ঢাকা, রবিবার, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

পূজার গল্প || বিসর্জন

বাঙ্কু বিহারি লাহিড়ী : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১০-০৭ ১২:১৩:২৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-০৮ ৪:১৮:৩০ পিএম

আজ দ্বিতীয়া। গত তিন, চার মাসের ব্যস্ততা আজ আর নেই। মতিন, মিনু, ছোটু, শিউলির মত তাদের জনাদশেক বাচ্চাদেরও মন ভালো নেই। সেই দশদিন থেকে তাদের ঝুপড়ির সামনের পার্কে কত আলোর রোশনাই, লাখো লোকের আনাগোনা, মাইকে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গান। তাদের ঝুপড়িগুলো পার্কের যে পাশটা বস্তির ধার ঘেঁষা, সেই পাড়েই পার্কের লোহার বেড়ার সাথে দড়ি দিয়ে বাঁধা ছেড়া পলিথিন দিয়ে ঘেরা তাদের ঘর, ঘর না বলে আস্তানা বলাই ভালো। পূজার মাসখানেক আগে দলবল নিয়ে পাড়ার ভোমলা কাকু এক রাতে তাদের ঝুপড়ির সামনে এসে বলে যায়, আজ রাতের মধ্যে তাদের এই আস্তানা সরিয়ে নিতে হবে।

সবার বাবা, মা, মানে বড়রা হাত জোড় করে অনুরোধ করে কোথায় সরিয়ে নেবে তাদের এই ছোট্ট আস্তানা; তার ওপর বর্ষাকাল- জল পড়ছে, এমনিতেই সব ভিজে, এখন সরিয়ে কোথায় নিয়ে যাবে? কিন্তু তাদের অনুরোধে চিড়ে ভেজে না। ভোমলা কাকু হুকুম দিয়ে গেছে, সরিয়ে না নিলে কর্পোরেশনের গাড়ি এসে ভেঙ্গে দেবে। এই ভোমলা কাকুকে সবাই খুব মান্য করে। ভোমলা কাকুর জন্যই তাদের রেশন কার্ড হয়েছে। মাসে চাল ডাল তেল সাবান পাওয়া যায়। তারপর ভোটের সময়, বিশ, পঞ্চাশ, একশ টাকা ও কখনো এক আধ বোতল মদও পাওয়া যায়। তাই ভোমলা কাকুর হুকুম সবাই মেনে নেয়। ভোমলা কাকুর মনে বোধ হয় কিছুটা দয়া হয়, বলে এক কাজ কর তোরা- দূরে আঙুল তুলে বস্তির একদিকে দেখিয়ে বলে, ঐ যে নতুন বাড়িটা হচ্ছে, তার ছাদে গিয়ে থাক, আমি বলে দেব। পূজোর এই কটা দিন, একবার ঝামেলা মিটে গেলে আবার যে যার মত চলে আসিস।

ভোমলার কথা শেষ হতেই সবাই তাড়াতাড়ি নিজেদের সম্বল যা আছে গোটাতে শুরু করে। সবাই মিলে একসাথে নির্মিয়মাণ ঐ ফ্ল্যাট বাড়ির চার তলার দখল নেয়। ভোমলা এসে দাঁড়িয়ে থেকে সবার থাকার বন্দোবস্ত করে যায়। বলে যায়, এই চার তলা ছাড়া অন্য কোথাও কেউ যেন না যায়।

