ঢাকা, বুধবার, ২৪ আষাঢ় ১৪২৭, ০৮ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

ছোটগল্প || অমীমাংসিত তালগাছ

মোহছেনা ঝর্ণা : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-২১ ৮:৩১:০৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-২১ ৮:৩১:০৫ পিএম

বেশ কিছুক্ষণ সবার আলাপ আলোচনা কানে শুনে, চোখে দেখে সালিশের প্রধান কর্তা মেম্বার সাহেব বললেন, আসলে পোলাটার ভুল হইয়া গেছে। বয়স অল্প। রক্ত গরম। এ-বয়সি পোলাপান কম বেশি সবাই ভুল করে। মানুষ মাত্রই ভুল করে। সবচেয়ে বড় কথা শয়তান এরকম উঠতি বয়সি পোলাপানগো কানের মধ্যে সারাক্ষণ কু মন্ত্রণা দেয়। আর ঘটনা যখন ঘটছিল তখন তো ছিল ক্ষেইনের সময়। (দিনের কিছু কিছু সময় আছে যখন মানুষ নিজের অজান্তে শয়তানের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নানা রকম আকাম-কুকাম করে ফেলে বলে রটনা আছে) হেদায়েত উল্লাহর মাইজ্জা পোলা নাজিমুদ্দিনও ওই ক্ষেইনের ফাঁদে পইড়া গেছে। মধ্য দুপুরে সূর্য যখন ঠিক মাথার উপরে খাড়া হয়ে থাকে তখন শয়তানের আছড় থাকে বেশি। নাজিমুদ্দিন যদিও বড় একটা অন্যায় করছে কিন্তু তার অন্যায়টারে ক্ষমা করা যায় কিনা তা আমাদের চিন্তা করা লাগবে, কারণ সে তখন হুঁশে ছিল না। আর সে তার কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইছে। তার চোখের পানি নিশ্চয়ই আপনারা সবাই দেখছেন।

উপস্থিত জনতার মধ্যে দু’চারজন মেম্বারের কথায় সমর্থন জানিয়ে হু হা করে। সালিশে গ্রামের জুমা মসজিদের ইমাম সাহেবও উপস্থিত। মেম্বার সাহেব, ইমাম সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলেন, ইমাম সাব আপনি কন, আমি ঠিক বলছি কি না?

ইমাম সাহেব জবাব দিলেন, জ্বি মেম্বার সাব, আপনি ঠিক বলছেন। উঠতি বয়সি ছেলেদের কানে শয়তান সারাক্ষণ কু মন্ত্রণা দেয়। এসময় নিজেরে নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন। কিন্তু এটাও ঠিক নাজিমুদ্দিন যা করছে তা খুবই অন্যায় হইছে। তাই তার উপযুক্ত বিচার আপনার করা লাগবো। শুধু ক্ষমা চাইলেই হইবো না। মেয়েটার কথাও তো আমাদের ভাবতে হইবো।

অঘ্রাণের শেষের দিকে বলে হিম হিম একটা বাতাস আছড়ে পড়ছিল মেম্বার সাহেবের কাছারি ঘরের দরজায়। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা কুলসমের মা নুরুন্নেসা মেয়েকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে কলিমুদ্দিনের দিকে ঘোর লাগা চোখে তাকায়। মেয়েটা ভয়ে তিরতির করে কাঁপতে থাকে পাখির বাচ্চার মতো। গত চার দিনে বাড়ি আর সদর হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করে মেয়েকে যমের দুয়ার থেকে ফিরিয়ে আনলেও মানুষের রূপধারী শয়তানের থাবা থেকে মেয়েকে মুক্ত করতে পারবে কি না তাতে বেশ শঙ্কায় থাকে নুরুন্নেসা। মেয়েটা কারো গলার শব্দ শুনলেই ভয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠে। সারাক্ষণ মায়ের বুকের সাথে লেগে থাকে। তাই এই অবেলায় মেয়েকে ঘরে রেখে আসার পরিবর্তে বুকের সঙ্গে লেপ্টে রাখতে হয়েছে। কেউ একটু জোরে কথা বললেই মেয়েটা কেঁপে উঠছে। তার এই কাঁপন মা নুরুন্নেসা ছাড়া অন্য কেউ টের পায় না।

