ঢাকা, বুধবার, ২৫ চৈত্র ১৪২৬, ০৮ এপ্রিল ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

ফ্রাংকফুর্টে চার ঘণ্টা

কাজী জহিরুল ইসলাম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-১১ ৭:১৬:৫৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-১১ ৭:৪১:১৯ পিএম

চার ঘণ্টার ট্রাঞ্জিট। চুপচাপ বিমানবন্দরে বসে থাকবো? কিছুতেই নয়। দ্যাট ইজ নট মি। রাও কাইকুই করছিল, অচেনা শহর, যদি টাইমলি ফিরে আসতে না পারি? আমি বলি, গ্যারান্টি দিচ্ছি, তোমাকে বুদাপেস্টের প্লেনে তুলে দেব।

ত্রিশ সেকেন্ডে জার্মান ইমিগ্রেশন। করোনার সুফল। নিচে নেমে এক সুন্দরীকে ধরি। বুদ্ধি দাও, হাতে চার ঘণ্টা, তোমার শহরকে উল্টে-পাল্টে দেখতে চাই। মেয়েটি ইংরেজি জানে। হাসি দিয়ে বলে, উল্টে-পাল্টে দেখতে পারবো না, তবে ফ্রাঙ্কফুর্টের একটা আমেজ সাথে করে নিয়ে যেতে পারবে। সোজা হপটুয়াখে চলে যাও। ট্যাক্সি   নেব? ও বলে নিতে পারো, তবে আমি হলে ট্রেনে যাব। আমি কি ওর চেয়ে কম স্মার্ট, ও ট্রেনে গেলে আমি কেন পারবো না। দরকার হলে জার্মান শিখে ফেলবো। রাওকে বলি, ফলো মি। ১৭ ইওরো দিয়ে দুজনের গ্রুপ ডে পাস কিনে ছুটে যাই ট্রেনস্টেশনে। প্লাটফর্ম ওয়ান থেকে এস নাইন। ১৭ মিনিটের রাইড। হপটুয়াখে নেমে দেখি একদল পশুপ্রেমীক নীরবে পশু হত্যার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। ওদের সাথে মোটাসোটা বেশকিছু কুকুরও যোগ দিয়েছে। আন্দোলনকারীদের সাথে আমার ছবি তুলে দিয়ে রাও হাসতে হাসতে মরে যায়। আমি বলি হাসছো কেন? রাও বলে, ওদের সাথে তো ছবি তুলবো আমি, তোমার কোনো রাইট নেই ওদের সাথে ছবি তোলার। তখনো আমি বুঝিনি। তৃণভোজী এবার খুলেই বলে, তুমি গরুর গায়ে দাঁত বসাও, তোমার বিরুদ্ধেই তো ওদের আন্দোলন। আমি বলি, এট লিস্ট কুকুরের গায়ে তো বসাই না, সো পিকচার ইজ জাস্টিফায়েড। কী অদ্ভুত সারি সারি গাছ, ইওরোপ ছাড়া শীতকালে এমন সুন্দর মোটাসোটা ন্যাড়া ডালের বৃক্ষসারি শোভা পৃথিবীর আর কোথাও দেখিনি। এই গাছগুলোর সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে জেনেভায়। কয়েকটা ছবি তুলে স্কয়ারে বেশ কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করি। ন্যু ক্রেম স্ট্রিট ধরে হাঁটতে হাঁটতে এসে পৌঁছাই পলস প্লাটজে।

শনিবার দুপুর। একটা বাজে। তাপমাত্রা মন্দ না কিন্তু মেঘলা আকাশ। এটাই কি কারণ? দোকানগুলো, ক্যাফেগুলো, স্কয়ারগুলো ঝিমুচ্ছে। না কারণ অন্য, করোনা, সর্বত্রই করোনা আতঙ্ক। যে দুই চারজন স্কয়ারে হাঁটছে, স্ট্রিটের ফুটপাতে হাঁটছে, তারা একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছে সন্দেহের দৃষ্টিতে। দৃষ্টিতে সন্দেহ এবং আতঙ্ক দুটোই ফুটে উঠছে।

পল প্লাটজে কিছু লোক সমাগম চোখে পড়ছে তবে মাছের টোপের মতো স্কয়ার জুড়ে যে রেস্টুরেন্ট-অলারা, ক্যাফে-অলারা, শত শত চেয়ার টেবিল পেতে রেখেছে খোলা আকাশের নিচে, সেগুলো খা খা করছে। রাও জার্মান বার্গারে রাও দাঁত বসাবে না, ও তৃণভোজী। তৃণভোজীর সামনে আমি কি করে মাংস খাই। আমরা ঢুকলাম ক্যাফেতে। মেয়েটির নাম ফ্র রোমিনা, সোনালী চুল, সাড়ে পাঁচফুটের মতো উচ্চতা, সুঠাম দেহ, স্ফীত বুক, সেখানে উপাসনালয়ের যুগল গম্বুজ, মেরুদণ্ড সোজা এবং মাথা উঁচু করে কথা বললেও ওর হাসিতে একই সঙ্গে বিনয় এবং রোমান্টিকতা উদ্ভাসিত। কী দেব? রাও তাকিয়ে আছে আমার মুখের দিকে, আমি অর্ডার করি, দুটো ক্রোসান্ট আর দুকাপ কাপুচিনো।

দীর্ঘ সময় নিয়ে আমরা কাপুচিনো শেষ করি। রাও উসখুস করছে, কিন্তু আমি যেহেতু বস, ভারতীয় সংস্কৃতি ওকে উত্তেজিত হতে দিচ্ছে না। আমি বলি, চিন্তা করো না রাও, আমরা ঠিক সময়েই পৌঁছে যাবো। ও বলে ট্রেনের কোন প্ল‌্যাটফর্ম থেকে উঠবো, কোন ডিরেকশনে যাবো, এসব খুঁজে বের করতেও তো সময় লেগে যাবে। আমি কিছুই না বলে শুধু হাত তুলি, রাও চুপ করে। আমি জানি মুখে চুপ করলেও ওর ভেতরে এখন অনেক কথা টগবগ করছে। আমি পাছাটা আরো একটু সামনে ঠেলে দেহটা এলিয়ে দিই। চোখ বন্ধ করে ফ্রাঙ্কফুর্টের গোপন সৌন্দর্য দেখার চেষ্টা করি।

ঠিক দুটোয় বিল মেটাতে গিয়ে রোমিনাকে বলি, শুধু তোমার কাপুচিনোই সুস্বাদু নয়, তুমিও খুব সুন্দর এবং আত্মবিশ্বাসী। যেন তুমি জানোই তোমার হাতের কাপুচিনো ভালো হবেই, হতেই হবে। তখন সে অন্য এক জার্মান বৃদ্ধাকে সার্ভ করছিল। রাও তখনো ব্যাগ, জ্যাকেট গোছাচ্ছিল। মেয়েটি বললো, একটু বসুন প্লিজ। আমি ফিরে এসে টেবিলে বসি। রোমিনা, আরো দুকাপ কাপুচিনো এনে টেবিলে রাখে। এটা আমার পক্ষ থেকে। এর আগে হাজারখানেক লোক আমার কফির প্রশংসা করেছে, ওদেরকে আমি একটি হাসির বেশি আর কিছু দেইনি, শুধু আপনাকেই কাপুচিনো উপহার দিলাম। আমি ওর নীল চোখের দিকে তাকাই। মেয়েটি বলে, হ্যাঁ আমি আত্মবিশ্বাসী কিন্তু এর আগে আর কারো চোখে আমার আত্মবিশ্বাস ধরা পড়েনি, এমন কি আমার বসের চোখেও না। এখন ভাবছি, আমি নিজেও কি জানতাম যে আমি এতোটা আত্মবিশ্বাসী? আজ থেকে জানলাম। এবং এই আত্মবিশ্বাস আমাকে শুধু আত্মতৃপ্তিই দেবে না, হয়ত অনেক দূর নিয়েও যাবে। আমি বলি, পরের বার ফ্রাঙ্কফুর্টে এলে রোমিনা'স কফি শপ খুঁজে বের করবো। মেয়েটি এবার বিস্মিত হয়। আপনি কি অন্তর্যামীও? হ্যাঁ, এটাই হবে নাম, তবে জার্মান ভার্শন।

আমরা বাইরে বেরিয়ে এসে পলসপ্লাটজে আরো কিছু ছবি তুলি। ডানদিকে একটি ধর্মশালা দেখে রাও বিভ্রান্ত হয়। এখানেই তো ট্রেনস্টেশনটা ছিল। রাও আমিও কনফিউজড। তবে রাস্তাটা মনে আছে, আরো দু'ব্লক বাঁয়ে হবার কথা, চলো বাঁ দিকে হাঁটি। রাও বারবার ঘড়ি দেখছে আর ঠোঁট কামড়াচ্ছে। আমরা সব সময় আইডিয়াল সিচুয়েশন ধরে নিয়ে সময়ের হিসেবটা করি। টুয়েন্টি পার্সেন্ট সিস্টেম লস বিবেচনায় রাখা উচিত। আমি ওকে বোঝাতে চেষ্টা করি। দেখেছো তো ঘোষিত সময়ের এক সেকেন্ড পরেও ট্রেন পৌঁছায় না কোনো স্টেশনে। সেই দেশে সিস্টেম লস বিবেচনায় রাখার পক্ষে না আমি। কিন্তু পথ হারানো? রিল্যাক্স ম্যান। আমরা পথ হারাইনি। এক ব্লক বাঁয়ে যাওয়ার পরেই ঠিক একই রকম দেখতে আরো একটি ধর্মশালার গম্বুজ উদ্ভাসিত হয়। এবার রাওয়ের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। হাউ কাম, বোথ আর সেইম! এক সময় ওদের খুব ধর্ম দরকার ছিল, তাই মোড়ে মোড়ে উপাসনালয়।

পশু প্রেমিকেরা তখনো আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। পশুর মুখোশ পরা দীর্ঘাঙ্গিনী নারীরা হাতে টিভিস্ক্রিন ধরে রেখে ভিডিও ফুটেজ দেখাচ্ছে। ক‌্যাম্পেইন জোরদার করতে সমর্থকদের নাম, ঠিকানা লিখে নিচ্ছে ছেলে কর্মীরা। কাজগুলো ওরা করছে খুব নীরবে। কোনো হৈ চৈ হাঙ্গামা নেই, কিন্তু ভিড় আছে, আছে পশুদের প্রতি কৌতূহলী মানুষের ভালোবাসা।

ট্রেনগুলো ঝকঝকে পরিস্কার, তার চেয়েও পরিস্কার সাবওয়ে স্টেশন। কোথাও ধুলোবালি, চকোলেটের খোসা বা টিস্যু গড়াগাড়ি খাচ্ছে না ফ্লোরে। লম্বা ফ্লোরে যতদূর দৃষ্টি যায় শুধুই ঝকমকে, চকচকে পাথরের ঢেউ। এবার এস এইট। এখন মুশকিল হচ্ছে কোন স্টেশনে নামবো? টিভিস্ক্রিনে সামনের সবগুলো স্টেশনের নাম ভেসে আছে, সাথে কোন স্টেশনে কখন পৌঁছুবে সেই সময়টাও। রাও চেচিয়ে ওঠে, ওই যে দেখো স্টেডিঅন। আসার সময় ওটা ছিল দুই স্টেশন পরে। আমি তাকিয়ে দেখি স্টেডিঅনের দুই স্টেশন পরে লেখা আছে ফ্রাঙ্কফুর্ট ফ্লুগহফেন। আরে এটাই তো এয়ার পোর্টে লেখা দেখেছি, নিশ্চয়ই ফ্লুগহফেন মানে বিমানবন্দর। আর তখনই চোখে পড়ে নামটির পাশে ছোট্ট একটি প্লেনের চিহ্ন।

আশ-পাশে তাকিয়ে রাও বলে, একটা জিনিস খেয়াল করেছো? আমি খেয়াল করার চেষ্টা করি, পরিচ্ছন্ন এবং ভিড়হীন সাবওয়ে ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। দেখো, কোনো অবিস (মোটা) মানুষ নেই। জার্মানরা খুবই স্বাস্থ্য-সচেতন হয়ে গেছে। এবার আমি সামনে পেছেন যে কয়জন যাত্রী আছে সবাইকে দেখার চেষ্টা করি, সত্যিই তো।

আবারও করোনা ম্যাজিক। এক মিনিটে সিকিউরিটি চেক। আমরা যখন বোর্ডিং গেইটে এসে পৌঁছাই তখনও বুদাপেস্টের প্লেন ছাড়তে এক ঘণ্টা বাকি।

ফ্রাংকফুর্ট। জার্মানি। ৭ মার্চ ২০২০।

লেখক: কবি, কথাসাহিত্যিক, জাতিসংঘে কর্মরত


ঢাকা/সাইফ