ঢাকা, সোমবার, ২২ আষাঢ় ১৪২৭, ০৬ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

আমি মুখরতার ভিতর নিঃসঙ্গ

নাসরীন জাহান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-০৯ ৬:১৯:৫৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৬-০১ ১২:২৯:২০ পিএম

আমার ভিতরে শান্ত, অস্থির আর নিঃসঙ্গ একটা মানুষ বাস করে। যে কোনো কারণেই সে একা। মানুষ বেশি বলে নিজেকে প্রকাশ করার জন্য, আবার কেউ কেউ বেশি বলে নিজেকে লুকানোর জন্য- আমি দ্বিতীয় কারণে লিখি। বেশি বলি-বেশি লিখি নিজেকে লুকানোর জন্য। তারপরও আব্বা লেখক হিসেবে আমাকে যে আসনে দেখতে চেয়েছিলেন, আমি সেখানে পৌঁছাতে পারিনি।

অনেকে আমাকে ‘উড়ুক্কু’ ‘আড্ডাপ্রিয় লেখক’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। জানাশোনা, হৃদ্যতা আছে এমন মানুষের সঙ্গে আড্ডা দিতে ভালো লাগে। আবার নতুন কারও সঙ্গেও আড্ডায় মেতে উঠতে পারি যদি টিউন মিলে যায়। যার সঙ্গে টিউনে মেলে না, তার সঙ্গে পাঁচ মিনিটের বেশি কথা বললে আমার মনে হয় জ্বর উঠে যাচ্ছে। আমি জানি আড্ডায় চিন্তার বিনিময় একজন লেখকের জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তির লালিত ধারণায় শান দেয় আড্ডা। গ্রাম থেকে আসার পর ঢাকায় যে জীবন শুরু হয়েছিল সেখানে দারুণ এক আড্ডা দেয়ার সুযোগ তৈরি হয় আমার। কাজল শাহনেওয়াজ, সেলিম মোর্শেদ, পারভেজ হোসেন- এদের সবার সঙ্গে একটা সম্পর্ক গড়ে উঠল। আমার তখন খুব ইচ্ছা করত ‘সংবেদ’-এ আমার লেখা যাক। ওদের সঙ্গে তখন আমি নিয়মিত কথাবার্তা বলি; বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে ধারণা আমূল পাল্টে গেল। ম্যাজিক রিয়ালিজম, সুরিয়ালিজম- এসব বুঝতে পারলাম। আমি তখন ওই ধারাতেও লিখতে শুরু করলাম। আট-নয়জন ছেলের মধ্যে আমি মেয়ে, সাহিত্য আড্ডা দিতাম। আমাকে কেউ আলাদা করে দেখার সুযোগ পেত না। এক ইঞ্চি ছোট বা বড় মনে করত না। আমি লড়াইটা ওভাবেই করতাম যে, আমি তোমাদের লেভেলের। ওরাও সেভাবেই কাউন্ট করত। আমাদের সাপ্তাহিক আসর বসতো, আসরে গল্পপাঠ হতো। কার গল্প ভালো হলো, কারটা ভালো হলো না, কেন হলো না- এসব আলোচনা হতো। ওই দিনগুলো আমার জন্য সাংঘাতিক প্রেরণার।

একবার পারভেজ হোসেন ‘সংবেদ’-এ আমার গল্প ছাপানোর ব্যবস্থা করল। তখন সাহিত্য আসরের অন্যসব বন্ধুরা বলল, দেখ নাসরীন- বন্ধুত্ব এক জিনিস, এথিকস আরেক জিনিস। আমরা যারা লিটলম্যাগ করি আমরা তো বড় কাগজে লিখি না। তুমি বড় কাগজে লিখবে; পারভেজ হোসেন কেন বড় কাগজে তোমার লেখা ছাপবে?

পারভেজ হোসেন ওদের কথার উত্তরে বলেছিল, আমরা লিটলম্যাগে লিখি কারণ বড় কাগজ আমাদের গল্প ছাপবে না। সিরিয়াস ধারার গল্পগুলো বড় কাগজ ছাপতে চায় না। তারা বাজারি লেখা চায়। কিন্তু নাসরীনের লেখা সিরিয়াস ধারার হলেও তারা ছাপবে। নাসরীন একমাত্র ব্যতিক্রম।

সেলিম মোর্শেদও একই কথা বলেছিল। তখন সেলিম মোর্শেদ লিটলম্যাগের গুরু। সে প্রচণ্ডভাবে আমার প্রশংসা করে বলত, যুগে যুগে এক একজন ব্যতিক্রম থাকে। নাসরীন জাহান একজন ব্যতিক্রম লেখক। বড় কাগজে সে সিরিয়াস ধারার লেখা লিখলেও তারা সেটা ছাপে। তো আমরা এখানে লেখাটাকে গুরুত্ব দিলাম, লেখককে না। বন্ধুরা বড় কাগজে লেখা নিয়ে প্রথমে প্রশ্ন তুললেও পরে মেনে নিয়েছিল। এভাবে একইসঙ্গে বড় কাগজ ও লিটলম্যাগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাই।

আমার আব্বা কোষ্ঠী গণনা করাতেন। ছোটবেলায় আমারও কোষ্ঠী গণনা করানো হয়েছিল, আমার কোষ্ঠীতে লেখা ছিল, কবিত্ব-সাহিত্যগুরু। এই ভবিষ্যদ্বাণী আব্বার মাথায় গেঁথে গিয়েছিল। আমার আব্বা প্রচণ্ডরকম বোহেমিয়ান। আমার ক্লাসের লেখাপড়া নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা ছিল না, কিন্তু কবে লিখতে শুরু করব- এনিয়ে খুব তাড়া দিতেন।

রবীন্দ্রনাথকে খুবই মান্য করতেন, মানে পীরের মতো জানতেন। আমি তখন মাত্র ক্লাস ওয়ানে পড়ি, ঠিক অবুঝের মতো মাকে বলতেন,  নাসরীন এখনো লেখা শুরু করে না ক্যান, ও না কবিত্ব-সাহিত্যগুরু। মনে আছে, আব্বার এই আচরণে আমার খুব দুঃখ হতো। আব্বা অধৈর্য হয়ে গেলেন, আমি যখন ক্লাস ফোরে, তখন হাল ছেড়ে দিলেন- লেখার জন্য আর বলতেন না। তখন বলতে শুরু করলেন, এই মেয়েকে দিয়ে লেখা হবে না, আসলে কোষ্ঠীতে ভুল ছিল!

আমাকে তখন ঢাকায় বটমলি হোমসে পাঠিয়ে দেয়া হলো। ফুফু আমাকে নিয়ে এলেন। তার একটা মেয়ে ছিল, মেয়ের বন্ধু দরকার তাই বলে আব্বাকে বুঝিয়ে আমাকে নিয়ে এলেন।

মনে মনে তখন আব্বার সঙ্গে চ্যালেঞ্জ চলছিল, লিখতে আমাকে হবেই। প্রথমে শব্দ টুকে রাখতে শুরু করলাম, শব্দের সঙ্গে শব্দ মেলাতাম। যেমন আলোর সাথে ভালো, নীলের সাথে ঢিল। হাতে তালি দিয়ে দিয়ে ছন্দ ঠিক করতাম। তারপর একটি ছড়া লেখা হলো। ছড়াটা আমার এক বান্ধবী দেখে ফেলে, আমি বললাম কাউকে বলো না। কিন্তু ও মিসদের বলে দিয়েছিল।

যাইহোক, বটমলি হোমস খ্রিস্টানদের পরিচালিত স্কুল। ওখানে বসন্ত উৎসব হতো। উৎসবের দিন কবিতা পাঠ করার জন্য মাইকে আমার ডাক পড়ল, আমি তো উধাও! পালিয়ে গিয়েছিলাম।

ছড়াটা আব্বাকে দেখানোর সাহসও পেলাম না, আব্বা মনে করতেন- লেখা হতে হবে রবীন্দ্রনাথের লেখার মতো। মানে, তার মাথা এতটা খারাপ!

ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় আবার ময়মনসিংহ চলে যাই। তখন আমি একটু একটু করে ছড়া লিখি। স্কুলের বান্ধবীরা কেউ কেউ জানত। আব্বার কানেও গেল, সেই কথা। আব্বা আমার লেখা দেখে বলেছিলেন, কিছুই হয়নি। আরো আরো বই পড়ো। ভালো ভালো বই পড়ো। লাইব্রেরিতে যাও, পাঠাগারে যাও। আড্ডা দাও, আলোচনা করো। নিজেকে সমৃদ্ধ করো। পাস করো, ভালো রেজাল্ট করো- এইসব কখনো বলেননি, তারপর আর কোনো দিনই আমার ক্লাসের রেজাল্ট নিয়ে চিন্তা ভাবনা হতো না।

আমার বান্ধবী পারভীন সুলতানার সঙ্গে বিভিন্ন লাইব্রেরিতে যাওয়া শুরু করলাম। পারভীন সুলতানা হচ্ছে রাহাত খানের ভাগনি। পারভীনও লেখালেখি করত- আমার চেয়ে এগিয়ে ছিল সে।

বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ‘শিশু’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা বের হবে। সেই সময় সারা দেশের স্কুলের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে লেখা আহ্বান করল ওরা। আমার শিক্ষক আমাকে বললেন, তুমি একটি গল্প দাও। স্কুলে আমাকে আর পারভীন সুলতানাকে ছাড়া আর কাউকে লেখার জন্য পাওয়া যাচ্ছিল না। দু’জনের মধ্যে ওকে বলল ছড়া লিখতে আর আমাকে গল্প লিখতে। বললাম, আমি তো কোনোদিন গল্প লিখিনি। শিক্ষক বললেন, যে ছড়া লিখতে পারে সে গল্পও লিখতে পারবে। একদম জোর দিয়ে কথাটা বলেছিলেন তিনি।

এ রকম একটা গল্প লিখলাম যে, শান্তা নামের একটি মেয়ে খুব অসুস্থ, সে জানালার পাশে তাকিয়ে থাকে, দুধওয়ালাকে দেখে, মানুষ দেখে। মেয়েটি একটি গল্প লেখে। তার ইচ্ছা মৃত্যুর আগে গল্পটি প্রকাশ হবে; এটি সে দেখে যাবে। মেয়েটি যে গল্প লিখছে ওটাই কিন্তু গল্প। শেষ করলাম এভাবে- গল্পটি যখন ছাপা হলো তখন ডাক্তার এলেন, মেয়েটির মুখ কালো দেখালো। এখানেই শেষ। গল্পটির নাম দিয়েছিলাম ‘ছাপানো গল্পটা’।

‘শিশু’ সংখ্যাটি দেশজুড়ে সাড়া ফেলেছিল। এরপর আমি ‘কিশোর বাংলা’, ‘নবারুণ’-এ লেখা দিতে শুরু করলাম, ছাপাও হতে শুরু করল।

আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। সবচেয়ে বড় প্রেরণার ছিল যে, কবি নাসির আহমেদ আমাদের পারিবারিক আত্মীয় ছিলেন। তিনি ঢাকা থেকে প্রায়ই আমাদের বাসায় আসতেন। তিনি বললেন, কিশোর বাংলায় তোমার যেসব লেখা ছাপা হয়, তোমার লেখা পড়ে মনে হয় না এটা বাচ্চাদের লেখা- বড়দের লেখা মনে হয়। তুমি বড়দের কাগজে লিখতে পারো। শুধু তাই না, আরও বললেন ‘দৈনিক বাংলা’য় লেখ। তখন কবি আহসান হাবীব ছিলেন সাহিত্য সম্পাদক। তার সম্পাদনায় আমার লেখা ছাপা হলো। তখন কলকাতার ‘দেশ’-এ লেখা ছাপা হওয়া আর আমাদের দেশে ‘দৈনিক বাংলা’য় লেখা ছাপা হওয়া একই ব্যাপার। পরপর আমার তিনটি গল্প ছাপা হলো।

ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেয়ার পর সেই লেখার সম্মানী আনতে গিয়েছিলাম। শাড়ি পরে বয়স বাড়ানোর একটা চেষ্টা ছিল-  শাড়ি পরেই গিয়েছিলাম। পত্রিকা অফিসে গিয়ে হাবীব ভাইয়ের রুমে যখন ঢুকছি তিনি বললেন, কী চাই? উনি ভেবেছিলেন, পেছনে ‘সাত ভাই চম্পা’র সম্পাদক বসে, তার কাছে গিয়েছি। তিনি আমাকে রুম দেখিয়ে দিচ্ছিলেন।

আমার তখন ভেতরে ভেতরে গর্ব। বললাম যে, আমি আপনার কাছেই এসেছি। তিনি বললেন, আমার কাছে মানে, তুমি আমার নাম জানো?

বললাম, জানি। আপনি কবি আহসান হাবীব।

বললেন, এদিকে এসো। তুমি আমার কাছে কেন এসেছ?

বললাম, আমি সম্মানী নিতে এসেছিলাম। অ্যাকাউন্টস থেকে বলছে, আহসান হাবীবের স্বাক্ষর নিয়ে এসো। আপনার স্বাক্ষর ছাড়া ওরা সম্মানী দিবে না।

অবাক হয়ে বললেন, আশ্চর্য! এখানে তোমার কী লেখা ছাপা হবে। কোন লেখার বিল? যাও। ‘সাত ভাই চম্পা’ বিভাগে গিয়ে কথা বলো। আমি স্কুলপড়ুয়া কারো লেখা ছাপি না।

বললাম, এরকম তো কোনো নিয়মাবলি দেখিনি কোথাও। আপনার পাতায়ই আমার লেখা ছাপা হয়েছে, আমি নাসরীন জাহান। তিনি প্রথমে চুপ হয়ে গেলেন। তারপর আমার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, তুমি! এসব লেখা তুমি লিখেছ?

ওই তিনটি গল্পের মধ্যে একটি গল্প ছিল এরকম যে, একটি মেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বিয়ে হওয়ার একমাস আগে মেয়েটি তার প্রেমিকের সঙ্গে মিলিত হয়েছিল। প্রেমিকের সন্তান ছিল মেয়েটির গর্ভে। বিয়ের পর স্বামী জানে পেটের সন্তানটি তার। মেয়েটি গর্ভধারণের সময় একমাস পিছিয়ে বলেছিল। স্বামী না জানলেও মেয়েটি তো জানত সন্তানটি কার। ওদিকে স্বামী ছিল খুবই ভালো। সন্তানকে নিয়ে তার নানা স্বপ্নের কথা বলত- সন্তানটি দেখতে কার মতো হবে এ নিয়েও কথা বলত। মেয়েটি স্বপ্ন দেখে, হরিণেরা তার সন্তানটিকে তুলে নিয়ে গেছে। নীল নামের একটি বিড়াল ছিল, তার জন্য একটি মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে নীল হয়ে মারা গেল। মেয়েটি ভাবে গর্ভের সন্তান জন্মের পরপরই সে মেরে ফেলবে। স্বামীকে সে ঠকাবে না।

আহসান হাবীব আমাকে বলেছিলেন, তুমি কি অনেক বই পড়ো? বললাম, হ্যাঁ। সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ্, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এদের লেখা পড়েছি।

শুনে বলেছিলেন, পৃথিবীর কোনো কিছুর বিনিময়ে লেখাটা ছাড়বে না। কারণ, লেখাটা তোমার রক্তে। মেয়েরা সংসারের কারণে লেখা ত্যাগ করে। তুমি প্রয়োজনে সংসার ত্যাগ করবে, লেখা নয়।

সেই পেয়েছিলাম গভীর অনুপ্রেরণা।  জীবনে অনেক চড়াই-উৎরাই গেছে, এই কথাটি মনে পড়েছে আর আমি নিজেকে আরো নিজের অবস্থানে থাকার নির্দেশ দিয়েছি। লেখা ছাড়িনি।

মাকে বলেছিলাম, সাহিত্য করে এমন কাউকে ছাড়া আমি বিয়ে করব না। মাত্র ম্যাট্রিক পাস করেছি, আব্বা হঠাৎ প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হলেন। মায়ের তত্ত্বাবধানে আমার বিয়ে হলো। লেখা ছাড়ার মতো পরিস্থিতি যে কখনো তৈরি হয়নি, তা নয়। আমার নয়জন ননদ-দেবর। বড় পরিবার হলে যেটা হয়, বারো মাসেই পরিবারে আত্মীয়-স্বজনের উপস্থিতি লেগেই থাকে। বিয়ে হয়েছে কম বয়সে। তখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি, লালমাটিয়া মহিলা কলেজে ক্লাস করতাম। ক্লাস শেষে বাজার করে ঘরে ফিরতাম। ফিরে ঘরের অন্যান্য কাজ করতে করতে রাত হতো- এরপর রাত জেগে লিখতাম-পড়তাম। ঘুম হতো খুবই কম। সেই থেকে আমার ইনসোমনিয়া হয়ে গেছে। ওইটাই তো লেখা ছাড়ার পরিবেশ। ওই বয়সে আমি সারারাত জেগে ভোরে একটু ঘুমাতাম। কিন্তু রোগ তো বয়ে বেড়াচ্ছি, ঘুমানোর চেষ্টা করেও ঘুমাতে পারি না। বর্তমানে এমন অবস্থা হয়েছে, ঘুমের ওষুধ পাঁচটি খেয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করি।  এ কথা ডাক্তারকে বলি না, এমন কথা শুনলে তো আর কোনো ডাক্তার চিকিৎসা করতে চাইবেন না। কিন্তু ওষুধ খেয়ে ঘুমানোর অভ্যাস হয়ে গেছে। তবে একথা বলতেই হয়, লেখা ছাড়ার যতো না কারণ আমার জীবনে এসেছে লেখা ধরে রাখার উপলক্ষ্য এসেছে তার থেকে অনেক অনেক বেশি বার- নানা ভাবে।

মা ছিলেন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বন্ধু। মা আমাকে লেখালেখি করার জন্য কখনো চাপাচাপি করতেন না। তিনি দেখতেন, বাবার সংসার নিয়ে কোনো চিন্তা নেই কিন্তু আমার লেখালেখি নিয়ে চিন্তা করছেন। বাবা ছিলেন উদাসীন। এমন হয়েছে একলাখ টাকা মূল্যের জমি দশ হাজার টাকায় বিক্রি করে কয়েক দিনের জন্য উধাও হয়ে যেতেন। আমাদের ছয় ভাইবোনকে নিয়ে বিপদে পড়ে যেতেন মা। তখন সংসার চালানোর জন্য মামার কাছে গিয়ে টাকা চাইতেন। আমি কাছ থেকে দেখেছি, কষ্ট পেতাম অনেক। মাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে, শুধুমাত্র আব্বার ভুলের জন্য। প্রচুর সম্পত্তি থাকার পরও আমাদের দিন কেটেছে কষ্টে। আব্বার হার্টের রোগ ছিল, বাড়িতে গরুর মাংস রান্না করা হতো না। আব্বা আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি চলে যেতেন। সেখান থেকে ঠিকই গরুর মাংস খেয়ে চলে আসতেন। মানুষের ওপর সাংঘাতিক প্রভাব বিস্তার করতে পারতেন।

আপাতদৃষ্টিতে আব্বাকে দোষী করা যায়, কিন্তু আব্বার বোহেমিয়ান স্বভাব কি আমি পাইনি? পেয়েছি। আবার মায়ের সংসারী স্বভাব-ঝামেলা পোহানোর স্বভাবও পেয়েছি। দুই সত্তা মিলেই আমি নাসরীন জাহান। তারা দুজনেই আমার লেখায় এসেছেন, ছায়া ফেলেছেন।  মায়ের কাছে শুনেছি, তিনি বিয়ের আগে প্রেমে পড়েছিলেন। এমন সংসারী মানুষও সেই ফেলে আসা প্রেমের জন্য মাঝে মাঝে নিভৃতে কেঁদে ভাসাতেন। মায়ের সে প্রেমের গল্পও আমার জানা। মা আমার প্রাণের বন্ধু, তিনি কাঁদলে আমারও কান্না পেত।

