ঢাকা, রবিবার, ৬ শ্রাবণ ১৪২৬, ২১ জুলাই ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:
বিশ্ব সংগীত দিবস

সুখ-দুঃখের সুরেলা প্রকাশ: বাংলাদেশের মেয়েলি গীত

শাহনাজ মুন্নী : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৬-২১ ৮:০৯:৫৫ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৭-০১ ৭:২৩:৩৩ পিএম
সুখ-দুঃখের সুরেলা প্রকাশ: বাংলাদেশের মেয়েলি গীত
মহুয়া ও সখীগণ, আবদুস শাকুর শাহ, অ্যাক্রিলিক অন ক্যানভাস
Voice Control HD Smart LED

|| শাহনাজ মুন্নী ||

চিরায়ত বাংলার ঐতিহ্যবাহী সংগীত মেয়েলি গীত। প্রাচীন যুগ থেকে গ্রামীণ নারী নিজের মনে প্রজন্ম পরম্পরায় রচনা করছে ও গাইছে এসব গীত। যদিও সময়ের পরিবর্তনে এখন সব কিছুর মতো এই পুরনো ধারাটিও প্রায় লুপ্ত হতে বসেছে। তবুও পল্লী-বাংলার কোনো নিভৃত কোণে এখনো হয়তো কোনো প্রবীণা গ্রামীণ নারীর কণ্ঠে  কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে চকিতে শোনা যাবে এই সব গীত-

‘‘মন বিন্ধাইলাম বনে বনে
আরো কান্দন কান্দে গো মায়’ও বনে বনে
আরো কান্দন কান্দে গো মায়’ও নিরলে বসিয়া
আরো কান্দন কান্দে গো মায়’ও ঠান্ডাতে বসিয়া
মায়’ও যদি দরদি হইতো
কোলের ঝিধন মায়’ও কোলেতে রাখিত
রাইজ্যের এলেম দুলা রাইজ্যে চইলা যাইতো
দেশের এলেম দুলা দেশে চইল্লা যাইতো ... ”

                                    [ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিয়ের গীত]

গুণগত ও পরিমাণগত বিবেচনায় বাংলা লোকসংগীতের এক বিস্তৃত ও বিশিষ্ট অংশ জুড়ে রয়েছে এই মেয়েলি গীত। অভিধানে ‘মেয়েলি’ শব্দের অর্থ নারীসুলভ বা কেবল মেয়েদের পক্ষেই যা স্বাভাবিক তেমন কিছু বোঝায়। এই অর্থে নারীসুলভ সংগীত বা নারীদের পক্ষে যে রকম সংগীত রচনা ও পরিবেশন করা স্বাভাবিক তাকে মেয়েলি গীত বলা যেতে পারে। আবার ‘লোকসংগীত রত্নাকর’ অনুযায়ী ‘পল্লীসমাজে স্ত্রীলোক কর্তৃক গীত গান মাত্রই মেয়েলি গান বলিয়া পরিচিত।’
মেয়েলি গান একান্তভাবেই বাংলার মেয়েদের গান। এই গানের ভাঁজে ভাঁজে মিশে আছে বৃহৎ নারীগোষ্ঠীর জীবন, তাদের সংগ্রাম, তাদের সরল সুখ ও অপার দুঃখবোধ। আবার এই গানই নারীর সৃষ্টিশীলতার প্রাণময় নিখাঁদ নির্ভেজাল মেয়েলি মনের অজস্র অনুভূতির সুরেলা প্রকাশ এবং নিসর্গের মতোই এই গান একান্তভাবে স্বতোৎসারিত ও প্রত্যাশাবিহীন। নিখাঁদ ও অকৃত্রিম মনের স্পর্শে আকর্ষণীয় অনন্য দুর্লভতায় ভরপুর। পরিকল্পনা, পরিমার্জনা ও সব ধরনের সংস্কারবিহীন এই খাঁটি নারীমনের হৃদয়োৎসারিত সংগীতের ভঙ্গীমাটি পৃথিবীর সর্বত্র এক।
কখনো কখনো নারী নিজেই রচনা করে নিজের সংগীত, নিজস্ব পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ আবেষ্টনীতেই আবার তা পরিবেশন করে, যেন এই সংগীত তার নীরব অস্তিত্বের সরব উন্মোচন, তার স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ধারা, ব্যক্তিত্বের সুরময় অভিব্যক্তি।
যদিও অনেক সময় দেখা গেছে, পুরুষেরাও নারীর জবানীতে নারীর সুখ-দুঃখ বর্ণনা করে গান রচনা করে এবং পুরুষ কণ্ঠেই তা পরিবেশিত হয়। যেমন অধিকাংশ ভাওয়াইয়া গানই নারীমনের নৈরাশ্যের ভাব অবলম্বন করে রচিত। গানের নায়িকা নারী, প্রেম স্পর্শকাতর নারীমনের প্রচ্ছন্ন বেদনার ভাব গানে বর্ণিত হয় কিন্তু এই গানগুলোকে কোনোভাবেই মেয়েলি গানের পর্যায়ভুক্ত করা ঠিক হবে না। বরং এই গানগুলোকে নারী আবেগের পুরুষালি প্রকাশ বলা যেতে পারে। সংবেদনশীল ও সহমর্মী পুরুষেরাই এই ধরনের গানের রচয়িতা।
মূলত, সামাজিক পারিবারিক অনুষ্ঠান ও বিবিধ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ নিরক্ষর নারী সংবেদনের যে স্বতঃস্ফূর্ত সাংগীতিক প্রকাশ, যা শুধু নারী কর্তৃক রচিত, পরিবেশিত ও নারী পরম্পরায় প্রচলিত, তার নামই মেয়েলি গীত।

