ঢাকা, সোমবার, ১ আশ্বিন ১৪২৬, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:
অগ্রন্থিত গল্প

কৃষকের ঈদ || মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী

কাজী জাহিদুল হক : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৮-২২ ৮:৩০:২২ এএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৮-২২ ৩:১৯:২৫ পিএম
কৃষকের ঈদ || মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী
Walton E-plaza

সংগ্রহ ও ভূমিকা : কাজী জাহিদুল হক

কৃষকের ঈদ হচ্ছে- খুশীর খবর। কখনো যাকে চোখে দেখিনি, সে-ই নাকি আজ এসেছে। এতে আনন্দ হলে দোষ কী? যে-গান আজও কানে শুনিনি সে তো একটু বেশী মিষ্টিই।  পর্বাহ এসেছে, পর্বাহ চলে গেছে। ঈদগাহে ভিড় জমেছে, উপাসনার উত্থান-পতন শেষ ক’রে যে যার বাড়ীতে চলে গেছে। এ-দৃশ্য বহুবার দেখেছি; তবু ঈদ সত্যিই কখনো দেখিনি। একখানা ছিন্নপ্রায় তহবন্দ, কীটদষ্ট একটা পিরহান, তৈলাক্ত একটা টুপি, বহুল ব্যবহারে জীর্ণ একখানি গামছা- সবই  বিদ্‌কুটে ময়লা। শুকনো কলাগাছ জ্বালিয়ে কিছু ক্ষার তৈরি হয়েছে। তাই দিয়ে কাচা হলো। এগুলো দিয়ে সদ্যস্নাত অঙ্গ সাজানো হয়েছে; কিন্তু নগ্নপদ। জুতা অবশ্য স্পর্শেন্দ্রিয়ের অভিজ্ঞতার বাইরে নয়, কিন্তু সে খেয়েই, পায়ে দিয়ে নয়। উৎসাহ নেই, কিন্তু কর্জ পাওয়া যেতে পারে। ধনী মধ্যবিত্তের উৎসাহের থলি আজ উন্মুক্ত; শুধু আজকার দিনেই এ-পদার্থ বিনা সুদে ধার দেওয়া হচ্ছে। সুর্মা কোথায় মিলবে; ঈদগাহে সচ্ছল ঈদওয়ালার সুর্মাদানির কৃষ্ণ অঞ্জন আজ প্রার্থীর চোখে বিনামূল্যে লিপ্ত হচ্ছে। খোশবু? ধনীর পুণ্যলোভী অনুগ্রহের দান তর্জনীর অগ্রভাগলিপ্ত আতরের শততম অংশ আজ গন্ধহীন দারিদ্র্য ধন্য করেছে। ইমামের সঙ্কেত-ধ্বনিতে যন্ত্রচালিত পুতুলের মতো নির্মম এক অজানা রহস্যের উদ্দেশ্যে শির অবনত হচ্ছে। তারপর মুখে হাসি টেনে মানুষ ঘরে ফিরছে। সে-ঘর কেমন? সে-গৃহীর অপভ্রষ্ট জীবনে এই হাসি কি প্রদীপের আলো, না বহ্নির দাহন-দীপ্তি?

আসুন পাঠক, একটিবার নিজের চোখে দেখে আসি; নিজের অন্তর দিয়ে এই জীবনকে একবার অনুভব করি। তাহলে কিন্তু আপনাকে শহরের য়্যাসফাল্ট মোড়া রাস্তা ছেড়ে গেঁয়ো পথের হাঁটুকাদা ঠেলতে হবে। যদি রাজি হোন, আসুন।

মোটর ছেড়েই সামনে ন’ মাইল কাঁচা রাস্তা। আপনার পরনে কী? পায়জামা? শেরওয়ানী? কাঁদা-পথে ও চল্‌বে না। লুঙ্গি পরছেন? উঁহু, ওটীও অচল। সচল, যদি মালকোঁচা মারতে পারেন, কেননা হাঁটুর ঢের ওপরে, কাপড় তুলবার দরকার হবে। ডিস্ট্রীক্ট বোর্ডের সদর সড়ক; কিন্তু তা’হলে কী হবে? বর্ষার আগে রাস্তায় মাটী দেয়া হয়েছে; সে কতো মাটী? রাস্তা মেরামতের জন্যে বোর্ড টাকা মঞ্জুর করেছে। তার অর্ধেক গেছে রুই-কাতলা থেকে শুরু করে চুঁনোপুটী পর্যন্ত সবারই পেটে। বাকী টাকার যে-মাটীটা পড়েছে, তা বর্ষার জোর বৃষ্টি নেমে ধুয়ে গেছে। রাস্তার চিহ্ন এখন যে-টুকু আছে, সে-ও গলে একেবারে মাখন হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানে স্থানে বড়ো বড়ো অল্ মানে গর্ত। এখানকার রাস্তা মাখনের চাইতে কিছু তরল। এর একধার দিয়ে কোনো রকমে যাওয়া যেতে পারে। এখানে কাদা হাঁটু পর্যন্ত। হুশিয়ার! মাঝখান দিয়ে যেন পা বাড়াবেন না, তাহলে কোমর পর্যন্ত কাদায় পুঁতবে কিনা শপথ ক’রে বলা যায় না। কোনো গরু এখানে পড়লে দু’চারটা জোয়ানের সাহায্য ছাড়া উঠতেই পারে না।

