ঢাকা, বুধবার, ৭ কার্তিক ১৪২৬, ২৩ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:
শিক্ষক দিবস

উত্তম গুরু তখনই যখন শিষ্যরা তাকে ছেড়ে চলতে পারে

আঁখি সিদ্দিকা : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১০-০৫ ৪:৫১:২৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১০-০৮ ৩:১০:১৮ পিএম

‘বাগেরহাট কলেজে আমার একজন নীরব পথপ্রদর্শক ছিলেন তিনি। মূল ভবনটার সামনের দেয়াল ঘেঁষে সুদৃশ্য পামগাছের সারি ছিল। এর আঙিনার দরজা দিয়ে ঢুকলেই সিমেন্টের বেদির ওপর আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের ছড়ি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ভাস্কর্যটা চোখের সামনে দেখা যায়। বিকেলের দিকে যখন কলেজ নির্জন হয়ে আসত— পামগাছ, রেস্তোরাঁ, পুকুর, রাস্তা সবকিছু নিয়ে ক্যাম্পাসটাকে একটা ছোট্ট সুন্দর রূপকথার দেশের মতো মনে হতো, তখন নিঃশব্দে আমি প্রফুল্লচন্দ্রের সেই ভাস্কর্যের সামনে গিয়ে দাঁড়াতাম। তারপর যিনি একদিন ছিলেন আজ নেই সেই মানুষটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে তাঁর ভেতর থেকে জীবনের দুর্লভ শিক্ষা ও শ্রেয় বোধকে নিজের ভেতর টেনে নিতে চাইতাম। আমি লক্ষ্য করতাম বিকেলের সেই স্তব্ধ প্রাকৃতিক পরিবেশের ভেতর আমার হৃদয় একটা দৃঢ় গভীর আত্মবিশ্বাসে সুস্থির হয়ে উঠেছে।’

প্রিয় শিক্ষক, চির ভাস্কর, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে কথাগুলো বলেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি সবার সরাসরি শিক্ষক না হয়েও সবারই ‘স্যার’। কিন্তু স্যারের প্রিয় শিক্ষক কে? জানতে চাইতেই অবয়বে মূর্ত হলো আনন্দ। ঠোঁটে খেলে গেল ভুবন ভোলানো সেই সুপরিচিত হাসি। কিছুক্ষণ পরেই স্যার যেন চলে গেলেন নিজস্ব স্মৃতির বলয়ে। যেনো প্রিয় শিক্ষকদের কথা বলছেন না, বলছেন এক সোনালী সময়ের কথা।

