ঢাকা, শুক্রবার, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ২২ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

স্বপনবুড়ো, আমায় ক্ষমা কোরো

হামিম কামাল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৭-১৮ ৭:৪১:২৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৭-২১ ৫:৫৯:৪৮ পিএম
হুমায়ূন আহমেদের ব্যবহৃত আলোকচিত্র : নাসির আলী মামুন


বেশ দিন কাটছিল আমার। সকালে ঘুম থেকে উঠে নাশতা করে কাপড় বদলে চায়ের কাপ হাতে লেখার টেবিলে বসে যাই। একটানা বিকেল পর্যন্ত লিখি। অবসাদ কাটাতে খানিকটা সময় বাইরে বেড়াই। আলো নিভলে ফিরে আসি। এরপর গোসল সেরে কাপড় বদলে কৃত্রিম আলোর নিচে বালিশ পেতে শুয়ে পড়ি একটা কোনো বই হাতে।

পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে গেলে, একপাশে বই নামিয়ে রেখে ভাবি আকাশপাতাল; হয়ত সকালের লেখার কথাই, বা কোথাও বেড়াতে যাওয়ার কথা। হয়ত ভাবছি, অনেক দিন দেখা নেই কোনো এক ‘তার’ সঙ্গে। শিগগির এই অদেখার শাপ মোচন করা দরকার। আশ্চর্য উপায়ে পরদিনই হয়ত শাহবাগে তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।

পার্লিয়া অফিস থেকে ফেরার পথে শাহবাগে নামে। আমরা দুজন পুরনো দিনের মতো পুরনো পথগুলোয় হেঁটে হেঁটে প্রেমের একপ্রকার রোমন্থন করতে করতে ঘরে ফিরি। শরীরে কিছু ক্লান্তি জমলেও মন পুরোপুরি ঝরঝরে তখন। এতোটাই যে, ক্লান্তি সে টের পেতে চায়নি। বিছানায় পিঠ ঠেকাতে চায়নি। দু’জনে মিলে একটা সিনেমা দেখে এরপর হয়ত বাতি নিভিয়েছি। কখনো আবার এমনও হয়েছে, দেয়ালের বাতি নিভল, কিন্তু তখনও স্মার্টফোনের পর্দা নিভল না। সেখানে হয়ত পালামৌর সুবাস নিয়ে আমার অপেক্ষায় ছিলেন সঞ্জীবচন্দ্র। বা রাজনৈতিক বোঝাপড়ার বার্তাকথাসহ যতীন সরকার।

দেখা গেল, পরদিনই ছুটি। হয়ত পার্লিয়া আর আমি মিলে রওনা হয়েছি রেলস্টেশনে। অজ্ঞাত কিশোরগঞ্জের ট্রেন সামনে এসে থামার পর, তাকে বিমুখ করিনি। কিন্তু কিশোরগঞ্জ পৌঁছোনোর আগেই আমরা পা রাখলাম নরসিংদীতে। এরপর উয়ারি বটেশ্বরের  আদিম আলো হাওয়ায় সেদিনের বিকেলটা হয়ে উঠল রহস্যময়। কতদিন এমন হয়েছে।

পরদিন, বা তার পরদিন, বা তারও পরের দিন, ফিরে এসেছি। মাথায় শব্দ আর বাক্যের সাগরে ভরা জোয়ার।

হঠাৎ ছন্দপতন।

হঠাৎ একদিন কশেরুকার ভেতর স্নায়ুর সুতোটা আটকে গেল। ভেতরে কোথাও বাতি নিভে গেল। ধুমধড়াস ধরণীতল!

ডাক্তার বলল, মেরুদণ্ডের একটা ডিস্ক সরে গিয়ে এই উৎপাত। অতো সুখে থাকতে থাকতে ধীরে ধীরে আমার শরীরে মেদ মাংস বাড়িয়ে চলার পরিণতি।

লেখার সুখে বিভোর আমি যখন ভুলেই গেছি টানা ছয়-সাত ঘণ্টা চেয়ার ছেড়ে একটুখানি উঠে দাঁড়ানোও হয়নি আমার, তখন মাথার কাছে মাতা প্রকৃতি বারবার কান মলেও আমাকে সজাগ করতে না পেরে চোখে রাগ নিয়ে দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি তার অস্তিত্ব অনুভব করেছি। কিন্তু সাড়া দিতে ভুলেছি। 

