ঢাকা, বুধবার, ৬ ভাদ্র ১৪২৬, ২১ আগস্ট ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

নীলের মেলা যদি আজও রাঙাত

প্রশান্ত মৃধা : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৪-১৯ ৮:২১:৩৯ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৬-০৪ ১:৪৭:৪২ পিএম
নীলের মেলা যদি আজও রাঙাত
Walton E-plaza

স্মৃতিরও (সম্ভবত) নির্বাচন করার সুযোগ থাকে। সেই সুযোগে হিসেব করে নেয়, কতটুকু মনে রাখবে আর কোনটুকু বাতিল করে দেবে। নইলে, যে-কথা মনে পড়ে বলি আমরা, সব কি সত্যি মনে পড়ে? যে ঘটনাটি মনে করতে চাই, সেই ঘটনার সময় যদিও বা মনে থাকে, কখনও দেখা যায় পাশ থেকে কাল খোয়া গেছে। কাল অর্থাৎ ঋতু। কোন ঋতুতে ঘটেছিল এই ঘটনা তা যেন একবারে মনেই পড়ে না। এ তো গেল যেটুকু মনে পড়েছে, তার বিস্তারে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে স্মৃতির ভাঁড়ারের এদিক-ওদিক; আর যা সে চাইলেও একেবারেই মনে আনে না, সেটুকু? সেটুকু ওই স্মৃতি তার নির্বাচনের সুযোগে যতটুকু মনে রাখার রেখেছে, বাকিটা বাতিল করে দিয়েছে।

স্মৃতির এই নিজস্ব খেলার কথা মনে এলো, চৈত্রসংক্রান্তির মেলা আর বৈশাখী মেলার কথা ভাবতে গিয়ে। প্রায় বছর চল্লিশেক আগের স্মৃতিতে হানা দিয়ে খুঁজে পাই সামান্যই। স্মৃতি তার বহরে যেটুকু রাখার রেখে দিয়েছে, বাকিটুকু লেপেপুছে একেবারে সমান! সেখানে আজ আর প্রায় কিছুই নেই। সেই লেপাপোছা ঝকঝকে তকতকে অংশে ঢুঁ দিতে চাই, তাহলে আরও বিপত্তি। কোনোভাবেই বর্তমান সেখানে প্রবেশাধিকার দিচ্ছে না অথবা আমার সচেতন প্রয়াসেও মিলছে না সে অধিকার।

এই যে স্মৃতির ঘরে হানা দেবার অধিকার হারিয়ে ফেলেছি, এই বিপত্তি থেকে নিজেকে উদ্ধারের পথ সম্ভবত (এখানেও সম্ভবত) একটাই যেটুকু এখনও নিজের সঙ্গে বয়ে নিয়ে চলছে স্মৃতি, সেটুকুকেই জানিয়ে দেয়া।