সালিশে নাজিমুদ্দিনও উপস্থিত। সে অবশ্য বাবা হেদায়েত উল্লাহর এক পাশে মাথা নিচু করে বসে থাকে। প্রথম দিকেই সে নিজের অপরাধ স্বীকার করে কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করলে উপস্থিত সকলের মন তার প্রতি কিছুটা নরম হয়। এরকম কান্নাকাটি যে তাকে ঘরে বসে শিখিয়ে পড়িয়ে আনা হয়েছে তা প্রায় প্রত্যেকে বুঝলেও কেউ এ নিয়ে ন্যাকামির অভিযোগ তোলে না।

কলিমুদ্দিন কান্না মিশ্রিত গলায় বলে, মেম্বার সাব আফনি আমার মাইয়ার লগে না ইনসাফ হইতে দিয়েন না। আমার মাসুম মাইয়া। এই মাইয়া বাঁচব কেমন কইরা?

গ্রামের মাদ্রাসার মৌলভী বলেন, আরে মূর্খের মতো কথা কইয়ো না কলিমুদ্দিন। মেম্বার সাহেব যখন বিচারের ভার নিছে একটা সুন্দর সমাধান হইব।

মজলিসের দুই একজন বলে ওঠে, মেম্বার সাব আপনি কিন্তু চোখকানা বিচার করবেন না।

কলিমুদ্দিনের চাচাতো ভাই রহিমুদ্দিন বলল, হেদায়েত উল্লাহর মাইজ্জা পোলা এর আগেও অনেক আকাম-কুকাম করছে। যদি তখন তার বাপ-মায়ে তারে শাস্তি দিত, উচিত বিচার করতো তাইলে আজকে আর এইদিন দেখতে হইতো না আমাদের। এবার যদি হেদায়েত উল্লাহর কথা শুইনা এই পোলার উচিত বিচার না হয় আগামীতে এই পোলা আরো জঘন্য কাজ করবে।

হেদায়েত উল্লাহ জবাব দেয়, তুমি এত কথা কও কা মিয়া? তোমরা নিজেরা এই বয়সে কম বান্দরামি করছনি? কম আকাম-কুকাম করছনি? আমার নাদান পোলা না বুইঝা একটা আকাম করছে, আমি তো অস্বীকার করি নাই। পোলারে কি পিডানটাই না দিলাম। তারপর এই বিচার লইয়া কোনো তালবাহানা করছি? কলিমুদ্দিন সালিশ ডাকছে আমি কোনো ঝামেলা করছি? হাসপাতালের বিলটা কিন্তু আমিই শোধ করছি। কারণ আমি জানি আমার পোলায় কামডা ঠিক করে নাই। কিন্তু আপনাগো সবার বুঝন লাগব আমার পোলাডা ঝোঁকের মাথায় অন্যায় করছে। এখন মেম্বার সাব যে বিচার করব আমি তা মাইনা নিমু।

রহিমুদ্দিন বলে, মেম্বার সাব নাজিমুদ্দিনের লগে কুলসুমের বিয়া দিয়া দেন। তাইলেই সব সমস্যার সমাধান।

নাজিমুদ্দিনের বাপ হেদায়েত উল্লাহ হুংকার দিয়ে বলে, ওই রহিমুদ্দিন তুমি ফাতরামি করবা না মিয়া। আমার পুতের লগে বিয়া হইব কলিমুদ্দিনের মাইয়ার? আমার খেতের কামলার মাইয়ার লগে আমার পুতের বিয়া? তোমার সাহস তো কম না!

অবস্থা বেগতিক দেখে গ্রামের মুরব্বি সেকান্দার মিয়া বলে, পোলারে বিয়া না করাইলে কলিমুদ্দিনরে, হেদায়েত উল্লাহ ৫০ হাজার টাকা নগদ দিয়া দেক, এই টাকা দিয়া কলিমুদ্দিন মাইয়ার বিয়া দিব। কি কন মেম্বার সাব? বলেই সেকান্দার মিয়া মেম্বার সাহেবের দিকে তাকায়।

ফিসফিস করে মেম্বারের কানের পাশে কি যেন বলে হেদায়েত উল্লাহ। সালিশে উপস্থিত নারী-পুরুষ সকলেই নিজেদের মধ্যে ফিসফাস শুরু করে।

মেম্বার সাহেব কলিমুদ্দিনকে ডেকে জিজ্ঞেস করে, কলিমুদ্দিন তোর কিছু কওনের আছে? বুঝি আমি, তোর মাইয়ার লগে অন্যায় হইছে, যে অন্যায় হইছে টাকা দিয়া তার সমাধান নাই। এখন কিছু একটা তো করতে হইব। তুই ক, তুই কী চাস? মাইয়ার বিয়া নাকি নগদ টাকা?

