ঢাকা, বুধবার, ৬ ফাল্গুন ১৪২৬, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

রুপালি পর্দার নায়ক || টোকন ঠাকুর

টোকন ঠাকুর : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৭-০৮-২৪ ২:২৬:০১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৮-২৪ ৪:৪২:০৮ পিএম

ক্লাস ফোরে পড়া এক ছাত্র তার ছোটকাকার সঙ্গে প্রথম সিনেমা দেখতে যাচ্ছে। সিনেমা হলের নাম 'ছবিঘর'। 'ছবিঘর' প্রেক্ষাগৃহ অবস্থিত গীতাঞ্জলি সড়কে, ঝিনেদা শহরে। এই শহরের আরেকটি প্রধান সড়ক অগ্নিবীণা। শহরের মাঝখান দিয়ে বাহিত একটি ছোট্ট নদী, নাম- নবগঙ্গা। নবগঙ্গা নদীটির তীরেই 'ছবিঘর' সিনেমা হল। আমার ছোটকাকা তখন  খুব সিনেমার পোকা, গাড়াগঞ্জ বাজারের পাশের ছোট্ট গ্রাম মধুপুর, পাশেই কুমার নদ, শৈলকুপার দিকে চলে গেছে। সেই কুমারের পাড়ে আমাদের মধুপুরে, আমার বাল্যকালের বাড়িতে আমি সেই ছোট্ট বয়সেই সেকালের সিনেমা জার্নাল 'চিত্রালী' ও 'পূর্বাণী' পড়তে পেরেছি আমার ছোটকাকার কারণে। ছোটকাকাই একদিন আমার বড়কাকার বড়ছেলে ও আমাকে নিয়ে গেলেন 'ছবিঘর'-এর উদ্দেশ্যে, সিনেমা দেখাতে। সিনেমার নাম 'ছুটির ঘণ্টা।'

সেই সিনেমা বা ছবি হচ্ছে আমার সেই ফোরে পড়া বয়সেরই একটি ছেলের গল্প। ছেলেটি স্কুলের বাথরুমে ঢোকার পর স্কুল ছুটি হয়ে গেছে ভেবে স্কুলের দফতরি বাথরুমের বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে চলে যায়। স্কুলের বাথরুমে আটকে পড়া ছেলেটি আর বেরুতে পারে না। একটা ট্র্যাজেডি তৈরি হয় এবং শেষমেশ ছেলেটি বাথরুমেই মারা যায় কারণ স্কুল কয়েকদিনের ছুটিতে ছিল। আটকে পড়া সেই ছেলেটির করুণ মৃত্যুর গল্প ছড়িয়ে পড়ল আমাদের স্কুলে, পাড়ায় পাড়ায়। আর আমরা যারা সিনেমাই দেখিনি তখন পর্যন্ত, তারা সেই সিনেমার গল্প শুনতে শুনতে বাড়িতে গিয়ে বায়না ধরলাম এবং ছোটকাকার সঙ্গে হলে গিয়ে সিনেমা দেখার অনুমতিও পেলাম।

গাড়াগঞ্জ-মধুপুর থেকে গেলাম ঝিনেদা শহর, ছবিঘর-এ, 'ছুটির ঘণ্টা' দেখব বলে। 'ছুটির ঘণ্টা' ছবির বাথরুমে আটকে পড়া ছেলেটির করুণ মৃত্যু দেখতে পারা হলো না সেদিন। কারণ, সিনেমা হল থেকে আগেরদিনই 'ছুটির ঘণ্টা' চলে গেছে এবং নতুন যে ছবিটা তখন চলছে, ছবির নাম 'আপন ভাই'- তাই দেখতে হলো। ফলত, ছুটির ঘণ্টার করুণ কাহিনি সেদিন আর দেখা হয়নি। পরে, আরেকটু বড় হয়ে আমি দেখলাম ছুটির ঘণ্টা ছবিটি। অর্থাৎ সেই ছোট্ট ছেলের মৃত্যুকাহিনি দেখলাম। দেখতে দেখতেই খালি মনে হচ্ছিল, ইশ, স্কুলের দফতরি বাইরে থেকে বাথরুমে তালা লাগানোর সময় যদি ভেতরে একটু দেখে নিতেন! দেখলেই, ছেলেটিকে দেখতেন, ছেলেটি আর আটকা পড়ত না, মরতেও হতো না তাকে এভাবে, সারা বাংলাদেশ কাঁপিয়ে, কাঁদিয়ে।  দফতরি কী ভুলটাই না করলেন খেয়াল না করে। স্কুলের সেই দফতরি ছিলেন রাজ্জাক, দফতরির বউ ছিলেন শাবানা। পরবর্তী জীবনে আমি ক্লাস ফোর থেকে আরো কিছু ক্লাস অতিক্রম করি। আরো অনেক ছবি দেখি। দুনিয়ার অনেক ছবিই দেখি। দেখতে দেখতে, আমিও একদিন ছবি বানানোর লোক হয়ে উঠি। আমিও সিনেমা বানানোতেই জীবন খরচ করছি। ভালো লাগছে এটা করতে। অনেক আনন্দ, যন্ত্রণাও, পেতে ভালো লাগে। পাচ্ছি।

