ঢাকা     সোমবার   ০৩ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ১৯ ১৪২৭ ||  ১৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

risingbd-august-banner-970x90

‘এক জীবনের গল্প বলতে গিয়ে অন্য জীবনের গল্প বলেছি’

146 || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:০৭, ৬ জুন ২০১৯  

গল্পকার, ঔপন্যাসিক জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের সাহিত্যিক জীবন শুরু ষাটের দশকে। গল্প দিয়েই তাঁর সাহিত্যিক জীবনের সূচনা। তাঁর গল্পে রয়েছে ছন্দময় কবিতার ছোঁয়া। কলমে উঠে এসেছে সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা, জীবনদর্শন, মুক্তিযুদ্ধ। তিনি সৃষ্টি করেছেন সাহিত্যে নতুন ধারা ‘ছোট উপন্যাস’। প্রবন্ধসাহিত্যে রয়েছে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান। লিখেছেন স্মৃতিকথা। অনুবাদ সাহিত্যেও তিনি উজ্জ্বল। জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের মুখোমুখী হয়েছেন কবি ওবায়েদ আকাশ ও খন্দকার মুনতাসীর মামুন।

খন্দকার মুনতাসীর মামুন : আপনার পৈতৃক নিবাস তো পাবনায়, তাই না?
জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত : হ্যাঁ। পাবনা জেলার বেড়া থানায়। জন্মেছি কুষ্টিয়া জেলায়, মাতুলালয়ে। বড় হয়েছি বগুড়ায়।

খ. মু. মা. : শুনেছি, জীবনের শুরুর দিকে আপনাকে অনেক স্ট্রাগল করতে হয়েছে। ঐ সময়ের কথা কিছু বলবেন?
জ্যো. প্র. দ. : লেখাপড়ার জন্য আমাকে নানাজনের সাহায্য নিতে হয়েছে, নানা আশ্রয়ে কাজ করতে হয়েছে। মা মারা যান খুব ছোটবেলায়; আমরা বগুড়া শহরে চলে আসি। ’৪৭-এ বাবার চাকরিস্থল পড়ে যায় ঐ বাংলায়। এ কারণে তাকে চাকরি ছাড়তে হয়। তিনি কর্মহীন হয়ে পড়েন। আমাদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেলে যা হয়- আমাকে অন্যের বাড়িতে থেকে কখনও গৃহশিক্ষক, দোকানের কর্মচারী, গরু-বাছুরের তদারককারী হতে হলো। এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে থাকতাম। তিনি আমাকে স্কুলে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। আমার বড় ভাই গিয়েছিলেন কলকাতা। তিনি এসে যখন শুনলেন আমি একজনের বাড়িতে আছি, তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। কিন্তু চাকরির কারণে এক বছর পড়াশোনায় গ্যাপ পড়ে গেছে। আমার বড় ভাই ঐ ব্যবসায়ীকে বললেন, ‘আমার ভাইটি লেখাপড়ায় খুব ভালো, ও লেখাপড়া করতে চায়, ওকে একটু সুযোগ দিন।’ তখন ঐ ব্যবসায়ী বললেন, ‘ঠিক আছে, ও থাকবে আমার বাড়িতে, আমার ছেলের মতো কাজকর্ম দেখাশোনা করবে, স্কুলে পড়বে কিন্তু ওর মাইনে আমি দেব না।’ তো সেভাবেই আমি তার কাছে ছিলাম দুই বছর।
তার ওখানে থেকেই আমি ম্যাট্রিক পাস করলাম। এবার কলেজে পড়ব, ভর্তি হওয়ায় খুব ইচ্ছে। কিন্তু কলেজে পড়ার যে টাকা নেই। ম্যাট্রিকের খরচ যোগাড় হয়েছিল নানাজনের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে। এবার কলেজে ভর্তির টাকা কোথায় পাই? দু-চারজন পরিচিত ব্যবসায়ীদের কাছে গেলাম, তাদের কাছে টাকা ধার নিয়ে ভর্তি হলাম কলেজে। যদিও কলেজের মাইনে হাফ ফ্রী করে দিয়েছিল তবু কিছু তো মাইনে দিতে হয়, টাকা লাগে। আমাদের পুরনো স্কুলের দফতরি কালু খুব ভোরে রেলস্টেশনে গিয়ে কলকাতা স্টেটসম্যান পত্রিকার বাণ্ডিল এনে, শহরে যারা স্টেটসম্যান রাখত তাদের বাড়িতে পৌঁছে দিত। সে আমাকে সব শিখিয়ে দিল। কালুর ঐ কাগজ বিলি করার কাজটা নিলাম। রোজ ভোরবেলা উঠে স্টেশনে থেকে কাগজ নিয়ে সারা শহরে হেঁটে হেঁটে কাগজ বিলি করতাম। তার থেকে কিছু টাকা আসতো। এভাবে আরো কিছু ছোটখাটো কাজ করে চলতে হতো আমাকে।