এ-পথে ওঠাই ভুল হয়েছে? ঘাবড়াবেন না; মাঝে মাঝে বিশ্রামের স্থান পাবেন। পুকুর বা নালা-ডোবায় গায়ের পায়ের কাদা ছাড়িয়ে বসবার যায়গা মিলবে; হয়তো বটতলা, হয়তো বা একটা বিড়ির দোকান। চলুন, চলুন। পুরা চার ঘণ্টা এইভাবে কাদার সঙ্গে যুদ্ধে ও বিশ্রামে কাটিয়ে গাঁয়ে এসে পড়লেন। এখানে অতোটা কাদা নয়, কেননা মানুষ, গোরু ও গাড়ীর ভিড় ঢের কম। ধনীর বাড়িতে যাবো না, গেলে হয়তো তাড়াবে। তা ছাড়া দেখ্‌বোই বা কী সেখানে?  তার চাইতে গরীব চাষীর বাড়ীতে চলুন। এক লোটা পানি পেলেন। একটা আধা ছেঁড়া চেটাই। দুটি বালিশ এবং একখানা কাঁথা বেচারী হাওলাত করে এনেছে সচ্ছল গৃহস্থের বাড়ী থেকে আমাদেরই জন্যে। আসুন, বসুন। তামাকে অভিরুচি আছে আপনার? আচ্ছা, এই হুঁক্কা নিন, টানুন। আরাম করুন। এক মাস রোজা গেলো। এফতারি, নূনপানি, কথনো কখনো গুড় ও আতপ চা’ল পানিতে ঘুটে ক্ষীর; এতে নারকেল দেয়াও চলে, কিন্তু মেলা ভার। সেহ্রী চিংড়ী পান্তা পেঁয়াজ, তাও পেট ভরে নয়। তাতে অনুযোগ নেই। খোদা যা মাপায়, তাই জোটে; তাতে না সবর হওয়া গুনার কাজ। আমরা বসেছি পুবের দাওয়ায়, দেখ্‌ছেন তো? চালটায় এতো ঝুল কালি কেন, ভাবছেন? তার কারণ পশ্চিমের ছোটো দাওয়াতেই চুলা, সেইটীই এ-বাড়ীর হেঁসেল। আগে আলাদা রান্না ঘর ছিল, তার ভিটাটী ঐ দেখা যাচ্ছে।  ঘরখানির দক্ষিণ ধারে উঠান। উঠানের পাশেই বড়ো দাওয়াটা। মানে ঘরখানা সাতচালা। চারিধারে চার-ফালি বাঁশের বেড়া। যখন ঘরখানা তোলা হয়, দেয়াল দেয়া হবে ইচ্ছা ছিল; কিন্তু সে-আশা পূর্ণ হয়নি। বড়ো দাওয়াটীর মাঝখানে বাইরে থেকে ভেতরের দিকে কেটে সিঁড়ি তোলা হয়েছে। এর পূর্ব ধারে থাকে বুড়ো- বাড়ীর কর্তা; পশ্চিম ধারে বুড়ী ও তার একটা দশ বছরের ছেলে। বুড়ো-বুড়ী মানে বয়স বুড়োর ঊনোপঞ্চাশ, বুড়ীর বিয়াল্লিশ।  এতো অল্প বয়সেই কেন তারা বুড়ো, বুঝতে পারলেন না? চাষ কাজে হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম, তাতে আবার পেট-ভর্তি খাওয়া জোটে না। এতে দেহ-যন্ত্র ক’দিন টিক্তে পারে? গোরুর পিছু পিছু লাঙগল ঠেল্লে আপনার মতো দু’আড়াই ছটাক চালে দেহপোষণ সম্ভব নয়। এদের নাশ্তা সকালে প্রকাণ্ড একথাল পান্তা, দু’পাঁচটী কাঁচা পেঁয়াজ, দু’তিনটি কাঁচা লঙ্কা এবং মিল্লে দু’দশটা চিংড়ী; বিকালে বাসি ভাত, লঙ্কা পোড়া, ক’ ফোঁটা সরিষার তেল এবং জুটলে খানিক চিংড়ী-বাটা। মানে অন্তত চারবার আহার দরকার। পায় কেউ তিনবার, কেউ বা দু’বার; তাও হয়তো যেখানে দেড় সের চাল চাই, সেখানে রয়েছে এক সের;- সেই এক সেরই সই। এছাড়া উপায় কী? এতে অস্থিমাংস শুধু খেটেই চলে, গরজমাফিক খোরাক পায় না। কাজেই জরা আস্তে কতক্ষণ?