কলিমুদ্দিন পিছন ফিরে নুরুন্নেসার দিকে তাকায়। নুরুন্নেসার চোখে আগুন। নুরুন্নেসা সালিশে আসার আগেই কলিমুদ্দিনরে ডেকে বলে দিয়েছে, যে আমাগো মাইয়ার উপর অত্যাচার করছে আমাগো দাবি তার কঠিন শাস্তি চাই। তার কঠিন শাস্তি নিজের চোখে না দেখলে এই শোক কোনোদিন মরব না আমার। কিন্তু এখন এই ভরা মজলিসে নুরুন্নেসার সেই কথাটা কলিমুদ্দিন কিছুতেই বলার সাহস করে উঠতে পারছে না।

এই হেদায়েত উল্লাহর খেতেই বারো মাস কামলা খাটে কলিমুদ্দিন। কলিমুদ্দিনের বউ নুরুন্নেসা ক্লাস ফাইভ পাস। শুধু পাস না ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাওয়া পাস। দরিদ্র ঘরের মেধাবী কন্যার মেধার মূল্যায়ন করার মতো মানুষ পাওয়া সমাজে দুষ্কর। পরিবার তো থাকে হা-ভাতে। একজন মানুষ কমলো মানে একটা পেট কমলো। একটা পেট কমাতে গিয়ে নুরুন্নেসার বৃত্তির সার্টিফিকেট চাপা পড়ে যায় সেদ্ধ ধানের গরম ভাঁপের নিচে। বোকাসোকা কলিমুদ্দিনের জোয়ান তাগড়া পরিশ্রমী শরীরের কারণে কাজের অভাব হয় না। নুরুন্নেসাও কপালের লিখন মেনে নিয়ে সংসারী হওয়ার চেষ্টায় মেতে থাকে। পরপর তিন কন্যার জন্ম হলে সবাই বলে নুরীর অভাবী ঘরে এত্তগুলা মাইয়া না হইয়া একটা দুইটা পোলা হইলে কার কি ক্ষতি হইত। মানুষের কথা নুরুন্নেসা কানে তোলে না। বরং জোরালো গলায় বলে, মানুষ করতে পারলে ছেলেমেয়ের মধ্যে কোনো ব্যবধান থাকে না।

নুরুন্নেসার কথা শুনে কেউ হাসে, কেউ টিপ্পনি কাটে, কেউ আবার সাহস দেয়।

মুরগীর বাচ্চার মতো সারাক্ষণ আগলে রাখে মেয়েদের নুরুন্নেসা। সেদিন যে কি হলো! বড় মেয়েটা যে কখন তালগাছ তলার দিকে গেল খেয়ালই করল না সে। ছোট মেয়েটার জ্বর ছিল। ছোট মেয়েকে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে অনেকটা সময় কেটে গেল। ভাবল অন্য বাচ্চাদের সাথেই হয়তো আছে। কিংবা অন্য কারো ঘরে হয়তো আছে। দুপুরের দিকে হঠাৎই কুলসুমকে খুঁজতে গিয়ে হয়রান হয়ে যায় নুরুন্নেসা। অন্য ঘরের জায়েরাও খুঁজতে বের হয়। খুঁজতে খুঁজতে তালগাছ তলার ভিটার কাছে ঘন জঙ্গলের মতো জায়গায় গোঙানির শব্দ শুনে ভেতর গিয়ে নুরুন্নেসা দেখে তার কলিজার টুকরা মাটির মধ্যে পড়ে আছে রক্তাক্ত অবস্থায়।

তিন মেয়েকে নিয়ে নুরুন্নেসার স্বপ্নের ঘরে শয়তানের থাবা দিল নাজিমুদ্দিন। প্রথমদিন কুলসুমের মৃতপ্রায় অবস্থা দেখে সবাই কলিমুদ্দিন আর নুরুন্নেসার পক্ষে কথা বললেও দু’দিন পার না হতেই সবার মুখে অন্যসুর। মেয়ে সামলাই না রাখলে দুর্ঘটনা তো ঘটবেই।

চারদিন সদর হাসপাতালে মেয়েরে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি শেষে বাড়ি ফিরে নুরুন্নেসাই স্বামী কলিমুদ্দিনরে নিয়ে মেম্বার বাড়িতে গিয়ে মেম্বার সাহেবের কাছে বিচারের আর্জি জানায়। হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ দেয়ার জন্য হেদায়েত উল্লাহ ছুটে যায়। হেদায়েত উল্লাহর বউ আমেনাও যায়। তাই হাসপাতাল থেকে ফিরেই নুরুন্নেসার সালিশ ডাকার কথা শুনে হেদায়েত উল্লাহর বউ আমেনা নুরুন্নেসাকে বাড়িতে গিয়ে শাসিয়ে আসে।

