে চলাফেরা করেন তিনি।

গ্রেনেড হামলায় আহত কুদ্দুছ মিয়া বলেন, ‘আমরা অনেক কষ্টে আছি। এখন আর কেউ আমাদের খোঁজ নেয় না। তবে আমরা সরকারীভাবে অনেক সহযোগিতা পেয়েছি।’ ২৭ জানুয়ারির কথা স্মরণ করতেই আতকে ওঠেন তিনি।

গ্রেনেড হামলায় নিহত আব্দুর রহিমের স্ত্রী আফিয়া খাতুন বলেন, তিনি সরকারের কাছে কিছুই চান না। মৃত্যুর আগে তার স্বামী হত্যার বিচার দেখে যেতে চান।

কিবরিয়ার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা ও হবিগঞ্জে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে হবিগঞ্জের বৈদ্যের বাজারে স্মৃতিস্তম্ভে পুস্পস্তবক অর্পণ, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, শোক র‌্যালি, দোয়া মাহফিল ও আলোচনা সভা।



রাইজিংবিডি/হবিগঞ্জ/২৭ জানুয়ারি ২০১৭/মামুন/বকুল

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন