ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৭ ফাল্গুন ১৪২৬, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

ছোটগল্প || জুলাইয়ের প্রেমহীন দিনগুলো

হোসেন শহীদ মজনু : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-২৫ ২:৩৫:১৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-২৫ ২:৩৯:৪০ পিএম

প্রকাশ্য চুমু নিয়ে যেহেতু মামলা, তাই শুনানিতে এ বিষয়ে বিশদ বিবরণ জানতে চাইলেন আদালত। যে আইনজীবী মামলা ঠুকেছিলেন, তিনি সাড়ম্বরে রগরগে বর্ণনা দিলেন। আর্জি জানালেন, মহামান্য আদালত ভিডিও ক্লিপিংটা দেখে আপনি সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হয়। ব্যাস; যেই বলা, সেই কাজ! আদালত পরবর্তী তারিখ ঘোষণা করে বললেন, ৩১ জুলাইয়ের শুনানিতে চুমুদৃশ্যের ভিডিও দেখার পর রায় ঘোষণা করা হবে।

উঠতি নায়িকা এলিজা আর হালের ক্রেজ গোলাম রসুলের চুমুর ফাঁস হওয়া ভিডিও এখন ভাইরাল। এ খবর অবশ্য পুরনো; সাংবাদিক হিসেবে আমার কাছে এর মূল্য বিগ জিরো! কিন্তু আদালতে আজকের শুনানির পর এটি তো নতুন খবর, পাঠককে এ তথ্য জানাতে হবে। চিফ রিপোর্টারকে ফোন করলাম। তিনি বললেন, হুম; তুমি জানানোর আগেই টিভিতে স্ক্রল দেখলাম। যাক গে লিখে পাঠাও।

আদালত চত্বর থেকে বেরিয়ে ডিআরইউ-এর মিডিয়া রুমে এসে একটিও কম্পিউটার ফাঁকা না পেয়ে একটু খারাপ লাগছিল; নিউজটা লিখে মেইল করে তবে বাসার দিকে যাব, বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতে বাকি নেই। এ সময় হন্তদন্ত হয়ে ঢুকল উর্মি। পেশায় নতুন হলেও মেয়েটার পরিশ্রম ও অধ্যবসায়কে সাধুবাদ জানাতে হয়। উর্মি বলল, ভাইয়া আপনার নিউজ লেখা শেষ! আমাকে একটা কপি দিয়েন, রিরাইট করে নেব। আইনমন্ত্রীর অ্যাসাইনমেন্ট ছিল প্রেস ক্লাবে, তাই কোর্টে যাওয়া হয়নি। ওর বলার ভঙ্গিতে মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে। আমি না করতে পারি না! ক্লান্তিটা হঠাৎ করে অনেকখানি হাওয়া হয়ে যায়। হেসে বলি, এখনো লেখা হয়নি রে!

বাসায় ফিরতে ফিরতে সেই রাত ১১টা-ই বাজল। মেট্রোরেলের বিশাল বিশাল পিলার খাড়া হয়ে গেছে, কোথাও কোথাও গর্তে ঢালাই চলছে, হলুদ হেলমেট-মার্কা চাকতি মাথায় শ্রমিকরা কাজ করছে; ঢাকার সড়কে আমি যেদিকে যাই, সেদিকেই যেন এই মহাকর্মযজ্ঞ। ডিআরইউ থেকে বেরিয়ে মৎস্যভবনের সামনে এসে মিরপুরমুখী বাসে যখন চড়ি তখন সন্ধ্যা ৭টা। ভাবছিলাম ঘণ্টাদুয়েকও যদি লাগে; রাত ৯টার মধ্যে ঠিকই পৌঁছে যাব মিরপুর-১০। স্টপেজ থেকে ৫ মিনিটের হাঁটাপথ। কিন্তু বিধিবাম। সড়কে যেন গাড়িবন্যা! বাস চলেই না, ফার্মগেট পৌঁছাতেই ৯টা বেজে গেল! নিজের বোকামির জন্য খারাপ লাগছিল। ইস! বাসে বসে না থেকে যদি হাঁটা শুরু করতাম তাহলে ৯টার মধ্যে মিরপুর পেয়ে যেতাম! আদালত চত্বরে থাকার সময়ই ছেলেটার বেঘোর জ্বরের কথা জানিয়েছিল বউ। বলেছিলাম, ৯টা-সাড়ে ৯টার মধ্যে পৌঁছে মিরপুর-২ এর শিশু হাসপাতালে নেব। সাড়ে ৯টা পেরুলেও যখন আমি বাসায় যেতে পারলাম না; বাসে বসে না থেকে মন চাচ্ছিল- নেমে দৌড়াই কিংবা সংসদ ভবনের পাশের খেঁজুরবাগানে গিয়ে ঝুলে পড়ি। অসহায়ত্বের সেই ভাষা যখন শরীরে ক্ষুব্ধ হয়ে ফুটে উঠছে; ঠিক তখনই ফোনটা এলো। : আর কতক্ষণ লাগবে?

বউয়ের ফোন। আমি উত্তর দেই- বুঝতে পারছি না, রাস্তায় যা জ্যাম!
: *লের চাকরি করো, কোনোদিন যদি সময়মতো একটা কাজ করতে পারছ!
মাথা ঠাণ্ডা রেখে বলি, কী করব বলো; জ্যামের সঙ্গে তো আর...

কথা শেষ করতে দেয় না রিনি; কাসার থালায় যেন বাড়ি পড়ে! কান থেকে অন্তত দু’তিন ইঞ্চি দূরে সরিয়ে ফেলি মোবাইল ফোন! তবুও কান ছেড়ে মনেও বড় বাজে তার কথা!
: ওই বোকাচোদা আগে বেরুতে পারো না, জ্যামের দোহাই দাও। নাকি অন্য কোথাও ছেলে-বউ বানাই রাখছো আরেক জোড়া!

এরপর আর কথা ফোটে না মুখে। মনে মনে নিজেকেই গালি দেয়- দূর শালা হতভাগা!
সাড়াশব্দ না পেয়ে রিনি আরও রেগে যাচ্ছে। হাতের ফোনটাতে যেন সেই উত্তাপ অনুভব করি! বিস্ফোরন্মুখ এই রমণীকে থামাবো কীভাবে মাথায় আসে না। কিছু একটা করতে হবে- যেই ভাবা অমনি সুযোগটা যেন চলে আসে- সিগন্যাল ছেড়েছে; চারদিকে বাস-টেম্পো-প্রাইভেটকারের হর্নের হাঁ-মুখের দিকে মোবাইলটা ঘুরিয়ে ধরি! ত্রিশ সেকেন্ড মতো; তারপর হুট করেই সুইচ অফ! আপাতত বাঁচা গেল! কিন্তু ছেলেটার সর্বশেষ আপডেট না পেয়ে আমি আরও মুষড়ে পড়ি। বাসায় ফিরে কি পরিস্থিতির মুখোমুখি হবো; তা ভেবে শরীরটা ঘেমে একশা। 

বাকিটা পথ কীভাবে গেছি যেন মনেই করতে পারি না! বাসার দরজায় যখন পৌঁছলাম, ঠিক ১১টা বাজে।  দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ! ডুপলিকেট চাবি থাকলেও খুলতে ইচ্ছে করল না, বরং মোবাইলের অন বাটনে আঙুল চলে গেল। এতো টেনশনের মধ্যেও মাথা ঠিকই কাজ করে- মোবাইল বন্ধ কেন; সে প্রশ্নের পাল্টা জবাব চলে আসে- নেটওয়ার্কের দোহাই দিয়ে কথা বলা যাবে রিনির সঙ্গে!

ডায়াল করি। রিং বেজেই যাচ্ছে; ওপাশে সাড়া নেই। আমার টেনশন আরও বাড়তে থাকে। যুক্তিরাও হাজিরা দেয় মগজে! হয়ত রাস্তায় কিংবা ডাক্তারের কাছে, ফোন ধরার সুযোগ পাচ্ছে না। বন্ধ দরজার সামনে ভাবলেশহীন দাঁড়িয়ে থাকি। সময় যেতে চায় না। টেনশনের সময়- মিনিট-সেকেন্ড-ঘণ্টা যেন এক বিন্দুতে মিলে যায়! কারো কোনো গত্যন্তর নেই; নড়াচড়া করার তাড়া নেই! আবারও কল দেই। না, পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয় না! থ মেরে দ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, কী করব- মাথা আর কাজ করে না।

 

দুই

৮ জুলাই দুপুরবেলা হঠাৎ করেই ছেলেটার শরীর গরম হয়ে উঠল! থার্মোমিটারে মেপে দেখি ১০৩ ডিগ্রি জ্বর। খাওয়ালাম একটা নাপা ট্যাবলেট। ভাবলাম, ওর বাবা কাজে ব্যস্ত, আপাতত তাকে না জানাই।  অপেক্ষায় থাকলাম, কিন্তু জ্বর কমার কোনো লক্ষণ নেই। ঘণ্টাখানেক পরে ছেলে জানাল, তার শরীর ব্যথা করছে। এর একটু পরেই বমি করল। এবার আর নিজেকে শান্ত রাখতে পারলাম না। ফোন করলাম পাভেলকে। অন্য আর দশটা ঘটনার মতো সে এটাকেও স্বাভাবিকভাবে নিয়ে বলল, আচ্ছা, রাত ৯টা-সাড়ে ৯টার মধ্যে এসে মিরপুর-২ এ শিশু হাসপাতালে দেখাব।

খুব রাগ হচ্ছিল ওর কথা শুনে। পরক্ষণেই মনে পড়ল; সাংবাদিকের এই এক চরিত্র, কিছুতেই রাগে না! 

সময় যত যেতে লাগল ছেলেটার অবস্থা খারাপের দিকে যেতে থাকল। বুঝতে পারলাম- খারাপ সময় এগিয়ে আসছে! বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যায় একবার একটু জ্বর কমল। ভাবলাম- ওষুধে কাজ হচ্ছে। কিন্তু রাত ৮টার দিকে ওর শরীরটা যেন পুড়ে যেতে লাগল। মেপে দেখি ১০৪। কী করব; না করব ভেবেও পাচ্ছি না। রাগে-ক্ষোভে মনে হচ্ছে মাথার চুল টেনে ছিড়ি! রাত প্রায় পৌনে দশটা বাজে পাভেলের এখনো কোনো খবর নেই। টেনশন আর নিতে পারছি না! আবার ফোন দিলাম। প্রথমেই জ্যামের দোহাই দেয়ায় নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না! মুখটা খারাপ হয়ে গেল! ওদিকে গাড়ি-ঘোড়ার শব্দে ভালোমতো আলাপও শেষ করতে পারলাম না। লাইনটা কেটে গেল! এখন আবার বন্ধ পাচ্ছি। কোনো দুর্ঘটনা ঘটল কিনা কে জানে? বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। ভাবলাম- এমন কেন ভাবছি আমি? অন্য কোনো কারণেও ফোনটা বন্ধ হতে পারে!

এখন রাত সাড়ে ১০টা বাজে। ছেলেটা আবারও বমি করল। আর কিছু ভাববার সুযোগ নেই, ওকে সঙ্গে নিয়ে বাসার বাইরে এলাম। ফ্ল্যাটে তালা মেরে হাঁটাপথেও রিকশার জন্য চোখ আতিপাতি করছিল, ভাগ্যক্রমে সামান্য সামনে একটা মিলেও গেল!  ছেলেকে নিয়ে উঠলাম, বললাম, মিরপুর-২। শিশু হাসপাতালে নেয়ার পর এই পরীক্ষা, সেই পরীক্ষা চলতে থাকল, রাত ১টায় জানা গেল ডেঙ্গু হয়েছে। আতঙ্কিত হবার সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল; পাভেলকে জানানো দরকার! ও এখন কোথায়? হাত চলে গেল ভ্যানিটি ব্যাগে, মোবাইল বের করে দেখি ১০টা মিসড কল! এবার উল্টো নিজের উপর রাগ-ক্ষোভ বাড়ল- ডেঙ্গুর আতঙ্কে কান্নায় চোখটা ঝাপসা হয়ে এল!

 

তিন

: হ্যালো পাভেল, কেমন আছো?
: এই তো ভাই চলছে, হঠাৎ কী মনে করে এতো রাতে ফোন দিলেন!
: আরে তুমি বলছিলা না, একদিন বারে যাইবা, পরিবেশ দেখবা। আজ যাইবা নাকি?

মেঘ না চাইতেই যেন বৃষ্টি নেমে এলো! দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রিনিকে ফোন দিতে দিতে যখন খুব ক্লান্ত লাগছিল, তখন মেরাজ ভাইয়ের প্রস্তাবটা ভালো লেগে গেল। ভাবলাম- বেশ হয়, দেখে আসি বারের পরিবেশটা, মন চাইলে দু’পেগ খেয়ে স্বাদটা নিলাম। তার কাছে আলো-আধারীর গল্প শুনতে শুনতেই তো বুঝে গেছি অনেক কিছু। এবার চাক্ষুস দেখার পালা!