“ কদম গাছের তলেরে কেবা বাঁশি বাজাওরে
বাঁশি বাজাও শাম শীতল কালারে
মায়’ও আইয়া কইলোরে, ও পুত্র রাজারে
ঘরে আইস্যা খাও দুধ ভাতোরে
তুমার দুধ ভাত তুমি খাও
তুমি মায়’ও ঘরে যাও
আমি যামু সুন্দরীর মন্দিরে, আমি যামু কামিনীর মন্দিরে...”

                          [ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিয়ের গীত]

বাংলার মেয়েলি গীতের কিছু স্বতন্ত্র ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রথমেই এই ধরনের গানের কথা ও সুরের সারল্যের প্রসঙ্গ টানা যেতে পারে। আধুনিক কাব্য ও সংগীতের মানদণ্ডে এগুলো খুব উন্নত কিছু নয়। নারী জীবনের সাদামাটা আনন্দ-বেদনা, উৎসব-অনুষ্ঠান, দেশাচার ও লোকাচারের সরল বিবরণ, সামাজিক রীতিনীতি, নারী-পুরুষের ঐতিহ্যগত সম্পর্ক ও গার্হস্থ্য ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় মেয়েলি গানের উপজীব্য। বলাবাহুল্য, এসব গানের কথায় কোনো জটিল চিন্তানির্ভর পরিকল্পনা বা চেষ্টাকৃত প্রয়াস লক্ষ্য করা যায় না। মেয়েলি গীতের যে স্বতঃস্ফূর্ততা, তা গ্রামীণ সমাজের অনাবিল ও অকৃত্রিম, এর ভাব ও ভাষা মনের সহজাত আনন্দানুভূতি থেকে সৃষ্ট, নির্ভেজাল ও নিরাবরণ। এতে যে সুর বিধৃত, তাতে হয়তো শাস্ত্রীয় ছন্দ-তাল-লয় ও সুরের সুষম ব্যাকরণ অনুপস্থিত, কিন্তু দেশজ আবেগ ও ঐতিহ্যমণ্ডিত লৌকিক সুরধারার প্রবল উপস্থিতি লক্ষণীয়।

দ্বিতীয়ত গানগুলোর উপস্থাপনা সহজ, অনাড়ম্বর ও অকৃত্রিম। সাধারণত এই গান গাইবার জন্য শিল্পীদের প্রাত্যহিক অনুশীলন, প্রশিক্ষণ মহড়া বা বাদ্যযন্ত্রের দরকার পড়ে না, তবে কোনো কোনো অঞ্চলে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। গ্রামীণ নারীরা তাদের প্রকৃতিপ্রদত্ত পরিমার্জনাহীন, স্বাভাবিক কণ্ঠে যথাসম্ভব দরদ ও আন্তরিকতা ঢেলে গান করেন। সে গানের পরিবেশনা হয়তো অলঙ্কারহীন, অনুজ্জ্বল ও নিরাভরণ, কিন্তু স্বচ্ছ, ভানহীন ও অকৃত্রিম।