বাগেরহাট শহর থেকে মামাবাড়ির গ্রামের দূরত্ব তখনকার হিসেবে মোটামুটি সাত মাইল। যেতে হতো নৌকায়। একটু বড়ো হলে শুকনোর সময়ে সাইকেল চালিয়ে গিয়েছি। কিন্তু নীলের মেলা বা চৈত্রসংক্রান্তির মেলায় যাবার অভিজ্ঞতা একেবারেই ছোটোবেলায়। তাও একমাত্র ওই মামাবাড়িতেই। চৈত্র মাস, অর্থাৎ শুকনার সময়। তখনও নদীতে সেই সময়ে ভালোই জল থাকত। একেবারে মামাবাড়ির ঘাট অবধি যেতে না-পারলেও, বড়ো খালের যেখানে শেষ সে অব্দি যেতে পারতাম নৌকোয়। যেতাম এই সংক্রান্তির আগে আগে, আসতাম বৈশাখের চার তারিখে বৈশাখী মেলা শেষ করে। এক সপ্তাহ স্কুল কামাই যেত। তবু ওই জোড়া মেলার আকর্ষণ থেকে নিজেকে কোনোভাবেই ফেরাতে পারতাম না। অথবা, হতে পারে আশৈশব টাউনে বড়ো হওয়ায়, এই মেলাই ছিল শহরের জীবনযাত্রার বাইরে আমার কাছে প্রধান আকর্ষণের। দিদিমার কাছে থেকে ডাক এলে তা থেকে নিজেকে দূরে রাখার উপায় ছিল না। কিন্তু স্মৃতি যা-ই সাক্ষ্য দিক, গহীনে থাকা তার যতটুকুই জানাক তবু আজও জানি না, চৈত্রসংক্রান্তির মেলাকে কেন নীলের মেলা বলা হতো? এর কয়েক দিন আগে দোলযাত্রা হতো। তখন মামাবাড়িতে আকৃতিতে একটি বড়ো ও একটি ছোট এমন দুটো মাটির উঁচু চারকোণা ঢিপি রং দিয়ে সাজানো হতো। তার আগের দিন সন্ধ্যার রাত পাশের কোনো মাঠে পোড়ানো হতো বুড়ির বাসা। তখন দূরের কোনো গ্রামের আকাশে ওড়ানো হতো ফানুস। আমার ফানুস ওড়ানোর মতো বয়স আর যোগ্যতা কোনোটাই হয়নি তখন। যদি মায়ের জ্ঞাতি ভাইয়েরা কোনো এক বছর তা বানিয়েছে, তাদের সঙ্গে ওড়ানোর সুযোগ হয়েছে। তবে বুড়ি বাসায় ঢুকে, ভিতরে আগুন দিয়ে দিদিমা আর অন্যদের সঙ্গে বেরিয়ে আসার মুহূর্তটি ছিল অতি রোমাঞ্চকর। এরপর দিনই হয়তো আবার শহরে ফিরে এসেছি। ফেরার সময় দিদিমা বলে দিয়েছেন, সামনেই নীলের মেলা, তারপর বৈশাখী মেলা, আমি যেন অবশ্যই আসি। যদি বলতাম মা-বাবা আসতে দেবে না, দিদিমা জানাতেন মাকে চিঠি লিখে দেবেন, অথবা কাউকে পাঠাতেন আমাকে নিয়ে আসার জন্যে।

এভাবেই নীল আর বৈশাখী মেলায় আসা হতো আমার। ওই মেলায় কী কিনতাম, কী খেতাম তা আর সেভাবে মনে নেই। তবে এক সারিতে অনেকগুলো মিষ্টির দোকান বসতো। সেখানে দোকানের সামনে বড়ো বড়ো কড়াইয়ে রাখা থাকতো রসগোল্লা। ভাসত। গরম গরম। কিছুক্ষণ ঘুরেফিরে সেগুলো একটা দুটো খাওয়ার কথা মনে আছে। বিক্রেতারা মনে করতেন, এতটুকু মানুষ একবারে এমন দুটো রসগোল্লা হয়তো খেতে পারবে না। আর অবধারিত ছিল নাগরদোলায় চড়া। বরফ কুচি দেয়া জল পাওয়া যেত। অর্থাৎ একটা র‌্যাঁদার মতো কাঠের ওপর বরফ ঘষে লেবুর রস মিশানো জলে দেয়া হতো। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে বসতো এই মেলা। তবে আকারে ছোটো। বৈশাখী মেলার তুলনায় তা চার ভাগের এক ভাগ। আমি জানি না, কেন এই মেলাকে ‘নীলের মেলা’ বলা হতো। জায়গাটির নাম ছিল সরকারি পুকুরপাড়। হ্যাঁ, সেখানে একটা বড়োসড়ো পুকুর ছিল। বাঁধানো তার ঘাট। কেন এই পুকুরটাকে ‘সরকারি পুকুর’ বলা হতো- তাও জানি না। হতে পারে পানীয় জলের জন্যে বলেশ্বর নদীর একেবারে কাছে এক সময় এই পুকুর খোঁড়া হয়েছিল।