রাতের পর রাত অজান্তেই মনের সুখের দামে শরীরে আক্ষেপ তৈরি করছি। হঠাৎ সেই দিন তার প্রতিফলক ধসটা নামল। সেই ধস সামাল দিতে না দিতেই ঋতুবদলের আরেক পরীক্ষা এসে উপস্থিত। এবং অনেক দিন পর এমন পরীক্ষায় আমার অকৃতকার্যতা ধরা পড়ল। জ্বরে পড়লাম। শেষ কবে জ্বর হয়েছিল মনে পড়ল না।

সারাক্ষণ বিছানায় শুয়ে অল্প আঁচে সেদ্ধ হই। আর চোখের সামনে কমে আসতে থাকা লুমেনে মন বিষণ্ন হয়ে থাকে। পার্লিয়া আমাকে যথাসঙ্গ দিয়েও আর মন পায় না। কেবলই মনে হয়, ও আমাকে এতো অবহেলা আর করেনি কখনো।

বন্ধু রিশাদ এসে অনেকটা সময় আমার পাশে কাটায়। গল্প পড়ে শোনায়, লেখা নিয়ে আলাপ করে। এতো ব্যস্ততার ভেতরও প্রায় ঘণ্টাছয়েক আমার সঙ্গে কাটিয়ে এরপর সে ফেরে। তবু আমার মনে হয়, এই আধখেঁচড়া আসার কোনো দরকার ছিল না।

প্রথম প্রথম লেখার আলাপে আমার চোখে আলো জ্বলে উঠত। ক্রমে সেটাও বন্ধ হতে থাকল। দেখা গেল শেষতক আমাকে কিছু পড়ে শোনানো ছাড়া আর কিছুতেই আমাকে কেউ শান্ত করতে পারছে না। আর শরীরের অবিরত যাতনার শাপে আমি ওদের পড়া যতটা শুনছি, তার খুব কমই হৃদয়ের পশছে বা মনের পটে আঁকতে পারছি। বোঝাপড়া পরিষ্কার হচ্ছে না।

মগজের ভেতর একটা পারমিয়েবল পর্দার ঘেরাও যেন সমস্ত কিছুর ওপর কুয়াশাফেলা অনুভূতি সরবরাহ করে চলেছে। তার থেকে আমার মুক্তি নেই। মনে অবসাদ বাড়তে থাকায় এক পর্যায়ে পড়াও অসহনীয় হয়ে উঠল।

ঠিক তখন, একটি বই আরো শতেক বইয়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে আমাকে বাঁচাল। সেই বইয়ের পাতায় পাতায় বাগশব্দের আশ্চর্য রহস্যময় জগৎ! আমার মনের আরো বারো রকম উন্নাসিকতা যেন তুষারপাতে ঢাকা পড়ল। যেন এক আরামদায়ম আসনে আমি ডুবে গেলাম। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। আমি সুখ পেলাম। অনেক অনেকদিন পর।

বড় অসুখের দিনে আমাকে সুখ এনে দিলো হুমায়ূন আহমেদের ‘গল্পসমগ্র’ নামে একটি স্ফীতকায় বই।

আমি চোখের স্বল্পালোয় ওটার দিকে তাকিয়ে ভাবতাম, এ বই কেন আরো মোটা হলো না? কেন অসীম হলো না কালো কালির অক্ষর বসানো মল্টেড সেলুলোজের যত পত্রঢাল?

সমস্ত কাজকর্ম ফেলে আমার যতন করার পাশাপাশি, এবার বই পড়ে শোনাতে শোনাতে পার্লিয়ার কপাল ঘেমে উঠল। ভাবলাম, বেচারি, ভেতর বাহির কত আর খাটবে? ওকে এবার মুক্তি দেওয়া যাক। নিজের উপায় নিজেকেই করতে হবে।

ওদিকে মেরুদণ্ডের ব্যথা নিয়েও সিংহাসন কি শবাসন, কোনো আসনেই বেশিক্ষণ থাকতে পারি না। ত্রিশে যেন সত্তর ভর করেছে। বিশেষ এক কৌণিক অবস্থানে কাত হয়ে আবিষ্কার করলাম পিঠের ব্যথাটা এভাবে দীর্ঘক্ষণ ঠেকিয়ে রাখা যায়। ব্যস! এবার দিন রাত এক করে আলোর দিকে পাতা মেলে দিয়ে আমি পড়ে যেতে থাকলাম, একা।

সেই জাদুর ধারা আবার বইতে শুরু করল। আমার গরম নিঃশ্বাস আর শুকিয়ে আসা টাকরা, আমার স্নায়ুসুতোর হাস্যরস আর চোখের ক্রমশ বিরক্ত হয়ে উঠতে থাকা রড কোষ সমস্ত শক্তি জড়ো করেও এতোখানি যোগান পেল না যে আমাকে তাদের কথা ভাবাতে পারে। আমি পড়েই চলেছি। সে এক আনন্দভ্রমণ।

মার্কেজ বলেছিলেন, আনন্দ যে অসুখ সারাতে পারে না, তার উপশম নেই। আমার মন যত সবল হয়ে উঠতে থাকল, প্রাকৃতিক আহিতির গুণে শরীরও তত প্রভাবিত হতে থাকল। অনেকদিন পর আমার মন এক স্বপনবুড়োর নির্ঘুম রাতের বিপরীতে কৃতাঞ্জলিপুটে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উপলক্ষ খুঁজে পেল। গেল দিন, এলো রাত। অতপর রাতও পেরোল।

সকালে রিশাদ এলে তার সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আলাপ হলো তাঁকে নিয়ে।

হুমায়ূন আহমেদের ওপর আর কখনো অবিচার করব না প্রকৃতির শপথ। বুকে হাত রেখে বলছি। তুমি ভাবতে পারবে না কী সঞ্জীবনী তিনি জ্বরতপ্ত অবস্থায় আমাকে পান করিয়েছেন। আমি বুঝতে পেরেছি, হুমায়ূন তাঁর কাজটিই করেছেন। এমন নির্মল আনন্দ আমি দূর শৈশবঘেঁষা কৈশোরে শেষ পেয়েছিলাম। এবং একটা বড় অংশ যেন তাঁর কাছ থেকেই। আমার মনে পড়েছে সব। আমার যত অহংকার, হুমায়ূন সময়ে এসে জল করে দিলেন। আমার শক্ত চোয়াল অনেকদিন আগে নরম হয়ে এসেছিল রিশাদ। আজ আবার তার পুনরাবৃত্তি হলো।

তুমি কি জানো আমার প্রথম তারুণ্যের এক দিনের কথা? যৌবনের আদর্শপরায়ণতা কত রূঢ় হতে পারে জানো? কী ঔদ্ধত্যে একদিন তাঁকে আমি অপমান করেছিলাম। তার মনে কষ্ট দিয়েছিলাম।

মান দেওয়াটাই ধ্যান আর বুদ্ধিমত্তার ব্যাপার। অপমান করতে বুদ্ধির চেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় নির্বুদ্ধিতার। নির্বোধ তাই খুব সহজেই বড়র সামনে পায়ে পা তুলে বসে। সেই দলে আমিও ছিলাম। শুনবে?

আগের দিন বন্ধু সৌরভের বাসায় গিয়েছিলাম।

ওর বাসা পুরনো ঢাকার হোসেনি দালান রোডে। খুঁজতে গিয়ে আমি চারবার কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে উপস্থিত হয়ে টের পেলাম, আমার মতো নতুন ঢাকার পক্ষীর পক্ষে পুরনো ঢাকার রহস্যঘন অলিগলির হাওয়া সাঁতরে গন্তব্যে পৌঁছনো কঠিন। মোবাইল ফোন সঙ্গে ছিল অবশ্য। কিন্তু বন্ধুকে ফোন না দেওয়ার একটা সংকল্প দাঁড়িয়ে গিয়েছিল আমার মনে। একটা অকারণ রোখ চেপে বসেছিল। দেখি, ফোন দেবো না। না দিলে কী হয়। ফোন ছাড়া মানুষ খুঁজে পায়নি বন্ধুর বাড়ি এই পুরনো ঢাকায়?