জিনিসপত্র বলতে, কিছু ছেড়া তোষক বা কাঁথা, একটা হাড়ি, একটা কড়াই, ভাঙ্গা বালতি, আর পরনের ছেড়া কিছু জামা কাপড়। মতিনের মার অবশ্য একটা নতুন কাপড় জুটেছে। কদিন আগে কি এক পরব গেছে, মতিনের বাবা মা দুজনেই মসজিদের সামনে বসেছিল, সেখানেই কেউ তাদের দিয়ে গেছে। কেউই আর নতুন কাপড় পরেনি। কারণ ফুটপাথের হোটেলে যেখানে তারা বাসন ধুয়ে দেয়, টেবিল মোছে, সেখানে এই কাপড় বড়ই বেমানান। ভেবে রেখেছে পরে কোনো একদিন পরবে। শিউলির মা, আর মিনুর মা দুজনে পাশের পাড়ার ফ্ল্যাট বাড়িতে কাজ করে। মাস গেলে নয় নয় করে হাজার বারোশো টাকা রোজগার হয়। তাদের স্বামীরা কেউ ভ্যান চালায়, কেউ রিকশা টানে, আবার কেউ রাস্তায় বুট পালিশ করে। মতিনের বাবা মার ঐ দলে একটু কদর বেশী। কারণ মাঝে মধ্যেই যে হোটেলে কাজ করে সেই হোটেল থেকে বেঁচে যাওয়া মাংস, রুটি প্লাস্টিকে বেঁধে নিয়ে আসে। অনেক সময় থালা ধুতে গিয়ে, বেশীর ভাগটাই রাতের দিকে, যখন বাসের কন্ডাকটর, ড্রাইভাররা খেতে আসে নেশা করে, তারা প্লেটে মাংস, রুটি ফেলে দিয়ে যায়। সেগুলো মতিনের মা প্লাস্টিকে জড়ো করে নিয়ে আসে। মতিন অপেক্ষা করে কখন মা ফেরে। একদিন ছোটুও ছিল মতিনের সাথে। মতিনের মা থালায়, রুটি মাংস মতিনকে দিতে গিয়ে দেখে ছোটুও বসে আছে, তাকেও দেয়। সাবধান করে, দেখ ছোটু তোর মাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে আয় তুই গরুর মাংস খাবি কিনা। ছোটু বিষয়টা বুঝতে না পেরে এক ছুট্টে তার মাকে গিয়ে বলে, রবিনা মাসি রুটি মাংস খেতে দিচ্ছে খাব? মাসি বলল তোমায় জিজ্ঞেস করতে গরুর মাংস খাব কিনা?

ছোটুর মা মালতি বলে- পেটে খিদে থাকলে কি হবে আর ধম্ম দিয়ে, খিদের ঘোরে, গরু, শুঁয়োর, বাদর, ইঁদুর সব খাওয়া যায়। ছোটু এসে রবিনা মাসিকে তার মার কথাগুলো বলে।

আজ এই ছাদের তলায় যে দশটা পরিবার একসাথে, ঘরের সীমানা ছাড়া, মাথা গুঁজেছে, তাদের আর বিচার করার সামর্থ্য কোথায়- কে হিন্দু, কে মুসলমান, কে মুচি, কে ডোম? সবারই এক পরিচয়- তারা পার্কের আস্তানা থেকে তুলে দেওয়া কিছু পরিবার; আশ্রয় পেয়েছে ভোমলাদার কল্যাণে। উৎসব শেষ হলেই আবার ফিরে যাবে নিজ আস্তানায়। মতিন, ছোটু, শিউলিদের বাবারা সবাই নেশা করে ফিরে টান টান হয়ে শুয়ে পড়ে। এক এক দিন রাতে বাচ্চাগুলোর ঘুম ভেঙ্গে যায় তাদের পাশের বন্ধুদের বাবা মার ঝগড়ায়। কখনও মতিনের বাবা মতিনের মাকে বলছে, কিরে মাগি আজ আর তোর ভাতার রুটি মাংস দিলে না? না কি তোর গতর আজ খায়নি সে হারামজাদা!

রবিনের মা ফোঁস করে ওঠে। এই গতর খাইয়েই তো তোদের মুখে রুটি মাংস তুলে দিই। নিজে যা রোজগার করিস সব তো ঐ সন্ধ্যে থেকে মদে ওড়াস- লজ্জা করে না তোর, আবার আমায় বলছিস। আমার এই গতর না থাকলে তোদের একবেলার খাবারও জুটত না।