আজতো বৃষ্টি নেই, খামখা চালের দিকে চাইলেন কেন? সাত সাতখানা চাল খড় দিয়ে ঢেকে রাখা সোজা কথা নয়। দু’একখানা করে চাল ছাওয়া হয়, বাকীগুলো কোনো রকমে গুঁজিগাজা দিয়ে রাখা হয়। অর্থাৎ ঘরে বা দাওয়ায় বসেও বৃষ্টির পানির দু’দশ ফোঁটা সওয়ার অভ্যাস এদের আছেই। মাঠেই যাদের জীবন, পানিকে পরোয়া করলে তাদের চলে কি? সেখানে হাঁটুতক কাদাপানি কিম্বা তারও কিছু বেশী: বৃষ্টি নাম্লো তো মাথার ওপর দিয়েই এক পশলা চলে গেলো। এদের ঘরের চাল চুইয়ে দশ বিশ ফোঁটা পানি পড়লে গা ভিজবে কেন? ঘরখানির পিছন দিকে নীচু একখানা আলাদা চাল দেখ্‌ছেন গোলপাতার ছাওয়া? পাটকাঠি দিয়ে ঘেরা? ওটী গোয়াল। লাঙলের দুটী বলদ, একটী গাই ও একটী বাছুর ওখানে থাকে। চালটার ওপর এখানে ওখানে ছেঁড়া বস্তা দেয়া কেন, ভাব্ছেন? না দিলে অবোলা জানোয়ার কটী ভিজবে। ওরা ভিজে কাবু হয়ে পড়লে চাষার সংসারে জোয়াল টানবে কে? - তাই এরা নিজেরা ভিজেও গোরু ক’টাকে বাঁচায়, নিজেরা মশার কামড় খেয়েও গোরুদের বাঁচোয়ার জন্যে গোয়ালে সাঁজাল দেয়। আপনার এই দাওয়াটার নীচে ঐ ছেঁদাটা কেন ভাবছেন? ওটা মুরগীর ঘরের দোর। দাওয়া গাঁথবার সময় ওখানটায় ঘরের মতো ফাঁকা রাখা হয়েছে। তার ওপরে আস্ত আস্ত বাঁশ দিয়ে ছাদ তৈরী হয়েছে। ঠিক সেই ছাদের ওপরেই আপনি বসে আছেন। চারটা মুরগী, দু’টো মোরগ এবং ক’টা আধাবয়সী বাচ্চা ঐ উঠানে চরছে দেখ্‌ছেন তো। ওগুলো এই বাড়ীর। এদের মোরগ-মুরগী কতক খায় শেয়াল-নেউল, দু’চারটা খায় সাপ, বাকীগুলো এরা। সাপে মুরগী খায় কেমন করে? তাও বুঝি জানেন না? মুরগী ডিম নিয়ে তা’ দিচ্ছে কিম্বা তা’ দেয়ার পরেই ছোটো ছোটো বাচ্চা হয়েছে। বর্ষায় বৃষ্টিতাড়িত সাপ ইঁদুরের গর্তপথে এখানে ঢোকে ডিম বা বাচ্চার লোভে। মুরগী বাধা দিতে গিয়ে ঠোক্রায়, সাপ তার জবাবে মাছে ছোঁ।

আঃ, ও কী করছেন? থাকলোই বা বেড়ার ফাঁক, তাই বলে ঘরের ভিতর তাকানোটা ভদ্রতা নয়। আচ্ছা, আচ্ছা, এখন তো ঘরটা খালিই, একবার দেখে নিন। ঘরে ঐ দেখুন একটা শিকা ঝুলানো। রঙীন নকশাওয়ালা মেটে হাঁড়ি থাকে থাকে তিনটী ঝুলছে। এদের প্রত্যেকটীকে ঘিরে রয়েছে সাতটা করে ক্ষুদে হাঁড়ি- ঐরকম নকশাদার। পয়সা কড়ি থেকে শুরু করে মায় ছেলেপিলের বা’রজোলাপের জন্যে বকুল বা ভেরেন্ডার বিচি পর্যন্ত সংসারের যাবতীয় উপকরণের স্থান ঐসব হাঁড়িতে। রেড়ায় ঝুলানো ক’টী বাঁশের চোঙা; এদের একটীতে গুড়মাখা তামাক। আর একটীতে ক’খানা দলিল-দস্তাবেজ এবং ক’খানা খাজনার দাখিলা-রসিদ। তৃতীয়টীতে বুড়োর মৃত বড়ো ছেলের স্মৃতিচিহ্ন তার গায়ের একটী ছেঁড়া জামা। উপরের দিকে আর কিছু না; এইবার নীচে দেখুন। মেঝের একধারে চার-ফালি বাঁশের চাছা-ছোলা চটার তৈরী একটা মাচা। ঐটীই এদের তক্তপোষ। মাচায় একটা মাদুর পাতা। এর এক কোণে ক’খানা আধা-ছেঁড়া কাঁথার একটা বোঁচকা,-  শীতে এদের একমাত্র অবলম্বন। মাচার নীচে গোটচারেক কলসী, একটীতে চাল, অন্যটীতে চালের গুঁড়া, তৃতীয়টীতে পুরোণো তেঁতুল, চার নম্বরটায় খানিক গুড়।  এ মাচায় থাকে বুড়োবুড়ীর মেজো ছেলে ও বউ। ছেলেটা বাইশ বছরের- দৃষ্টিসই জোয়ান; লাঙলে-যোতা জোড়া পশুর পেছনে সে-ই এখন বুড়ো বাপের স্থলাভিষিক্ত তৃতীয় প্রাণী। বউটার বয়স তেরো। বয়সে স্বামীস্ত্রীতে মানায়নি, ভাবছেন? কিন্তু এ-খুঁতখুতিটা আপনার অন্যায়। যে দেশে গৌরী অষ্টম বর্ষেই অরক্ষণীয়া, সেখানে তেরো বছরে মাচায় শুতে দোষ কী? তা’ছাড়া বউটীর বাপের সঙ্গে বুড়ো-কর্তার জোয়ান বয়স থেকেই বেয়াই বলাবলি ছিল। সেই পুরোণো ধর্ম মাচার ওপরেই রক্ষা হচ্ছে। এটা এদের অংশের আহ্লাদের জিনিস, কাজেই চুপ করুন, ওকথা আর তুলবেন না।

এই মেজোটীর পূর্ববর্তী বড়ো ছেলেটীর একটা খোকা হয়েছিল। আট মাসে হ’লো তার প্রবল জ্বর, সঙ্গে সঙ্গে এলো তড়কা। মামুদ বখশের কবিরাজীতে সে হয়তো ভালো হ’তে পারতো, কিন্তু মামুদ সব মাটী করলে ওষুধের দাম এবং নিজের দর্শনী মিলিয়ে পুরো এক টাকা চার্জ করে। ইতিমধ্যে সামন্য অসুস্থতার মধ্যে খোকার বাপটী শেষ রাত্রিতে বাঁধে মাছ ধরতে গিয়ে বেহদ্দ ঠান্ডা লাগিয়ে আসে। পরদিন থেকে প্রবল জ্বর, বুকে পিঠে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট- মানে নিউমোনিয়া! বাপ-বেটা- দুটী রোগীর ওষুধ-পথ্য কী এমনিই আসে নাকি? মামুদ বখশের বড়ি বা দোকানীর সাবু-বার্লি মিছরী বা ডালিম-বেদানা মুফৎ মেলে না। আট দিনে বাপ-বেটা দু’টোই খতম! বুড়ো নিজের হাতে এদের মাটীসই করেছে; তারপর জোয়ান বউ তার ঘর থেকে চলে গেছে! এর পর এক বছর যেত না যেতে বুড়োর হ’লো কাশি; ক্রমে লোন্তা কাশির সঙ্গে এলো রক্তের ছিট।

তা আসুক, ওরকম তো অনেকেরই হয়ে থাকে। ও নিয়ে বসে থাকলে কি চাষীর চলে? টেকো মাথায় গ্রীষ্ম বর্ষা সকল সময়েই তাকে মাঠের মাটী ঘাটতে হয়। বিঘা সাতেক জমি তার নিজের ছিল, আরো ক’বিঘা বর্গাচাষ করতো। এতোগুলো জমির চাষবাস কি বললেই হ’লো? কথায় বলে : কাজের মধ্যে চাষ, আর রোগের মধ্যে কাশ, অর্থাৎ দুঃসাধ্য। তা বুড়োর দু’টোই আছে। কাজেই এক জোড়া বলদ, নিজে এবং ছেলেটাতে কুলায় না; আরো জন-মজুর চাই; জন-মজুর নিতে গেলে তাদের মজুরী চাই, মানে টাকা। তার পথ সোজা মহাজনের বাড়ীতে। মহাজন বেঁটে চক্রবর্তী ভীষণ লোক, পুরাদস্তুর চশমখোর। আইনকে কলা দেখানোর ঢের ঢের ফিকির তার জানা। আইন সুদ কমাবে? তা ক’মাক। দলিলে টাকার পরিমাণ ডবল তে-ডবল লিখে নিতে মানা করছে কে? ঋণ-সালিশী বোর্ড? তাতে কী? জমি পাট্টা দাও কিম্বা, আরো ভালো, একটা গোটা জমা কোবালা করো। টাকা প্রতি মাসিক কমসে-কম দু’পয়সা সুদ সমেত সাত বছরের ভিতর টাকা ফেরত দিতে পারলে জমি ফেরত পাবে। আরে ফেরত তো পাবেই, সেজন্যে একরারী দলিল কেন চাচ্ছ, মহাজনের কথায় বিশ্বাস নেই? তা, যাকে বিশ্বাস নেই, সে-ই বা তোমাকে বিশ্বাস করবে কেন? জমি না দাও, গয়না-গাঁটী নিয়ে এসো। কোথায় পাবো গয়না? কেন বুড়ীর নথটা কী করলে? বউয়ের নাকে?  তা আনো না সেটা খুলে! সামনেই তো ফসলের মওসুম। তখন টাকা দিয়ে খালাস ক’রে নিয়ে ফের তাকেই দিয়ে দিও।

-তা নথটা এনেছো তো বটে, কিন্তু এর সোনা ততো ভালো নয়, নীচের দরে এর মূল্য বিশটাকার বেশী হ’তে পারে না। বেশী দরটা কেন ধরতে যাবো? কবে তুমি নিতে পারবে তার ঠিক নেই। এর মধ্যে সোনার দর নেমে যেতে পারে। তখন?

-না, না, বিশটাকার গয়না রেখে বারো টাকা কর্জ দেয়া যায় না; বড়ো জোর সাত টাকা দিতে পারি। তাও ঠিক ছয় মাসের মধ্যে ফেরত নিতে হবে; একটা দিন খেলাপ হ’লেও কিন্তু আর পাবে না, তা আগেই ব’লে দিচ্ছি।

-দেখো বাপু, বেশী জ্বালাতন ক’রো না, আট টাকার বেশী এক ক্রান্তিও আমি দিতে পারবো না। তোমার খুশী হয় রাখো, নইলে পথ দেখো।

এইভাবে আটটী টাকা ও তার সুদ বুড়োর পুত্বউয়ের সাতাশ টাকার নথটা খেয়ে বসেছে। দু’টো জমায় সাত বিঘা জমি; এক জমায় চার বিঘা, অন্যটায় তিন। প্রথম জমাটী বেঁটে চক্রবর্তীর নামে কোবালা হয়, দেয় চল্লিশ, দলিলে লেখা হয় ঊনআশী। সাত বছরের মধ্যে সুদ ও আসল টাকা দিলে জমি ফেরত হবে কথা ছিল, কিন্তু কথা কথাই মাত্র। জমি কোবালা হতেই বেঁটে চক্রবর্তী সাত বছরের জন্য জমি ছেড়ে দিতে বলে। অনেক কাঁদাকাটি ক’রে বর্গাদারি কবুলিয়ত দিয়ে আপাতত রক্ষা হয়। কিন্তু দু’বছর পরেই ফসল-অন্তে নোটীশ দিয়ে জমি নিয়ে নেয়। এতে বুড়ো বিষম রেগে যায়। এম্নি নির্বোধ এবং গোয়ার সে-যে রাগের বশে সে সাধু গাজীর পক্ষে অর্থাৎ বেঁটে চক্রবর্তীর বিপক্ষে আদালতে একটা ডাহা সত্য সাক্ষ্য দিয়ে আসে।

-কী বল্লে? সত্য সাক্ষ্য? বেঁটের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য কখনো সত্যি হ’তে পারে? কী রকম ছেচড়া দেখেছো! বেটা বেবাক মিথ্যে বলে এসে বলছে কি না সত্যি!