‘আমার একদম ছেলেবেলায় বাবার সঙ্গে আমাদের তেমন কোনো যোগাযোগ হয়নি। আমি তখন মায়ের হাতে বড় হচ্ছি। আমার বয়স যখন সাড়ে পাঁচ বছর, তখন মা মারা গেলেন। সুতরাং একদম ছেলেবেলায় মায়ের বেত এবং একজন শিক্ষক শরদিন্দুবাবুর হাতেই আমার শিক্ষাজীবন শুরু। শরদিন্দুবাবু আমার শৈশবের শিক্ষক। তাঁর খালি পা। অনেক দূর থেকে আসতেন। পা দুখানা ধুলায় ধূসর হয়ে থাকত। আমাকে তিনি ভীষণ আদর করতেন। পকেটে পেয়ারা নিয়ে আসতেন। কারণ আমাদের চারপাশে প্রচুর আমগাছ ছিল। ফলে আমের ব্যাপারে আমাদের আগ্রহ ছিল না। অসাধারণ মানুষ ছিলেন আমার শৈশবের শিক্ষক শরদিন্দু বাবু। বড় হয়ে তাঁকে অনেক খুঁজেছি, পাইনি। সেই শরদিন্দু বাবুর কাছ থেকে শৈশবেই শিখেছিলাম, বইপড়া একটা বড় আনন্দের ব্যাপার, এটা তাত্ত্বিক এবং কল্পনার বিষয়। আমার মা খুব কঠোর ছিলেন, অসুস্থও ছিলেন, যে জন্য তাঁর মেজাজ খিটখিটে ছিল। তিনি মারা যান আমাদের অল্প বয়সেই। তাঁর সব সময়ই ভেতরে একটা আতঙ্ক কাজ করত- আমরা বুঝি নষ্ট হয়ে যাচ্ছি। তাঁর অবর্তমানে হয়তো আমরা শেষ হয়ে যাব। সে জন্য আমাদের তাঁর অনুশাসনে রাখতেন সব সময়। অসুস্থতার সময়ও তিনি আমাদের সঙ্গে কঠোর ব্যবহার করতেন। একেবারে ছেলেবেলার কথা। আমার মধ্যে যা কিছু ভালো, তার বড় একটা অংশ এসেছে শিক্ষকদের কাছ থেকে। এরপর আমি জামালপুর চলে গেলাম। সেখান থেকে পাবনা। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে বাবা অধ্যক্ষ হয়ে গেলেন। আমি তখন ভর্তি হলাম পাবনার রাধানগর মজুমদার একাডেমিতে। ওই স্কুলে যেসব শিক্ষককে আমি পেলাম, তাতে আমার মনে হয়, আমার জীবন জ্বলে উঠল। আমাদের এক স্যার ছিলেন- নাম পতিরাম বাবু। তখন পতিরাম শব্দটির অর্থ আমি জানতাম না। বড় হয়ে জেনেছি- জ্ঞানী। কিন্তু তিনি একটি অকাট মূর্খ ছিলেন। কিন্তু এখানে তাঁর শিক্ষক হওয়ার পেছনে কারণ ছিল। সব সময়ই জমিদার পরিবারের একজন এই স্কুলের শিক্ষক থাকতেন। তবে যারা খুব চৌকস হতো বা ঝকঝকে হতো, তারা কেউ শিক্ষকতায় আসত না। পতিরাম বাবু এমন কিছু পড়াতেনও না। কিন্তু হঠাৎ তিনি একদিন জ্বলে উঠলেন। স্বামী বিবেকানন্দের গল্প বলতে শুরু করলেন। কী করে স্বামী বিবেকানন্দ অনেক কষ্ট, ত্যাগের মধ্য দিয়ে আমেরিকা গেলেন কিংবা কীভাবে বিশ্ব ধর্ম সম্মেলনে বক্তৃতা দিলেন, কীভাবে মানুষকে জাগিয়ে তুললেন ইত্যাদি। মানে সে যে কী অনুপ্রেরণাকারী বক্তৃতা! শুনে আমার মনে হলো, আমি স্বামী বিবেকানন্দ হব। হলে এটাই হতে হবে। আমার ভেতরে তিনি স্বপ্ন জাগিয়ে তুললেন। আমার মনে হয়, শিক্ষকদের বড় একটা ভূমিকা রয়েছে ছাত্রদের জীবন গড়ার ব্যাপারে। এ ছাড়া আরো ভালো ভালো শিক্ষক ছিলেন। এরপর ভর্তি হলাম পাবনা জিলা স্কুলে। সেখানেও অসাধারণ সব শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ হলো। কলেজে যখন এলাম, তখন যে কত ভালো ভালো শিক্ষক পেলাম! বাগেরহাট প্রফুল্লচন্দ্র কলেজ ছিল আমার কলেজ। প্রফুল্লচন্দ্রের নিজের হাতে বানানো কলেজ এটি। তিনি বেছে বেছে সেরা শিক্ষকদের ওই কলেজে নিয়ে এসেছিলেন। ১৯৫৫ সাল, আমি যখন কলেজে ভর্তি হলাম, তখনো সেই গুণী শিক্ষকরা ছিলেন। ১৯৫৬ সালে তাঁরা চলে গেলেন। কী অসাধারণ শিক্ষক তাঁরা ছিলেন বলে শেষ করার মতো নয়। কী প্রেরণা, কী স্বপ্ন, কী আলো, কী ঝলমলে পৃথিবী তাঁরা দেখাতে জানতেন, সেটা পুরোপুরি অন্য রকম।’

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জীবনে শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষকদের প্রভাব বিস্তর। শিক্ষকদের কাছ থেকেই তিনি জীবন চিনেছেন, জগত চিনেছেন। তাঁর স্কুল রাধানগর মজুমদার একাডেমির আর একজন শিক্ষক অমর পালকে তিনি স্মরণ করেছেন এভাবে: ‘স্যার স্নেহ আর প্রীতি ছাড়া ছাত্রদের কিছুই দিতে জানতেন না। আমাদের সব দোষ ও লজ্জা দুই হাতের আদরে ঢেকে অপর্যাপ্ত প্রীতিতে কেবলই আপ্লুত করে যেতেন তিনি। সেই স্নেহের ধারা আমার শৈশব থেকে যৌবন পেরিয়ে আজও আমাকে যেন স্নিগ্ধ করে চলেছে।’ নবম শ্রেণীতে ওঠার পর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ রাধানগর মজুমদার একাডেমি ছেড়ে পাবনা জিলা স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে যে সব শিক্ষক তাঁর কিশোর হৃদয়ে স্বপ্ন আর ভালোবাসার পৃথিবী জাগিয়ে তুলেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম শিক্ষক মওলানা কসিমউদ্দিন আহমেদ। ক্লাশঘর থেকে স্কাউটিং, খেলার মাঠ থেকে বিতর্কসভা— সব জায়গাতেই স্যার ছিলেন ছাত্রদের নেতা ও সহযাত্রী। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হন।

শিক্ষকতাকে কেনো ভালো লাগলো? জানতে চাইলে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ অকপটে বললেন, ‘শিক্ষক হিসাবে আব্বা ছিলেন খ্যাতিমান। ১৯৫০ সালে আমি যখন পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র, আব্বা তখন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের অধ্যক্ষ। কলেজের ছাত্রছাত্রীরা তাঁর কথা উঠলে এমন সশ্রদ্ধ উদ্বেলতায় উপচে পড়ত মনে হত কোনো মানুষ নয়, কোনো দেবতা নিয়ে তারা কথা বলছে। একজন ভালো শিক্ষক ছাত্রদের হৃদয়ে শ্রদ্ধা ভালোবাসার যে কী দুর্লভ বেদিতে অধিষ্ঠিত থাকেন আব্বাকে দেখে টের পেতাম। একজন মানুষের এর চেয়ে বড় আর কী চাওয়ার থাকতে পারে? তখন থেকেই আমি ঠিক করেছিলাম এই পৃথিবীতে যদি কিছু হতেই হয়, তবে তা হবে শিক্ষক হওয়া, আব্বার মত শিক্ষক। ধন নয়, মান নয়, খ্যাতি, বিত্ত কিছুই নয়— একজন নাম-পরিচয়হীন শিক্ষক হিসাবে ছাত্রদের মাঝখানে জীবন কাটিয়ে দেবার এই সিদ্ধান্তটি যেসব কারণে ছেলেবেলাতেই নিতে পেরেছিলাম, আব্বার ব্যক্তিত্বের প্রভাবটাই তার মধ্যে সবচেয়ে বড়। প্রায় সব পিতাই চায় তাঁর স্বপ্নের মশালটা নিজের সন্তানের হাতে তুলে দিয়ে যেতে কিন্তু সুযোগ হয় অল্প মানুষেরই। সবার বাবার মত আমার বাবাও নিশ্চয় চাইতেন তাঁর সন্তানদের মধ্যে এক বা দুজন তাঁর সাহিত্য ও শিক্ষকতার আদর্শকে উত্তরাধিকার সূত্রে বহন করুক। শিক্ষক হবার কোনো প্ররোচনা তিনি আমাকে সরাসরি দেননি। আমার ধারণা শিক্ষকতা আমার রক্তে মিশে ছিল। তাই আমি এভাবে অমোঘ বিধিলিপি মেনে নেয়ার মতো ঐ রাস্তায় চলে গিয়েছিলাম।’