তৃতীয়ত মেয়েলি গীতে আঞ্চলিকতার প্রভাব সুস্পষ্ট, বিভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষার নিখুঁত, মৌলিক ও নির্ভরযোগ্য নিদর্শন এই সংগীত। যেহেতু জনগণের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত মুখের ভাষায় এই সংগীত রচিত, সেহেতু স্বাভাবিক ভাবেই প্রতিটি অঞ্চলের বিশেষ ধরনের ভাষা বৈশিষ্ট্যের স্বচ্ছন্দ ও সাবলীল প্রয়োগ এই গানগুলোর গায়কী ও প্রকাশভঙ্গিতে লক্ষ্য করা যায়।

মেয়েলি গীতের চতুর্থ বৈশিষ্ট্য এর গতিশীলতা। সময় ও সমাজ মানস পরিবর্তনের সঙ্গে জীবন উপকরণের পরিবর্তিত বস্তুগুলোও মেয়েলি গীতে দ্রুত স্থান দখল করে নেয়। ভাব, ভাষা, বিষয় ও যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজস্ব ধারায় অচেতন ভাবেই পাল্টে যায়। পুরনো গানের সঙ্গে প্রয়োজনবোধে মুখে মুখেই সংযোজিত হয় নতুন কথা ও নতুন সুর। ফলে সবসময়ই গানগুলো সমসাময়িক, গতিশীল ও এক অর্থে আধুনিকও বটে।

পঞ্চমত মেয়েলি গীতে পারিবারিক বন্ধনের জয়গান গাওয়া হয়ে থাকে। নারীমন যতই দূরে থাক-না কেন, সে তার শেকড়ক ভোলে না। চাচা-চাচী, ভাই-বোন, মামা-মামী, মা-বাবা, এমনকি শ্বশুর পক্ষের আত্মীয়স্বজন প্রত্যেকেরই স্নেহময় উত্তপ্ত স্পর্শ নিজের অনুভবে, নিজের গানের প্রতি ছত্রে সে অক্ষয় করে রাখে। পারিবারিক সংলগ্নতার ও আত্মবন্ধনের গভীরতার এমন অপূর্ব চিত্র, পারিবারিক সম্পর্কের প্রতি এমন গভীর আস্থা ও বিশ্বাসের জীবনানুগ আকুতি লোকসংগীতের অন্য কোনো ধারায় খুঁজে পাওয়া বিরল।

তাছাড়া মেয়েলি গীত লিখিত নয় বলে ও যুগে যুগে কালে কালে নারীদের মুখে মুখে রচিত এবং নারী পরম্পরায় স্মৃতি ও স্বতঃস্ফূর্ততায় বিকশিত বলে এর কোনো একক রচয়িতার নাম খুঁজে পাওয়া কঠিন। এই কারণে বলা যায় যে, মেয়েলি গীত কোনো একক বা বিশেষ নারীমনের প্রতীক নয়, বরং সংহত নারীসমাজের আলেখ্য, সমষ্টিগত সামাজিক সৃষ্টি। ব্যক্তিগত হৃদয়বেগের চাইতে সমাজ জীবনে প্রসূত সমষ্টিগত অনুভূতি, সমষ্টি-চেতনা, সমষ্টি স্বীকৃতি মেয়েলি গীতে প্রাধান্য পেয়েছে। যাতে প্রতিফলিত হয়েছে বৃহত্তর নারীগোষ্ঠীর মন মানসিকতার অকপট ও ঐশ্বর্যহীন ছবি। এই বৃহৎ নারীগোষ্ঠীর শিক্ষা নেই, নিজেদের আশা-আকাঙ্ক্ষা জনসমাজে পৌঁছে দেবার উপযুক্ত হাতিয়ার নেই। রয়েছে সহজাত কণ্ঠস্বর, এরই সহায়তায় সৃষ্টিশীল আত্মপ্রকাশের তাগিদে সে মুক্ত করেছে মনের দুয়ার। নিজেদের হাসি-আনন্দ, নিজেদের আত্মপ্রতিষ্ঠার কামনা, জীবনের বিচিত্র সংঘাত ও উত্থানপতনের প্রতিক্রিয়াজাত মনের ফসলে ভরে দিয়েছে লোকসংগীতের বিশাল এলাকা। যে অংশে নারীর নিরঙ্কুশ অধিকার অবারিত ও গৌরবজনকভাবে স্বীকৃত।