গাড়াগঞ্জের মধুপুর গ্রাম পাড়ি দিয়ে ঝিনেদা শহর হয়ে চলে যাই খুলনায়। খুলনায় আমার থাকা শেষ হয়ে আসে এবং আসতে হলো ঢাকায়। ছবি আঁকাতেই আমার প্রাক-স্নাতক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ হয়। ছিলাম খুলনা আর্ট কলেজে, ছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটে। তো সেই ছুটির ঘণ্টার দফতরি রাজ্জাকের দেখা পড়ল অসংখ্য। আমিও পোকা হয়ে উঠলাম, সিনেমার। রাজ্জাক-শাবানা, রাজ্জাক-কবরী, রাজ্জাক-ববিতা, রাজ্জাক-রোজিনা- এরকম আর কি! জানলাম, এদেশের সিনেমামোদীরা রাজ্জাককে অভিনেতা হিসেবে সারাজীবনের জন্যে একটি উপাধি দিয়েছে- নায়করাজ। সেই নায়করাজ রাজ্জাক সম্প্রতি প্রয়াত হলেন বৃদ্ধ হয়ে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে দীর্ঘসময় নায়ক হয়ে থাকা অভিনেতাটি চলে গেলেন। জহির রায়হানের 'বেহুলা' বা 'জীবন থেকে নেয়া' ছবির নায়ক চলে গেলেন। একটি শূন্যতা ভেসে উঠল সিনেমা পর্দায় বা পর্দার বাইরে মানুষের সামাজিক জীবনের আলোচনাতেও। আর আমার মনে পড়ে যাচ্ছে সেই ছোট্ট বয়সে; ছুটির ঘণ্টা দেখতে গিয়ে দেখতে না-পারার কথা। মনে পড়ে যাচ্ছে, ওই বয়সে মনে হওয়া রুপালি পর্দার রহস্যের কথা। সত্যিই, সিনেমা সেই বয়সে এক অপার রহস্য। রহস্যের শেষ নেই!

যেমন আমার মনে হতো, একটি ছবিতে রাজ্জাক হয়তো স্কুলের দফতরি, আবার আরেকটি ছবিতে তিনি কীভাবে নিরক্ষর রিকশাচালক? একটি ছবিতে তিনি নিজেই ছাত্র আবার আরেকটি ছবিতে তিনিই কীভাবে গুণ্ডা চোর? একটি ছবিতে হয়তো রাজ্জাক এক বিশাল ধনী লোক আবার পরের ছবিতে তিনি কীভাবে বাবা বা বাবা কেন চাকর? বড় অদ্ভুত লাগত ব্যাপারটা। রহস্য লাগত। সেই রহস্য আমাকে চিন্তা করতে করতে কোথায় নিয়ে যেত! আহা রে, ছোটবেলার সিনেমা রহস্য কেন বড়বেলায় ভেঙে গেল!

রুপালি পর্দার নায়ক আদতে এমনই হয়। এক ছবিতে তিনি জন্ম নেন, আরেক ছবিতে তিনি হয়তো বুকে গুলি বিঁধে মরেও যান। নায়িকাদের সব্বাইকে নিজের প্রেমিকা এবং বউও মনে হতো। এক ছবিতে যে নায়িকা গ্রামের মেয়ে, নেচে নেচে বেড়ান, পরের ছবিতেই তাকে দেখেছি তিনি শহরের ভার্সিটি পড়া মেয়ে। আমার গ্রামের মেয়েও ভাল্লাগে, শহরের মেয়েও ভাল্লাগে। রহস্যের যেমন শেষ নেই, ভাল্লাগারও শেষ নেই। আজ, সেই ছোটবেলার রহস্যে ঘেরা এক নায়কের প্রস্থান হলো। রাজ্জাক চলে গেলেন। বাংলার সিনেমাপ্রেমী দর্শক রাজ্জাককে মনে রাখবে নায়ক রাজ্জাক হিসেবেই। তিনি অমরত্ব পেয়ে গেছেন বাংলাদেশে।

রাজ্জাক, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাস হয়ে গেলেন 'রংবাজ', 'মজনু' রাজ্জাক। তাঁর কর্ম ও জীবনকে আমি আমার শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

 

২৪ আগস্ট, ২০১৭

মগের মুলুক, ঢাকা

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৪ আগস্ট ২০১৭/তারা