খ. মু. মা. : এই যে এত বিস্তর অভিজ্ঞতা এসব কী আপনার গল্পের রসদ জুগিয়েছে?
জ্যো. প্র. দ. : জুগিয়েছে তো বটেই! আমার অনেক গল্পেই এটা পাওয়া যাবে। অনেক রচনাতেই এটা আছে। তো এই করেই আমি কলেজ শেষ করলাম। কলেজে পড়ার সময়েই ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক গাঢ় হয়। আমি পুরোদস্তুর অ্যাক্টিভিস্ট হয়ে যাই। রাস্তায় রাস্তায় মিছিলে যোগ দিই। ছাত্র ইউনিয়নের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছি, কলেজ  ম্যাগাজিন সম্পাদনা করছি। আমরা হাতে লেখা একটা ম্যাগাজিনও করেছিলাম, নাম দিয়েছিলাম ‘রামধনু’। আমি এবং কমলেশ সেন বলে আমার এক বন্ধু ছিল, যে পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী নেতা হিসেবে পরিচিতি পায়, এই দুজন মিলেই  ‘রামধনু’ পত্রিকাটি বের করি। ওটা ছিল মূলত একটি খাতা যা হাতে লেখা, এবং রেক্সিনে বাঁধাই করা, ওখানে আমাদের সব গল্প-কবিতা ছিল। এই হাতে লেখা পত্রিকাটি হাতে হাতে ঘুরত।
একদিন শুনলাম ছাত্র ইউনিয়নের কথা। আমি, কমলেশ হাঁটতে হাঁটতে ছাত্র ইউনিয়ন অফিসে গেলাম। গিয়ে দেখি সেখানে আবৃত্তি প্রতিযোগিতা হচ্ছে, জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ পড়া হচ্ছে। আমি তো তখনও ঐ ধরনের কোন প্রতিযোগিতায় অংশ নিইনি, তবু সাহস করেই ঐ প্রতিযোগিতায় বনলতা সেন পড়লাম। এবং প্রথম হলাম। মনে আছে, কায়েদে আযমের জন্মদিন উপলক্ষে রচনা প্রতিযোগিতায় আমি প্রথম হয়েছিলাম। এই করতে করতে শহরে বেশ পরিচিতি হলো।

ওবায়েদ আকাশ : প্রথম সার্থক গল্পটা অর্থাৎ যার মাধ্যমে আপনি গল্পকার হয়ে উঠলেন, সেটি সম্পর্কে একটু জানার কৌতূহল আছে।
জ্যো. প্র. দ. : এ প্রসঙ্গে আমি আমার কলেজ ম্যাগাজিনে লেখা গল্পের কথাই বলবো। এরপর আমি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখা শুরু করেছি। তবে সে গল্প আমার কোন বইয়ে আসেনি। ইনফ্যাক্ট আমার প্রথম জীবনের বেশিরভাগ গল্পই আমার বইয়ে পাওয়া যাবে না। বইয়ে আসেনি। সব হারিয়ে গেছে। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের লাইব্রেরিতেও খুঁজে পাইনি। আমার যেসব গল্প সংবাদ-এ ছাপা হয়েছে, আজাদ-এ ছাপা হয়েছে, মিল্লাত-এ ছাপা হয়েছে, একটি গল্পও বইয়ে আসেনি। সব হারিয়ে গেছে। এমনকি ঢাকা কলেজ ম্যাগাজিনে যে গল্প ছাপা হয়েছিল, জগন্নাথ হল ম্যাগাজিনে যে গল্প ছাপা হয়েছিল, তাও আর খুঁজে পাইনি।

ও. আ. : শুরুর দিকের কোন গল্পটিকে আপনি সার্থক গল্প মনে করেন, মানে গ্রন্থিত গল্পগুলোর ভেতর?
জ্যো. প্র. দ. : সার্থক গল্প যদি বলি তবে বলবো, আমার বহুল পঠিত গল্প ‘পরমাত্মীয়’। এটি আমার বইয়েরও প্রথম গল্প এবং আমি নিজেও মনে করি, এটি আমার একটি সার্থক গল্প।

ও. আ. : ওটা তো মনে হয় ‘দুর্বিনীত কাল’-এ আছে।
জ্যো. প্র. দ. : হ্যাঁ, ওখানেই আছে।

ও. আ. : ঐ গল্পটা যখন লেখেন তখন আপনার বয়স কত ছিল?
জ্যো. প্র. দ. : তখন আমি ইউনিভার্সিটিতে পড়ি, সেকেন্ড ইয়ারে।

ও. আ. : ঐ সময় কি আপনি কবিতা দ্বারা আক্রান্ত ছিলেন? কবিতা পড়তেন প্রচুর নাকি গল্প পড়তেন?
জ্যো. প্র. দ. : না না, আমি কবিতাও পড়তাম প্রচুর, গল্পও পড়তাম। তাছাড়া সেসময় আমার যে বন্ধুবৃত্ত ছিল, কবি সেবাব্রত চৌধুরী, কবি হায়াৎ মামুদ, হুমায়ুন চৌধুরী- সাহিত্যানুরাগী ছিলেন। কবিতা, গল্প সব পড়া হতো।