এরপর বেঁটে চক্রবর্তী হঠাৎ খুব ভালোমানুষ হ’য়ে দাঁড়ায় এবং বুড়োর সঙ্গে বন্ধু ব্যবহার- যেমন মিষ্টি আলাপ, পথে দেখা হ’লেই কুশল জিজ্ঞাসা ইত্যাদি করতে থাকে।

সহসা এক রাত্রিতে বুড়ের ঘরে লাগে আগুন! বুড়ো ভারি হুঁশিয়ার লোক, তাই রক্ষা; আগুন পিছনের গোয়ালের চাল ছেড়ে উপরে উঠতে পারেনি, কেননা আগুনের আলো হতেই সে টের পায়। কিন্তু বেচারীকে এভাবে বে-ওতন করবার চেষ্টা কে করলে? বেঁটে চক্রবর্তী বলে : এটা সাধুর কর্ম, তার ক্ষেতের ধানে তোমার গরু লাগায় ঝগড়াটা তো নিতান্ত কম হয়নি!

অবশ্যি এর পেছনে বেঁটের কোন হাত আছে মনে করা অন্যায়। অন্যায় বই কী? এক শো বার অন্যায়! ধনী মহাজনের মতিগতি এ-পথে চলে না, চলতে কখনো দেখেছো কারুর? পেছনে কামড় দিও না; বলো তো সামনেই বলো, শুনি।

বুড়োর সঙ্গে তার খাতির জমেই ওঠে। কালেকটর সাহেব বাহাদুর মহকুমায় আসছেন; তাঁর কাছে একটা দরখাস্ত দিতে হবে গ্রামের রাস্তাঘাট ভালো করবার জন্যে, বুড়োর বাড়ীর কাছের বড়ো পুকুরটাকে পঙ্কোদ্ধারের জন্যে। কিন্তু দরখাস্তটা তাড়াতাড়িতে লেখা হয় নি। সাধারণের সই করাতে ভারি দেরি হয়, তাই সেইটীই আগে সেরে নেয়া হচ্ছে। তা বুড়ো মানুষের সইটী আগে থাকলেই ভালো হয়, কেন না বুড়ো লোকের কথার একটা আলাদা মূল্য আছে। লিখতে জানো না তাতে কী? একটা টিপ্ দাও।

এতে অবশ্যি রাস্তাঘাট ভালো হয় না, পুকুরটাও ঝাড়াই হয় না, হয় একখানা ত্রিশ টাকার হ্যান্ডনোট তৈরী। বুড়োর অস্থাবর ক্রোক দেয়া হয়েছে। ডিক্রীদার বেঁটে চক্রবর্তী, দলিল ঐ ত্রিশ টাকার হ্যান্ডনোট! অস্থাবরটা কী? গাই-বাছুর দু’টি, অন্য গোরু দু’টি, ঘরের ধান-চাল। লাঙল-টানা বলদ আইনত ক্রোক হয় না? তা না হোক্ কিন্তু ঐ দু’টী যে লাঙলের বলদ, এটা তো আগে আদালতকে জানাতে হবে? তাই জানিয়ে আসুক না! ডিক্রীর টাকা তো মারা যেতে পারে না? তিন বিঘা জমি তার এখনো রয়েছে; টাকা না দিয়ে যাবে কোথায়?  ক্রোকী পরোয়ানা নিয়ে পেয়াদা আসবার কথা ছিল ঈদের ছুটীর পর। আদালত বন্ধ থাক্লে সে-সময় নাকি অস্থাবর ক্রোক দেয়া চলে না। আরে ধ্যেৎ তোমার! কেন চলবে না? ছুটীর মধ্যেই অস্থাবর পাকড়াও করার তো সুবিধা। সুবিধা মানে এতে বুড়ো খুবই জব্দ হবে এবং বাধ্য হয়ে টাকার একটা কিনারা করবে। আদালত খোলা থাকলে হয়তো সে লাঙলের বলদ সম্বন্ধে সদ্য সদ্য একটা ফ্যাসাদ সৃষ্টি করবে। যে-রকম ছেঁচড়া বদরাগী লোক! আশ্চর্য্য কী!

আজ ঈদ। রাত পোহায় পোহায়, এমন সময় বেঁটে চক্রবর্তী, তার লোকজন এবং পেয়াদা বুড়োর বাড়ীতে হাজির! ঘরে ছিল অধমনটাক চাল, মুরগীর ঘরে ছিল ক’টী মোরগ-মুরগী- এসব এবং চারটা গোরু পেয়াদা অর্থাৎ বেঁটে চক্রবর্তীর লোকেরা তক্ষুণি ধরে ফেল্লো। মাল ধরকার কায়দাই এই। মাল মানে হাসপাতালে দ্বিপদ প্রাণী মারা গেলে মুদ্দফরাস তাকে যা ভাবে, এদের কাছে জ্যান্ত জীবই তাই!

এই চাল থেকে বুড়ো রোজার ঈদে সাদ্‌কা দেবে ইচ্ছা ছিল; একটা মোরগ জবাই করে আজ সকলের খুশীর ঈদে শরীক হবে সাধ ছিল। সে-সব চুলায় যাক, কিন্তু মুশকিল হলো একটা পোষা গাই নিয়ে। বুড়োর গোয়ালের বাছুরের মা-টী মারা যাওয়ার পর- কেন মারা গেলো? কেউ বলে দুষ্ট ঘাস খেয়ে, কেউ বলে বেঁটে চক্রবর্তীর অনুগত এক মুচির দেয়া কলাপাতার পুঁটলি খেয়ে, মোদ্দা কথা পেট ফেঁপে, মারা যাওয়ার পর সে অবস্থাপন্ন গ্রাম-ভাই বিশু মোড়লের কাছ থেকে একটা আসন্নগর্ভা বকনা পালতে নেয়, যাকে বলে পেষানি নেয়া। এটা জমির বর্গাদারির মতোই ব্যাপার। গাই বিয়ুলে দুধের অর্ধেক এবং বাচ্চার অর্ধেক; মানে অর্ধেক মূল্য কিম্বা দু’টো হয়ে গেলে তাদের একটা বিশুর পাওনা। বিশুর সেই সুদৃশ্য গোরুটী আজ বুড়োর গোয়াল থেকে পেয়াদার কবলে। বিশু হাঁ হাঁ করে ছুটে এলো। আমার গোরু বাবা ধরলে কেন? পেয়াদা বলে : তোমার গোরু তার প্রমাণ?

-প্রমাণ আবার কী? পাড়ার লোক সবাই জানে?

-আরে রেখে দাও তোমার পাড়ার লোকের কথা। বেঁটে চক্রবর্তী বলে : ছেঁচড়া বেটাদের কথা বাদ দিতে পারো? গরজ পড়লে ওরা রাতকে দিন করতে পারে।

নিরুপায় বিশু বলে : বুড়ো ভাই, আমার গোরু ছাড়িয়ে দাও, পোষানিতে আমার আর কাজে নেই।

গোরুটীর বাঁট বেড়েছে, ক’দিন পরেই বাছুর হওয়ার সম্ভাবনা। বেশ দৃষ্টিসই গোরু, দাম ত্রিশের কম হবে না।

বুড়োর ভ্যাবাচাকা লেগে গেছে। কী আর করে? বলে : বিশু ভাই, এর যা হয় একটা ব্যবস্থা করো, আল্লা সুদিন দিলে নিমকহারামী আমি করবো না।

ব্যবস্থা মানে ডিক্রীর টাকাটা ধার দাও। কিন্তু বিশু ভয়ানক হাতভারি লোক। তবে তার ব্যবসা মহাজনী নয়; কাজেই অনুরোধের ঢেঁকি তাকে অবশেষে গিলতেই হ’লো। বুড়ো কিরা খেয়ে বললো যে, ছুটীর পর রেজিষ্ট্রী আপিস খুললেই ফেরত পাওয়ার ওয়াদায় তার শেষ তিন বিঘা জমি সে বিশুকে কোবালা করে দিয়ে আসবে, তবে এ ক’টী বছর জমি ক’খানা তাকেই বর্গা দিতে হবে, সেজন্য অবিশ্যি সে কবুলিয়ত দেবে। সবাই জানে, বিশুও জানতো যে, এইভাবে জমি দিয়ে দিলে চাষীর আর তা ফিরিয়ে নেবার সাধ্য হয় না। কাজেই বিশু মোড়ল একটা মৌখিক একরারে আবদ্ধ রইলো যে, পাঁচ বছরের ভিতর টাকা শোধ দিতে পারলে জমি ফেরত দেয়া হবে।