মতিনের এসব শুনতে ভাল লাগে না। মতিনের বাবা, রসুলের কথা গুলো শুনতে পায় শিউলির বাবা রতন। সেও ইদানিং রসুলের সাথে নেশা করে ফিরে, শিউলির মা আরতীকে গালমন্দ করে। এত টাকা মাইনে পাস, কোথায় ঢুকিয়ে রাখিস। টাকা চাইলে পাওয়া যায় না। কোন নাঙের জন্য রাখছিস? প্রথম প্রথম আরতী রতন কে জবাব দিত। শিউলি বড় হচ্ছে, তার বিয়ে দিতে হবে। আস্তে আস্তে কিছু টাকা কড়ি জমাতে হবে। সেই মতন যে বাড়িতে কাজ করে সেই বৌদির কথা মত মাসে মাসে একশ টাকা করে বৌদির হাত দিয়েই ব্যাংকে জমা করে। আরতী নিজে কিছু জানে না, বোঝে না তাই বৌদি যা করে দেয় তাই। শিউলির বয়সও হচ্ছে। এখন সে এগারো বছরের। তার শরীরের মেয়েলি অংশগুলো ক্রমশঃ প্রকাশ পাচ্ছে। ছেড়া ফ্রকে, ম্যাক্সিতে সব ঢাকা পড়ে না। শিউলি আজকাল লক্ষ্য করে, রাস্তার কলে স্নানের সময় বস্তির কিছু ছেলেরা এসে কলপাড়ে দাঁড়িয়ে তাকে ইশারায় ডাকে। সে না দেখতে চাইলেও তার নজরে পড়ে। সে একদিন তার মাকে বলে, আমি আর কলপাড়ে নাইতে যাব না। বস্তির ছেলেগুলো এমনভাবে তাকিয়ে থাকে, আমার ভালো লাগে না। আরতী মেয়েকে সান্ত্বনা দেয়। বলে- ও কিছু না। মেয়েদের ছেলেরা দেখবেই। তুই না তাকালেই হলো। এরপর একদিন ভোমলা এলে, আরতী তাকে বলে, দেখ দাদা, শিউলি বড় হচ্ছে আর পাড়ার ছেলেরা ও কলপাড়ে নাইতে গেলে অসভ্যতা করে। তুমি ওদের একটু বলে দিও বাপু।

ভোমলা সব শুনে বলে কৈ ডাক দিকি তোর মেয়েকে, দেখি কে কী বলেছে। ইদানিং শিউলি অন্ধকার না হলে ঝুপড়ি থেকে বেরোয় না। তার কেমন ভয় ভয় করে। আরতীর ডাকে ঝুপড়ি থেকে মুখ বাড়ায়। ভোমলা ডাকে এদিকে আয়, দেখি কে কী বলেছে। শিউলি ভয়ে ভয়ে বেরিয়ে আসে। মাথা নিচু করে দাঁড়ায়। ভোমলা শিউলির আগাপাশতলা নিরীক্ষা করে। সত্যিই তো তার শরীর বেড়েছে। তারই লোভ লাগছে। সে এমনভাবে তাকায় শিউলির শরীরের দিকে যেন চোখ দিয়েই তার শরীরের প্রতিটা কোণা সে লেহন করবে। তার জীব দিয়ে লালা গড়ায়। জীবটা ঠোঁটের এক কোণ দিয়ে বার করে বুলিয়ে নেয়। তার হাত ধরে কাছে টানে, কাছে টানতেই তার ছেঁড়া ম্যাক্সির ফাঁক দিয়ে যৌবন উঁকি মারে যা ভোমলার নজর এড়ায় না। বলে, ভয় নেই। আমি আছি তো! আমি বলে দেব, কাল থেকে কেউ আর তোকে কিছু বলবে না। ভোমলাকে বস্তির সবাই সমীহ করে, ভয় পায়। এখানকার কাউন্সিলার সময়ে অসময়ে ভোমলাকে ডেকে পাঠায়, বস্তিতে এলে ভোমলাকে সাথে নিয়ে ঘোরে। ভোটের সময় ভোমলার হাতে টাকা পয়সাও দেয়। শর্ত একটাই বস্তির ভোটের সবটাই যেন কাউন্সিলারের খাতে পড়ে। এছাড়া ইদানিং বস্তির আশেপাশে কোনো ফ্ল্যাট বাড়ি হলে, সে বালি সাপ্লাইয়ের অর্ডারও পায়। একবছরের মধ্যে সে একটা বাইকও কিনেছে; যদিও পুরোনো। তাই ভোমলার কথায় আরতী আর শিউলি আশ্বস্ত হয়। শিউলির মনে পাড়ার ছেলেদের ভয় দূর হলেও, ভোমলা সম্পর্কে ভয় আরো চেপে বসে। আজকের তার তাকানো শিউলি আন্দাজ করতে পারে। সে মাকে এই বিষয়ে কিছু জানাতে পারে না। সে কানাঘুষা শুনেছে এবং নিজেও প্রত্যক্ষ করেছে ভোমলার সাথে তার মার সম্পর্ক আছে। এই নিয়ে আগে প্রায়ই বাবার সাথে ঝগড়া হতো। এখন মনে হয় বাবা মেনে নিয়েছে। কবছর আগের কথা কি একটা ব্যাপারে মিনুর মার সাথে আরতী ঝগড়া হয়েছিল। মিনুর মা মুখের ওপর বলেই দিল, তুই কি আর অন্যের দোষ ধরবি আরতী, শিউলির বাবা কে, আমি কি আর জানি না। ওর চেহারার কোন অংশ তোর বরের সাথে মেলে। ফ্ল্যাট বাড়ির দত্তবাবুর সাথে তুই কি ফষ্টিনষ্টি করতিস তা কি আর কারুর জানতে বাকি আছে!এখন সতী সাজছিস, তাও যদি ভোমলার সাথে তোর লীলা খেলা না চলত।

শিউলি তখন এই কথাগুলো না বুঝলেও এখন বুঝতে পারে। পূজোর তখনও প্রায় মাসখানেক বাকি, এক দুপুরে ভোমলার বুকের ওপর মাথা রেখে শিউলি আবদার করে, দে না একটা জামা কিনে মেয়েটাকে, বড় হচ্ছে, কতদিন আর ছেড়া জামায় লজ্জা ঢাকবে। ভোমলা বলে পুজোর সময় দেব। পূজোর আগ দিয়ে আরতীর হাতে একটা জামা তুলে দিয়েছিল ভোমলা শিউলির জন্য। এখন দিনের বেলা সেই জামাটা শিউলি পরে থাকে।

পুজোর সময় নতুন আস্তানায় রাত কাটিয়ে পরের দিন সবাই নিজের নিজের কাজে বেরিয়ে পড়ে। মতিন, ছোটু, মিনু, ও বাকিরাও পার্কে এসে ভিড় করে। ট্রাকে করে, বড় বড় বাঁশ, এত এত কত রঙের কাপড়, দড়ি, বড় বড় পিচবোর্ড, রঙিন, কলশি, হাঁড়ি কত কি আসছে। ওদের খুব ভাল লাগে! দুএকবার কাছ গিয়ে দেখার চেষ্টা করেছে, তাড়া খেয়ে পালিয়ে আসতে হয়েছে। তাদের চোখের সামনে পার্কের খালি জায়গাটার একটা দিকে কেমন করে আস্তে আস্তে বিশাল একটা বাড়ি তৈরি হচ্ছে। প্রথম প্রথম তাদের নিজেদের মধ্যে তর্ক লাগত এটা কী হবে? কেউ বলত- জাহাজ, কেউ বলত বাড়ি। তার পর একদিন বিশাল বড় একটা গাড়ি করে দুগগা ঠাকুর নিয়ে হাজির। যারা ছিল তাদের মধ্যে কি উৎসাহ। কিন্তু একি,না আছে চোখ, না মুখ। কেমন ন্যাড়া ন্যাড়া। তারপর একদিন রঙ লাগানো শুরু হল মাটির ওপর। যত দিন যায় একটু একটু করে বদলাতে লাগল মাটির মুখ, শরীর সব কিছু। একদিন সুযোগ বুঝে তারা প্রতিমার পিছন দিকটায় পৌঁছে গেল। গিয়ে তারা অবাক, একি, পিছনটা অমন খালি খালি কেন? পুরো ন্যাংটা। সামনেটা এত সুন্দর আর পিছনটা ন্যাংটা। মতিন বলে ওঠে, দেখ দেখ ঠাকুরটা কিন্ত আমাদের মত ন্যাংটা। বলে নিজেদের মধ্যে সে কি হাসি! আসলে তারা প্রতিমার পিছনের অংশের সাথে নিজেদের অবস্থার তুলনামূলক বিচার করে খুশী হয়। আর ব্যাপারটা অনেকটাই সেই রকম। পুজোর চাকচিক্যের আড়ালে যে উলঙ্গতা আছে তাকে জাঁকজমকের বাহ্যিক আবরণে ঢেকে রাখার ব্যর্থ প্রয়াস। পুজোর কটা দিন, পাড়ায় গজিয়ে ওঠা অস্থায়ী খাবারের দোকান থেকে সন্ধ্যে থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নানান স্বাদের ফেলে দেওয়া আধখাওয়া খাবার সংগ্রহের প্রতিযোগিতা। সব শেষে ছোটু, মিনু, মতিন ও তাদের সব সঙ্গীরা এক জায়গায় জড়ো হয়ে নিজের নিজের সংগ্রহ দেখায়, কে কত বেশী আনতে পেরেছে। সেই সংগৃহীত রসদের আবার ভাগ হত সব পরিবারের মধ্যে। নিজেদের মধ্যে খাবার কুড়ানোর প্রতিযোগীতা। পুজো শুরু হওয়ার আগেই তারা জানতে পারে তাদের পার্কের পুজো নাকি প্রথম হয়েছে। একদিকে পুজোর আভিজাত্যের প্রতিযোগিতা আর একদিকে আস্তাকুঁড় ঘেঁটে খাবার সংগ্রহ করার প্রতিযোগিতা।

আজ দ্বিতীয়া। ঠাকুর ভাসান যাবে। তোড়জোড় চলছে। তাদের খোলা আস্তানার সবাই পার্কে হাজির। শিউলির বাবা রতন অনুপস্থিত। সে সকাল থেকে নেশা করে ঘুমোচ্ছে। কোনো হুঁশ নেই। সকলের সাথে ভোমলাকাকুও ব্যস্ত। মতিন, শিউলিরা দেখে বড় বড় ট্রাক এসেছে। বাজনা বাজছে। ট্রাকের ওপর ধরাধরি করে দুগগা ঠাকুরকে তোলা হচ্ছে। এক এক করে সব ঠাকুর তোলা হলে, আর একটা ট্রাকে, লাইটের ইয়া বড় বড় বোর্ড লাগানো হচ্ছে। পাঁচ ছয়জন ঢাকি সশব্দে  ঢাক বাজাচ্ছে। কিছু ছেলে নাচছে। মতিনরা এক পা, দু পা করে ভিড়ের দিকে এগিয়ে যায়। আজ আর তাদের কেউ আটকায় না। তারাও দুই চারজনের সঙ্গে নাচের তালে কোমর দুলিয়ে তাল মেলায়। আজ তাদের মনের আনন্দ আর ধরে না। শিউলি ভিড়ের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে সব লক্ষ্য করে। ভোমলা কাকুকে দুএকবার এদিক ওদিক যেতে আসতে দেখে। একবার চোখাচোখি হতে হাসে বলেও মনে হয়। ভিড় এগোতে শুরু করে। প্রতিমা নিয়ে ট্রাকগুলোও আস্তে আস্তে চলতে শুরু করে। ধুনচির ধোঁয়া আর গন্ধে চারদিক ম ম করে। শিউলিকে একটি বাচ্চা ছেলে এসে বলে তার বাবা তাকে ডাকছে। ছেলেটিকে আগে কখনও দেখেছে বলে তার মনে হয় না। পুজো উপলক্ষ্যে পার্কে সাজানো বড় আলোগুলো আস্তে আস্তে নিভে যায়।

আজ সব কেমন নিস্তব্ধ। শিউলি ছেলেটির কথার গুরুত্ব না দিয়ে শোভাযাত্রা দেখতে থাকে। মিনিট পাঁচেক পর আবার ছেলেটি এসে শিউলিকে বলে তার বাবা ডাকছে। শিউলি আশেপাশে তার মাকে খোঁজে। আধো অন্ধকার আর ভিড়ে দেখতে পায় না। সে তড়িঘড়ি ফ্ল্যাটের অস্থায়ী আস্তানার দিকে পা বাড়ায়। যেতে যেতে ভাবে, বাবাকে তো সে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে এসেছে। নেশা করে ঘুমোচ্ছিল। কি এমন হলো! ভাবতে ভাবতে সে ফ্ল্যাটের সামনে হাজির হয়। আজ অন্ধকার একটু বেশী মনে হচ্ছে। আসলে এত দিন পার্কের পুজোর লাইটের ছটা এসে পড়ত তাই অন্ধকার কম লাগত। এখন লাইট নিভে যাওয়াতে অন্ধকার বেশী মনে হচ্ছে। সে সাবধানে পা টিপে টিপে সিঁড়ি ভাঙ্গতে শুরু করে। সবে দোতলায় পা দিয়েছে, এমন সময় কেউ পিছন থেকে তার মুখটা চেপে ধরে। আর একজন তার হাত পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলে। শিউলি চিৎকার করতে চাইলেও পারে না। তাকে পাঁজাকোলা করে দোতলার একটা মেঝের ওপর শুইয়ে দেয়। নিচে মাদুর পাতা আছে সে বুঝতে পারে। তার মুখে কাপড় বেঁধে দেয়। তার চিৎকার গোঙানির মতন শোনায়। একটা পায়ের শব্দ শুনতে পায়। নিচ থেকে ওপরে আসছে। অন্ধকারে সে কেবল একটা ছায়া দেখতে পায়। সে ছটফট করতে থাকে। যে লোকটি আসে সে ইশারায় বাকি দুজনকে সরে যেতে বলে। শিউলির হাত বাঁধা দেখে সে তাদের একজনকে চড় মারে। এগিয়ে এসে শিউলির হাতের বাঁধন খুলে দেয়। শিউলি দেখে তার ভোমলা কাকু। শিউলি ঈশ্বরকে মনে মনে ধন্যবাদ জানায়, এই বিপদে ভোমলা কাকুকে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য। শিউলি এতদিন ভোমলা কাকুকে ভুল বুঝে এসেছে। ছেলেদুটি আড়ালে চলে গেলে, শিউলির পিছনে এসে বলে দাঁড়া তোর মুখের বাঁধনটা খুলে দিই। শিউলিকে উঠে বসতে সাহায্য করে। পিছন থেকে মুখে বাঁধা কাপড়ের গিঁট খোলার নামে এক টানে তার ফ্রকের চেনটা নিচে টেনে আনে। শিউলির পরনের ফ্রক আলগা হয়ে যায়। শিউলি দুই হাত দিয়ে নিজের ফ্রক বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে। ভোমলা হিসহিসিয়ে ওঠে। বলে কোনো লাভ নেই। এখানে চিৎকার করেও কিছু হবে না। সবাই গেছে মায়ের বিসর্জন দিতে। এর থেকে ভালো আমার কথা শোন, তোকে তোর মার মতো রাজরানী করে রেখে দেব। কেউ তোর দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারবে না। শিউলি সজোরে ঘাড় নাড়ে, গলার স্বরে গোঙানি। ভোমলা এক ঝটকায় তার ফ্রক টেনে নামায়। আধো অন্ধকারে তার প্রস্ফুটিত স্তনে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ। সে এক ধাক্কায় শিউলিকে মাটিতে শুইয়ে দেয়। তার শরীরের ওপর নিজের শরীরটাকে চেপে ধরে। তার বুকে নিজের মুখ চেপে ধরে। শিউলির যাবতীয় প্রতিরোধ এক লহমায় চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যায়। একবার দুবার তিন বার, নাহ্‌ শিউলি আর মনে করতে পারে না। তার চোখে অন্ধকার নেমে আসে। নাকে তীব্র মদের গন্ধ এসে ঠেকে। এ গন্ধটা অন্য রকম। তার বাবার মুখে যে গন্ধ পাওয়া যায় ঠিক তেমনটা নয়। ভোমলার নেশাগ্রস্ত শরীর এলিয়ে যায়। পাশে অপেক্ষারত দুজন ভোমলার ছাড়ার প্রতিক্ষায় ছিল। মেয়েটিকে নড়াচড়া করতে না দেখে পকেট থেকে মোবাইল বার করে তার মুখে আলো ফেলে। তার নাকের কাছে হাত নিয়ে বোঝার চেষ্টা করে তার শ্বাস চলছে কিনা। কিছু বুঝতে না পেরে, মুখে বাঁধা ওড়নাটা খুলে শিউলির গলায় পেঁচিয়ে একটা দিক পা দিয়ে চেপে ধরে আর এক দিক দুহাতে ধরে পূর্ণ শক্তিতে টেনে ধরে। লক্ষ্য করে মেয়েটির শরীর একটু ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে যায়। সেখান থেকে তারা দুজন যখন নিচে নেমে আসছে সেই সময় আরতীকে এগিয়ে আসতে দেখে। আরতী যে এদিকেই আসবে সেটা তারা খেয়াল করে না। আরতীকে সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসতে দেখে তারা আড়াল নেওয়ার চেষ্টা করে। আরতী অন্য কারুর উপস্থিতি অনুভব করে। সে দোতলার ল্যান্ডিং এ থমকে দাঁড়ায়। এদিক ওদিক তাকাতেই মেঝেতে দুটো শরীর পড়ে থাকতে দেখে। কাছে গিয়ে বুঝতে পারে একটা তার মেয়ে। আর একটা ভালো করে দেখে বুঝতে পারে ভোমলার। তার মানে ভোমলা তার মেয়ের সাথে... আরতী আর কিছু ভাবতে পারে না। সে দৌড়ে চারতলায় যায়। অন্ধকার হাতড়ে বঁটিটা হাতে নেয়। দৌড়ে নিচে এসে ভোমলার গলা লক্ষ্য করে এককোপ বসায়। কোপটা ঠিকমত গলায় না পড়ে একটু নিচের দিকে লাগে। বঁটির আঘাতে ভোমলার নেশা কেটে যায়। সে বাবাগো মাগো বলে চিৎকার করে ওঠে। আরতী এলো পাথাড়ি বঁটির কোপ চালায়। ভোমলা নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়।অ তার ঘাড়ে কোপটি বেশ ভালোভাবেই পড়ে। ঘাড় সামনের দিকে ঝুলে যায়। ভোমলার বড় শরীর দড়াম করে মেঝেতে আছড়ে পড়ে। আরতী সেই পড়ে থাকা শরীরের বিভিন্ন জায়গা কোপাতে থাকে। বঁটিটা ছুড়ে ফেলে ধপ করে শিউলির মাথার কাছে বসে পড়ে। মেয়ের মাথা বুকে চেপে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে।