জুমা মসজিদের ইমাম সাহেব বলেন, কলিমুদ্দিনের মাইয়াডা অনেক ছোট। তাই বিয়ের প্রস্তাবের চেয়ে নগদ টাকার প্রস্তাবটা আমার ভালো মনে হইতাছে মেম্বার সাব। কলিমুদ্দিন তুই কথা কস না ক্যান?

কলিমুদ্দিন এবারো নিরুত্তর থাকে। পেছন থেকে নুরুন্নেসা বলে ওঠে মেম্বার চাচা, বেয়াদবি না লইলে আফনারে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই।

মেম্বার বলে, বলো কলিমুদ্দিনের বউ, কী কথা?

আইজকা আমার মাইয়ার লগে যে অন্যায় হইছে, আমার মাইয়ারে যেভাবে কষ্ট দিছে ওই জানোয়ার, একই অন্যায় যদি আফনার মাইয়ার লগে হইত মেম্বার চাচা, তখন আফনি কী বিচার চাইতেন, কী বিচার করতেন?

সালিশে উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে দু’একজন গর্জে ওঠে, ওই বেত্তমিজ, মুখের লাগাম দিয়ে কথা ক। ফকিরনি কোনখানকার! কার লগে কী কস, কথার কোনো লাইসেন্স নাই। কিসের লগে কিসের তুলনা!

নুরুন্নেসা তাদের কথায় গা করে না। হেদায়েত উল্লাহর চামচাদের সে ভালো করেই চিনে।

নুরুন্নেসার প্রশ্ন শুনে মেম্বার সাহেবের প্রচণ্ড রাগ হয়। কিন্তু মেম্বার রাগ সামলে বলে, শোনো কলিমুদ্দিনের বউ, বাচ্চাকাচ্চা জন্ম দিলেই তো হয় না। বাচ্চাকাচ্চা চোখে চোখে রাখতে হয়। আর মেয়ে বাচ্চা হইলে তো কথাই নাই। তুমি তোমার মাইয়া সামলাইয়া রাখো নাই, দোষ তো তোমারও কম না। দেখো না, পশুপাখিও একটা বয়স পর্যন্ত বাচ্চাকাচ্চা চোখের আড়াল করে না। মুরব্বি গো মুখে মুখে কথা কইয়া নিজের দোষ আর বাড়াইও না। মাইয়া মানুষ তুমি, গলার স্বর নিচু করে কথা বলো। আদব কায়দা কিছুই তো শিখলা না।

নুরুন্নেসা শান্ত গলায় বলে, ঘর পুড়ছে আমার, আমার পোড়া ঘরের কথা আমি না বললে আপনারা আমারে সাহায্য করবেন কেমনে?

ইমাম সাহেব বলে, শোনো কলিমুদ্দিনের বউ, সাফ সাফ কথার জবাব দাও। নাজিমুদ্দিনের লগে মাইয়ার বিয়া দিতে চাও, নাকি নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা চাও।

অসম্ভব! এই কামলার ঝিরে আমার পোলার বউ করনের চিন্তাও যেন কেউ না করে, বলে চেঁচিয়ে ওঠে হেদায়েত উল্লাহ।

নুরুন্নেসা গলা ছেড়ে বলে ওঠে, আমি এই বিচার মানি না হুজুর। নুরুন্নেসা কথা শেষ করতে পারে না। তার আগেই মেম্বার বলে, তুমি কী চাও কলিমুদ্দিনের বউ? তোমার বক্তব্য কী?

নাজিমুদ্দিনের শাস্তি চাই। নাজিমুদ্দিনের লগে আফনারা আমার মাইয়ার বিয়ার কথা চিন্তা করেন কেমনে? যে পোলা দিনে দুপুরে একলা পাইয়া আমার মাইয়ারে অত্যাচার করে, সেই পোলার লগে মাইয়া বিয়ার কথা চিন্তা করেন কেমনে? জবাব দেয় নুরুন্নেসা।

নাজিমুদ্দিনের মা আমেনা বাজপাখির মতো উড়ে এসে বলে, ওই ফকিরনির ঝি ফকিরনি, মাইয়া বিয়াইলেই হয়? মাইয়া সামলাই রাখতে পারস না? এখন আমার পোলার কান্ধে সব দোষ চাপাস? অই ভরদুপুরে তোর মাইয়া জঙ্গলে ঘুরে, তুই কই আছিলি তখন?