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তাঁর শিক্ষাজীবন এবং শিক্ষকতা প্রসঙ্গে লিখেছেন ‘নিষ্ফলা মাঠের কৃষক’ গ্রন্থে। বইটির ভূমিকায় তিনি লিখেছেন ‘একদিন, তরুণ বয়সে, স্বপ্নতাড়িতের মত এসে যোগ দিয়েছলাম শিক্ষকতায়।’ তিনি তাঁর জীবনে শিক্ষকদের স্মরণ করেন এভাবে: ‘অসাধারণ সেইসব শিক্ষক সম্ভবত এখন রূপকথার গল্পের নায়ক হয়ে গেছেন। তাঁদেরকে মনে হয় অতলের গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া কিংবদন্তী। আহ! শুধু শিক্ষক নন, যেন একই সঙ্গে স্নেহশীল পিতা ও মমতাময়ী মাতার গুণে গড়া বন্ধুও। যাঁরা নিজেরা প্রদীপের সলতে হয়ে আগুন জ্বেলে ছাত্রের জীবনে আলো দান করেন। ধীরে ধীরে যাঁরা সৃষ্টি করেছেন একজন নিষ্ফলা মাঠের কৃষক।’

তিনি সম্ভবত বাংলাদেশের একমাত্র লেখক যিনি বাংলাদেশের শিক্ষাজগতের গুণগত মানের অধঃপতনের বিষয়টি বইয়ের পাতায় আদ্যোপান্ত লিখেছেন। কীভাবে ধাপে ধাপে একটা দেশ ও জাতির শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বসে পড়ে তা একেবারে চলচ্চিত্রের মত ধরা পড়বে পাঠকের চোখে তাঁর লেখায়। শিক্ষাঙ্গণে ক্যানসারের মত সন্ত্রাসের বিস্তার দেখেছেন নিজের চোখে। চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না সম্ভবত। কারণ দেশটাই যে রাহুর গ্রাসে! আসলে স্বাধীনতা-পূর্ব ও স্বাধীনতা-উত্তর ত্রিশ বছরের সামরিক শাসনই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে আমাদের। সব মিলিয়ে হতাশাজনক অবস্থা এবং পতনের চূড়ান্ত।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন ১৯৬১ সালে, মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজে খণ্ডকালীন প্রভাষক হিসেবে। তখন তাঁর বয়স মাত্র বাইশ বছর। মজার ব্যাপার, একই সময়ে মুন্সীগঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন তাঁর বাবা আযীমউদ্দিন। ছেলে একই কলেজে যোগ দিলে তাঁর জন্য প্রশাসনিক অস্বস্তির কারণ হবে মনে করে তিনি কলেজের গভর্নিং বোর্ডের সভায় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে অন্তর্ভূক্তি করার ব্যাপারে আপত্তি প্রকাশ করেন। কিন্তু পরীক্ষার ফল ভালো থাকায় তাঁর আপত্তি টেকেনি। গভর্নিং বডির সচিব হিসাবে বাবাকেই ছেলের নিয়োগপত্র পাঠাতে হয়েছিল। সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্তটি জমে উঠেছিল কলেজে তাঁর যোগদানের প্রথম দিন। সেই দিনের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, ‘প্রথম ক্লাশে ছাত্রদের সঙ্গে নতুন শিক্ষকদের পরিচয় করিয়ে দেবার দায়িত্ব অধ্যক্ষই পালন করতেন- এটাই ছিল নিয়ম। আমার ব্যাপারেও আব্বাকে তাই করতে হলো। রুটিন মাফিক আব্বার পেছনে পেছনে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীর একটি শাখায় গিয়ে হাজির হলাম। ছাত্রদের উদ্দেশ্যে তাঁর সংক্ষিপ্ত ইংরেজি ভাষণে আব্বা আমার একটা ছোটখাট পরিচয় তুলে ধরে সব শেষে বললেন, যেহেতু ওর শরীরে শিক্ষকের রক্ত আছে আমার মনে হয় ও ভালো শিক্ষকই হবে। আমার ধারণা ছিল, আমার নিয়োগের দ্বন্দ্বে পরাজয়ের ফলে উনি ভেতরে ভেতরে কিছুটা তেঁতে আছেন। হয়ত তাঁর সেদিনের বক্তব্যে সেই ক্রোধের কিছু প্রতিফলন ঘটবে। কিন্তু ঘটনা হলো ঠিক উল্টো। বক্তৃতার সময় আব্বার গলা কিছুটা ধরেই এল। মনে হল তাঁর উত্তরসূরির আসনে নিজ হাতে আমাকে বসিয়ে যেতে পেরে তিনি যেন ভেতরে ভেতরে গর্বিত এবং পরিতৃপ্ত।’