ও. আ. : একটা কথা অনেকেই বলেন যে, গল্প যদি কাব্যাক্রান্ত হয় তাহলে গদ্যের আসল স্বাদটা থাকে না। অনেকেই সেটাকে দূষণীয় মনে করেন। আপনার গল্পগুলো দেখি প্রচণ্ডভাবে কাব্যাক্রান্ত, কিন্তু আপনার গল্পের এই কাব্যিক ভাষা সবাই খুবই ইতিবাচক অর্থে নিয়েছে। এবং সবাই মনে করছেন এটিই আপনার গল্পের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। আপনার বেলায় কেন এমনটা হলো বলে আপনি মনে করেন?
জ্যো. প্র. দ. : এটা খুব বাড়াবাড়ি বলা হবে বলে মনে করি না আমি, যদি ভাষাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে জানা যায়; কবিতার ছন্দ, কবিতার অনুপ্রাস, কবিতার চিত্রকল্প যদি গদ্যের চলনের সঙ্গে মিশিয়ে রচনা তৈরি করা যায়, সে তো অবশ্যই সুখপাঠ্য হবে। এই বিশ্বাস থেকেই আমি আমার এই রচনাশৈলী ধরে রেখেছি।

ও. আ. : আপনি কি সুচিন্তিতভাবেই এ রচনাশৈলী ব্যবহার করতেন?
জ্যো. প্র. দ. : প্রথমদিকে যেমন ‘একজন পুরুষ চাই’ কিংবা ‘পরমাত্মীয়’ লেখার সময় আমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। লিখেছি, কেটেছি, লিখেছি আবার ঠিক করেছি। এভাবে প্রথম দিকে অনেক কিছু করেছি। কিন্তু এরপর আমাকে আর বেশি বেগ পেতে হয়নি।

ও. আ. : আপনার গল্পের স্বাতন্ত্র্য বা বাঁকটা ঠিক কোথা থেকে শুরু হলো?
জ্যো. প্র. দ. : আমি যখন গল্প লিখতে শুরু করলাম, যে রকম গল্প হয়, লোকে যেগুলোকে ছোটগল্প হিসেবে চিহ্নিত করে সেভাবেই আমি লিখতাম। কিছুকাল লেখার পর আমার মনে হলো, যেমন গল্প আমি লিখতে চাই সেটা হচ্ছে না। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ইন্ধন জুগিয়েছিলেন এনামুল হক, ‘উত্তরণ’ পত্রিকার সম্পাদক। তিনি বগুড়ার। আমি উত্তরণ-এর সহ-সম্পাদক ছিলাম। তিনি আমার একটি গল্পও ছাপলেন। তারপর বললেন, নতুন গল্প লিখতে হবে, এরকম গল্প নয়। সেই থেকেই আমার মনে এল যে, নতুন গল্প কী? নতুন গল্প ভাবতে ভাবতে আরেকটা গল্প লিখলাম। লিখেই সেটা ‘সমকাল’-এ দিয়ে এলাম, জাফর ভাইয়ের (সিকান্দার আবু জাফর) হাতে। তখন সমকাল-এর বেশ নামডাক। দু’দিন পর জাফর ভাই বললেন, এ গল্প তো ছাপা হবে না।
গল্পটা কি সেটা আজ আর মনে নেই, তবে এটা মনে আছে যে, সমকাল অফিস থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রামকৃষ্ণ মিশনের পুকুর পাড়ে গিয়ে আমি গল্পটা ছিঁড়ে পুকুরে ফেলে দিয়েছিলাম। এরপর আমি ভাবতে থাকলাম, নতুন গল্প কী? এই ভাবতে ভাবতেই মনে হলো, তাহলে নতুন গল্প এমন কিছু হবে যেটা সম্পূর্ণভাবেই আমার নিজের, যেটা কারও কাছ থেকে নেয়া নয়। নিজের মত করেই ভাষা তৈরি করতে হবে, নিজের ভেতর থেকেই আসতে হবে সমস্ত কথা, যা অন্যের নয়। এই ভেবে আমি রাত্রি বেলায় গিয়ে গল্প লিখতে শুরু করলাম ‘একজন পুরুষ চাই’। যেটা ছিল অসাধারণ রকম রাজনৈতিক। সে গল্প লিখতে গিয়ে আমাকে নানা কৌশলে শব্দের পরে শব্দ সাজাতে হয়েছে, বাক্যের পরে বাক্য সাজাতে হয়েছে। প্রচুর তৎসম, তদ্ভব এবং বিদেশি শব্দের ব্যবহার আছে। শব্দকে ভেবে ভেবে সাজাতে হয়েছে।
‘একজন পুরুষ চাই’ লিখে জাফর ভাইয়ের কাছে নিয়ে গেলাম। তার দুদিন পর যখন জাফর ভাইয়ের কাছে গেলাম, উনি বললেন যা, ভেতরে গিয়ে প্রুফ দেখে দে। অর্থাৎ আমার লেখা গল্পটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ছাপতে দিয়েছেন, এবং তাৎক্ষণিকভাবেই ছাপা হয়েছে। ওরকম যখন হলো, অর্থাৎ জাফর ভাই যখন গল্পের ধাঁচটা পছন্দ করলেন, আমি বুঝে নিলাম, এই হচ্ছে নতুন গল্প, যার ভাষা সম্পূর্ণই আমার, যার কথা সম্পূর্ণই আমার।

ও. আ. : এবং আপনার ঐ ধারাটাই বোধহয় রয়ে গেছে।
জ্যো. প্র. দ. :  না, আমি কিন্তু প্রচলিত ধারার গল্পও লিখেছি। কাহিনিপ্রধান গল্প লিখেছি, সেখানেও আমার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ছড়ানো আছে, যা দিয়ে অন্য কারও গল্পের সঙ্গে আমার গল্পের পার্থক্য করা যায়।

ও. আ. : এই যে আমরা বলি, নিজস্ব ভাষা তৈরি করা, এক্ষেত্রে কোন বিষয়টা আপনাকে সহযোগিতা করেছে? আপনি যে এই জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ভাষা আবিষ্কার করলেন, এক্ষেত্রে কে আপনাকে প্রভাবিত করেছে?
জ্যো. প্র. দ. : অনেকেই আমাকে এ ধরনের প্রশ্ন করেছেন। আমি ভাববার চেষ্টা করেছি যে, আসলেই কি আমি কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়েছি? যেমন ধরা যাক সেকালে আমি যাদের গল্প পড়তাম বাংলায়, বিমল কর, সন্তোষকুমার ঘোষ, সুবোধ ঘোষ, আলাউদ্দিন আল আজাদ প্রমুখ যাঁরা ছিলেন, আমি তো কাউকেই এভাবে লিখতে দেখিনি। হতে পারে, এঁদের সবার লেখাই আমার ভেতরে একটু একটু করে নির্যাস দিয়েছে। কিন্তু আমি কারও এমন লেখা দেখেছি, তা আমি মনে করতে পারবো না। সে সময় আমি অনুবাদ পড়তাম প্রচুর। ইউনিভার্সিটিতে এসে ইংরেজিতে প্রচুর লেখা পড়ি, ক্লাসিক উপন্যাস পড়েছি, ইটালিয়ান-ইউরোপিয়ান লেখা পড়ি, কারও লেখাই যে ঠিক এরকম সেটা বলতে পারবো না। একজন আমাকে অবশ্য বলেছিলেন যে, কমলকুমার মজুমদারের প্রভাব আমার লেখায় আছে- থাকতে পারে। কিন্তু কমলকুমার মজুমদারকে তো আমি অনেক পরে পেয়েছি। কমলকুমার মজুমদারের ‘অন্তর্জলী যাত্রা’ আমি পড়েছি যখন আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ বেরিয়ে গেছে। ইতিমধ্যে আমি গল্পকার হিসেবে পরিচিত। হ্যাঁ, কমলকুমার মজুমদারের ভাষায় যেমন তৎসম শব্দ প্রচুর, এটা দেখে হয়ত কেউ এমন ভাবতে পারেন। কিন্তু আমি মনে করি না যে, আমি কমলকুমার মজুমদার দ্বারা প্রভাবিত।

বাঁ থেকে জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, ওবায়েদ আকাশ, পূরবী বসু  ও হায়াৎ মামুদ


ও. আ. : আপনি একটা সময় যুক্তরাষ্ট্রের একটা প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে কাজ করেছেন সম্পাদক হিসেবে। সেখানে নিশ্চয়ই আপনাকে প্রচুর পাণ্ডুলিপি পড়তে হয়েছে।
জ্যো. প্র. দ. : সেখানে বেশির ভাগই ছিল গদ্য রচনা। তাও আবার মোস্টলি টেকনিক্যাল জার্নাল। আমি ঐ সময় তিনটি জার্নাল দেখতাম।

ও. আ. : আমরা জানি, এক এক দেশের বৈশিষ্ট্য নিয়ে এক এক দেশের সাহিত্য তৈরি হয়। একটা মেজাজ কিন্তু বোঝা যায়, যেমন জার্মানির জন্ম ইতিহাস যারা জানে কিংবা হিটলার কিংবা নাৎসিদের ইতিহাস যারা জানে, তারা কিন্তু বোঝে জার্মান সাহিত্য এমনই হবে। আপনার কাছে কি মনে হয় বাংলাদেশের গল্পকাররা বাংলাদেশের সঠিক ভাষা বা সঠিক মেজাজটা ধরে রাখতে পারছেন? আপনার বন্ধু হাসান আজিজুল হকের কথা বলতে পারেন, মাহমুদুল হকের কথা বলতে পারেন কিংবা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কথা বলতে পারেন।
জ্যো. প্র. দ. : তারা তো সমসাময়িক গদ্য লিখেছেন। তারা নিজেদের মতো করেই গদ্যকে সমৃদ্ধতর করেছেন। তবে গদ্য কী রকম থাকবে, এর চেহারা কী হবে- এটা অনেকটাই নির্ভর করবে পাঠকের রুচিকে তুলে ধরার ওপর। আপনি যদি পাঠককে শ্রদ্ধা করতে শেখেন, মনে করেন, পাঠক আপনার এই লেখা নেবে, আজ এই লেখা না পড়লেও পরবর্তীকালে বা পরে এই গদ্যের অনুরাগী সে হবে, তাহলে পাঠক কী পড়তে চায় সেদিকে লক্ষ্য না রেখে পাঠককে আমি কী পড়াতে চাই সেদিকে লক্ষ্য রাখবেন, সেভাবে আপনি লিখবেন। তবে এও ঠিক যে, যিনি আমার লেখাটা পড়বেন তার একটা ছবি অবশ্যই আমার চোখের সামনে ভাসে।

ও. আ. : সেটা কি আমাদের এখানে হয়েছে?
জ্যো. প্র. দ. : হয়েছে তো বটেই। যেমন হায়াৎ মামুদের কথা বলা যায়। হায়াৎ মামুদ যে রীতিতে গদ্য লেখেন, সেটা বাংলাদেশে আগে লেখা হতো না। তার গদ্য আর আমার গদ্য একেবারেই আলাদা। কিন্তু কী অসাধারণ শব্দের বিন্যাস!

ও. আ. : অর্থাৎ পাঠকের রুচি নির্মাণের পাশাপাশি তাদের মনোজাগতিক বিষয়টিও লেখকের মাথায় চলে আসে, তাই তো!
জ্যো. প্র. দ. : অবশ্যই। আমি যখন গল্প লিখছি তখন ভাবছি কী? আমার এ গল্পটা পড়বে কে? আমার বন্ধুস্বজন, কাছের মানুষদের আগে গল্পটা পড়াবো। তারা পড়ে বলবে, কেমন হয়েছে। তখনই তো আমি বুঝবো, আমার গল্প কতটা সার্থক। অর্থাৎ লেখকের সামনে তার পাঠকের মুখটা আঁকা থাকেই।

ও. আ. : আপনার পরবর্তী রচনাগুলো যেমন ‘সময় অসময়ের মুক্তিযুদ্ধ’, ‘সময় ভোলে না কিছু’, ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প’- এই লেখাগুলোকে আপনি কী ধরনের লেখা বলতে চান?
জ্যো. প্র. দ. : এই জাতীয় রচনা আমি শুরু করেছি আশির দশকে। আমি প্রতিটি রচনাই নতুন আঙ্গিকে লিখতে চাই। যেমন অনেক আগে একটি গল্প লিখেছিলাম ‘উৎসে ফেরা’। এই গল্প আওয়ামী লীগের পত্রিকায় ছাপাও হয়েছে। তারা এটা বুঝেছে কতটা, জানি না। যে গল্পের মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে বলা হয়েছে আধুনিক বাংলাদেশের উৎস।

ও. আ. : বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আপনার আরো একটি গল্প আছে, ‘স্মৃতিসৌধ’। গল্পটি আমি দৈনিক সংবাদ-এ ছেপেছি। এই যে ভিন্নার্থে বঙ্গবন্ধুকে তুলে ধরা, স্মৃতিসৌধ হিসেবে দেখা, এর ভেতরে নিঃসন্দেহে একটা আলাদা ব্যাপার রয়েছে।  
জ্যো. প্র. দ. : আছে নিশ্চয়ই। গানের কোথাও বঙ্গবন্ধুর সরাসরি উল্লেখ নেই, অথচ তারই কথা বলা হয়েছে। ’৬৯-এর পরে তো আমি আর বাংলা লিখতাম না, আমেরিকা চলে যাই। ক্লাসের টার্ম পেপার ইত্যাদি নিয়ে দিনরাত্রি কেটে যেত। লেখার কথাই উঠত না। তখন আমেরিকায় নতুন লিটারেচারের স্রোত বইছে। এভারগ্রিন বলে একটা ম্যাগাজিন ছিল, অ্যালেন গিন্সবার্গ অথবা ওদের সময়ের লেখকরা লিখতেন, বেশ কিছুকাল চলেছিল। সেসব পড়তাম। সেই কাগজে নিউ ডাইরেকশন্স পেপারব্যাক বলে ঐ সমস্ত লেখকদের এক ধরনের রচনা বেরুত, সেগুলোর পাঠ নতুন লেখার প্রতি আমাকে প্রচণ্ডভাবে আগ্রহী করে তুলেছে। নতুন রীতির প্রতিও আকৃষ্ট হই।     
ইউনিভার্সিটি অব মিসৌরীতে যখন পিএইচডি করতে গেলাম, ওখানে ইনফরমেশন অফিসারের চাকরিও  করতাম এবং তখন কিছু জার্নাল এবং নিউজ লেটার দেখতে হতো। আবার লেখালেখি শুরু হলো। সামান্য সময়ের জন্য একবার দেশে এসেছিলাম, ’৮৭ সালে। এক বছর ছিলাম। তখন বাংলা লিখেছি কিছু।
’৮৭-এর পরে ভাবলাম, এখন থেকে এমন লেখা লিখবো, যে লেখা হবে এক অর্থে নতুন, পড়তে ভাল লাগবে, যে পাঠককে আমি পড়তে দেব, সে পড়বে, শুরু করবে এবং লেখার ভেতরে প্রবেশ করবে। তার যদি মনে হয় কিছু বুঝলাম না সে আবার ফিরে আরেকবার পড়বে, তবে পড়তে তার ভাল লাগবেই, আমার লেখাই তাকে ভেতরে টেনে নেবে। দ্বিতীয়ত, আমি তাকে এমন নতুন পথ দেব, এমনভাবে গল্প বলবো যে আপাতদৃষ্টিতে সে যেটা মনে করছে কিছুক্ষণ পড়ার পর সে বুঝবে, তা তো নয়, তাহলে আরেকবার ভেবে দেখা যাক। কখনও কখনও এক জীবনের গল্প বলতে গিয়ে আমি অন্য জীবনের গল্প বলেছি, এভাবে নানা কৌশলের মাধ্যমে আমি নতুন গল্প লিখেছি।  

ও. আ. : নতুন গল্পের ধারাবাহিকতাই কী আপনার লেখালেখির নতুন ফর্ম ‘ছোট উপন্যাস’?
জ্যো. প্র. দ. : ছোট উপন্যাসও ঠিক একই রকম। বেশ কয়েকটি গল্প আমি লিখলাম। লেখার পরে আমার মনে হলো, এই গল্পগুলোকে যদি আমি গ্রন্থনা করি, তাহলে কী দাঁড়ায়, তাহলে একটি উপন্যাস দাঁড়ায় কী? ভেবে দেখলাম, গল্পগুলোয় আমি যে জীবনের কথা লিখেছি, উপন্যাসেও প্রায় একই জীবন ধরা যায়। তাই ভাবলাম, এই তো, আমি একটা নতুন ফর্ম পেয়ে গেছি, এটা উপন্যাসেরই ফর্ম, যেহেতু উপন্যাসের ভেতরে বিস্তৃত জীবন আছে, মানুষের কথা আছে, অথচ এর ফর্ম একেবারেই আলাদা। সেই বর্ণনা নয়, এর ভেতরে সেই ধারাবাহিকতা নেই, অকস্মাৎ দৃশ্যপট উন্মোচিত হচ্ছে, জীবনের একটি ঝলক দেখিয়ে যাচ্ছে, পরমুহূর্তে তা মিলিয়ে যাচ্ছে, এই জীবনকে চোখের সামনে রেখেই শুরু হলো আমার ছোট উপন্যাস। এটা ছোট গল্পের মতই, কিন্তু ছোট গল্প নয়। স্লাইস অব লাইফ নয়, এটা সম্পূর্ণ জীবন।

ও. আ. : আপনি দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি করছেন এবং এটাও নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, আপনার লেখার নির্দিষ্ট পাঠক রয়েছে। আপনার গল্প যারা পড়েন, তারা আপনার ছোট উপন্যাস পড়ে কি ধারণা করতে পারবে যে, আমি একটা ভিন্ন কিছু পাঠ করছি। লেখক যে  ছোট উপন্যাস হিসেবে আলাদা একটা ফর্ম দাঁড় করিয়েছে, সেই সংজ্ঞাটা খোঁজার মানসিকতা কী তাদের তৈরি হবে?
জ্যো. প্র. দ. : হতো, অবশ্যই হবে। যারাই আমার ‘ছোট উপন্যাস’ পড়েছেন তারা বলেছেন, নতুন লেখা পড়ছি। ‘শূন্য নভে ভ্রমি’ প্রকাশ করার পর নিউইয়র্কে একটা প্রকাশনা হয়েছিল। সেখানে যারা এসেছিলেন তারা প্রায় সবাই বলেছেন, সম্পূর্ণ নতুন ধরনের উপন্যাস। অনেকেই বলেছেন, কী পড়লাম, অপূর্ব! সাংঘাতিক রকমের! ভেতরে প্রবেশ করে বুঝতে পেরেছে সকলেই এমন নয়, তবে ভুল কিছু দেখতে পেয়েছে সেটাও কেউ বলেননি। তাদের কেউই লেখাটিকে গতানুগতিক লেখা বলেননি।

ও. আ. : একটু পেছনে যাই, আপনাদের বেড়ে ওঠার সময়টা, ওই যে উত্তাল ষাটের দশক, আপনি, হায়াৎ মামুদ, হাসান আজিজুল হক, রবিউল হুসাইন, মাহমুদুল হক- এই সময়টার কথা জানতে চাই যে, আপনারা আসলে কীভাবে এগিয়েছেন। যেমন ষাটের দশকে বোদলেয়ার প্রভাবিত করেছিল কবিতাকে বা তিরিশের দশকের অনেকেই তিরিশের বৈশ্বিক মন্দায় প্রভাবিত হয়েছিল। এরকম কোন বিষয় ছিল কি নেপথ্যে কাজ করেছিল আপনাদের বেলায়? ওই সময়ের উন্মাদনার কিছু গল্প শুনতে চাই।
জ্যো. প্র. দ. : ষাটের দশকের প্রায় পুরোটাই আমার ঢাকা শহরে কেটেছে অস্থির দেশের রুদ্ধ উন্মাতাল রাজনীতির সময়।  সেটা স্পষ্ট করে কিছু বলা যেত না তখন। তাই নতুন পথ খোঁজা। শুনেছেন হয়ত, আমরা সেসময় নতুন লেখালেখির জন্য নতুন পত্রিকা বের করার চেষ্টা করছি। ‘বক্তব্য’ বলে একটা লিফলেট বের করেছিলাম। যেখানে বলেছিলাম, আমরা সেখানে নতুন লেখা লিখবো। আমরা দুটো লিটল ম্যাগাজিন বের করেছিলাম- ‘সপ্তক’ ও ‘কালবেলা’। কালবেলা করেছিলাম আমি আর হায়াৎ মামুদ। সপ্তক করেছিলাম আমরা সাতজন। আমরা যে নতুন পত্রিকা বের করবো তার প্রস্তুতি হিসেবেই ‘বক্তব্য’ নাম দিয়ে আট ফোল্ডারের একটি লিফলেট ছেপেছিলাম। তখনকার দিনের নতুন যারা ছিলেন, আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ, মনিরুজ্জামান, মান্নান সৈয়দ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আরও অনেকে। প্রথমে স্টেডিয়ামে বসার কথা ছিল, পরে শরিফ মিয়ার চায়ের দোকানে মিটিং হলো। সেই মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হলো পত্রিকা একটি বের হবে। সেটির সম্পাদক হবো আমি। এবং খুব সম্ভব সায়ীদকেও সম্পাদক করার কথা উঠল। আমরা মিটিং সেরে চলে এলাম। এর পরদিন প্রশান্ত ঘোষাল আমাকে বলল, সেদিন রাত্রিবেলায় ওখান থেকে গিয়ে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ সকলের সঙ্গে বসে ঠিক করেছে তারা আলাদা একটি পত্রিকা বের করবে। শুনে আমি বললাম, ঠিক আছে, তারা বের করবে, করুক। আমি আর মনি (হায়াৎ মামুদ) তখন ঠিক করলাম আমরা কালবেলা বের করবো।
সপ্তক বের করার ইতিহাসটা এরকম যে, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, বন্ধুরা মিলে একটা কাগজ বের করবো। তখন লিটল ম্যাগাজিন বলে কিছু ছিল না। তখনকার দিনে অনিয়মিত ম্যাগাজিন বের করা যেত না, ডিক্লারেশন লাগত। তাছাড়া ডিক্লারেশন লাগত কী লাগত না তা আমরা খোঁজও নিই নি। আমরা নিজেরাই অনিয়মিত সংকলন বের করলাম। মূলত আমি, মনি, সেবু, হুমায়ুন, শহীদ কাদরী, আল মাহমুদ, দেবব্রত চৌধুরী- এরাই ছিল সপ্তকে। আমি আর মনিই ছিলাম স্তম্ভ, কালবেলার এবং সপ্তকেরও। আমাদের এক বন্ধু ছিল শফিক খান, তার প্রেস ছিল। সেই শফিক খান আমাদের ছেপে দেবে বলল। অতঃপর শফিক খান ছেপে দিল, আমরা কাগজের নাম দিলাম সপ্তক।

ও. আ. : আপনারা যে পত্রিকা বের করলেন, এর কমিটমেন্ট কী ছিল?
জ্যো. প্র. দ. : নতুন লেখা। আমরা কজন নতুন লেখক এসেছি, আমাদের পরিচিতি হবে। এসটাব্লিশমেন্টের পক্ষে যেসব লেখা পত্রপত্রিকায় ছাপা হচ্ছে, আমাদের লেখা সেসব লেখা ছিল না। আমাদের লেখা নতুন লেখা।

ও. আ. : আমাদের দেশে একটা ধারণা বেশ প্রচলিত যে, লিটল ম্যাগাজিন হচ্ছে লেখক তৈরির একটা জায়গা। লেখকরা এখানে লিখবে, এখানে লিখে হাত পাকাবে, পরবর্তীতে তারা বড় লেখক হবে। তবে কলকাতায় গিয়ে দেখলাম, ওখানে কিন্তু লেখকরা লিটল ম্যাগাজিনকে সেভাবে মনে করছে না, সেখানে শঙ্খ ঘোষও লিখছেন, দেবেশ রায়ও লিখছেন, নতুনরও লিখছেন। এবং তারা কিন্তু মনে করছেন না যে, এটা শুধু তরুণদেরই মুখপত্র, তারা ভাবছেন, যে লেখায় তারুণ্য আছে, সে লেখাই লিটল ম্যাগাজিনে ঠাঁই পাবে।
জ্যো. প্র. দ. : ‘কৃত্তিবাস’ যখন সুনীল কিংবা শক্তি বের করে তারা তো সবাই তরুণ, তারা মিলেই করেছে, বুদ্ধদেব বসু হয়ত পরবর্তীকালে কৃত্তিবাসে লিখেছেন। বুদ্ধদেব বসু যে অনেক দূরের লোক ছিলেন তাও তো নয়। আমাদের এখানে সপ্তকেও কিন্তু ঐ সময় শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, ফজল শাহাবুদ্দিনের লেখা ছাপা হয়েছে। আমি যে বিষয়টা বলতে চাচ্ছি, নতুন লেখকরা সপ্তকে লিখে তাদের হাত পাকাবে এটা ভেবে কখনই আমরা কারও লেখা ছাপাইনি। আমরা মনে করেছি, এটাই হচ্ছে নতুন কাগজ, এখানে সবাই লিখবে, এটাই মানসম্মত কাগজ, এটাই মানসম্মত লেখা। এই চিন্তা থেকেই সপ্তক প্রকাশিত হয়েছিল। কিছুকাল চলে। ’৬৪-র দাঙ্গার পর সেবু ভারতে চলে যায়, আমি অন্য কাগজে ঢুকি, মনি চট্টগ্রামে চলে যায়। এরপর সপ্তক বন্ধ হয়ে যায়। পরে আমরা কালবেলা প্রকাশ করি। কালবেলার উদ্দেশ্যও একই রকম ছিল। অর্থাৎ নতুন লেখকদের আঁতুড়ঘর ভেবে আমরা কখনই কালবেলা প্রকাশ করি নি। নতুন লেখা থাকবে, শক্তিমান লেখক তৈরি হবে এটাই ছিল আমাদের উদ্দেশ্য।

ও. আ. : একটা লিটল ম্যাগাজিন আত্মপ্রকাশের পেছনে উদ্দেশ্যটা তাহলে কী হবে?
জ্যো. প্র. দ. : লিটল ম্যাগাজিন শব্দটা আমরা পরবর্তীকালে করি। কফম্যানের লিটল ম্যাগাজিন বলে একটি গ্রন্থ আছে, যেখানে এই রকম প্রকাশনার বিষয়ে বিস্তৃতভাবে বলা আছে। সেই বক্তব্য অনুযায়ী লিটল ম্যাগাজিন হলো মূলত এশটাব্লিশমেন্টপন্থি লেখকদের বাইরে যাঁরা লেখেন তাঁদের পত্রিকা। যেহেতু এই পত্রিকার লেখাগুলো নতুন ধরনের এবং এই লেখাগুলোকে এশটাব্লিশমেন্টের কেউ সাপোর্ট করে না, সেহেতু এই পত্রিকার লেখকরা নিজেদের পয়সাকড়ি দিয়েই পত্রিকা ছাপায়। এদের প্রচারও খুব কম। এ থেকেই লিটল ম্যাগাজিন নামকরণ হয়েছে। বেশিরভাগ ম্যাগাজিন কয়েক সংখ্যা প্রকাশিত হয়, তারপর বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনের ধাঁচে এশটাব্লিশমেন্টপন্থীরাও কিন্তু কাগজ বের করে। যুক্তরাষ্ট্রেও এমন অনেক কাগজ আছে। যেমন তাদের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে জার্নাল প্রকাশিত হয়। গ্রান্টা বলে তাদের একটি কাগজ আছে যেটি প্রকৃত অর্থে লিটল ম্যাগাজিন, কিন্তু এটি যথেষ্ট মানসম্মত সাময়িকী।

ও. আ. : এই লিটল ম্যাগাজিনের ভবিষ্যৎটা কেমন দেখতে পাচ্ছেন? ডিজিটাল যুগে অনেক অনলাইন পোর্টাল এসেছে, অনলাইনে লেখা ছাপা হচ্ছে- এসব কি লিটল ম্যাগাজিনের বিকাশের ক্ষেত্রে কোনরকম নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে?
জ্যো. প্র. দ. :  ভাবি নি কখনও। তবে লিটল ম্যাগাজিনে যারা লিখছেন, অন্তত আমাদের দেশে, তারা মনে করেন, তাদের প্যাশন  প্রকাশিত হয় নিজের চিন্তার যারা সমকক্ষ তাদের সঙ্গে। ইন্টারনেটে সেটি খুব একটা হয় বলে মনে হয় না। এটা অনেকটাই সামগ্রিক হয়ে যায়। আমি মনে করি, লিটল ম্যাগাজিনের এই ট্রেন্ড এত দ্রুত শেষ হওয়ার নয়।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৬ জুন ২০১৯/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়