আমার মাইয়া সামলাই রাখতে হবে ক্যান? আমার মাইয়া তো কারো ক্ষতি করে নাই। যাগো পোলা মাইনষের ক্ষতি করে তাগো পোলাগোরে সামলাই রাখেন সবাই- নাজিমুদ্দিনের মায়ের কথার জবাব দেয় নুরুন্নেসা।

নুরুন্নেসার কথা শুনে হেদায়েত উল্লাহ চিৎকার করে উঠে। তার চিৎকার দেখে কলিমুদ্দিনের চাচাতো ভাই রহিমুদ্দিনও হৈ চৈ শুরু করে।

হঠাৎ করে সালিশে উপস্থিত জনতার হৈ চৈ দেখে ইমাম সাহেব মেম্বার সাহেবের কানের কাছে ফিসফিস করে কিছু একটা বলে। আর তখন মেম্বার সাহেব মুখ গম্ভীর করে বলে, শোনো মিয়ারা মাগরিবের আজানের আর বেশি দেরি নাই। কলিমুদ্দিনরে হেদায়েত উল্লাহ পঞ্চাশ হাজার টাকা নগদে দিয়া দিব- এটাই হইল আমার বিচার।

নুরুন্নেসা বুকের সঙ্গে লেপ্টে থাকা সাত বছরের কন্যা কুলসুমরে আরো শক্ত করে বুকে চেপে বলে, এই বিচার আমি মানি না।

মেম্বার সাহেব গর্জে উঠে বলে, তুমি কী চাও?

নুরুন্নেসা গলার স্বর উঁচিয়ে বলে, আমি নাজিমুদ্দিনের ফাঁসি চাই। আর কোনো নাজিমুদ্দিন যেন জন্মাইতে না পারে তাই নাজিমুদ্দিনের ফাঁসি চাই। আপনারা বিচার করতে না পারলে আমি থানায় যাব। মামলা করব।

নুরুন্নেসার কথা শুনে সালিশে উপস্থিত জনতা কয়েক মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। কারণ তাদের গ্রামে মেম্বার, চেয়ারম্যান ডিঙিয়ে থানা-পুলিশের কাছে যাওয়ার কথা চিন্তাও করে না কেউ। মেম্বার সাহেব, চেয়ারম্যান সাহেব আর জুমা মসজিদের ইমাম সাহেব পর্যন্তই তাদের দৌড়। বছরের পর বছর চলে আসা প্রথা ডিঙিয়ে নুরুন্নেসার মতো একজন হা-ভাতে যখন এই প্রথার বিরুদ্ধে যাওয়ার ঘোষণা প্রকাশ্যে দেয় তখন উপস্থিত জনতা আসলে বিস্ময় গোপন করতে পারে না। আবার বিস্ময়ের ঠেলায় উচ্ছ্বসিত হতেও তাদের বাধে। সময় যখন এমন দোদুল্যমান, ঠিক তখন বড় মিয়া বাজারের মসজিদ থেকে মাগরিবের আজানের ধ্বনি ভেসে আসে। মাগরিবের নামাজ পড়ার জন্য হঠাৎ সবাই হুড়োহুড়ি করে কাছারিঘর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে সালিশে নতুন করে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। কাছারিঘর থেকে বের হওয়ার সময় অনেকে মনে মনে কলিমুদ্দিনের বউ নুরুন্নেসার সাহসের তারিফ করে। হেদায়েত উল্লাহর বিষ দাঁত যদি এবার ভাঙে এই আশায়ও থাকে কেউ কেউ। কিন্তু সাহস করে কেউ মুখে কিছু বলতে পারে না।

নাজিমুদ্দিনের মা আমেনা এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেও নুরুন্নেসার চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারে না। হেদায়েত উল্লাহও মেম্বার সাহেবকে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করেন। কলিমুদ্দিনের চাচাতো ভাই রহিমুদ্দিনও মেম্বার সাহেবকে কিছু বোঝাতে যায়। কিন্তু নামাজের সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে মেম্বার সাহেব এবং ইমাম সাহেব দু’জনেই মাগরিবের নামাজ আদায়ের জন্য কাছারিঘর থেকে বের হওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে।


ঢাকা/তারা