: ভাই, আপনি কই? আমি কোথায় আসব?
: এক কাজ করো, মোহাম্মদপুরের সুইট ড্রিমে চলে আসো, ওখানে ডিব্বা কাশেম আছে, ভেতরে গিয়ে তাকে ফোন দিও। আমিও আসতেছি।
: আচ্ছা ভাই।

এরপর মোবাইলে পাঠাও অ্যাপসে ঢুকে মোটরবাইক ডেকে পাঠালাম। রাইডার যেন রেডিই ছিল, ১০ মিনিটে মোহাম্মদপুর। ঢুকে গেলাম সুইট ড্রিমে, ফোন দেয়া লাগল না। আলো-আধারীতে কয়েকটা টেবিল এগিয়েই কোণার দিকে দেখি ডিব্বা কাশেম বসা। হেসে উঠলেন, তাহলে শেষ তক আইলেন। বসেন।

একটু পরই টেবিলে অর্থনীতির খবরের জুনিয়র রিপোর্টার মেসের আলী এসে যোগ দিল। আমাকে দেখে একটু শরমিন্দা হলেও কাশেম জড়তা কাটিয়ে দিয়ে বললেন, আরে মিয়া লজ্জা পাও  ক্যান, পাভেলভাই ঘুরান্টি দিবার আইছে!

ডিব্বা কাশেম  হাঁক দিলেন- এই সেলিম এখানে তিনটা ফিশ ফ্রাই দে, ঠাণ্ডা পানি আর ৬ পেগ হুইস্কি। দূর থেকেই সেলিম সাড়া দিল- জ্বি স্যার। সবকিছু যেন রেডিই ছিল, মিনিট পাঁচেক পর চলে এলো সেলিম। হুইস্কির গ্লাস পাশে ঠেলে রেখে ফিশ ফ্রাইয়ের দিকে ঝুকলাম।

সব খাইবেন ভাই, ২ পেগে কিচ্ছু হবে না- বলেই ডিব্বা কাশেম একচুমুকে এক পেগ শেষ করলেন! সঙ্গে পানিও নিলেন না! মেসের আলী পানি মিশিয়ে এক চুমুক দিল। আমিও তার দেখাদেখি পানি মিশিয়ে কোনোরকম গলা ভিজিয়ে ফিশ ফ্রাইয়ে মনোযোগী হলাম।

ফোনটা বাজছে, কিন্তু ধরতে পারছি না, হুট করে পুরো পরিস্থিতি বদলে গেছে! এমন একটা পরিস্থিতির জন্য আমার কোনোরকম প্রস্তুতি ছিল না! বারবার বাজছে মোবাইল। চুপিচুপি রিসিভ করতেই মিরাজভাই কিছুটা রাগমিশ্রিতকণ্ঠে বললেন, কতক্ষণ ধরে ফোন করছি, ধরছো না কেন? বারে তো কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না! তুমি কোথায়?

আমি মিনমিনে গলায় বলি, ভাই বারের ভেতরেই আছি, রেইড চলছে! পাশের টেবিলে জিজ্ঞাসাবাদ চলছিল; চুপচাপ নিজেদের মধ্যে আলাপ করছিলাম। পাছে না ধরে নিয়ে যায়! কী একটা বেইজ্জতি ব্যাপার! আপনি একটু অপেক্ষা করুন, পরিস্থিত ঠাণ্ডা হলে কল দিচ্ছি। 

পাশের চেয়ারে বসা মেসের আলী ক্ষেপে গেল আমার উপর। বলল, পাভেলভাই আপনি না বেশি ভালো মানুষ! আমরা সাংবাদিক; এতো ভয়ের কী আছে! চুপ করে একটু বসুন; আমরা আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাই, খানাপিনা করতে থাকি, দেখি তারা কী করে আমাদের!

আরেক ধাপ এগিয়ে ডিব্বা কাশেম গান ধরলেন, ‘চাড়া জো মুঝপে সুরুর হে/আসার তেরা ইয়হে যারুর হে/তেরি নাজার কা কাসুর হেই দিলবার দিলবার দিলবার...।’ ওয়েটার সেলিম ছুটে আসে; হাতজোড় করে বলে, স্যার প্লিজ একটু শান্ত থাকেন। পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেন।

কাশেম ধমক দিয়ে উঠে- সেলিম, তুই যা। আমাদের আরো ৬ পেগ হুইস্কি দে। 

আমার এক পেগ শেষ হয়নি, গ্লাসেই পড়ে আছে, ওদিকে তিন পেগ খাওয়ার পর কাশেম একটু টাল হয়ে পড়েছে! হালটা এবার আমাকেই ধরতে হলো। বললাম, কাশেমভাই প্লিজ একটু চুপ থাকেন। আমার কথায় যেন কাজ হলো। তিনি আপাতত চুপ করলেন।

সামান্য একটু অভিজ্ঞতা নেয়ার জন্য সুইটড্রিম বারে এসে কী বিপদেই না পড়া। যেভাবে চেক করছে, তাতে যেকোনো সময় খারাপ পরিস্থিতিতে পড়তে পারি। এর মধ্যে ডিব্বা কাশেমের মাজেজাটা আরেকবার মনে পড়ে গেল! যেকোনো খারাপ পরিস্থিতিতে ভাবনাকে অন্যদিকে নেবার টেকনিকটা শিখিয়েছিল রিনি! আহা! ছেলেটাকে নিয়ে কোন হাসপাতালে না জানি আছে রিনি, নাকি বাসায় ফিরেছে? জটিল এসব ভাবনা থেকে কেন জানি আমি ডিব্বা কাশেমের লম্বা কাহিনির সারসংক্ষেপটা আবার ঝালিয়ে নিতে চাইলাম- মিরাজ ভাইয়ের কাছেই শুনেছিলাম ডিব্বা কাশেমের সেই জীবনের গল্প। বছর বিশেক আগের কথা- কারওয়ান বাজারের টয়লেট পট্টি কাশেমের দখলে। মানে মাসোহারাটা চলে আসে পকেটে। সেই টাকায় কুষ্টিয়ার জয়রামপুর গ্রামে দোতলা বাড়ি যখন হলো; দশ গ্রামের লোক দেখতে এলো! এলাহি কাণ্ড! সব্বাইকে মিষ্টিমুখ করিয়ে ছাড়ল আজহার মাঝির ছেলে কাশেম। প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ফিরল গ্রামবাসী। বুড়ো আজহারেরও এলাকায় কদর বেড়ে গেল, ছেলে কাশেমের জন্য পাত্রী দেখতে হুমড়ি খেয়ে পড়ল ঘটকেরা! গোলদার, পোদ্দার, সর্দার, মহলদার বংশের মেয়ের খোঁজ নিয়ে তারা হাজির। কিন্তু কোনো পাত্রীই পছন্দ হয় না কাশেমের। তার একই কথা- কেউই তেমন সুন্দরী না। অবশেষে পাওয়া গেল; লস্কর বাড়ির ছোটো মেয়ে কমলাকে। ব্যাস, হয়ে গেল বিয়ে। ভালোই চলছিল তাদের সংসার। মাসোহারার টাকায় সপ্তাহের বৃহস্পতিবার বাড়ি যেত কাশেম। শুক্র-শনি থেকে রোববার সকালে ঢাকায় ফিরত। দোষ বলতে ওই একটাই; কারওয়ান বাজারের টয়লেট পট্টির একচ্ছত্র আধিপত্য। পুলিশের সঙ্গে কমলার পালিয়ে যাবার পরই মদের নেশা পেয়ে বসে কাশেমকে। কারওয়ানবাজার আর বারেই কাটে রাত-দিন। গ্রাম-সংসার সব শেষ। বুড়ো বাবাটাও গত হয়েছে অনেক দিন। এখন তো একবসায় এক ডিব্বা মদ পান করেও তার নেশা মেটে না, আরও চায়। তাই বন্ধুরা মিলে তার নাম রেখেছে ডিব্বা কাশেম! নিয়মিত যারা বারে আসে তাদের সবাই চেনে ডিব্বা কাশেমকে।

: আপনার লাইসেন্সটা দেখান।
বাস্তবে ফিরি আমি। বলি, মানে! কিসের লাইসেন্স? আমার কোনো লাইসেন্স নেই, আমি সাংবাদিক।
আমার মুখের কথা যেন মুখেই থাকে, ডিব্বা কাশেম নারকোটিকসের অফিসারটির দিকে তাকিয়ে বলে, ওরা আ-মার ছাংবাদিক বন্দু, আমার লাইছেন্স আছে। তারা এ-অ্যাকটা মি-মি-টিংয়ে বইছে।

টাল হওয়া কাশেমের কথায় যেন কাজ হয়, অফিসারটি বলেন, এটা মিটিংয়ের  জায়গা না ভাই, আপনারা পরে আর এখানে আইসেন না।

এরপর পাশের টেবিলে চলে যান অফিসারটি, সঙ্গে যায় সাঙ্গপাঙ্গরাও। ওখানে বসা ১৫-২০ বছর বয়সী ৪টি ছেলেকে উঠিয়ে নিয়ে কাউন্টারের কোণায় গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। আমি খাওয়া ভুলে সেদিকেই তাকিয়ে থাকি। দেখি, একেকজনের মোবাইল কেড়ে নিয়ে অভিভাবকের নম্বর জেনে ফোন দেবার হুমকি দিচ্ছে। একটু পর একটি কাগজে তাদের নাম-ঠিকানা লিখে মুচলেকা নিয়ে মোবাইলগুলো রেখেই তাড়িয়ে দিল।

অন্য আরেকটি টেবিলে দু’চারজনের ওপর চড়াও হলেন অফিসারটি। একটু দূরের টেবিলে দেখি মোটামতো এক তরুণীও আছে, সেখানে গিয়ে অফিসারটি সুবিধা করতে পারল না, চাইবার আগেই লাইসেন্স দেখিয়ে দিল তরুণী!

ব্যাস, এরপর আর বেশি হম্বিতম্বি দেখলাম না! একটু পর পরিবেশটা আগের মতো হলো! মিরাজভাই এসে ঢুকলেন; ততক্ষণে ডিব্বা কাশেম আর যেন হুঁশে নেই! বিল পরিশোধ করে বেরিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে গেটম্যানকেও ৫০ টাকা বকশিস দিয়ে সড়কে নেমে পড়ল।

পাঠাওয়ে ঢুকলাম, প্রায় ১০ মিনিট পর একজন রাইডার মিলল। আবার বাসার গেটে পৌঁছলাম যখন তখন রাত ২টা বাজে। মনের ভেতরে একটা আশাবাদ কাজ করছিল- এবার নিশ্চয় তালা দেখব না। কিন্তু চাঁদ যে অমাবশ্যায় ঢাকা! দরজায় দাঁড়িয়ে মোবাইলটা হাতে নিলাম- ওমা! রিনির অনেকগুলো মিসড কল ভেসে উঠল। যা শালা! নিজেকে নিজে আরেকবার গালি দিলাম। রাত বাজে ২টা! দিলাম ফোন- এক চান্সেই রিসিভ হলো। ও পাশে কান্নায় বন্ধ হয়ে আসা গলায় রিনি বলল, বাবুর ডেঙ্গু হয়েছে, তুমি কোথায়?

আমারও গলায় যেন ছাতু আটকে গেছে! মিনমিনে কণ্ঠে বললাম, বাসার সামনে। তোমরা কোথায় বলো? ‘শিশু হাসপাতালে’ বলেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠল রিনি।

 

চার

নায়ক-নায়িকার পক্ষের আইনজীবী মুশফিক মজুমদার খান বলা শুরু করলেন, একটা চুমুতে জাতির মান চলে গেছে, সবকিছু গোল্লাই গেল, দেশে নীতিনৈতিকতার জলাঞ্জলি হয়েছে- ইত্যাদি ইত্যাদি বলে যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদপত্রের পাতা গরম করার চেষ্টা করছেন, তাদের বলি, যতই গরম করেন আগুন জ্বলবে না! আপনারা ঘোলাপানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছেন। মানুষের দৃষ্টি মূল সমস্যা থেকে অন্যদিকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন। আপনারা বিভ্রান্তি সৃষ্টির মাধ্যমে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ভুলে যাচ্ছেন কেন- নায়ক-নায়িকারা হলেন জাতির বিবেক। নায়ক গোলাম রসুল একাই একশো জন অপরাধীকে ধরাশায়ী করে সিনেমায় যেমন হিরোইজম তৈরি করেন, সেই গোলাম রসুলের বাস্তব জনপ্রিয়তা আকাশ সমান। ফ্যানরা তাকে সত্যিই কতটা ভালোবাসেন সেটা মনে হয় আপনারা জানেন না! আর নায়িকা এলিজার নাচের ভক্ত কত সহস্র তা ভেবে দেখেছেন! আরে ভাই, (মামলাকারীর পক্ষের আইনজীবীর উদ্দেশ্যে) আপনি একবার ভেবে দেখেছেন, সাম্যবাদীদের দেশ রাশিয়া আর ধর্মের দেশ সৌদি আরবেও এখন বলিউড-হলিউড ঢুকে গেছে! চুমুর দৃশ্য আর কোনো আলোড়ন তোলে না! আর আপনারা আমাদের জনপ্রিয় দু’জন সেলিব্রেটির একান্ত সময়ের এক মিনিটের ভিডিও পেয়ে বড় গোস্বা হয়ে গেলেন! কেনরে ভাই আর কাজ নেই?

এবার মামলার পক্ষের আইনজীবী চিৎকার করে উঠেন, অবজেকশন ইউর অনার।

বিচারক হাতুড়ি পিটিয়ে বলেন, অবজেকশন অভার রুল। আপনি বলুন, মুশফিক সাহেব। আদালতের এসব বাদানুবাদ আমার ভেতরে কোনো ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে না। বরং পুরোটা সময়জুড়ে বাবুর কাছে মনটা পড়ে থাকে। হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণাক্লিষ্ট তার মুখ ভেসে ওঠে বারবার। রিনি কীভাবে যে সামলাচ্ছে। 

আদালত থেকে বেরিয়ে সোজা ডিআরইউতে চলে আসি। মনমেজাজ খুবই খারাপ। কিছু ভালো লাগছে না! রিনি এরই মধ্যে দু’বার ফোন করে হাসপাতালে ডেকেছে। বলেছে, ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলা দরকার। বাবুর জ্বর কমছে না! নিউজটা লিখতেও ইচ্ছা করছে না, কিন্তু বিকল্প কোনো উপায় নেই! মিডিয়া রুমে বসে যখন লেখা শুরু করলাম, তখনই কেউ একজন বলল, প্রেস ক্লাবে আইনমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন বিকাল ৫টায়। সম্মেলন কাভার করে হাসপাতালে যেতে হলে বেশ রাত হয়ে যাবে, তখন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের দেখা পাওয়া মুশকিল! এসব ভেবে নিউজটা লিখে অফিসে মেইল করে চিফ রিপোর্টারকে ফোন দিলাম- ভাই, ছেলেটার ডেঙ্গু হয়েছে, হাসপাতালে ভর্তি। জ্বর কমছে না। সেখানে যাওয়া দরকার। যদি আইনমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনটা অন্য কাউকে দিয়ে কাভার করাতেন ভালো হতো।

চিফ রিপোর্টার রেগে গেলেন। বললেন, না। অন্য কেউ তোমার মতো করে আইনমন্ত্রী কাভার করতে পারবে না। ওটা কাভার করেই হাসপাতালে যাও।

রাগে-দুঃখে মনটা বিগড়ে গেল! ক্যান্টিনে গিয়ে এককাপ চা খেয়ে মনে হলো, সারাদিন পেটে কিছু পড়েনি। ডাল-ভাত খেলাম অনিচ্ছা সত্ত্বেও। রিনিকে ফোন করে পরিস্থিতি বুঝিয়ে বললাম। যাচ্ছেতাই গালাগালি করল। ও এরকম করলেও এই প্রথম আমার খারাপ লাগল না। বরং কীভাবে বাবুর কাছে পৌঁছাব সে জন্য মনটা আকুলি-বিকুলি করতে লাগল।

 

পাঁচ

হাসপাতালে ভর্তির পর একদিন, দুদিন করে ১০ দিন চলে গেল। জ্বরটা বেশ কমলো- ভাবলাম সেরেই বুঝি উঠলো আমাদের ছেলেটা। না, এরপর ২৩ জুলাই হঠাৎ করেই তার রক্তচাপ ৬০/৪০-এ নেমে গেল, হৃদস্পন্দন-৫২। আঁতকে উঠলাম, এখন কী হবে! ডাক্তার ইসিজি করালেন, বললেন কোনো উন্নতি নেই। বাবু দ্রুত নেতিয়ে পড়ছে। সেদিন রাত ৩টায় ডিউটি ডাক্তার ডেকে বললেন,  আপনার ছেলেকে যেখানে শিশুদের আইসিইউ সাপোর্ট আছে এমন হাসপাতালে নিয়ে যান। এতো রাতে কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। গোটা তিরিশেক ফোন করলাম। গভীর রাতে বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা চেয়ে বিপদের কথা বললাম। না, কেউ-ই তেমন কিছু করতে পারল না। ভোর ৫টায় খোঁজ পেলাম, বনানীর বেবি হেলথ কেয়ার ক্লিনিকে শিশুদের আইসিইউ আছে। ছুটলাম সেখানে, ডাক্তার দেখলেন। বললেন, আপনার ছেলের বয়স ১০ প্লাস হলেও তার ওজন ৩০ কেজি। তাই পিআইসিইউতে না রেখে আইসিইউতে রাখেন। আসলে বাবুর বয়সের তুলনায় ওজন একটু বেশি হওয়ায় ডাক্তার এ পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু মাথায় কুঠারাঘাত পড়ল যখন শুনলাম- এখানে ভর্তি করাতে ৪০ হাজার টাকা ডিপোজিট করতে হবে। এ ক’দিনে যে খরচ গেছে, নতুন করে একসঙ্গে এতো টাকা কীভাবে ম্যানেজ করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু বাবুর জন্য আমার চেয়ে রিনিই যেন প্রাণটা সঁপে দিতে একধাপ এগিয়ে। বিয়ের গয়না বেচে হাসপাতালের ডিপোজিট জমা দিল।

পরের দিন জানতে পারলাম, এ হাসপাতালে আইসিইউতে থাকলে দিনে প্রায় ৪০ হাজার টাকা বিল দিতে হবে- যা আমাদের পক্ষে বহন করা একেবারেই অসম্ভব। তাই আবারও পিআইসিইউ খুঁজতে লাগলাম। আবারো অন্তত অর্ধশত ফোন। ২৫ জুলাই বিকেল বেলা আরেক হাসপাতালে যোগাযোগ করে, জরুরি বিভাগে দেখিয়ে আইসিইউতে ভর্তি করলাম। যতবার ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করি- ওর কি এখন আইসিইউ লাগবে? ততবার তিনি বলেন, এটা রোগীর অভিভাবকের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে! কিছুক্ষণের মধ্যে আইসিইউতে তার চেয়ে বড় আরেকজন ডাক্তার বাবুকে দেখে গেলেন। একটু পরে আমাকে ডেকে নিয়ে জানালেন, এই শিশুকে আইসিইউতে নয় পিআইসিইউতে নিতে হবে।

শুনেই আমার মাথায় বাজ পড়লো। আমার অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে আর কত দৌড়াবো? সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না কী করবো? কারণ কোথাও যে পিআইসিইউ খালি নাই। অনেক খুঁজে পেলাম আরেক ঠিকানা। সেখানে ছুটবো, কিন্তু এই হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ কোনো সেবা না দিয়েই তাদের পারিশ্রমিক ৮ হাজার টাকা চার্জ করল। তখন কিছুই করতে পারিনি। মুখ বুজে টাকা দিয়ে আমার অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে আরেক হাসপাতালে দ্রুত ভর্তি ছুটলাম।

নতুন হাসপাতালে, দেখেশুনে, বুঝে, বারবার জিজ্ঞেস করে ভর্তি করলাম আমার বাবুকে। এবার পি(প্যাডিয়াট্রিক)আইসিইউতে আমার সন্তান, ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে ভর্তি। অনেক আশা নিয়ে অপেক্ষা করছি- এবার আমাদের প্রাণপ্রিয় বাবু সুস্থ হবে, হাসিমুখে বাসায় ফিরবে। পিআইসিইউয়ের পাশেই একটু দূরে একটা কেবিনে দুশ্চিন্তায় আমার আর রিনির নিদ্রাহীন প্রহর কাটে, কারণ বাবুর রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন কোনোভাবেই স্বাভাবিক হচ্ছে না। ২৯ জুলাই অবস্থা আরও খারাপ হলো, রক্তচাপের সঙ্গে যোগ হলো ফুসফুসে পানি জমা। দিনরাত্রি একাকার হয়ে গেল। অফিসের ছুটিও শেষ হয়ে আসছে। কিন্তু কোনো অগ্রগতি নেই বাবুর! আর কোথায় নেব আমাদের বাবুকে, কার কাছে গেলে সে ভালো হবে।

৩০ জুলাই ভোরের আলো কেবল ফুটতে শুরু করেছে, ডাক্তার ডেকে পাঠালেন আমাদের। বললেন, সরি, আপনাদের ছেলে আর নেই। নিমিষে চারপাশটা ঢেকে গেল নিকষ অন্ধকারে।


ঢাকা/তারা