ব্যবস্থা হলো বেঁটে চক্রবর্তীর চণ্ডীমণ্ডপের বারান্দায় বসেই। ধৃত মালের ফিরিস্তিতে অনুক্ত থাকায় চাল ও মোরগ-মুরগী ততোক্ষণে পেয়াদা কদমরসুল শেখের বাড়ীতে চলে গেছে তার ঈদের আনন্দ বাড়াতে। তা, ও নিয়ে আর মাথা ঘামালে চলছে না; সময় সংক্ষিপ্ত; ও বেলায় ঈদের বাজার, মানে মেলা; এ বেলায় একটু সকাল-সকাল নামাজ সেরে নিতে হবে; ঈদগাহে এতোক্ষণে ভিড় জমতে শুরু হয়েছে। কাজেই বেশী বিলম্ব না করে বিশু ব্যবস্থা-অনুযায়ী সমস্ত উক্ত অনুক্ত ও উহ্য খরচা সমেত মোট নগদ পঁয়ষট্টি টাকা দিয়ে তার নিজের গোরু এবং বুড়োর দুটো বলদ ও বাছুর খালাস ক’রে নিয়ে এলো।

বুড়োর হাড় শক্ত। যক্ষা এবং আইনের এই অপরূপ ব্যবহারের মার খেয়েও সে ঈদগাহে গেছে; সেখানে সুর্মা আতর মেখেছে, নামাজে শরীক হয়েছে, তারপর মুখে হাসি টেনে এখন ঘরে ফিরছে। কেন না বিশুর দয়ার জন্যে আজ সে কৃতজ্ঞ। ঘরের চাল শুন্য হলেও পড়শীর কাছ থেকে কিছু কর্জ পাওয়া গেছে; পেয়াদা মুসলমান-ভাই হওয়ায় ঈদের বরকতে একটা মুরগীও তাকে ছেড়ে দিয়ে গেছে; খোদার এই মেহেরবানীর জন্যে শোকরগোজারীও আজ তার কম নয়।

ভূমিকা :

চিন্তাবিদ, প্রাবন্ধিক, জীবনীকার, সাংবাদিক ও সম্পাদক মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর (১৮৯৬-১৯৫৪) জন্ম সাতক্ষীরা জেলার বাঁশদহ গ্রামে। বিশ শতকের মধ্যভাগে প্রাঞ্জল ভাষায় প্রবন্ধ রচনা করে তিনি সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি ছিলেন মুসলিম কৃষ্টি ও সমাজজীবনের ব্যাখ্যাকার এবং আদর্শবাদী সাহিত্যিক। সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে সমাজসেবাকে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ওয়াজেদ আলী প্রথম জীবনের কিছুকাল কবিতা লিখেছেন, পরবর্তীকালে কিছু নক্‌শা বা তাঁর ভাষায় ‘প্রায় গল্প’ রচনা করেছেন, বেশ কয়েকটি জীবনীগ্রন্থ প্রণয়নের পাশাপাশি কিছু অনুবাদকর্ম করেছেন। বাংলা একাডেমি থেকে আবদুল মান্নান সৈয়দের সম্পাদনায় তাঁর রচনাবলির অংশবিশেষ দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে (প্রথম খণ্ড-১৯৯০, দ্বিতীয় খণ্ড-১৯৯২)। কিন্তু পত্রপত্রিকায় মুদ্রিত তাঁর অনেক লেখা এখনো অগ্রন্থিত রয়ে গেছে। ‘কৃষকের ঈদ’ গল্পটি তেমনই একটি গল্প। এটি সাপ্তাহিক ‘কৃষক’ পত্রিকার ‘ঈদুলফেৎর-১৩৪৭’ সংখ্যা থেকে সংকলিত। ‘নিখিল বঙ্গ কৃষকপ্রজা সমিতি’র কলকাতার মুখপত্র হিসেবে ১৩৪৫ বঙ্গাব্দে পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। পত্রিকাটির কতগুলি সংখ্যা বেরিয়েছিল বা কতদিন চালু ছিল সে-তথ্যও জানা সম্ভব হয়নি। আলোচ্য ঈদ সংখ্যাটি ১৩৪৭ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত। এ থেকে ধারণা করা যায় পত্রিকাটি দুই বছরের অধিক মসয় চালু ছিল। পত্রিকাটির প্রকাশিত সংখ্যাগুলোর সন্ধান পাওয়া গেলে বাংলা সাহিত্যের এবং তখনকার সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কিত অনেক মূল্যবান লেখা বর্তমানের পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করা যেত। গল্পটিতে ‘কৃষক’ পত্রিকায় মুদ্রিত বানান অনুসরণ করা হয়েছে।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২২ আগস্ট ২০১৮/তারা

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       
Walton AC
Marcel Fridge