ঢাকা, বুধবার, ২ আশ্বিন ১৪২৬, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

অপেক্ষা করছিলাম রিজিয়া রহমানের জন্য

স্বরলিপি : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০২-০৭ ৪:৩৮:০৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০২-০৭ ৪:৪৪:২৫ পিএম
অপেক্ষা করছিলাম রিজিয়া রহমানের জন্য
কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে রিজিয়া রহমান
Walton E-plaza

স্বরলিপি: সন্ধ্যা নামার মুহূর্তে হাজির হলাম উত্তরা তিন নম্বর সেক্টরের এক বাড়িতে। গার্ড জানতে চাইলো কার কাছে যেতে চাই? উত্তরে নাম বললাম। শুনে মনে হলো না সে খুশি হলো। নিস্পৃহ কণ্ঠে বললো, ‘খালাম্মাতো অসুস্থ, দাঁড়ান কল দিয়ে আগে জেনে নেই’।
রিসেপশন ডেস্কের পাশেই একটা চার্ট, ওতে প্রতি ফ্ল্যাটের এক-একজনের নাম লেখা। সেখানে ‘রিজিয়া রহমান’ নামটি জ্বলজ্বল করছে। হয়তো আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। আমিও তাকিয়ে আছি কৌতূহলী হৃদয়ে অপেক্ষার দৃষ্টি নিয়ে। যাই হোক, আমি যাওয়ার অনুমতি পেলাম। ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে কলিংবেলে আঙল রাখলাম। অল্প সময় পরে একটি মেয়ে দরজা খুলে ভেতরে যেতে বলল। অদ্ভুত এক নিস্তদ্ধতা অনুভূত হলো। ভেতরে ড্রয়িংরুমে বসলাম, কোথাও কোনো রঙের চাকচিক্য চোখে পড়লো না। ডাইনিংরুমের টিউব লাইট জ্বলে ওঠার শব্দ পেলাম; অল্প আলো এসে পৌঁছল ছোট্ট এবং সাজানো ড্রয়িংরুমে। যে মেয়েটি আমাকে দরজা খুলে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল সে এসে বললো, ‘দাদু ঘুম থেকে উঠেছেন, আপনাকে অপেক্ষা করতে বলেছেন’।

আমি ঠিক তখনো জানি না, কোন রুমে থাকেন রিজিয়া রহমান। হঠাৎ ক্রাচের শব্দ পেয়ে বুঝলাম, আমার অপেক্ষার প্রহর শেষ হতে চলেছে। বারান্দায় বাগানবিলাস ফুল, সারাদিনের রোদ গায়ে মেখে খানিকটা নেতিয়ে পড়েছিল। আমি অপেক্ষা করছিলাম রিজিয়া রহমানের জন্য। টি-টেবিলে রাখা সবুজ কাচের ঝকঝকে ফুলদানি, ওতে রাখা ছিল দুই ধরণের ফুল। একটার রং ধূসর আর একটা সাদা। মনে হচ্ছিল, সেগুলো অবশিষ্ট ফুল; হয়তো প্লাস্টিক বলেই! আর সব ম্রিয়মান আলোর মধ্যে ফুলদানিটা রীতিমতো আরও সবুজ, আরও সতেজ হয়ে উঠছিল যেন! যদিও ফুলদানিটিই একমাত্র সবুজ ছিল না।