আমার রোখ হালে জল না পেয়ে তখন সন্ধির কাছে নত। ক্লান্ত অবসন্ন দেহে এক বাড়ির শ্যাওলাটে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে কপালের ঘাম ফেলে ফোনটা বের করতে বাধ্য হলাম। সেদিন বন্ধু সৌরভ যদি এসে আমাকে নিয়ে না যেত, রাগে দুঃখে আমি বোধহয় কেন্দ্রীয় কারাগারেই ঢুকে পড়তাম।

সেই রাতে বন্ধু আমাকে ফিরতে দিলো না। রাতভর দুজন গল্প করলাম, সিগারেট পোড়ালাম। আপন আপন গোপন ক্ষত কিংবা পুলক উন্মোচন করলাম পরস্পরের কাছে। বেশ কাটল।

পরদিন সকালে পরিবেশ অনুকূল পেয়ে গতকালের রোখ তার ম্যান্ডেট বদলে আবার জ্বালাতে থাকল। বলে কিনা, তুমি এখান থেকে হেঁটে শাহবাগ যাও। এ তোমার গতকালের শাস্তি।

সত্যিই হাঁটতে শুরু করলাম। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ কী করে যেন ফজলে রাব্বী হলটা পেয়ে যেতেই মনের সুস্থ কিন্তু ভীত অংশটা অভয় পেল। এখান থেকে পথঘাট আমার চেনা।

যখন চারুকলার সামনে পৌঁছেছি তখন ক্ষুধা নয়, তৃষ্ণায় আমার গলা শুকিয়ে মরু। এরকম অনেক তৃষ্ণা আমি পাবলিক লাইব্রেরির দোতলায় ‘মুখ ধোবেন না’ জলে মিটিয়েছি। ভাবলাম আজও তাই হোক।

তখনও জানি না, আমি হেঁটে চলেছি এক অদ্ভুত গ্লানির বোঝার দিকে। পরবর্তী জীবন যা আমি বয়ে নিয়ে বেড়াব।

লাইব্রেরি ফটকের কাছে দাঁড়াতেই দেখতে পেলাম, দূরে ক্যান্টিনের কাছে একটা উঁচু চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে, কে যেন সামনের অর্ধবৃত্তাকার জটলা উদ্দেশ্য করে কথা বলে যাচ্ছে। এতো দূর থেকে লোকটার অবয়বের পর সবার আগে আর যা দেখতে পেলাম, তা ওই লোকটার কান।

কী সর্বনাশ! এতো বড় কান নিয়ে দাঁড়িয়ে কে এই লোক! এক রূপকথা ছাড়া কোনো মানুষের এমন কান তো আমি দেখিনি!

গলায় তেষ্টা। সিঁড়ি ভেঙে লাইব্রেরিতে না উঠে সোজা ওই ক্যান্টিনের দিকেই এগোতে থাকলাম। উদ্দেশ্য, ক্যান্টিনের ওই বোতলমাপা ঘোলাজল। এখন সিঁড়ি ভাঙার শক্তি নেই। আর সেই ফাঁকে ওই বৃহৎ কর্ণধর লোকটিকেও দেখতে পাবো। কী বলছে সে?

আরো খানিকটা সামনে যেতেই হঠাৎ দেখতে পেলাম, জটলার পেছনে ছোট করে প্যান্ডেল টাঙানো হয়েছে। তার ভেতরে সারি সারি টেবিল পাতা। টেবিলগুলোর ওপর সুন্দর সজ্জায় বিছিয়ে রাখা অনেক বই। ছোট করে কোনো বইমেলা হচ্ছে বোধয়। বইগুলোর রঙিন মলাটে আলো ছায়ার বিশ্লিষ্ট প্রতিফলন।

প্যান্ডেলের পেছনভাগের একটা পর্দা দেখে চমকে উঠলাম। কৈশোরের স্বপনবুড়োর নামটি খুব বড় করে লেখা- হুমায়ূন আহমেদ।

এক মিনিট! হুমায়ূন আহমেদ?

ঝট করে তাকিয়ে দেখি, হ্যাঁ, সেই রূপকপ্রতীম কানের শ্যামল মানুষটি আর কেউ নন। কী বলছেন তিনি? লোকগুলো এমন চুপ করে থেকে কী শুনে যাচ্ছে? তাদের তোষামোদ-তেলচিটে মুখগুলো দেখে হঠাৎ আমার ভীষণ রাগ হলো।

এ হলো সেই রাগ, যার সঙ্গে যৌবনের ঔদ্ধত্যবাদের প্রত্যক্ষ যোগ আছে। যখন তখন এই রাগ মুকুটের মতো মাথায় চেপে বসে আর লোককে সেই মুকুট দেখাব বলে ভেতরে এক ধরনের ভূতফাটা আবেগ অনুভব করি। আবেগটা একেকটা তরঙ্গের মতো শরীরের নিচ থেকে খেলতে খেলতে মাথায় উঠে আসে। তখন চারপাশ কেমন ঝিমঝিম করে ওঠে।