“পাটের শাড়ি পিইন্ধা গো ঝিধন
বাবার ছানমন খাড়া গো ঝিধন, বাবার ছানমন খাড়া
হাইস্য মুখে দেও বিদায় বাবা
যাইতাম পরের ঘরে ও বাবা, যাইতাম পরের ঘরে
কারো লাগি পালছিলাম ঝি ধন
রাজার চারকি কইরা গো ঝি ধন, বাদশাহর চারকি কইরা
পরের পুতে লইয়া না যায়গা ঝি ধনরে বুকে ছেল দিয়া...’’

                                                  [ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিয়ের গীত]

বাংলা লোকসংগীতে আলাদা করে মেয়েলি গীতের স্বাতন্ত্র্য স্বীকার করা হয়েছে সাম্প্রতিক কালে। এর আগে মেয়েলি গীতকে ‘বিবাহ সংগীত’, ‘ব্রতের গান’, ‘ঘরের গান’ প্রভৃতি গীতের অন্তর্ভুক্ত করে আলোচনা করা হতো।
প্রখ্যাত ফোকলোর গবেষক ও পণ্ডিত আশুতোষ ভট্টাচার্য মেয়েলি গীতকে ব্যবহারিক (Functional) ও (Calendric) লোকসংগীতের পর্যায়ভুক্ত করে আলোচনা করেছেন। কেননা, অধিকাংশ মেয়েলি গীতই পারিবারিক জীবনে ব্যবহারিক প্রয়োজনে অথবা বৃহত্তর সমাজ জীবনের উৎসব অনুষ্ঠানকে উপলক্ষ করে গীত হয়। যদিও তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ‘এক শোকসংগীত ব্যতীত ব্যবহারিক সংগীত সর্বত্রই মেয়েলি সংগীত’। আবার আনুষ্ঠানিক সংগীত বা বারোমাসী পার্বণ সংগীতও প্রধানত নারীরাই গেয়ে থাকে। আশুতোষ ভট্টাচার্য স্বতন্ত্রভাবে মেয়েলি গীতের আলোচনা করেন নি এবং আনুষ্ঠানিকতার বাইরের মেয়েলি গানগুলোর দিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দেন নি।

আরেকজন ফোকলোর সংগ্রাহক, গবেষক মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী বিষয় ও উপস্থাপনার ধরন অনুযায়ী মেয়েলি গীতকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। ১. অন্তর্মুখী: যা শুধু নারী আচার অনুষ্ঠানেই গাওয়া হয়ে থাকে এবং যা একান্তভাবে অন্তঃপুরচারিণী ও আঞ্চলিক নারী সমাজেই সীমাবদ্ধ। অন্তর্মুখী গানের সুর নিন্ম ও চাপা। যেমন: বিয়ের গীত। ২. বহির্মুখী: এই প্রকারের গানগুলো আবার চার রকমের, (ক) শিকারমূলক, (খ) কৃষিমূলক, (গ) যুদ্ধোন্মদনা বা বীরত্বমূলক, (ঘ) শোকাত্মক। বহির্মুখী গানগুলো বহির্জগতের প্রভাবান্বিত, সুর অপেক্ষাকৃত উচ্চ ও উদাত্ত।

অধ্যাপক মুহাম্মদ আবদুল জলিল মেয়েলি গীতকে প্রধানত তিনটি ধারায় বিভক্ত করেছেন। যেমন: (ক) ব্যবহারিক বা পারিবারিক: অনুষ্ঠানের দিক থেকে এই ব্যবহারিক সংগীতগুলোকে তিনি আবার তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন, ১. গর্ভবতী রমণীকেন্দ্রিক, ২. নবজাতক বা শিশুকেন্দ্রিক ও ৩. বিবাহকেন্দ্রিক। (খ) প্রেমসংগীত, (গ) কর্মসংগীত। এছাড়াও প্রকৃতি বিষয়ক, মানত বিষয়ক, তন্ত্রমন্ত্র বিষয়ক, দৈনন্দিন জীবন বিষয়ক এবং শোকসংগীত ও কাহিনিমূলক সংগীত ধারায়ও মেয়েলি গীতকে বিভক্ত করা যেতে পারে বলে তিনি মত প্রকাশ করেছেন।
গবেষক আতোয়ার রহমান তার প্রবন্ধে চারিত্রের দিকে লক্ষ্য রেখে মেয়েলি গীতকে ছয় ভাগে ভাগ করেছেন।

১. সংস্কারমূলক (গর্ভাধান, সাধভক্ষণ)
২. বিবাহ বিষয়ক
৩. নাইওর ও জামাই আগমন বিষয়ক
৪. পূর্বরাগ বিষয়ক
৫. বধূজীবনের সুখ ও দুঃখ বিষয়ক এবং
৬. অন্যান্য যেমন: পূজা পার্বণ, মেয়েলি ব্রত ও কিছুসংখ্যক ধর্মীয় অনুষ্ঠানের গান।

খগেশ কিরণ তালুকদার ‘বাংলাদেশের মেয়েলি গীত’ প্রবন্ধে খুবই সরল দুটি বিভক্তি টেনেছেন। তার মতে মেয়েলি গীত প্রধানত দুটো পর্যায়ে বিভক্ত। বিবাহাদি সামাজিক অনুষ্ঠানের গীত এবং ব্রতাদি অনুষ্ঠানের গীত।
সামীয়ূল ইসলাম প্রণীত ‘উত্তর বাংলার লোকসাহিত্য’ গ্রন্থেও মেয়েলি বিয়ের গীতের বিভিন্ন পর্যায়ের বিষয়ভিত্তিক গানের একটি লম্বা ফিরিস্তি দেয়া আছে।
উপরোল্লিখিত গবেষক ও সংগ্রাহকেরা মেয়েলি গীতের যে শ্রেণীকরণ করেছেন, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিষয়নির্ভর। অবশ্য বিষয় অনুসরণ না করে মেয়েলি গীতের প্রকারভেদ নির্ণয় খানিকটা দুঃসাধ্যও বটে। যাই হোক, আলোচিত মতামতের ভিত্তিতেই আরো স্পষ্ট ও সংক্ষিপ্তভাবে মেয়েলি গীতকে মোটামুটিভাবে দুই ভাগে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে। যথা:

১.  আনুষ্ঠানিক বা উপলক্ষ নির্ভর গীত
২.  অনানুষ্ঠানিক বা অনুভূতি নির্ভর গীত

প্রথমটিতে বিয়ের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানের প্রত্যেকটি বিশিষ্ট স্তরের বিশিষ্ট সংগীত অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। যেমন: ঘটক আগমন, গায়ে হলুদ, কনে সাজানো থেকে শুরু করে কনে বিদায়, বাসর শয্যা ও বধূবরণ পর্যন্ত সমস্ত গান। এছাড়াও পূজা পার্বণ, মেয়েলি ব্রত, অন্নপ্রশান, গর্ভবতী নারীর সাধভক্ষণ ও বিভিন্ন প্রকার বৃহত্তর সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব অনুষ্ঠান এবং বিশেষ কোনো উপলক্ষকে কেন্দ্র করে যে সমস্ত গীত নারী কণ্ঠে পরিবেশিত ও প্রচলিত, সেগুলোও আনুষ্ঠানিক বা উপলক্ষ নির্ভর গীতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। উৎসব-অনুষ্ঠান ছাড়া এসব গান পরিবেশনের কোনো সুযোগ নেই বললেই চলে। সাধারণত অনেকে একসঙ্গে বসে দলবদ্ধভাবে এই ধরনের গান পরিবেশন করে থাকে। মেয়েলি গানের মধ্যে এই আনুষ্ঠানিক বা উপলক্ষনির্ভর গানগুলোর গুরুত্ব আর প্রচলনই সর্বাধিক এবং এদের সংখ্যাও অন্য শ্রেণির মেয়েলি গানের চেয়ে বেশি।

দ্বিতীয়টির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে অনুষ্ঠানের বাইরে গাওয়া গানগুলো। উদাহরণ হিসেবে দাম্পত্য প্রেম, স্বামী গৃহে বধূর নির্যাতন, স্বামীর বিরহ, পরকীয়া প্রেম, স্বামীর বহুবিবাহ ইত্যাদি অনুভূতি প্রধান গান এবং শোকের গান, শ্রমজীবী নারীর গান, যৌবনবতী স্ত্রীর নিঃসঙ্গতার গান ও কাহিনিমূলক গানের কথা উল্লেখ করা যায়। এই ধরনের গানগুলো সাধারণত এককভাবে গাওয়া যায়। যদিও অনানুষ্ঠানিক বা অনুভূতি নির্ভর গান খুব বেশি খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয় না, তথাপি নারীর মর্মসুখ বা দুঃখের অনুভূতি এসব গানেই বেশি মূর্ত হয়ে উঠে।

“কুক্ষণে জল ভরতে আইলাম বিরহিনীর দেশে।।
কেউর কাঙ্খে লুটা গো ঘটি, কেউর কাঙ্খে কলসি
রাধিকা সুন্দরীর কাঙ্খে হীরার মাঞ্জা কলসি
কেউর পিন্ধন লালো গো লীলো, কেউর পিন্ধন শাড়ি
রাধিকা সুন্দরীর পিন্ধনে গো কিষ্ট লীলাম্বরী ...”

                            [ময়মনসিংহের বিয়ের গীত]

মেয়েলি গীত সাধারণত একসঙ্গে অনেকে মিলে গোল হয়ে বসে গায়। এই উচ্চকণ্ঠ সমস্বরে গান গাওয়া অতি প্রাচীন ও বহুল প্রচলিত সামাজিক প্রথা। কীর্তন, দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার টুসু ও ভাদু এবং পূর্ববঙ্গে প্রচলিত মেয়েলি গীত সম্মেলক গানের পরিচিত দৃষ্টান্ত।
কোনো গান যখন অনেকে মিলে একসঙ্গে গায়, তখন স্বাভাবিক ভাবেই সকলের সুর ও তালজ্ঞান সব সময় সমান থাকে না, কারো গলা একেবারে গুণহীন, কেউ আবার প্রাণপণে গলা চড়াতে থাকেন। ফলে প্রত্যেকের সুর ও তাল এক খাতে প্রবাহিত হয় না। কিন্তু অনেকে মিলে যেখানে গান করছে, সেখানে দু’-চারজনের স্বর ও সুর বিচ্যুতি নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। সম্মেলক আচরণটাই বড় হয়ে ওঠে, সবার ভূমিকাই সমান হয়ে দাঁড়ায়। এ যেন গ্রামীণ নারীর ক্রিয়া-কর্মে ও অনুষ্ঠানে সবাই মিলে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়ার অন্যতম আনুষ্ঠানিক রূপ। এই সমষ্টিগত সামাজিকতা আবার প্রভাবিত করে পরবর্তী প্রজন্মের কিশোরী ও বালিকাদের।

মেয়েলি গানের গীতভঙ্গিমা একটানা। কোনো আয়াসসাধ্য অলঙ্কার  বা স্বরভঙ্গি নেই। সুরকলাতেও নেই তেমন কোনো বৈচিত্র। একই সুরকলার ও একই কথার পুনরাবৃত্তি চলতে থাকে। এই পুনরাবৃত্তি গানের শ্রোতা অর্থাৎ গ্রামীণ নারীসমাজের মজ্জায় গানকে প্রোথিত করতে সাহায্য করে। সুর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটানা, সরল ও পুনরাবৃত্তি প্রধান। এছাড়াও আঞ্চলিকতা, অলঙ্কার প্রয়োগের স্বতঃপ্রবৃত্তরীতি, উচ্চারণের রুক্ষতা সুরকে একটি নির্দিষ্ট কিন্তু অমার্জিত কাঠামোতে প্রবাহিত করে। গানের তাল ও ছন্দ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনিয়ন্ত্রিত, তবে মেয়েলি সংগীতে ছন্দ ও গায়কীতে প্রচলিত অনেক লোকসংগীতের সুরের প্রভাব থাকলেও রূপান্তর প্রক্রিয়ায় তা নারীর নিজস্ব ও স্বতন্ত্র সাঙ্গীতিকতায় পরিণত হয়।
এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, গ্রাম্য নারী তার অবস্থানগত কারণেই শিক্ষিত শহুরে লোকের মতো সংগীতের শাস্ত্রসম্মত সুর, কথা ও ভাবের কাব্যিক সৌন্দর্য এবং ভাষার জটিলতা বোঝে না। তার জ্ঞানের পরিধি শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মাপকাঠিতে সীমায়িত ও ত্রুটিপূর্ণ। সুরের আবেগ প্রধান পুনরাবৃত্তি, তাল ও লয়হীনতা, আধুনিক যুগের জটিল বিমিশ্রতায় বেড়ে ওঠা শিক্ষিত কানের কাছে একঘেয়ে ও বিরক্তিকর মনে হতে পারে। কিন্তু মেয়েলি গান আসলে প্রথাবদ্ধ সীমার মধ্যেই আত্মস্ফূরণ ঘটানোর প্রচেষ্টা, তাদের বিশিষ্ট মানস চেতনার পরিচায়ক।
কেউ কেউ অভিযোগ করেন, মেয়েলি গানে বিষয় বৈচিত্র্যের অভাব আছে, জীবনের একটি অনুষ্ঠানের মধুর ও বেদনার রস নিয়েই এতে একমুখীন চর্চা চলে, সমগ্র জীবনের ছবি ফুটে ওঠে না। এই অভিযোগ একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না, কিন্তু মেয়েলি গানগুলোকে আসলে এর সময়, অবস্থান তথা স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা করে বুঝতে হবে। বুঝতে হবে লৌকিক জীবনের বাস্তবতা দিয়ে। তারপর এর সমস্ত অমার্জনা ও ত্রুটি মেনে নিয়েই প্রবেশ করতে হবে মেয়েলি গীতের সরল ও সরস ভুবনে।