মেয়েটি আবার এলো। কফি, পানি, আর কেক সামনে রেখে বলল, ‘আপনাকে আর একটু অপেক্ষা করতে হবে, দাদুর পা ফুলে গেছে, উনি ওঠার চেষ্টা করেছিলেন পারেননি’।
ভয় হলো! হয়তো এতো কাছে এসেও ফিরে যেতে হবে। ‘ঘর ভাঙা ঘর’ ‘উত্তর পুরুষ’ ‘সূর্য সবুজ রক্ত’ ‘বং থেকে বাংলা’, ‘প্রেম আমার প্রেম’, ‘উৎসে ফেরা’সহ অনেক কালজয়ী উপন্যাসের স্রষ্টা রিজিয়া রহমান। তার সৃষ্টি বহমান। আমার মনে হলো, হ্যাঁ, এইতো সেই ঘর যে ঘরে রিজিয়া রহমানের কাছে চরিত্ররা এসে ভিড় জমায়, ভিন্ন ভিন্ন গল্পের বাহক হয়ে আসে তারা। এই ঘরে অনেক চরিত্র পায়চারী করে। তিনি  তাদের সাথে কথোপকথন চালিয়ে যান। ঠিক একজন লেখকের যেটুকু আড়ালে গিয়ে কথোপকথন চালাতে হয়, এইসব দেয়ালের পাশে কোথাও রয়েছে সেই আড়াল।

 

রাইজিংবিডির ঈদ সংখ্যার সম্পাদক তাপস রায়, রিজিয়া রহমানের সাক্ষাৎকার নেয়ার অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছিলেন। আমি তাপসদাকে বলে এসেছিলাম, হয়ে যাবে। কিন্তু পরে আর মনে হচ্ছিল না যে হবে। একটা দরোজা খুলে গেল, আমাকে ডাকা হলো ভেতরে। জানানো হলো, দাদু হেঁটে এখানে আসতে পারবেন না। আপনাকে বেডরুমে ডেকেছেন।
দুঃশ্চিন্তা, দেখা হওয়া, না-হওয়ার যে ঘোর দোটানা মেঘ উড়ে গেল। একজোড়া চোখ থেকে দৃঢ় চাহনি আমাকে ছুঁয়ে দিল। রিজিয়া রহমান বালিশে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। পায়ে আলতো ছুঁয়ে সালাম করলাম। তিনি বললেন, ‘আপনাকে আমার এখন যেভাবে ধরা দরকার ছিল, ইচ্ছেও হচ্ছে; অথচ আমি পারছি না। দেখে হয়তো বুঝতেই পারছেন, শরীরটা ভিষণ খারাপ। গত সপ্তাহে আপনি টেলিফোন করেছিলেন, আমি আপনাকে কথা দিয়ে ফেলেছিলাম, এজন্য আর না করতে পারিনি। আজ একটু অসময়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, আচ্ছা, সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আপনি তো অনেক দূর থেকে এলেন, আমার তো অনেকদিন বাইরেই যাওয়া হয় না। বাইরের কথাই-বা বলি কেন, বারান্দাতেও বসা হয় না। আপনি বসুন। খাটে বসতে একটু সমস্যা হবে, পা ‍তুলে আরাম করে বসুন। বসার জায়গাটা সব সময় নিজের পক্ষে নিয়ে নিতে হয়। আর আপনাকে অনেক সময় বসে থাকতে হলো, এজন্য আমি দুঃখিত’।

না, ঠিক আছে। আমি বললাম।

আপনি কিছু মনে না করলে আমি শুয়ে শুয়ে কথা বলতে চাই।

জি। আর, যদি সম্ভব হয়, আমাকে আমাকে ‘তুমি’ করে বলুন।

দেখুন, একটা বয়সের পর মানুষকে বিবেচনা করতে হয় তার ইনটেলেকচুয়ালিটি দিয়ে। আপনার সাথে আমার অল্প সময়ের পরিচয়। আর আপনি এসেছেন আমার সাক্ষাৎকার নিতে। আপনি একটা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করছেন, অন্তত সেই বিবেচনায় আপনাকে আমি ‘আপনি’ সম্বোধন করছি। আশা করছি এতে আমাদের কথোপকথনে সমস্যা হবে না। ভালো হয়, আপনি আমাকে কি প্রশ্ন করবেন, তা যদি একবার বলেন। আর একটা কথা আমাকে বলুন তো, এই যে সাক্ষাৎকার-এগুলো কি ছেলেমেয়েরা পড়ে?

হ্যাঁ পড়ে। আমি ছোট্ট করে জবাব দেই।

আমার তো মনে হয়, ঈদ সংখ্যায় কিছু নাম প্রকাশের খুব দরকার হয়। লেখক বড়, লেখাটা বড় বিষয় নয়! অনেকদিন হলো কোনো ঈদ সংখ্যায় লিখি না। সাক্ষাৎকারও দেই না। কনজিউমার কোম্পানিগুলো প্রসার লাভ করলো, ঈদ সংখ্যাগুলোও ঘটা করে বের হতে শুরু করলো। আমি যখন কিশোরী ছিলাম, তখন ‘বেগম’ পত্রিকার ঈদ সংখ্যা দেখতাম। এরপর ‘বিচিত্রা’, ‘ইত্তেফাক’ এগুলো জনপ্রিয় ছিল। আমাদের টেলিফোন করে বলা হতো- লেখা দেয়ার জন্য, বিষয় নির্ধারণ করে দেয়ার কথা আমি কোনদিন শুনিনি। বলা হতো, গল্প বা উপন্যাস দিতে হবে। দিতাম, সেইভাবে প্রকাশও হতো। গত কয়েকবছর আমি ঈদ সংখ্যায় একদম কোনো লেখা দেই না। দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা আমার কাছে উপন্যাস চাইলো, আমি দিলাম। পড়ে বলে- বড় হয়ে গেছে, ছোট করে দেন। তারা ঠিক এতোটাই ছোট করতে বলেছিল যে, আমার মূললেখার চারভাগের তিন ভাগ ফেলে দিতে হতো। পরপর আরও দু’একটি পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক একই আচরণ করলেন। যাই হোক শুধুমাত্র প্রকাশ করতে হবে বলে, আমি আমার লেখা অসম্পূর্ণ রাখতে রাজী হলাম না। সেই থেকে বন্ধ। খেয়াল করলাম বাঁধাই করা কিছু ছবি টেবিলের ওপর রাখা। সেগুলো নিয়ে কথা বলতে বলতে বললাম, অনুমতি দিলে, আপনার সঙ্গে একটা ছবি তুলতে চাই।

আমি তো লেখক, আমার ছবি দিয়ে কি করবেন বলুন তো? আমি সারাজীবন লিখেছি, লেখা দিয়ে পাঠকের কাছে পৌঁছতে চেয়েছি। আমরা তো লেখকদের লেখা দিয়েই চিনতাম। তাদের চেহারা মনে মনে আঁকতাম। এখন আর কিছু গোপন থাকছে না, আড়াল থাকছে না। এতে কিন্তু একটা সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। ধরুন, আমি আপনার সাথে এখন ছবি তুললাম আর এই ছবিটা প্রকাশ হলো। তাতে কি হবে, মানুষ আমার এই অসুস্থ চেহারাটা মনে রাখবে। এই বইমেলাকেন্দ্রীক লেখক-পাঠকদের একসঙ্গে ছবি তোলার বিষয়টা আমার বিরক্তকর মনে হয়। অনেক লেখককে দেখি, নিজের বই হাতে নিয়ে বিজ্ঞাপন দেয়; এমন তো হবার কথা নয়। আমার কাছে ভালো লাগে না। মানুষ সব কিছু উদযাপন করতে চায়, এখন তো উৎসব আর উৎসব! এই যে ঈদ এই উৎসবটি কিন্তু আর কেন্দ্রে নেই। ঈদ এলে মানুষ এখন বিদেশ চলে যায়, আরও কী কী করে। ছোট ছোট অনেকগুলো ব্যাপার তৈরি হয়ে গেছে যেগুলো ঈদ উদযাপন ঘিরে পারিবারিক সম্মেলনকে নিয়মিত থাকতে দিচ্ছে না।