আমি আমার শরীরে তেমনই এক ঝিমঝিমে ভাব টের পেলাম। তেষ্টার কথা ভুলে দাঁড়িয়ে পড়লাম কথা শুনতে। কী বলতে পারেন এই ভদ্রলোক? মানুষের ভাবনাচিন্তাকে তুচ্ছ রসবোধের গণ্ডির  ভেতর আটকে ফেলে নির্বোধ সুখবন্দি করে তোলা এই মানুষটা কী বলতে চান? মানুষকে আর সমস্ত কল্যাণকামী বই থেকে বিমুখ করার কুহক বিস্তারি এই লোক কী চান? আদর্শিক সাহিত্য সাধনাকে সাধারণ মানুষের কাছে প্রতিনিয়ত হেয় প্রতিপন্নকারী এই লোকের কথা তো আমি শুনব না!

আমার শৈশবের রঙিন সূচনাদিন আর কৈশোরের কল্পবিলাসী দিনদ্বৈরথের তিনি সাথী। কিন্তু যৌবনের রসদ কোথায়? আমি তো পাইনি!

হুমায়ূন আহমেদ নামে কোনো মানুষ যদি কোনোদিন কলম না ধরতেন, তাকে সাধু কিংবা দুয়ো কোনোটাই দেওয়ার জন্যে আমি খুঁজে পেতাম না। সেটা আলাদা কথা। শৈশবে আমার মনটাকে যেন আরো বড় কিছুর জন্যে প্রস্তুত করে, ব্যক্তি আমার তারুণ্যের দাবির সামনে তিনি টিকতে পারলেন কোথায়। কেবল কোমল, পরাজিত একদল মানুষ তৈরিতেই সমস্ত শক্তি তার ফুরিয়ে গেল?

শুরুতে স্কেপটিক ছিলেন। পরে মিস্টিক হলেন, বেশ তো। কিন্তু তারপর? শেষতক তিনি সেক্যুলার ছিলেন সত্যি। কিন্তু অনেক প্রতিক্রিয়াশীল মানুষ তাদের উদ্ভট অন্ধত্ববাদের গোড়ায় তার লেখা থেকে নিয়ে জল ঢালছে, আমি দেখেছি। খসড়া সব বোঝাপড়া তৈরি করিয়ে তিনিই কি সেই উপায় তৈরি করে দেননি?

সাহিত্যকে ছেলের হাতের মোয়া প্রতিপন্নকারী এই মানুষটির জন্যে যেনতেন লোকেরাও আজ ভাবতে পারছে, রাত থেকেই কলম ধরে বুঝি জনতার সাগরে সুড়সুড়ির বিকট সব ঢেউ তুলবে। তুলেছেও কতজন। তাদের চিনি না আমি!

এইসমস্ত ভাবছি। আমার কানের পথ দিয়ে তখন ক্ষোভবাষ্প বেরোচ্ছে বিধায় তার কথা অল্পই কানে এলো। তখনও ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ নামে চলচ্চিত্রটা কেবল তার মস্তিষ্কভূত। পরিকল্পনার নকশায় নিহিত। আত্মপ্রকাশ করেনি। তিনি বলছেন, এই চলচ্চিত্র নামানোর মতো টাকা এ মুহূর্তে তাঁর হাতে নেই। এ যাবত অনেক যাতনা মাথায় নিয়েছেন, এবার এটাই শেষ। এরপর তিনি আর কোনোদিন চলচ্চিত্র বানাবেন না।

শুনলাম, এই কথার পর মানুষের ভেতর থেকে একটা শোর উঠল। সবাই সমস্বরে বলতে থাকল, না না স্যার, আপনি আরো অনেক ছবি বানাবেন! কেউ বলল, আপনার আরো অনেক দেওয়ার আছে, আপনার দিকে আমরা তাকিয়ে আছি! কেউ একজন চিৎকার করে বলল, আপনি থামবেন না!

আরো কত রকমের বাক্য যে তোড়া থেকে ছেঁড়া ফুলের মতো তার দিকে ছুটে যাচ্ছিল! তিনি আধানির্বিকার হয়ে শুনে যাচ্ছিলেন। দেখে আমার খানিক আগের ক্ষোভটা আবার ফিরে আসতে থাকল। এই সব সামান্য মানুষ কত অল্পে আটকে আছে। ওদের এতো কিসের ঋণ। ওরা এতো পলায়নপর কেন। এতো মাখনরসিক কেন। এই বিরাট বিকট জনগোষ্ঠীর কাছে আমি কী প্রস্তাব নিয়ে যাব। কী আশা করতে পারি।

শক্তির সেই চেনা তরঙ্গ আমার পা থেকে প্রতিটি কোষ তরঙ্গিত করে মাথায় আছড়ে পড়তে থাকল। মনে হলো কোথাও কোনো তার খুলে পড়েছে। তার ছিন্নাংশপথে চিড় চিড় শব্দে স্ফূলিঙ্গ নির্গত হয়ে চলেছে। সে এক ভর। সে এক ব্যথা! সইতে না পেরে আমি বলে উঠলাম, অনেক হয়েছে!

পরমুহূর্তে চারপাশ কেমন বিস্ময়ে খানিকটা স্তিমিত হয়ে এলো। আবার বললাম, ‘অনেক হয়েছে, আর তৈল মর্দনের প্রয়োজন নেই। ওনার তা যথেষ্টই আছে।’

এ কথার পর আমার মাথার ছিন্নতন্তুর স্ফূলিঙ্গনির্গম যেন খানিকটা কমে এলো। লোকেরা বোধহয় আমার প্রতি দয়াবশত কিংবা ইতিহাসের জনপ্রিয়তম লেখক-চলচ্চিত্রকারের প্রতি গাঢ় প্রেমবশত আমার কথাকে ঢেকে দিতে গিয়ে আবার আগের কথায় শোর তুলল। কিন্তু কোথায় যেন সুর কেটে গেছে। খানিক আগের আধনির্লিপ্ততার ভেতরও কোথাও একটা প্রসন্নতা লুকিয়ে ছিল হুমায়ূন আহমেদের। দেখতে পেলাম, সেই প্রসন্নতা আর নেই। তাঁর চোখজোড়া যেন ব্যথাতুর হয়ে উঠল।

ওই মুহূর্তের পটটা আজীবন আমার মনে আঁকা হয়ে থাকবে। চোখের আলোটা যেই বদলে গেল তার। সেই বদলে যাওয়া ম্লান আলোর হৃস্ব তরঙ্গ আমার হৃদয়ের পর্দা ভেদ করার দিব্য ক্ষমতার প্রকাশ ঘটাল। মনের চোখের সামনে মুহূর্তের জন্যে লেখকের আজীবনকার কোমল এবং নিবেদিত হৃদয়টা উন্মোচিত হলো।

তাঁর ভাষা আর ললিতভাষ্য বুঝে নিতে আমার আর এক মুহূর্ত দেরি হলো না। এই বোঝাপড়ার জন্যেই যেন আমি জীবনের কুড়িটিরও বেশি বছর ধরে অপেক্ষায় ছিলাম। একটা ছোট সংসর্গজাদুর জন্যে তা কেবল আটকে ছিল। 

আমি কেমন বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম। ভাবকে ভাষা দেওয়ার ক্ষমতা আমার এখনও যেমন নেই তখনও ছিল না এবং তখনকার অবস্থা ছিল আরো শোচনীয়। সেই অপরাঙ্গমতা থেকেও একটা অবিশ্বাস্য সন্তাপে আমার গোটা মন ছেয়ে গেল।

হুমায়ূন চুপ হয়ে গেলেন। একবার যেন দেখবেন বলে ভাবলেন, কে বলেছে কথাগুলো। পরমুহূর্তে বিষণ্ন অপমানিত চোখজোড়া নামিয়ে নিরস্ত হলেন।

তার ভেতর একটা মৃত্যুমতি অসুখ তখন ক্রমশ লতিয়ে বাড়ছিল, আমার তা জানা ছিল না। সেই সঙ্গে, লেখকের জীবনের প্রাপ্তিও যে হতাশার শহরসমান বড় এক বরফখণ্ড, যার অল্পই কেবল জলের ওপরে দেখা যায়, তা আমার তখনও জানা নেই। সব মিলিয়ে আরো শতেক পথে তার মনটা বিপন্ন হয়ে থাকবে সেদিন। একজন অর্বাচিন তরুণের ক্ষিপ্ত কথার বাণ গিয়ে বেঁধার পক্ষে হৃদয়ের প্রতিরক্ষা যথেষ্ট দুর্বল হওয়াটা, তখন বেদনাদায়করকম বিশ্বাস্য।

এরপর আমি চলে এলাম। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে মনে পড়ল, জল খাওয়া হয়নি।

আবার ফিরলাম। ভাবলাম, কোনো ভাবে তাঁর কাছে গিয়ে একটা কোনো কর্ণসুখকর কথা আমি বলব। ঋণ তো কম নয়। কথা বলতে যাঁরা আমাকে শিখিয়েছেন, হিসেবে তিনিও কি তাঁদের একজন নন আমার কাছে? আমার সাহিত্য সংশ্রবসুখের প্রথম গোপনবাগানসাথী কি এই মানুষটিই নন? আমি কী করে এতো নির্দয় হতে পারলাম?

ফিরে গিয়ে তাঁকে আর পেলাম না।

এরপর, আর কোনোদিন নয়।

আমার স্বপনবুড়োকে জীবনে একবারই চর্মচোখে দেখেছিলাম। তখনই হৃদয়ে ব্যথা দিয়ে বসেছি। অপনোদনের সুযোগ পেলাম না। গোটা ব্রহ্মাণ্ড চষে হুমায়ূন আহমেদকে আর কোথাও আমি খুঁজে পাবো না। যে অপরাধ করেছি, তার অক্ষয় ভর আমার হৃদয়ে সেই থেকে জমে আছে।

বন্ধু আমার কাঁধে হাত রাখল। দেখলাম, কখন সহধর্মিণীও এসে দাঁড়িয়েছে।

এখন আমি অনেকটাই সুস্থ। যদিও পিঠের আক্ষেপটা পিছু ছাড়েনি। কিন্তু ঋতুর উপহার ওই জ্বরটা ছেড়ে গেছে। অনেকদিন পর বিকেলে সিগারেটের স্বাদ পেলাম। নতুন সিদ্ধান্তের কোনো বদল ঘটল না দেখে বুঝতে পারলাম, সংকটকালে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসিনি। বরং অরুচির দিনে রুচিরার সঙ্গ পেয়েছি। 

আমার ধারণা, মানুষের আদর্শবাদ, রাজনৈতিকতা এসব কিছু তাৎক্ষণিকতা বিচারে বাস্তবতা হয়ে দেখা দেয়। এমন অগনিত তৎক্ষণ নিয়েই তো ক্ষণের বিস্তার। বর্তমানের শকটের নিচে তো ওই তাৎক্ষণিকতারই চাকা। এই চাকা গড়িয়ে মানুষ বলত ব্যক্তিটিকে নয়, বরং মানুষ নামের তত্ত্বটিকে গড়িয়ে নিয়ে চলেছে ভবিষ্যতের দিকে।

তাৎক্ষণিকতাকে তাই কখনো তুচ্ছ করা যায় না। কিন্তু এটা চলকমাত্র, চিরন্তন নয়। যখন কাল চিরন্তন নয়, বরং কালের পরিবর্তন চিরন্তন; যখন বোধ চিরন্তন নয়, বরং বোধের উদ্বোধন চিরন্তন; তখন মানুষের জ্ঞান চিরন্তন না হয়ে অনুভূতির মশালই চিরন্তনী পায়, যার উত্তাপের নাম প্রজ্ঞা।

উড়তে হলে পাখির দুটি পাখাই চাই। কেউ তাই ঘাম ঝরিয়ে পাথর কুঁদে শিলালিপি তৈরি করবে। কেউ মিস্টিক অরণ্যে ধোঁয়া ওঠা সরোবরের পাশে দাঁড়িয়ে অনুভূতির পায়রা ওড়াবে।

দুই পক্ষ যখন একই দেহের ভাগী, কথা উঠতে পারে। দুই আলাদা যজ্ঞের ঋত্মিক বচসার জলসায় পাটি পেতে মুখোমুখি বসে গলার রগ ফোলাতে পারে; সঙ্গে তাদের অনুসারীকুল। আমি তখন সাঁতরে কালীগঙ্গা পার হয়ে গেছি। পিছু ফিরছি না।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৮ জুলাই ২০১৮/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন