ঢাকা, সোমবার, ২২ আষাঢ় ১৪২৭, ০৬ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

ঠিক পথে গালিব এসে যেত যদি...

মুম রহমান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-২৭ ৪:৪৮:০৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-২৭ ৬:১৫:২৭ পিএম
মীর্জা গালিব (১৭৯৭-১৮৬৯)

আজ থেকে ঠিক ২০২ বছর আগে আগ্রায় জন্মেছিলেন তিনি। ফার্সি ভাষায় কবিতা লিখতেন। পরে মোগল সাম্রাজ্যের শেষ নবাব বাহাদুর শাহ্‌ জাফরের রাজ দরবারে যোগ দিয়ে উর্দুতে কবিতা লিখতে শুরু করেন। কিন্তু জীবনভর বেদনা ভোগ করেছেন তিনি। দেখেছেন মোগল সাম্রাজ্যের পতন আর ইংরেজদের উত্থান। একদিকে তাঁকে পীড়িত করেছে ইংরেজদের অধিগ্রহণ, অন্যদিকে তাকে কুড়ে কুড়ে খেয়েছে দারিদ্র্য। দুরূহ কবিতা লিখেছেন বলে তাঁর সময়ে পাঠকপ্রিয় হননি। কিন্তু আজ দুই শতক পেরিয়ে তিনি বিশ্বে সমাদৃত কবি। তাঁর কবিতার পঙ্‌ক্তি কবিতাপ্রেমীদের মুখে মুখে ফেরে।

মীর্জা আসাদুল্লাহ বেগ খানকে আমরা সবাই ‘মীর্জা গালিব’ নামেই চিনি।

মুশকিলপ্রেমী কবি গালিবের জীবনও কেটেছে চরম মুশকিল, বেদনা আর হতাশায়। তবু তিনি রসিকতা ছাড়েননি। তাঁর কবিতাতেও বেদনা আর রসিকতা পাশাপাশি ঠাঁই পেয়েছে। নিজেকে নিয়ে এবং নিজের বেদনা, যন্ত্রণা নিয়ে তাঁর মতো করে কেউ মজা করতে পারেননি। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছেন। বাবা মীর্জা আব্দুল্লা বেগ খান লখনৌতে এসেছিলেন হায়দারাবাদের নিজামের দরবারে কাজ করতে। গালিবের দাদা মীর্জা কুকান বেগ খান ছিলেন তুর্কিস্তানী। উজবেকিস্তানের সমরখন্দের বাসিন্দা ছিলেন। আয়-রোজগারের আশায় ভারতবর্ষে এসেছিলেন।

আগ্রায় জন্ম নেয়া গালিব নিজেও রাজকবি হয়েছিলেন। কিন্তু রাজার দেয়া কাজ (ইতিহাস রচনা করা) বাদ দিয়ে কবিতা লিখতেন। আড্ডা ও পানাহারে ব্যস্ত থাকতেন। বেঁচে থাকার জন্য বা দুটো খানাদানার জন্য কখনোই কোন কাজ করেননি তিনি। বন্ধুরাই তাঁকে দেখত। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন নবাব ইলাহী বকশের কন্যা ওমরাও বেগমকে। এই বিয়েকে গালিব জেলখানা বলে উল্লেখ করেছিলেন। সাত সন্তানের জনক ছিলেন তিনি। কিন্তু একজন সন্তানও দীর্ঘজীবি হয়নি। একজন সর্বোচ্চ ১৫ মাস বেঁচেছিল। এরপরও কবিতাই ছিল গালিবের বেঁচে থাকার প্রেরণা।

উর্দু কবিতা, গজলকে গালিব নতুন মাত্রা দিয়েছেন। তাঁর মাধ্যমেই শুধু প্রেম আর বেদনার গীত হয়ে থাকেনি উর্দু গজল। তিনি গজলকে দার্শনিক শক্তি দিয়েছেন। নতুন ভাব আর ভাবনার প্রয়োগ করেছেন। তিনি বলতেন, ‘আমি চেষ্টা করি এমন কিছু লিখতে যা পড়লে মানুষ খুশি হবে। (ম্যায় কোশিশ কর্তা হু কে ক্যা এইসা বাত লিখু যো পড়েহ খুশ হো যায়ে)।

একাধিক কবিতায় নিজেকে তিনি গালিব (বিশিষ্টতম) এবং আসাদ (সিংহ) নামে অভিহিত করেছেন। মোগল সাম্রাজ্যের শেষ উজ্জ্বল নক্ষত্র মীর্জা গালিব শুধু ভারত, পাকিস্তান, পারস্য নয় বিশ্বের বহু দেশের কবিতাপ্রেমীদের আদরের কবি। নিজের সময়ে অতো জনপ্রিয় না-হলেও পরবর্তীকালে গালিব বিশ্বে অন্যতম সেরা উর্দু ও ফার্সি কবি হিসেবে আলোচিত হয়েছেন।

গালিবের নির্বাচিত ২৫টি শের:

*
ও জিজ্ঞেস করছে, গালিবটা কে?
কেউ কি বলে দিবে, নাকি আমাকেই বলতে হবে?

*
আমি মানলাম, গালিব কিছুই নয়
মাগনা পাওয়া গেলে মন্দই বা কী?

*
হৃদয়ই তো, ইট-পাথর তো নয়, ব্যথায় ভরে উঠবে না কেন?
আমি কাঁদব হাজারবার, কেউ আমারে জ্বালায়-ই বা কেন?

*
মন্দিরে নয়, মসজিদে নয়, দুয়ারে নয়, কারো ঘরেও নয় জেনো
আমি বসে আছি পথের ধারে, তাহলে আমাকে উঠাবে কেন?

*
জীবন তো এমনিতেই কেটে যেত
কেন তোমার পথের কথা মনে এল?

*
তোমার গলিতে আমাকে দাফন করো না ওগো ঘাতক
আমার ঠিকানা খুঁজতে এসে লোকে খুঁজে নেবে তোমার ঘর।

*
কোনো আশা তো পূর্ণ হয় না
কোনো চেহারা তো নজরে আসে না।

*
আগে হৃদয়ের হাল দেখে হাসি আসত
এখন কোনো কিছুতেই হাসি আসে না।

*
আমি ওখানেই আছি যেখান থেকে
নিজেই নিজের কোনো খবর পাই না।

*
যদি আমার ভাগ্যে লিখেছিলে বেদনা এতোই
হে রব, তবে আরো কয়েকটা হৃদয় দিলেই তো হতো।

*
তাকে দেখে যে চমক আসে আমার মুখে
তাতে ও ভাবে রোগীর অবস্থা ভালোই আছে।

*
দয়া করে আমাকে ডেকে নিও যখন চায় মন
আমি তো বিগত সময় নই যে ফিরে আসতে অক্ষম।

*
ঠিক পথে গালিব এসে যেত
আর কিছুদিন যদি বেঁচে থাকত।

*
প্রেমই তো গালিবকে অকর্মা করে দিলো
নইলে আমিও তো কাজের লোকই ছিলাম।

*
সহস্র আকাঙ্খা এমন যে প্রতিটি আকাঙ্খাতেই প্রাণ যায়,
অনেক পূর্ণ হয়েছে আমার আশা তবু মনে হয় কমই হলো।

*
ভালোবাসার শুরুতেই কাঁদো কেন তবে
আগে আগে দেখ আর কী কী হবে...

*
হৃদয়ে অজস্র অতৃপ্ত বেদনার দাগ বারবার মনে পড়ে যায়
হে আমার খোদা, আমার কাছে আমার পাপের হিসাব চেয়ো না।

*
ভালোবাসার উপর জোর খাটে না- এ এমনই আগুন গালিব
যা লাগালেও লাগে না আর নেভালেও নেভে না।

*
আমি তো তোমার নামের আশিক
চিঠি লিখব খামাখাই, কোনো মতলব ছাড়াই।

*
ডাকবাহক ফিরে আসার আগেই আরেকটা চিঠি লিখে ফেলেছি
জানতাম, আমার আগের চিঠির জবাবে সে কী লিখতে পারে।

*
জেনেশুনেই হৃদয় দিয়েছ, এখন কেন তাকে বিশ্বস্ত ভাবছ?
কাফেরকে তুমি মুসলমান ভেবেই ভুল করেছ।

*
বুলবুলের কাণ্ডকারখানা দেখে হাসছে এখন ফুল
যাকে আদতে প্রেম বলে সে তো মগজের গণ্ডগোল।

*
মজনু আর কী করেছিল, তোমাকে আমি দেখিয়ে দিতাম
কেবল বেদনার সুরা পান থেকে যদি একটু অবসর পেতাম।

*
নাদান দিল তোর হলোটা কী
আদতে এই ব্যথার ওষুধই-বা কী?

*
আমার তো তার প্রতিই বিশ্বস্ততার আশা
যে জানে না বিশ্বস্ততা কী জিনিস?

*
জিজ্ঞেস করো না তোমার পেছনে আমার কী অবস্থা
বরং তুমি দেখ কী রং খেলে যায়- যখন আমার সামনে তুমি।


ঢাকা/তারা