রিজিয়া রহমানের সঙ্গে প্রথমদিকে যখন কথা বলা শুরু করেছিলাম, সেই চেহারাটা ক্রমে বদলে যেতে থাকে। তাকে প্রাণবন্ত মনে হয়। মাথার নিচ থেকে বালিশটা সরিয়ে একটা হাতে ভর করে শুয়ে ছিলেন তিনি। চোখ-মুখ জ্বলজ্বল করছিলো। নিউজ পোর্টাল রাইজিংবিডির ঈদ সংখ্যার জন্য নিতে যাওয়া সাক্ষাৎকারের প্রশ্ন-উত্তর চলছিলো। যেহেতু, আগেই সব প্রশ্ন জেনে উত্তর দিতে শুরু করেছিলেন রিজিয়া রহমান, তাই আর প্রশ্নের উত্তর জানার ইচ্ছা হলেও প্রশ্ন করিনি।

তিনি নিজেই প্রশ্ন করলেন, আমার ঘরে ঢোকার সময় আপনার কি একটা ছবি চোখে পড়েছে? আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না কোন ছবির কথা বলছেন। তিনি বললেন, কবি সুফিয়া কামালের সঙ্গে একটা ছবি আছে আমার। আমি উঠে গিয়ে দেখে আসলাম। প্রশ্ন করলেন, সুন্দর না?

হ্যাঁ।

তারপর রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে তোলা ছবি দেখিয়ে বললেন, হাতে নিয়ে দেখুন। আরও বললেন, আগেকার ঈদ সংখ্যা মানেই তো রাবেয়া খাতুনের লেখা থাকবে। সুফিয়া কামাল, রাবেয়া খাতুন এই নামগুলো অন্যরকম আলোড়ন তৈরি করতে পারে। আমি কিন্তু তাদের খুব সহজেই পেয়ে যাইনি। হয়তো সেকারণেই তারা আমার কাছে অন্যরকম, অনেক কিছু। খুব তাড়াতাড়ি পাওয়ার প্রবণতা আমার ভালো লাগে না।

আপনাকে খুব প্রাণবন্ত লাগছে।

আমি তো সব সময় প্রাণবন্তই থাকি, মানুষ কি মনে করে তা জানি না। এই মুহূর্তে কিছুটা হাঁপিয়ে উঠেছি।

তাহলে বরং কথা শেষ করি।

হ্যাঁ, আমি তো হাঁটতে পারছি না। আপনাকে যে একটু এগিয়ে দিয়ে আসবো তাও হচ্ছে না। কিছু মনে করবেন না প্লিজ। সুস্থ থাকলে আপনাকে আপ্যায়ন করতে পারতাম। নিজে তো কিছু করতে পারি না।

লেখালেখি? চমকে উঠে জানতে চাই।

সে তো চলমান বিষয়। লেখা ভেতরগত। ভেতরে চলে আসে, খুব না পারলেও কিছু কিছু লিখি।

মানুষ যখন হাঁটতে শুরু করে, আশপাশের সবকিছু মনে হয় গতিশীল। সেগুলোও যেন সরে সরে যায়। একটা দৃশ্য আর একটা দৃশ্যের গায়ে লেপ্টে পড়ে।

চলে আসার সময়, ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলো সালেহা। ডাইনিংরুম, বইয়ের র‌্যাকে থাকা সারি সারি বই, তার প্রাপ্ত সব পুরস্কারের ক্রেস্ট সব দৃশ্য পেছনে ফেলে এলাম।

শেষবার, রিজিয়া রহমান বলছিলেন, রাইজিংবিডির ঈদ সংখ্যার এককপি আমাকে দেবেন। বলেছিলাম অবশ্যই দেব। আশাকরছি আর একবার দেখা হবে।

উত্তরে বললেন, হয়তো দেখা হবে, হয়তো হবে না।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       
Marcel Fridge