নীলের মেলার পরদিনই পহেলা বৈশাখ। আগের দিন ওই মেলা থেকে আনা ফুট-বাঙ্গি-তরমুজ আর মিষ্টি ও দই দিয়ে বর্ষবরণ। বৈষ্ণবপন্থীদের নগর সংকীর্তনের মিছিল প্রতিটি বাড়িতে আসতো। তবে বৈষ্ণবপন্থার এই বর্ষবরণ রীতি মামাবাড়ির দিকে তেমন একটা ছিল না। সেটা বেশি চোখে পড়ত এখান থেকে আড়াই কিলোমিটার পশ্চিমে আমাদের নিজেদের বাড়ির দিকে।

যদি পহেলা বৈশাখের পরদিন মামাবাড়ি থেকে আবার শহরে না এসে থাকি, তাহলে আগামী দুই দিন শুধু অপেক্ষা বৈশাখের চতুর্থ দিনটির জন্যে। সেদিন স্থানীয় স্কুলের মাঠে বসবে বৈশাখী মেলা। সকাল হতেই চলে যাব সেখানে। একলা অথবা দিদিমা কারও সঙ্গে পাঠাবেন। বিশাল এই মেলা ঘুরে ঘুরে দেখায় কতো আনন্দ! এক পাশে সারি করে বসতো মনোহরী দোকান। সেখানকার ক্রেতা মূলত মেয়েরাই। অন্যদিকে বড়ো খালের পাড়ের দিকটা ও রাস্তার কাছ দিয়ে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের অফুরান দোকান। মাঝখানের জায়গাটার কোণায় নাগরদোলা, বিভিন্ন ধরনের বাজি ও জুয়ার কোর্ট। আর গ্রামের দিকে ঢুকে যাওয়া খালের পাশ ধরে ময়রার (মিষ্টির) দোকান। মনে আছে, একবার এতো বার নাগরদোলায় উঠেছিলাম যে শেষবার নেমে আর হাঁটতে পারিনি। মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার দশা! সেই দিনটাকে আজও আমার মনে হয়, নাগরদোলার দিন।

ছোটোবেলায় সবকিছুই আকৃতিতে বড়ো লাগে। এই মেলাও তাই লাগত। একটু একটু করে বড়ো হতে হতে নিজের কাছে এই মেলার আকৃতি ছোটো হতে শুরু করে। সেটা অবশ্য দুইভাবে। নিজের চোখের কাছে আর এর প্রকৃত আকৃতিও। কারণ, এই এতো আয়োজনে একটি মেলা বসার কারণ ছিল সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থা। অর্থাৎ অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘে ধানের কাজ শেষ হওয়ার পরে, ফাল্গুন ও চৈত্র- এই দুই মাস গেরস্ত সারা বছরের খোরাক রেখে বাকি ধান বিক্রি করে দিতো। তখন হাতে নগদ টাকা। তখন সারা বছরের জন্যে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার সময়। মেলাও যেন সে কথা মনে রেখে ভরে উঠত। মানুষের প্রয়োজনীয় প্রায় সব কিছু নিয়ে সে হাজির। হাঁড়ি-বেলন থেকে শুরু করে কুমড়ো পর্যন্ত। ওদিকে দা-বঁটি থেকে সুচ। যাতে এসব কোনো কিছুই কিনতে তাকে গঞ্জের দিকে যেতে না হয়।

কিন্তু ধীরে ধীরে তো ধানের মতো প্রধান ফসলেরও উৎপাদনের হিসাব বদলে গেছে। সঙ্গে এসব এলাকায় মাছের চাষসহ অন্যান্য রবিশষ্য চাষও শুরু হয়। এমনকি চৈত্র বৈশাখে এই এলাকার নদীর চরে ফুট-বাঙ্গি-তরমুজের চাষও শুরু হলো। আর গঞ্জের পণ্য ধীরে ধীরে পাওয়া যেতে লাগল স্থানীয় দোকানে। অথবা রাস্তা ভালো হয়েছে, বর্ষকালেও যখন ইচ্ছে গ্রাম থেকে বাইরে যাওয়া যায়। ফলে, ধীরে ধীরে এসব গ্রামীণ মেলা তার চরিত্র বদলে ফেলেছে। আকৃতিও কমছে। আর এসব মেলা নিয়েও ক্রেতা-বিক্রেতা আয়োজক তিন পক্ষেরই উৎসাহে ভাটা পড়েছে।

আর, এদিকে নিজের দিকে তাকিয়ে দেখি, আমিও বড়ো হয়ে গেছি। এমনকি দিদিমাও নাতির চোখ-মুখ আর সেই বাল্য আর কৌশরের মেলায় যাওয়ার উৎসাহ না-দেখে হারিয়ে ফেলেছিলেন যেন সেই আহ্বান অথবা তিনিও বুঝতে পারতেন, দিন বদলে গেছে। তারও এসব মেলা থেকে প্রায় কোনো কিছুই আনানোর প্রয়োজন পড়তো না। ফলে আমাদের দুজনার উৎসাহের কমতিই তো বুঝিয়ে দেয় এই মেলার ক্রমহ্রাসমানতার কারণ। দুই দিকের দুই প্রজন্ম, মাঝখানে একটি প্রজন্ম- এই যে সময়, এই সময়ের কাছেও মেলার প্রয়োজনীয়তাও যেন এক হয়ে গেছে। সেখানে এখন আয়োজনটাই ধারাবাহিকতা রক্ষার, অন্য কিছু নেই আর।

কিন্তু পরে আর দিদিমার কাছে জানতে চাওয়া হয় নি, গত শতাব্দীর কখন থেকে প্রথম এখানে মেলা বসতে দেখেছেন। দুর্ভিক্ষের ও যুদ্ধের বছরগুলোতে এখানে মেলা হয়েছিল? মুক্তিযুদ্ধের বছর? অতীতের একটা নিশানাও হয়তো পাওয়া যেত। দিদিমার তো এই শতাব্দীর এক দশকও কাটানো হয়নি ধরাধামে। ততদিনে নাতির হাতে মেলা দেখার টাকা দেয়ার সুযোগও হাতছাড়া হয়ে গেছে তার। আর দুজনের দেখা হওয়ার দিনক্ষণের মেলার ওই নির্দিষ্ট দিনগুলোর সঙ্গেও মিলতো না। তবে উভয়ে দেখা হলে একথা বিনিময় হতো: সেই মেলা এখন আর নেই। বসে কোনোরকম একটু। পাশ থেকে কেউ হয়তো পুরোটার বিবরণ দিত। নাগরদোলা আর জুয়া ঠিকই আছে। সন্ধ্যার পরে পুতুল নাচ। মিষ্টির দোকান কমে গেছে। আর সারাবছরের প্রয়োজনীয় জিনিসের দোকান প্রায় বসেই না। মেয়েদের সাজসজ্জার দোকানও অনেক কম। তাই মেলা আকারে ছোটো। আর পুতুলনাচ ইত্যাদি বিভিন্ন অব্যবস্থাপনার জন্যে সন্ধ্যার পরে মহিলাদের যাওয়া কমে গেছে।

শুনে, খুব মিলানো যায় না, আবার যায়ও। কল্পনা তো করে নেয়া যায়। যেভাবে স্মৃতিও যেন কিছু জিনিস কল্পনা করে নেয়। এমনকি হঠাৎ কোনো এক বছর গিয়ে উদয় হলে, দিদিমা আর নেই; মেলার মাঠের মধ্যিখানে দাঁড়ালে তার কথা মনে পড়ে। ভেবেছি, হায় এটাও তো জানতে চাওয়া হয়নি কখনও, বৈশাখের মেলাকে বলে বৈশাখী মেলা কিন্তু চৈত্রসংক্রান্তির মেলাকে নীলের মেলা বলে কেন? নীলের মেলা শব্দ দুটো মাথায় গেঁথে আছে। কিন্তু আজও পর্যন্ত এর অর্থ জানি না।  

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৯ এপ্রিল ২০১৯/তারা

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       

Walton AC
Marcel Fridge