ঢাকা, সোমবার, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০১ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

বছরে একবার বাধ্যতামূলক লকডাউন

কাজী জহিরুল ইসলাম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৪-২৫ ৯:০৮:২২ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৪-২৫ ৯:০৮:২২ এএম

সবাই এখন ইতিহাস খুঁড়ে তুলে আনছেন মহামারির শেকড়।  নেটফ্লিক্সে দেখছিলাম ইতিহাসভিত্তিক একটি সিরিয়াল ‘ক্রাউন’। 

প্রথম পর্বেই রাজা জর্জ-৬ এর মৃত্যু ঘটে এবং নাইরোবিতে সফররত থাকা অবস্থায় ২৪ বছরের তরুণী এলিজাবেথ-২ ব্রিটেনের রাণী হন।  ইংল্যান্ড বা গ্রেট ব্রিটেনের মানুষদের আগেই রাণীকে দেখে ফেলেন উপনিবেশ কেনিয়ার অধিবাসীরা।

বৃদ্ধ উইনস্টন চার্চিল তখন প্রধানমন্ত্রী।  বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে পার্টি থেকে চাপ আসছিল চার্চিল যেন পদত্যাগ করেন কিন্তু চার্চিল তাতে মোটেও কর্ণপাত না করে বেহায়ার মতো নিজেকে শারীরিকভাবে সক্ষম ঘোষণা করে আসছিলেন। ক্ষমতায় থাকার জন্য তিনি নানান কৌশল ও মিথ্যার আশ্রয় নেন।  রাণীর অভিষেক ক্ষমতায় আরোহনের দেড় বছর পরে করার পরিকল্পণা করেন প্রধানমন্ত্রী।  কারণ অভিষেক না হওয়া পর্যন্ত কেউ তার পদত্যাগের দাবি তুলবে না। দুবার স্ট্রোক করেও সে কথা রাণীর কাছে গোপন রেখে সর্দি জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন বলে মিথ্যাচার করেন এবং চিকিৎসককে মিথ্যা রিপোর্ট দিতে বাধ্য করেন।

১৯৫৩ সালের বসন্তে, রাণীর অভিষেকের তিন মাস আগে, ইংল্যান্ডের আকাশ হঠাৎ বৈরি হয়ে ওঠে।  বেশ কিছুদিন অন্ধকার কুয়াশায় ডুবে ছিল দেশ। সারাদিন ঘন কুয়াশা, সূর্যের দেখা নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছিলেন পরিবেশ দূষণের ফলে আবহাওয়া বিপর্যয় ঘটেছে। হাজার হাজার মানুষ সর্দি, জ্বর, ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হচ্ছিলেন।  হাসপাতালগুলো রোগী জায়গা দিতে পারছিল না।  শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকা রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত ইনহেলার ছিল না। চিকিৎসা কর্মীরা দিশেহারা হয়ে পড়েন।  জনগণ, এমন কি খোদ রাণীও, প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য চাইছিলেন। কিন্তু চার্চিল সবাইকে বলেন, এটা প্রকৃতির খেয়াল, সব ঈশ্বরের হাতে। আবহাওয়া মন্দ হয়েছে, আবার ঠিক হয়ে যাবে।

তিনি এ বিষয়ে মিডিয়ার আগ্রহকে নেতিবাচকভাবে দেখেন এবং নিজে মিডিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। ইংল্যান্ডের মানুষ আরো একবার চার্চিলের শারীরিক অক্ষমতার কথা জোরেসোরে বলতে শুরু করে।

তার ব্যক্তিগত সহকারী এ-সময়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে বাসচাপা পড়ে। কারণ ঘন কুয়াশায় ভিজিবিলিটি ছিল না বলে বাস ড্রাইভার পথচারীকে দেখতে পাননি। তখন চার্চিলের মধ্যে পরিবর্তন আসে। তিনি ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে জড়ো হওয়া জনাকীর্ণ সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, বৈরি প্রকৃতি দিয়েছেন ঈশ্বর, কবে ঠিক হবে তা ঈশ্বরই জানেন। তবে আমার সরকার চিকিৎসা খাতে বরাদ্দ বাড়াবে, চিকিৎসা সরঞ্জাম বাড়াবে যাতে অসুস্থ মানুষ সঠিক চিকিৎসা সেবা পায়। চার্চিলের এই বিচক্ষণ ঘোষণা তাকে আরো একবার জনরোষ থেকে বাঁচিয়ে দেয়।

এক সময় বাকিংহাম প্যালেসের বিশাল জানালার কাচ ঠেলে পড়ন্ত বিকেলের আলো এসে ঢোকে, ইংল্যান্ডের আকাশ বৈরি প্রকৃতির অভিশাপ থেকে মুক্তি লাভ করে। কিন্তু ততদিনে প্রাণ হারায় বহু লোক। সেটি ছিল পরিবেশ দূষণের ফল।

আজ পৃথিবীর আকাশ ঢেকে দিয়েছে এক অদেখা মেঘ, মানব সভ্যতার আকাশ ডুবে আছে ঘোর অন্ধকারে।  এটিও কী পরিবেশ বিপর্যয়ের ফল নয়? মানুষের ভারে পৃথিবী ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ার আগেই যদি মানুষ সচেতন না হয়, জনসংখ্যা কাম্য স্তরে না রাখে তাহলে প্রকৃতি নিজেই তা নিয়ন্ত্রণ করবে, এ কথা তো বহু বহুদিন আগেই ১৮ শতকের ইংলিশ অর্থনীতিবিদ টমাস রবার্ট ম্যালথাস বলে গেছেন। তার ফল কি আমরা ইতোমধ্যেই দেখিনি? সুনামী, স্পেনিশ ফ্লু, প্লেগ, খরা, ভূমিকম্প কতভাবেই তো প্রকৃতি কেড়ে নিচ্ছে প্রাণ। আমি দেখছি প্রকৃতি এখন দুইভাবে মানুষ বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করছে এবং নিজেকে শুদ্ধ করছে। মানুষ উৎপাদন কমাচ্ছে সমকামীদের সংখ্যা বাড়িয়ে, অটিস্টিক মানুষের সংখ্যা বাড়িয়ে আবার মৃত্যু ত্বরান্বিত করছে রোগ-বালাই দিয়ে, মহামারি, দুর্ভিক্ষ দিয়ে, প্রকৃতিক বিপর্যয় দিয়ে।

প্রকৃতি কখনো কাজটি খুব নীরবে ঘটাচ্ছে আবার কখনো খুব চড়াও হয়ে উঠছে।  করোনাভাইরাস দিয়ে মানুষকে করেছে গৃহবন্দী, একযোগে সারা পৃথিবীতে। বিমান উড়ছে না, গাড়ি চলছে না। এই যে কোটি কোটি টন জ্বালানি পোড়ানো বন্ধ হয়েছে এভাবেই কি প্রকৃতি নিজেকে শুদ্ধ করছে না? যদি আমরা নিজেরাই সচেতন হতাম, যদি নিজেরাই সুন্দর পরিকল্পনা  করে প্রকৃতি দূষণ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতাম তাহলে হয়ত প্রকৃতিকে এতোটা নির্মম, নিষ্ঠুর হতে হতো না। আমরা কী এরপরেও শিখবো না? আমরা কী এখন থেকে প্রতি বছর একবার একযোগে সারা পৃথিবী নিয়ম করে দুই সপ্তাহের জন্য লকডাউনে যেতে পারি না? বছরে একমাস রোজা রেখে আমরা যেমন দেহকে ডিটক্স করি তেমনি বছরে দু-সপ্তাহ বাধ্যতামূলক লকডাউনে গিয়ে প্রকৃতিকে, আমাদের প্রিয় এই পৃথিবীকে, ডিটক্স করতে পারি না? তাহলে হয়ত প্রকৃতির এই রুদ্র মূর্তি ধারণ করার দরকার হবে না।

আমরা জানি করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আমাদের হাতে কোনো অস্ত্র নেই।  এমন কি আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য কোনও ঢালও নেই। এখন একমাত্র উপায় হচ্ছে এর কাছ থেকে পালিয়ে থাকা, যুদ্ধ এড়ানো। করোনা হচ্ছে একটি অদৃশ্য গ্রেনেড, কার পকেটে এই গ্রেনেড আছে আমরা জানি না।  কাজেই এড়িয়ে চলতে হবে প্রায় সবাইকে।

এখন গতরখাটা মানুষের দেশে লকডাউনে থাকার মানে হচ্ছে দুর্ভিক্ষকে আমন্ত্রণ জানানো।  এই দুর্ভিক্ষ প্রতিহত করার জন্য সরকারগুলোকে যথাযথ ব্যাবস্থা গ্রহণ করতে হবে।  সামাজিক সংগঠনগুলোকে এখন খুব কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। সরকারের সব প্রতিষ্ঠানকে স্বাভাবিক কাজকর্ম কমিয়ে করোনা-পরিস্থিতি মোকাবিলায় এগিয়ে আসতে হবে। সরকারকে উন্নয়ন বাজেট থেকে বরাদ্দ কেটে মানুষের ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দেবার জন্য বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।  সেই খাবার যেন উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর হাতে পৌঁছে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।  এই দুর্যোগ নিয়ে আমরা যেন রাজনীতি না করি।  যেন দল, মত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ এই নীতির আলোকে মানুষের পাশে দাঁড়াই। পৃথিবীর মানুষের, একটি দেশের, ভূখণ্ডের সকল মানুষের ঐক্যবদ্ধ হবার জন্যও এটি একটি বড় সুযোগ, এই সুযোগকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা যদি কাজে না লাগাই, তাহলে বড় অপরাধ করে ফেলবো আর সেই অপরাধের শাস্তি হিসেবে হয়ত আমাদের মোকাবিলা করতে হবে আরো বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

হলিসউড, নিউইয়র্ক। ২১ এপ্রিল ২০২০।

লেখক: কবি, কথাসাহিত্যিক, জাতিসংঘে কর্মরত

 

/সাইফ/