ঢাকা     সোমবার   ১০ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২৬ ১৪২৭ ||  ২০ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

নিউ ইয়র্কের একটি ল্যান্ডমার্ক ভবন ও তার পেছনের গল্প

|| রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০২:৩৪, ২১ জানুয়ারি ২০২০  
নিউ ইয়র্কের একটি ল্যান্ডমার্ক ভবন ও তার পেছনের গল্প

একটি নাম খুব মনে পড়ছে, সুজান বেরেসফোর্ড। হ্যাঁ, এই মহিলাকে অ‌্যাড্রেস করেই আমাদের সব চিঠিপত্র লেখা হত। সময়টা ১৯৯১ সাল। সোয়া এক বছর পর আমি ব্র্যাকের চাকরি ছেড়ে দিয়ে হবিগঞ্জ থেকে ঢাকায় ফিরে আসি। যোগ দেই বিজ্ঞান গণশিক্ষা কেন্দ্র নামের একটি এনজিওতে। এর নির্বাহী পরিচালক ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইব্রাহীম, পদার্থ বিদ্যার অধ্যাপক (তখন সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন)।

এই প্রতিষ্ঠানটিতে যোগ দিয়েই জানতে পারি এর ৪০% আর্থিক সাহায্য আসে আমেরিকার ফোর্ড ফাউন্ডেশন থেকে। হেনরি ফোর্ডের বিখ্যাত গাড়ি প্রস্তুতকারী কোম্পানি ফোর্ড মোটর কোম্পানি। ফোর্ডের গাড়ির কথা তো সবাই জানি, কিন্তু গরীব মানুষের উন্নতির জন্য ওরা আর্থিক সাহায্যও দেয়? বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি সম্পর্কে আমার তখন কোনো ধারণা ছিল না। আমাদের দেশে এসব ধারণার আমদানি হতে আরো প্রায় এক দশক লেগে গেলেও হেনরি ফোর্ডের বড় ছেলে এডসেল ফোর্ডের মাথায় এই চিন্তা আসে ১৯৩৬ সালেই। তিনি দাতব্য কাজের জন্য গড়ে তোলেন ফোর্ড ফাউন্ডেশন। মোটর কোম্পানির উপহার ২৫ হাজার ডলারের চেক দিয়েই প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয় মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেট্রয়েট শহরে। বিজ্ঞান ও শিক্ষা সংক্রান্ত কাজে সহযোগিতা প্রদানের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করে ফোর্ড ফাউন্ডেশন। প্রথমে ফোর্ডের পরিবারের সদস্যরাই এই চ্যারিটিটি ম্যানেজ করত। কিছুদিনের মধ্যেই এসব বিষয় নিয়ে অন্য যারা কাজ করেন, তাদেরকে ছোটো ছোটো গ্র্যান্ট দিতে শুরু করে ফোর্ড।

আমার অফিস ম্যানহাটনের প্রথম ও দ্বিতীয় অ‌্যাভিনিউয়ের  মাঝখানে, ৪৫ স্ট্রিটে। দুপুরে মধ্যাহ্নভোজন বিরতিতে আমি হাঁটাহাঁটি করি। মুক্তিও হাঁটতে পছন্দ করে, অবশ্য কোনো এক ফাঁকে, ভালো কোনো ক্যাফে/রেস্তোরাঁ পেলেই ঢুকে পড়ে। অন্য কোনো খাবার নয়, ডেজার্টেই মুক্তির আগ্রহ। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এলোমেলো না হেঁটে উদ্দেশ্যমূলক হাঁটব। একেক দিন একেকটা জায়গায় যাব, দেখব এবং সেইসব দেখাগুলো লিখে ফেলার চেষ্টা করব।

আমার অফিসের মাত্র দুই ব্লকের মধ্যেই ফোর্ড ফাউন্ডেশনের ল্যান্ডমার্ক বিল্ডিং। নিচতলায় স্প্লিট লেভেলে ইনডোর বাগান। শীতকালে যখন পুরো এলাকা ধূসর, তামাটে, সাদা, তখন ফোর্ডের বাগানে সবুজের হুড়োহুড়ো। কাচঘেরা এই বিশাল বাগানে শীতকালে হেঁটে বেড়াতে দারুণ লাগে। প্রথমত সবুজের ছড়াছড়ি, দ্বিতীয়ত ঠান্ডা নেই কোনো। মুক্তিকে বলি, চলো ফোর্ডের বাগানটা দেখে আসি। আসলে এতটা খুঁটিয়ে আগে কখনো দেখিনি। অন্য বাঙালি সহকর্মীদের নিয়ে যখন যাই, পর্যবেক্ষণের চেয়ে আড্ডাবাজিটাই বেশি হয়, তেমন কিছু দেখা হয় না। এটি যে একটি ল্যান্ডমার্ক বিল্ডিং এই তথ্যটিও গত আট বছরে জানতে পারিনি। এই স্থাপনাটি সম্পর্কে বলার আগে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের ইতিহাস আরেকটু বলে নেই। ১৯৪৩ সালে এডসেল ফোর্ড মারা গেলে এর দায়িত্ব নেন হেনরি ফোর্ডের নাতি এবং এডসেল ফোর্ডের বড় ছেলে হেনরি ফোর্ড-২। হেনরি টু ভিষণ ডাইনামিক মানুষ ছিলেন। ফোর্ড ফাউন্ডেশনকে তিনি একটি আন্তর্জাতিক মানের দাতব্য সংস্থায় পরিণত করেন এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ফোর্ড ফাউন্ডেশন হয়ে ওঠে পৃথিবীর অন্যতম ফিলানথ্রোপিক প্রতিষ্ঠান।

দারিদ্র্য বিমোচন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, শিক্ষা, শান্তি কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানুষের সার্বিক উন্নয়ন ঘটানোর আদর্শ নিয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে ফোর্ড ফাউন্ডেশন। আমেরিকায় কালো মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ফোর্ডের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এই প্রতিষ্ঠান কালো আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ এবং আইনচর্চায় সহযোগিতা প্রদান করে, যাতে তারা কালোদের অধিকার নিয়ে কাজ করতে পারে। সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ফোর্ডের সিগনেচার কার্যক্রম। যে ল্যান্ডমার্ক দালানটির সামনে এখন আমরা দাঁড়িয়ে আছি এর নামও তাই, ‘দি ফোর্ড ফাউন্ডেশন সেন্টার ফর সোশ্যাল জাস্টিস’।

১৯৪৯ সালে ফোর্ডের ট্রাস্টি বোর্ড মনে করে এর সদর দফতর নিউ ইয়র্কে হওয়া উচিৎ। ১৯৫৩ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত নিউ ইয়র্কের ভাড়া করা অফিস থেকে কার্যক্রম চালানো হয় এবং ১৯৬৭ সালে ৮১ হাজার বর্গফুটের এই দালানে স্থায়ী অফিস স্থাপন করে ফোর্ড ফাউন্ডেশন। ১২ তলা এ ভবনটি ডিজাইন করেন স্থপতি কেভিন রশ এবং জন ডিঙ্কেলু, উদ্বোধন করেন ফোর্ড ফাউন্ডেশনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হেনরি ফোর্ড দুই। নয়নাভিরাম আভ্যন্তরীণ বাগানটি ডিজাইন করেন ডেন কিলি, এবং এটিই ছিল পুরো আমেরিকায় এই পর্যায়ের প্রথম অভ্যন্তরীণ বাগান। যা এই দালানটিকে করে তুলেছে দর্শনীয় স্থান। উদ্বোধনের পরে ভবনটি সম্পর্কে নিউ ইয়র্ক টাইমসের স্থাপত্য সমালোচক এডা লুইস হাক্সটাবেল লেখেন, বিরল স্থাপত্য নকসা এবং একটি শিল্পকর্ম। ১৯৯৮ সালে অফিশিয়ালি নিউ ইয়র্ক সিটি এই ভবনটিকে ল্যান্ডমার্ক ভবন ঘোষণা করে এবং বলা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে নির্মিত একটি সফল স্থাপত্যকর্ম।

১৯৫২ সালে ভারত সরকারের আমন্ত্রণে ফোর্ড ফাউন্ডেশন প্রথম আমেরিকার বাইরে অফিস খোলে এবং কাজ শুরু করে। সৃজনশীল ও মুক্তচিন্তার প্রকাশ, লিঙ্গ, বর্ণ ও জাতিগত বৈষম্য নিরসন, প্রাকৃতিক সম্পদ ও জলবায়ুর পরিবর্তনে মানুষের ওপর প্রভাব, সামাজিক ন্যায়বিচার এসব বিষয় নিয়ে কাজ করার উদ্দেশে ফোর্ড ছড়িয়ে পড়ে সারা পৃথিবীতে। যার নাম উল্লেখ করে শুরু করেছিলাম, সুজান বেরেসফোর্ড, তিনি একজন প্রকল্প সহকারী  হিসেবে ফোর্ডে কেরিয়ার শুরু করেন ১৯৭০ সালে এবং ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠানটির সর্বোচ্চ পদ, প্রেসিডেন্টের আসন অলংকৃত করেন। আমি যে সময়টার কথা বলছি, ১৯৯১ সাল, তখন সুজান ছিলেন বহির্বিশ্বের কার্যক্রমের দায়িত্বপ্রাপ্ত ভাইস প্রেসিডেন্ট। আমাদের চিঠিপত্র তার বরাবরেই পাঠানো হত। নামটি আজও চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় কয়েক বছর পরই ঘোষণা আসে বাংলাদেশে ফোর্ড ফাউন্ডেশন আর আর্থিক সাহায্য দেবে না, ওরা এখান থেকে সকল কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু কি কারণে ওরা বাংলাদেশকে ফান্ড দেবে না তা আমরা ভালো করে কিছুই জানতে পারিনি। আমাদের ফান্ডিং বন্ধ হয়ে যায়, প্রকল্পগুলো হুমকির মুখে পড়ে, আমরা অন্য দাতা সংস্থার খোঁজে মরিয়া হয়ে উঠি। কিন্তু আমি জানি ফোর্ড ফাউন্ডেশন এখনো অনেক দেশে আর্থিক সাহায্য দিচ্ছে, যদিও এর যৌবনে ভাটা পড়েছে অনেক আগেই, তবুও, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে সাহায্যের জন্য নতুন করে আলাপ-আলোচনা করা যেতে  পারে। 

ফোর্ড ফাউন্ডেশন থেকে বেরিয়ে আমরা বিচ্ছিন্ন হই। যার যার অফিসে ফিরে যাই। অফিসে ঢুকতে ঢুকতে ভাবছি আগামীকাল কোথায় যাওয়া যায়।

লেখক: কবি, কথাসাহিত্যিক, জাতিসংঘে কর্মরত


ঢাকা/সাইফ

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়