তথ্যসূত্র
১.   ড: মুহম্মদ এনামুল হক ও শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী (সম্পা) : ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, জুন ১৯৮৪, পৃ. ৯২১
২.   ড: শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্য (সঙ্কলিত) : ‘বঙ্গীয় লোকসঙ্গীত রত্মাকর’, বাংলার লোকসঙ্গীতের কোষগ্রন্থ, চতুর্থ খ-, এ, মুখার্জী অ্যা- কোং প্রা: লি: কলিকাতা, ১৯৭৭, পৃ. ১৭২০
৩.   ড. শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্য : ‘বাংলার লোকসাহিত্য’, ক্যালকাটা বুক হাউস, কলিকাতা, প্র: সংস্করণ―১৯৫৪, পৃ. ১২৯
৪.   ড: জয়শ্রী ভট্টাচার্য : ‘বাংলা লোকসঙ্গীতে নারী ভাবনা’, অমর্ত্য প্রকাশ, কলকাতা, পৃ. ১
৫.   অধ্যাপক হাসান হাফিজুর রহমান ও আলমগীর জলিল (সম্পা) : ‘উত্তর বঙ্গের মেয়েলি গীত’, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৩৬৯, পৃ. ভূমিকা (খ)
৬.   ড: মুহম্মদ আবদুল জলিল (সম্পা) : ‘বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলের মেয়েলি গীত’, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৪, পৃ. ৪৪
৭.   ‘উত্তর বঙ্গের মেয়েলি গীত’ পূর্বোক্ত, পৃ. ভূমিকা (ঙ)
৮.   ড: শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্য : ‘বাংলার লোকসাহিত্য’, তৃতীয় খণ্ড, ক্যালকাটা বুক হাউস, কলিকাতা, ১৯৬৫, পৃ. ৩৬০
৯.   মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী (সংগৃ: সম্পা:) : ‘বাংলাদেশের লোকসঙ্গীত পরিচিত’, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৭৩, পৃ. ২৮২
১০. ‘বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলের মেয়েলি গীত। পূর্বোক্ত, পৃ. ৫
১১. আতোয়ার রহমান “মেয়েলি গান” ‘পাকিস্তানের লোকগীতি’ পাকিস্তান পাবলিকেশন্স, ১৯৬৬, পৃ. ৪৯
১২. খগেশকিরণ তালুকদার, ‘বাংলাদেশের মেয়েলি গীত’ বাংলা একাডেমী, বৈশাখী লোক উৎসব প্রবন্ধ ১৪০০ স্বরোচিষ সরকার (সম্পা), বাংলা একাডেমী, ১৯৯৩, পৃ. ১০৯
১৩. সামীয়ূল ইসলাম ‘উত্তর বাংলার লোকসাহিত্য’ ঢাকা, ১৯৭৩, পৃ. ১৯২

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২১ জুন ২০১৯/তারা

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       

Walton AC
Marcel Fridge