ঢাকা, বুধবার, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ঐতিহ্যের বলীখেলা

আশরাফ উল্লাহ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৪-২৭ ৪:৩৪:২৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৪-২৮ ১১:৪৯:৫২ এএম

আশরাফ উল্লাহ : ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সবে দানা বাঁধছিল। মাস্টারদা সূর্য সেন তখনো সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করেননি। তখনই সাহস ও শক্তির প্রকাশ ঘটানোর জন্য অভিনব এক পরিকল্পনা করেন চট্টগ্রাম শহরের বদরপাতির ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর। আয়োজন করেন বলী খেলার। দৃশ্যত ক্রীড়াশৈলী, আদতে তরুণদের সংগঠিত করা। সময়টা ১৯০৯ সাল, বাংলায় ১৩১৫। সেই শুরু। পেরিয়েছে ১০৮ বছর। এই খেলা এখন চট্টগ্রামের ঐতিহ্য।

১৩১৫ বঙ্গাব্দের ১২ বৈশাখ প্রথমবারের মতো এ আয়োজন হয়েছিল চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে। সেই থেকে প্রতিবছর একই দিনে অব্যাহতভাবে বসছে বলীখেলার আসর। উদ্যোক্তার নামের সঙ্গে মিলিয়ে এর নাম আবদুল জব্বারের বলীখেলা। সেই প্রথমবার যেমন সারা দেশ থেকে এমনকি পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার থেকে দলে দলে বলীরা এসে ভিড় জমিয়েছিলেন, এখনো বজায় রয়েছে সে রেওয়াজ। তবে শুরুর দিকে প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকে চট্টগ্রাম শহরে এসে ভিড় জমাতেন বলীরা। অনুশীলন শুরু হতো আগেভাগেই। আমানত শাহর মাজারের পাশের বোর্ডিংয়ে তাঁদের থাকার ব্যবস্থা, খাওয়া ও আপ্যায়নের যাবতীয় আয়োজনই করতেন আবদুল জব্বার সওদাগর। এখন সেই ব্যবস্থা নেই, তবুও দূর-দুরান্ত থেকে এখনো বলীরা এসে উপস্থিত হন প্রতিযোগিতার দিন বা একদিন আগে। সুদীর্ঘ কাল ধরে বলীখেলার আয়োজনটি বংশ পরম্পরায় টিকিয়ে রেখেছে আবদুল জব্বারের পরিবার। চট্টগ্রাম শহরের বিশিষ্টজনদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে বলীখেলা ও বৈশাখী মেলা চালিয়ে আসছেন তাঁরা। জব্বার সওদাগরের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে শুক্কুর আনোয়ার নিয়েছিলেন দায়িত্ব। ১৯৮৫ সালে তাঁর মৃত্যু হলে ১৯৮৬ সাল থেকে হাল ধরেন তাঁর ছেলে শওকত আনোয়ার বাদল। তিনিই এখন বলীখেলা ও মেলা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক।

দেশাত্মবোধের চেতনা থেকে এই ঐতিহ্যবাহী খেলা ও মেলার প্রচলন। ব্রিটিশ সরকার আবদুল জব্বার সওদাগরকে ‘খান বাহাদুর’ উপাধি দিয়েছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধেই ছিল তাঁর অবস্থান, তাই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তাদের দেওয়া এই সম্মান। তিনি যুবসমাজকে দেশের প্রয়োজনে নিজের শক্তি-সামর্থ্য বৃদ্ধি ও লড়বার প্রেরণা যুগিয়েছেন।
 


বলীখেলার আভিধানিক নাম ‘মল্লযুদ্ধ’ বা কুস্তি প্রতিযোগিতা। চট্টগ্রামে এই খেলা চলে আসছে প্রাচীন কাল থেকে। ‘মল্ল’ নামে খ্যাত বহু প্রাচীন পরিবার এখনো আছে। এ অঞ্চলের অন্তত ২২টি মল্ল পরিবার ইতিহাস প্রসিদ্ধ, যা উল্লেখ আছে গবেষক আবদুল হক চৌধুরী রচিত ‘বন্দর শহর চট্টগ্রাম’ গ্রন্থে। দুই বলী মুখোমুখী হবেন শক্তি ও কসরতের লড়াইয়ে। প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করে কয়েক মুহূর্ত তাঁর পিঠ মাটিতে ঠেকিয়ে রাখতে পারলে জয় নিশ্চিত হয় এ খেলায়। প্রাচীন এই খেলাটি নতুন মাত্রা পেল আবদুল জব্বারের উদ্যোগের মধ্য দিয়ে। সাহস ও শৌর্যের সঙ্গে যুক্ত হলো দেশের প্রতি ভালোবাসা, দেশের জন্য লড়াই করার প্রেরণা।

জব্বারের বলীখেলার পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন স্থানে যেমন কক্সবাজারে ডিসি সাহেবের বলীখেলা, সাতকানিয়ায় মক্কার বলীখেলা, আনোয়ারায় সরকারের বলীখেলা, রাউজানে দোস্ত মোহাম্মদের বলীখেলা, হাটহাজারীতে চুরখাঁর বলীখেলা, চান্দগাঁওতে মৌলভীর বলীখেলা এখনও কোনোরকমে বিদ্যমান। এই খেলার শুরু থেকেই বেজে চলে রণবাদ্য। কাঁপন ধরানো ঢাক-ঢোলের আওয়াজ। চারদিকে হর্ষধ্বনি। একেবারে ময়দানি লড়াইয়ের পূর্ণ-আমেজ। উঁচু বলীমঞ্চে উদোম গায়ে লড়েন সুঠামদেহী বলীরা।
 


এই আয়োজন উপলক্ষে বসে মেলা। তিন দিনের আনুষ্ঠানিক মেলা বসার কথা থাকলেও কার্যত পাঁচ-ছয় দিনের মেলা বসে লালদীঘির ময়দানের চারপাশের এলাকা ঘিরে। মেলা বসে আন্দরকিল্লা মোড় থেকে লালদীঘির চারদিক, হজরত আমানত শাহ (রা.) মাজার পেরিয়ে জেল সড়ক, দক্ষিণে বাংলাদেশ ব্যাংক চত্বর পেরিয়ে কোতোয়ালি থানার মোড়, পশ্চিমে কে সি দে সড়ক, সিনেমা প্যালেস হয়ে টিঅ্যান্ডটি অফিস পর্যন্ত বিশাল এলাকাজুড়ে। চট্টগ্রামের আনাচে-কানাচে তো বটেই, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল সাভার, নরসিংদী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ফেনী, সিলেট, ময়মনসিংহ থেকে বিক্রেতারা আসেন পণ্যসামগ্রী নিয়ে। মেলায় পাওয়া যায় সব ধরনের জিনিস। বিশেষ করে গৃহস্থালির নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। হাতপাখা, মাটির টব, পাটি, ছোটদের খেলনা, কাঠের আসবাবপত্র, প্রসাধনসামগ্রী, ঘর সাজানোর নানা উপকরণ-বড় ফুলদানি, প্লাস্টিকের ফুল, ফ্লোর ম্যাট প্রভৃতি, হস্তশিল্পের মধ্যে রয়েছে পাটের শিকা, দোলনা ও থলে, মৃৎশিল্পের সামগ্রী-সানকি, চাড়ি, বড় পাত্র মোটকা, ঢাকনা ও ভুঁই।

এ ছাড়া ফলের বীজ, গাছের চারা, চাঁই, ডালা, কুলা, আঁড়ি, তামা ও কাসার তৈজসপত্র, দা-বঁটি, খুন্তি, ঝাড়ু, বেলুনি, পিঁড়িসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসই রয়েছে। এমনকি খরগোশ বা বিচিত্র পাখিও বিক্রি হয় এখানে। এত সব কিছু আছে আর মেলায় মুড়ি-মুড়কির দোকান থাকবে না, তা কী করে হয়। ফাঁকে ফাঁকে রয়েছে বিভিন্ন খাবারের দোকান। এসব দোকানে বিক্রি রয়েছে গজা, খই, মুড়ি-খইয়ের মোয়া, তিলের মোয়া, চিনিমাখা ছোলাবুট, মুড়ি, বাতাসা, নাড়ু, ভুট্টা, জিলাপি, মিষ্টি, দই, চানাচুর, আচারসহ মৌসুমী ফল।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৭ এপ্রিল ২০১৮/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন