ঢাকা, বুধবার, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৭ মে ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

ফ্রি লাঞ্চ

কাজী জহিরুল ইসলাম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০২-০৮ ৮:২০:১৭ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০২-০৮ ৮:২০:১৭ এএম

মেঘলা আকাশ। হু হু করে হাওয়া বইছে। আমার অফিসের বড় বড় দুটি কাচের জানালায় দুদ্দার করে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে হাওয়ার দৈত্য।

এপ্রিল-মে মাসে একবার এবং অক্টোবর-নভেম্বরে একবার আমেরিকাতে এই আউলা বাতাস বয়। নভেম্বরের বাতাসে লাল-হলুদ রঙে সজ্জিত গাছের পাতারা ঝরতে থাকে। আর এজন্যই এই সময়টাকে বলা হয় ‘ফল’ বা ‘ঝরা’ ঋতু। উন্নত দেশের লোকেরা এইসব প্রাকৃতিক দুর্যোগকে জয় করে ফেলেছে অনেক আগেই। বৃষ্টি কিংবা তুষারপাত যাই হোক না কেন, কেউ কাজ ফেলে ঘরে বসে থাকে না। উত্তর মেরুর অনেক দেশে শীতকালে সূর্য ওঠে না বললেই চলে।

প্রায় ২২/২৩ ঘণ্টাই থাকে রাত্রির অন্ধকার। আবার ঠিক তার উল্টো ঘটনা গ্রীষ্মকালে। সূর্যতো ডুবতেই চায় না। প্রায় ২২/২৩ ঘণ্টাই থাকে দিনের আলো। কিন্তু ঘড়ি ধরে দিন-রাত্রির সীমা নির্ধারিত। সূর্য উঠুক না-উঠুক সকাল নয়টায় সবাই অফিসে হাজির। রাতের মতো বাতি জ্বালিয়ে চলে কাজ-কর্ম। আবার গ্রীষ্মকালে সূর্য না ডুবুক, ঘরে ভারী পর্দা টানিয়ে ওরা ঘুমিয়ে পড়ে ঘড়ি দেখে।

আমিও এই হু হু শীতল হাওয়ার সমূহ অত্যাচারকে উপেক্ষা করে বেরিয়ে পড়লাম। এখন বারোটা বাজে। সেকেন্ড অ‌্যাভিনিউর এপারে আমার অফিস ওপারে অলিম্পিয়া নামের একটি ডেলি। খুব বেশি দূরে যাব না। অলিম্পিয়ার চিকেন স্যুপ দিয়েই সেরে নেব আজ। আসলে আজকাল বাতাসের অত্যাচারটা তেমন নিতে পারি না। বরং একটু কম খেয়ে থাকাই ভালো।

হুড়মুড় করে একগাদা লোক লিফটে এসে উঠল। সবার  হাতেই একটি করে ছাপানো কাগজ। ওরা কি কোনো মিছিলে যাচ্ছে? এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায়? আমার সহকর্মী সিলভাইনকেও দেখতে পাচ্ছি এ দলে। আমি ওর চোখের দিকে তাকাতেই ও আমাকে প্রশ্ন করে, আপনি জানেন না? আমি বলি, কি? ‘কোসি’ আজ ফ্রি লাঞ্চ দিচ্ছে। আজই শেষ দিন। এর আগের দুই শুক্রবারও দিয়েছে। আপনার কাগজ কই? নিজেকে কেমন বোকা বোকা লাগছে। কোসি ফ্রি লাঞ্চ খাওয়াচ্ছে, সবাই জানে, আর আমি জানি না? আমি বলি, আমি কার্বোহাইড্রেড খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি তো তাই যাব না। তাছাড়া নিশ্চয়ই অনেক লম্বা লাইন হবে। তা হবে, বলেই ওরা লিফট থেকে নেমে পড়ল। আমিও অলিম্পিয়ার দিকে হাঁটতে শুরু করি।

ফ্রি কান্ট্রি আমেরিকাতে প্রায়শই ফ্রি খাবার ও পানীয় পাওয়া যায়। বড় বড় সুপারমার্কেটগুলোতে সব সময়ই টেস্ট করার জন্য খদ্দেরদের নানান রকম খাবার পরিবেশন করা হয়। টুথপিকের ডগায় লাগানো মুরগি বা চিজের টুকরো আমরা কে না খেয়েছি। জুস, ইওগার্ড থেকে শুরু করে চিপস, রুটি, নানান রকম ফলের টুকরো, গ্রিল করা মাছ বা মাংসের টুকরো, আরো কত কি যে ফ্রি পরিবেশন করে। কেউ চাইলে ছুটির দিনে কোনো একটি বড় সুপার মার্কেটে ঢুকে এসব নমুনা খাবার খেয়েই লাঞ্চ বা ডিনার সেরে ফেলতে পারে।

এত গেল ফ্রী নমুনা খাবার। মাঝে মাঝে অফিসে আসার পথে দেখি কোনো এক কফি শপের সামনে একটি কাগজ লাগানো, ‘আজ সারাদিন ফ্রি কফি’। কোনো কোনো রেস্টুরেন্ট সপ্তাহের কোনো একদিন পরিবেশন করে ফ্রি লাঞ্চ।

ফ্রি সেবাও পাওয়া যায়। যেমন প্রায়শই দেখি হাতে লিফলেট ধরিয়ে দিচ্ছে, ৩০ মিনিট ফ্রি বডি মাসাজ। কখনো কখনো দেখা যায় কোনো এটর্নির লিফলেট, প্রথম ভিজিট ফ্রি। অথচ সেই এটর্নির দেখা পেতে গুণতে হয় ঘণ্টায় ৪০০ ডলার ফি।

স্যুপ নিয়ে অফিসে ফিরে এলাম বটে কিন্তু আমার বাঙালি মস্তিস্ক উসখুস করছে। একটি কথা আছে না, ‘বাঙালি ফ্রি পেলে নতুন জামায় আলকাতরা মাখে’। গত সপ্তাহে ডাক্তার আমাকে ওজন কমাতে বলেছে। ‘কোসি’র ফ্রি লাঞ্চটি নিঃসন্দেহে আমার জন্য এখন ফ্রি আলকাতরার চেয়ে উন্নত কিছু নয়। কোনো রকমে নিজে বুঝিয়ে নিবৃত্ত করলাম।

অফিস শেষ করে বাড়ি ফিরব। রুমের তালা লাগাতে লাগাতে দেখি আমার আরেক সহকর্মী সিমি, দুপুরে সিলভাইনের হাতে দেখা, ফ্রি লাঞ্চের নীল কাগজটি নিয়ে ধা ধা করে ছুটে যাচ্ছে। আমি চিৎকার করে ডাকলাম।

সিমি মাত্র এক সেকেন্ডের জন্যে ঘুরে বলল, দেরি করিয়ে দেবেন না, কোসি বন্ধ হয়ে যাবে। ঠিক ওর পেছনে ছুটতে ছুটতে এল মিরাকুলা, হাতে সেই একই কাগজ। ও আমাকে পাশ কাটাতে কাটাতে বলল, আমি এক কপি বেশি প্রিন্ট করেছি, আপনার চাই একটা? আমি বললাম, অবশ্যই। এরপর ওদের পেছন পেছন আমিও দ্রুত গতিতে হাঁটতে শুরু করি।

লেখক: কবি, কথাসাহিত্যিক, জাতিসংঘে কর্মরত


ঢাকা/সাইফ