এরপর ওসি নিজে ঘটনা তদন্তে আসেন। আরতীকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয়। শিউলির কোমল অপার্থিব শরীরটার ওপর সরকারী ছুরি কাঁচির প্রয়োগ চলে। পরের দিন সকাল হতেই মিডিয়ার হাঁকডাক। সবাই নিজের নিজের মত ব্রেকিং নিউজ দিতে ব্যস্ত। কেউ এটাকে আত্মহত্যা বলে চালাতে চায়, কেউ আবার ত্রিকোণ প্রেম। এই টানাপোড়েনে সত্যটা ক্রমশ উধাও হতে হতে একসময় মিলিয়ে যায়। কোর্টে শুনানি শুরু হয়। বিচারপতি আরতীর কাছে জানতে চান সে এই খুন করেছে কি না? করলে কেন করেছে? আরতী বিচারকের দিকে ফিরে একটা কথাই বলে, বিসর্জনের দিন আমার দুর্গাকে যে অসুর বিসর্জন দিয়েছিল, আমি সেই অসুরকে বিসর্জন দিয়েছি। কোর্ট রুমে পিনপতন নিস্তবদ্ধতা নেমে আসে। আরতী অসুর বধ করে ফিরে যায় কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যে সর্বজয়ার মত।

 

শারদ সংখ্যায় পড়ুন পূজার আরেকটি গল্প
সিঁদুর খেলা



কলকাতা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন