ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৬ চৈত্র ১৪২৬, ০৯ এপ্রিল ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

আড্ডার গল্প—আশরাফ সিদ্দিকী

কাজী জহিরুল ইসলাম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-২৬ ১১:১২:৪০ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-২৬ ১১:১২:৪০ এএম

দুই সপ্তাহ আগে বর্ষিয়ান সঙ্গীতজ্ঞ মুত্তালিব বিশ্বাস আমাকে ফোন করেন।  মুত্তালিব ভাই ফোন দিলেই আমি এর কারণ বুঝে যাই।

তিনি ৮৩ অতিক্রম করেছেন, কাছাকাছি বয়সের শিল্প সাহিত্যাঙ্গনের কারো কথা মনে পড়লেই আমাকে ফোন দেন, তাদের শারীরীক অবস্থার খোঁজখবর নেন। আমি অবশ্য ফোন ধরেই বলি, মুত্তালিব ভাই কেমন আছেন? তিনি এর উত্তরে হেসে দেন।  হেসে দিয়েই বলেন, আমি তো ভালোই আছি, ওমর সাহেব কেমন আছেন সেটা জানতেই ফোন করলাম। ওমর সাহেব মানে মহিউদ্দিন ওমর, এক সময় অভিনয় করতেন, এখন নিউ ইয়র্কে থাকেন। তিনিও সত্তরের ঘরে, প্রায়শই অসুস্থ হয়ে পড়েন।

মুত্তালিব ভাই ৮৩ বছরের এক তরুণ তুর্কি।  এখনও মঞ্চে দাঁড়িয়ে চার ঘণ্টা গান করতে পারেন।  শুধু এক দেড় ঘণ্টা পরে তার একটি সিগারেট ব্রেক লাগে, ব্যাস, আবার গাইতে শুরু করেন।  শুধু যে গান করেন তা-ই না, প্রতিটি গানের ইতিহাস নিখুঁতভাবে বর্ণনা করেন। কোন গান কে লিখেছেন, কবে এটি প্রথম গাওয়া হয়, কোন স্টুডিওতে রেকর্ড করা হয় ইত্যাদি। আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনি তার সঙ্গীত বয়ান। অনেকেই হয়ত জানেন না এই মুত্তালিব বিশ্বাসই বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের স্বরলিপিটি তৈরি  করেন।

সেদিন ফোন করে জানতে চাইছিলেন ড. আশরাফ সিদ্দিকীর কথা। আজকাল তার কোনো খোঁজখবর পাই না।  কেউ তাকে নিয়ে কিছু লেখেনও না, আপনি কিছু জানেন? আমি জানি তিনি কি জানতে চাইছেন। আমি বলি, যত দূর জানি তিনি বেঁচে আছেন। তবে কতটা সুস্থ আছেন এই খবর জানি না। খোঁজ নিয়ে আপনাকে জানাবো।

এক সময় আশরাফ সিদ্দিকীর সাথে আমার নিবিড় সখ্য ছিল।  মুত্তালিব ভাই ফোন করার পর আমি কবি মাহবুব হাসানকে ফোন করি। গত রোববারের (৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮) ঘরোয়া রেস্টুরেন্টের আড্ডায় মাহবুব ভাইকে আবারো জিজ্ঞেস করি, এবং এই প্রসঙ্গে আশরাফ সিদ্দিকীর কর্মকাণ্ড নিয়ে আমরা কিছুক্ষণ আলাপও করি। ১৯২৭ সালের ১ মার্চ টাঙ্গাইলে তার জন্ম, মাহবুব ভাইয়ের বাড়িও টাঙ্গাইল, সেই সূত্রে লক্ষ করলাম কিছুটা বাড়তি টান রয়েছে তার আশরাফ সিদ্দিকীর প্রতি। কিছুটা আত্মীয়তার যোগসূত্র আছে, তাও জানালেন।

দেশ বিভাগের পর এক দরিদ্র শিক্ষক তার পরিবারের সবাইকে নিয়ে আত্মহত্যা করেন। ঘটনাটি বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল তখন। এতে আশরাফ সিদ্দিকী খুবই মর্মাহত হন এবং সেই বৃদ্ধ শিক্ষককে নিয়ে লিখে ফেলেন তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কবিতা ‘তালেব মাস্টার’। ১৯৫০ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ বের হয় ‘তালেব মাস্টার ও অন্যান্য কবিতা’।  এর পরে যদিও তার আরো বেশ কিছু কবিতার বই বের হয় কিন্তু মানুষের হৃদয়ে আশরাফ সিদ্দিকী তালেব মাস্টার হয়েই বেঁচে আছেন। তালেব মাস্টার থেকে কিছু অংশ এখানে তুলে দিই।

‘যুদ্ধ থেমে গেছে । আমরা তো এখন স্বাধীন ।

কিন্তু তালেব মাস্টারের তবু ফিরল না তো দিন !

স্ত্রী ছয় মাস অসুস্থা

আমারও সময় হয়ে এসেছে: এই তো শরীরের অবস্থা!

পাঁচ মাস হয়ে গেছে : শিক্ষা বোর্ডের বিল নাই ।

হয়ত এ-বারের টাকা আসতে আসতে শেষ হবে আয়ু তাই

শতছিন্ন জামাটা কাঁধে ফেলে এখনো পাঠশালায় যাই

ক্ষীণ কন্ঠে পড়াই:

‘হে মোর চিত্ত পুণ্য তীর্থে জাগোরে ধীরে

এই ভারতের মহামানবের সাগর তীরে...

মনে মনে বলি :

যদিই ফোটে একদিন আমার এইসব সূর্যমুখীর কলি!

ইতিহাস সবই লিখে রেখেছে ।  রাখবে-

কিন্তু এই তালেব মাস্টারের কথা কি লেখা থাকবে?

আমি যেন সেই হতভাগ্য বাতিওয়ালা

আলো দিয়ে বেড়াই পথে পথে কিন্তু

নিজের জীবনই অন্ধকারমালা ।

মানিকবাবু! অনেক বই পড়েছি আপনার

পদ্মানদীর মাঝির ব্যথায় আমিও কেঁদেছি বহুবার

খোদার কাছে মুনাজাত করি : তিনি আপনাকে

দীর্ঘজীবী করুণ

আমার অনুরোধ: আপনি আরও একটা বই লিখুন

আপনার সমস্ত দরদ দিয়ে তাকে তুলে ধরুন

আর আমাকেই তার নায়ক করুণ!

কোথাও রোমান্স নেই ! খাঁটি করুণ বাস্তবতা-

এবং এই বাংলাদেশের কথা।’

আশির দশকের শেষের দিকে এবং নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে ঢাকা শহরে আমি এবং আমার খালাত ভাই কাজী কনক প্রচুর অনুষ্ঠান করতাম। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র ছিল আমাদের নিয়মিত মঞ্চ।  প্রায় সব অনুষ্ঠানেই আমাদের অবধারিত অতিথি থাকতেন আশরাফ সিদ্দিকী।  সেই সুবাদে তার সঙ্গে আমাদের একটি নিবিড় সখ্য গড়ে ওঠে।  তিনি মঞ্চে উঠে বেশ হিউমার করতেন, দর্শকদের হাসাতেন। তার এই গুণটি আমার খুব ভালো লাগত।  একদিন তার সঙ্গে মঞ্চে লেখিকা রাবেয়া খাতুনও আছেন।  তিনি মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে বাঁ দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে আছেন রাবেয়া খাতুনের দিকে। রাবেয়া খাতুন কি কিছুটা অস্বস্তি বোধ করছেন? আশরাফ সিদ্দিকী দীর্ঘশ্বাস ফেলার মতো করে বলে উঠলেন, ‘রাবেয়া, হায় রাবেয়া’।  এই বলার মধ্যে কিছুটা ব্যর্থ প্রেমের আহাজারি ছিল বলেই হয়ত দর্শক নড়ে-চড়ে বসলেন, কেউ কেউ হেসেও উঠলেন। তিনি মাথাটা ঝাঁকিয়ে বলেন, ‘কিছু হলে হতেও পারত। যৌবনে রাবেয়া বেশ সুন্দরী ছিল।’

এরপর শুরু করেন ঢাকাইয়া জোক।  এক লোক জুতো কিনতে এসেছে। জুতোর দাম বারো টাকা, ক্রেতা দামাদামি করছে, ছয় টাকায় দেবেন? বিক্রেতা বলে, হ, দিমু। ক্রেতা বাড়িতে গিয়ে প্যাকেট খুলে দেখে বাক্সের ভেতরে এক পাটি জুতো।  সে দোকানে ফিরে আসে।  দোকানি বলে, দুইটার দাম তো বারো টেকা, ছয় টেকায় তো একটাই পাইবেন। পাশের দোকান থেকে আরেক ঢাকাইয়া দোকানদার বলে, হালায় বহুত বদ।  কিছু মনে কৈরেন না ভাইজান।  এক কাম করেন, হুগনা গু চিবায়া ওর মুখে থুক দেন।

আশরাফ সিদ্দিকী মুলত লোক বিজ্ঞানী। লোকজ সাহিত্য নিয়ে তিনি প্রচুর কাজ করেছেন। তিনি কবি জসীম উদদীনের ছাত্র ছিলেন। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর সাথেও ছিল তার সুসম্পর্ক, সেই সুবাদে মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর সাথে কিছু কাজও তিনি করেন। তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছেন।  সংগ্রহ করেছেন লোকজ সাহিত্য। আমাদের পল্লী সঙ্গীতের যে শতাধিক উপশাখা আছে এটা আশরাফ সিদ্দিকীই খুঁজে খুঁজে বের করেছেন। প্রায় সাড়ে তিনশ’ র মতো কবিতা লিখলেও ‘তালেব মাস্টার’ ছাড়া তার আর অন্য কোনো কবিতা তেমন তরঙ্গ তুলতে পারেনি। বরং তার গল্প ‘গলির ধারের ছেলেটি’ অবলম্বনে নির্মিত সুভাস দত্ত পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘ডুমুরের ফুল’ তাকে অনেক বেশি পরিচিতি এনে দেয়। ছবিটি অনেকগুলো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়।

যেহেতু লোকজ সাহিত্যের প্রতিই তার আগ্রহ বেশি ছিল।  ঢাকার বাইরে যাবার কোনো নিমন্ত্রণ হাতছাড়া করতেন না। ১৯৯৯ সালে কবি জসীম উদদীন পরিষদের আয়োজনে আমরা শেরপুরের ভায়াডাঙ্গা সফরে যাই।  সেই সফরে আমাদের সঙ্গী হন আশরাফ সিদ্দিকী। একসঙ্গে ভ্রমণ এবং রাত্রীযাপন তাকে আরো নিবিড়ভাবে চিনতে সাহায্য করে। এই সময়েই তিনি আমাকে নাতি ডাকতে শুরু করেন। আমিও তাকে নানা ডাকতে লাগলাম। এর আগে অবশ্য তাকে আমি স্যার বলতাম।

জীবনের অধিকাংশ সময় শিক্ষকতা করলেও ১৯৭৬ সালে তিনি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক পদে যোগ দেন এবং ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত এই পদে বহাল ছিলেন। এই সময়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি কবিতা লিখে তা বাংলা একাডেমির মঞ্চে পাঠ করেন নির্মলেন্দু গুণ। এই অপরাধে গুণ দা কে মহাপরিচালকের কক্ষে ডেকে আনা হয়।  কয়েকজন আন্ডার কভার সেনা কর্মকর্তা গুণ দাকে জেরা করেন। তার কাছে কবিতাটির কপি চান।

তিনি বলেন, আমার কাছে কপি নেই।  এই গল্প অন্য এক আড্ডায় গুণ দার কাছে শুনেছি।  গুণ দা’কে নিয়ে যেদিন আড্ডার গল্প লিখবো তখন আরো বিস্তারিত বলবো।

১৯৮৯ সালে সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরুদ্দীনের জীবদ্দশায় তার জন্মশতবার্ষিকী পালন করেছি আমরা।  আশরাফ সিদ্দিকীর বয়স এখন ৯১ বছর।  আমি প্রার্থনা করি তিনি যেন কমপক্ষে আর ৯টি বছর বেঁচে থাকেন।  আমরা অন্তত একজন প্রকৃত লেখকের জন্মশতবর্ষ উদযাপন করি।

লেখক: কবি, কথাসাহিত্যিক, জাতিসংঘে কর্মরত

 

ঢাকা/সাইফ