পরবর্তীকালে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সিলেট মহিলা কলেজে শিক্ষকতা করেন। ১৯৬২ সালের পহেলা এপ্রিল রাজশাহী কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে সরকারি চাকুরিজীবন শুরু করেন। এরপর ঢাকায় ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজে (বর্তমানে ঢাকা বিজ্ঞান কলেজ) যোগ দেন। সেখান থেকে ঢাকা কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ জালালউদ্দিন আহমেদের আমন্ত্রণে চলে আসেন ঢাকা কলেজে। এখানেই তিনি তাঁর শিক্ষকতা জীবনের স্বর্ণযুগ অতিবাহিত করেন। দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মুখে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে তাঁকে এগিয়ে যেতে হয়েছে। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রায় সবগুলো দিক সমন্বিত হয়েছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সংগঠক সত্তায়। তিনি অনুভব করেছেন- সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমাদের প্রয়োজন অসংখ্য উচ্চায়ত মানুষ। ‘আলোকিত মানুষ চাই’ এই স্লোগানে তিনি সারা দেশে একটি আন্দোলনের অগ্রযাত্রী হলেন। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এই চিন্তাটি প্রথম আমার মনে জাগে ১৯৬৮ সালের দিকে। তখনই কিছু মেধাবী এবং প্রতিভাবান তরুণকে নিয়ে আমি একটি ঋদ্ধিধর্মী চক্র গড়ে তোলার চেষ্টা করি। কিন্তু স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় তাতে ছেদ পড়ে। তারপর স্বাধীনতা আসে। আমাদের সামনে এক বিপুল সম্ভাবনার জগৎ উন্মোচিত হয়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই এক সার্বিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে সেই স্বপ্ন ভেঙে খানখান হয়ে যেতে শুরু করে। কাজেই আবার নতুন করে আমাদের এ বিষয়ে চিন্তা শুরু করতে হয়। জাতীয় দুঃখের অর্থপূর্ণ অবসান এবং সত্যিকার জাতীয় উন্নতি ক্ষুদ্র মানুষ দিয়ে সম্ভব নয়, এজন্য চাই বড় মানুষ, আলোকিত মানুষ। এই ভাবনা থেকে আবার ১৯৭৮ সালে আমরা সমবেত হলাম সেই পরিপূর্ণ মানুষ গড়ে তোলার চেষ্টায়— যারা একদিন তাদের যোগ্যতা এবং শক্তি দিয়ে, প্রয়াস এবং আত্মদান দিয়ে এই জাতির নিয়তি পরিবর্তন করতে চেষ্টা করবে।’

আজ সেই চেষ্টা সফল হয়েছে। আলোহীন, বিচ্ছুরণহীন ও অকর্ষিত শিক্ষা ব্যবস্থার অন্ধকারে সুপ্ত ও সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করতে গিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন সবার প্রিয় ‘স্যার’। মহাভারত থেকে তিনি প্রায়ই উচ্চারণ করেন ‘উত্তম গুরু তখনই যখন শিষ্যরা তাকে ছেড়ে চলতে পারে’। তিনি চলেছেন প্রিয় শিষ্যদের আর্দশ তৈরি করে দেয়া কল্পনারাজ্যে। সাহস করেছেন স্বপ্নের সমান মানুষ গড়তে। প্রবলভাবে রঙের মানুষ, প্রিয় মানুষ, প্রিয় শিক্ষককে শিক্ষক দিবসে জানাই প্রণতি।

 

শিক্ষক দিবসের আরো লেখা পড়ুন:
শুরু হোক অনুসন্ধান: যতীন সরকার
ফ্রেন্ড ফিলোসফার গাইড- এমন শিক্ষক পাওয়া কঠিন



ঢাকা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন