ঢাকা, মঙ্গলবার, ২ আশ্বিন ১৪২৬, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

‘রামপাল ও মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতি’

: রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৫-০৪-১৬ ১২:৩৩:৫৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৫-০৪-১৬ ৫:৩৭:৩০ পিএম
Walton E-plaza

নিজস্ব প্রতিবেদক : ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, রামপাল ও মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিবেশ রক্ষা ও মানুষের আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তাকে গুরুত্ব না দেওয়ার পাশাপাশি ভূমিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়ার চরম দুর্নীতি হয়েছে।

 

পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মবহির্ভূত অনুমোদন, অর্থায়নে জাইকার বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ, রামপাল প্রকল্পে গণশুনানির মতামতকে অগ্রাহ্য, ক্ষতিগ্রস্থদের হয়রানি ও বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের তথ্য গোপণসহ বেশ কিছু অনিয়ম উল্লেখ করা হয়েছে।

 

বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে মাইডাস সেন্টারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রধান কার্যালয়ে ‘রামপাল ও মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্প : ভূমি অধিগ্রহণ ও পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।

 

পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মবহির্ভূত অনুমোদন : আইন অনুযায়ী শিল্প এলাকা বা ফাঁকা জায়গা ছাড়া এ ধরণের প্রকল্পের ছাড়পত্র দেওয়ার নিয়ম নেই। কিন্তু রামপাল ও মাতারবাড়ি প্রকল্প যে স্থানে বাস্তবায়িত হচ্ছে সেটি কোন শিল্প এলাকা কিংবা ফাঁকা জায়গা নয়।

 

রামপাল প্রকল্প সুন্দরবন এনভায়রনমেন্টাল ক্রিটিক্যাল এরিয়া (ইসিএ) থেকে মাত্র ১৪ কি.মি. এবং মাতারবাড়ি প্রকল্প সোনাদিয়া থেকে ১৫ কি.মি. এর মধ্যে। যেখানে ভারতে ২৫ কি.মি. ও মালয়েশিয়ায় ২০ কি.মি. এর মধ্যে কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

 

এছাড়া সুন্দরবনের মতো একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল যার আইনগত অভিভাবক হলো বন বিভাগ। সেখানেও পরিবেশ অধিদপ্তর বন বিভাগের মতামত গ্রহণ করেননি। এ প্রকল্পে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পাওয়ার আগেই মাটি ভরাট করাসহ অন্যান্য কার্য্ক্রম শুরু করা হয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় প্রকল্পের স্থান নির্বাচনে পরিবেশ ও মানুষের বিষয় বিবেচনায় না নিয়ে প্রকল্পের সুবিধাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

 

জাইকার বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ : জাপান সরকারের প্রতিশ্রুত জলবায়ু তহবিল থেকে মাতারবাড়ি প্রকল্পের জন্য ঋণ প্রদান করা হয়েছে বলে জানিয়েছে টিআইবি। এ বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, তারা যে তহবিল থেকে বাংলাদেশ সরকারকে ঋণ দিচ্ছে তা জলবায়ু তহবিল থেকে আসছে। এটা বাংলাদেশের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা।

 

জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) যে জলবায়ু তহবিল থেকে ঋণ দিচ্ছে এর সপক্ষে কোন কাগজপত্র আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কাগজপত্র না থাকলেও আমাদের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য রয়েছে যে জাইকা প্রতিশ্রুত তহবিল থেকে মাতারবাড়ি প্রকল্পে ঋণ দিচ্ছে।

 

ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতি : প্রকল্প এলাকায় ভূমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী ক্ষতিপূরণের টাকা উত্তোলনের প্রতিটি স্তরেই অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ন্যূনতম ক্ষতিপূরণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ক্ষতিপূরণ প্রদানে প্রকল্পগুলোতে প্রতিটি ফাইল প্রসেসিংয়ে নিয়ম-বহির্ভূতভাবে মোট ক্ষতিপূরণের ৩%-১০% পর্যন্ত অগ্রিম ঘুষ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

 

দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে চিংড়ি ঘেরের ইজারার ক্ষতিপূরণ অতিমূল্যায়িত করে ইজারাদার নয় এমন ব্যক্তিরাও ক্ষতিপূরণের টাকা উত্তোলন করেছে। ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।

 

টিআইবির গবেষণায় দেখানো হয়েছে মাতারবাড়ি প্রকল্পে চিংড়ি ঘেরে প্রায় ৩১ কোটি টাকা অতিমূল্যায়িত হয়েছে। এর মধ্যে ১১৪জন ঘের ইজারাদারদের অধিকাংশই রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। উভয় প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহন নিয়ে জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে।

 

ক্ষতিগ্রস্তদের হয়রানি : কোন ক্ষতিপূরণের ফাইলের বিপরীতে আরবিট্রেশন থাকলে তা সমাধানের জন্য আইনজীবি নিয়োগ, নির্ধারিত তারিখে ম্যাজিস্ট্রেট না বসাসহ ক্ষতিগ্রস্থ জমির মালিকদের হয়রানির শিকার হতে হয়।

 

উভয় প্রকল্পের বিরোধীদের বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে হুমকি প্রদান ও নির্যাতন করা হয়েছে। ন্যায্য ক্ষতিপূরণ না পেয়ে জমি থেকে উচ্ছেদ ও প্রকল্পবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে অনেকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অজুহাতে মামলা করা হয়েছে এবং পুলিশের ভয়ে অনেকে পলাতক জীবন যাপন করছে।

 

অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সময়মতো ক্ষতিপূরণ না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্তরা দিনদিন দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে নিমজ্জিত হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়।

 

বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের তথ্য গোপন : ২০১০ সালে প্রজ্ঞাপনমূলে সরকার সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের আওতাধীন পশুর নদীকে বিরল প্রজাতির গাঙ্গেয় ডলফিন ও ইরাবতী ডলফিন সংরক্ষনের স্বার্থে বণ্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ঘোষনা করে। কিন্তু রামপাল প্রকল্পের এনভায়রনমেন্টাল ইমপেক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ইআইএ) প্রতিবেদনে বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপণ করা হয়েছে। এমনকি ইআইএ প্রতিবেদনে বিভিন্ন শ্রেনীর উদ্ভিদ ও প্রাণি কোন ক্ষতির সন্মুখিন হবে কি না তা বলা হয়নি।

 

রামপাল প্রকল্পে গণশুনানির মতামতকে অগ্রাহ্য : রামপাল প্রকল্পে গণশুনানিতে অংশগ্রহণকারীদের মতামত অগ্রাহ্য করেই ইআইএ চূড়ান্তকরণ এবং মাতারবাড়ি প্রকল্পে স্টেকহোল্ডার সভাগুলো প্রকল্প এলাকার বাইরে হওয়ায় সংশ্লিষ্ট জনগণের মতামত উঠে আসেনি। এমনকি এসব স্টেকহোল্ডার সভায় অংশগ্রহণকারীদের ‘প্রকল্পের বিরোধিতা না করার’ ব্যাপারে রাজনৈতিক নেতার হুমকি প্রদানের তথ্য পাওয়া গেছে।

 

কার্বন ডাই-অক্সাইড গাছ পালার খাদ্য তৈরি করবে : সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে কয়লা পরিবহণ ও কার্বণের ফলে সৃষ্ট দূষণও এখানে বিবেচনায় আনা হয়নি। রামপাল প্রকল্পে ৮০ শতাংশ লোড ফ্যাক্টর ধরে প্রতিবছর ৭৯ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হবে। যার ফলে সুন্দরবনের পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে মন্তব্য করা হয়নি। বরং সংশ্লিষ্ট বিষয়টি এড়িয়ে কার্বন ডাই-অক্সাইড গাছপালার খাদ্য তৈরিতে সাহায্য করবে বলা হয়েছে।

 

দারিদ্র বৃদ্ধি : ভূমি অধিগ্রহণের ফলে একদিকে ভূমির ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নির্ভরশীল বিভিন্ন সম্পূরক পেশায় নিয়োজিত মানুষের আয়-উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের দারিদ্র বৃদ্ধি পাচ্ছে ও ভবিষ্যতে আরো পাবে।

 

সমস্যা সমাধানে ১২ দফা সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- রামপাল ও মাতারবাড়ি তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান/ব্যক্তি কর্তৃক পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা, ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন কর্মপরিকল্পনা অনুসারে মূল্য নির্ধারণ, নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান দিয়ে জরিপ করে এ দুটি প্রকল্পের সব ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির তালিকা প্রণয়ন, ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ভূমি অধিগ্রহণ শাখা কর্তৃক প্রকল্প এলাকায় ‘ওয়ান স্টপ’ সার্ভিসের মাধ্যমে স্বল্প সময়ে ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থাসহ প্রকল্পগুলোতে ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ প্রদানে দুর্নীতির ঘটনা তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণ সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ।

 

এ ছাড়া কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য আলাদা পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা গাইডলাইন প্রণয়ন, কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সম্পাদিত অংশীদারিত্ব এবং ঋণ চুক্তি জনসম্মুখে প্রচার, প্রকল্প থেকে পাওয়া লভ্যাংশের একটা অংশ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে প্রকল্প এলাকার উন্নয়নের জন্য ব্যয় এবং প্রকল্পের লভ্যাংশ থেকে ভূমি হারানো ব্যক্তিদের জন্য স্থায়ী অর্থ সংস্থানের ব্যবস্থা গ্রহণ ইত্যাদি।

 

সর্বোপরি পরিবেশের দূষণ বিবেচনা করে কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প সুনির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে পর্যায়ক্রমে বন্ধ করতে হবে। বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ এবং বায়ুবিদ্যুতের মত নবায়নযোগ্য প্রযুক্তির বিকাশ ঘটানোর ওপর টিআইবি জোর দিয়েছে।

 

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ও উপ-নির্বাহী পরিচালক ড. সুমাইয়া খায়ের।


 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৬ এপ্রিল ২০১৫/এম এ রহমান/ইভা/নওশের

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       
Marcel Fridge