বলে রাখি, সমাজে যা কিছু উচ্চারণ করা কঠিন তার একটি শব্দ হলো ‘পিরিয়ড’। আমাদের সময় আরো খারাপ অবস্থা ছিল, কিন্তু মা আমাকে অনেক কঠিনকে সহজে প্রকাশ করা শিখিয়েছেন। পিরিয়ড হবার আগেই এই সম্পর্কে সবকিছু আমি মায়ের কাছেই জেনেছিলাম, তাই প্রস্তুতিও ছিল। প্রথম পিরিয়ড হলো, ভয় পাইনি। মা শিখিয়েছেন। মায়ের সঙ্গে কথোপকথন চলেছে অবিরাম। আমার অনেক লেখায় প্রধান চরিত্র মা। আমার লেখা ‘ক্রশকাঠের কন্যা’য় লিখলাম- মা মারা গেল, মাকে স্কুলের মাঠের পাশে খাটিয়াতে রাখা হলো। উপরে বাতি জ্বলছে। পুরোরাত পার হলো। এই যে দৃশ্য আমি লিখলাম- সত্যিকার অর্থে আমার মা যখন মারা গেলেন, হুবহু একই দৃশ্য তৈরি হলো। মনে হলো আমি ‘ক্রশকাঠের কন্যা’র দৃশ্য দেখছি। মনে হচ্ছিল এই দৃশ্য আমি কেন আগেই রচনা করলাম!

আব্বা ছিলেন সুদর্শন। আমি আব্বার কাছে জেনেছি, তিনি একবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন- ওই আমলে এক নার্স আব্বাকে বলেছিলেন, আমাকে বিয়ে করতে হবে না, আপনি শুধু আমাকে একটা সন্তান দিন। আব্বার তখন প্যারালাইসিস। বিছানায় শুয়ে জীবনের অনেক কাহিনি আমাকে শোনাতেন। আব্বার জীবনে অনেক নারী এসেছেন, তাদের সম্পর্কে আমাকে বলেছিলেন। মা চাইতো আব্বা যেন ওসব গল্প আমাকে না শোনান। মায়ের আশঙ্কা ছিল, গল্প জানার পর আমি আব্বার প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলব। কিন্তু না, একেবারেই তা হয়নি। আব্বা বুঝতে পেরেছিলেন, লেখালেখিতে আমার মেধা অনেকখানি প্রস্তুত হয়ে গেছে। তিনি মূলত সৃজনশীল মেধার প্রতি ভালোবাসা থেকে সেসব গল্প আমাকে বলেছিলেন। যা পরবর্তীতে আমার ‘উড়ুক্কু’ লেখার সময় কাজে এসেছে।

‘সোনালি মুখোশ’ও আব্বার জীবনের গল্পদ্বারা আচ্ছন্ন। আব্বা তার জীবনে আসা এক নারীর প্রেমের গল্প শোনাচ্ছিলেন, বলতে বলতে এক সময় থেমে যান। আমি আব্বার হাত ধরলাম। বললাম, আব্বা আপনার আর কোনো সন্তান আছে? যদি থাকে আপনি আমাকে বলুন, তাকে আমি সারা জীবন দেখে রাখব। প্রেম থেকে যদি কোনো সন্তান হয়ে থাকে, এমন ঘটনা তো ঘটতেই পারে। কিন্তু তাকে রেখে যাওয়া, আর অস্বীকৃতির কষ্ট নিয়ে আপনি মরতে পারেন না।

আব্বা বললেন, না নেই।

কিন্তু আমি আমার প্রশ্নটাকেই এগিয়ে নিলাম বিষয় হিসেবে। শুধু তাই নয়, কখনো কখনো নিজের লেখা বা শেষ হওয়া গল্পও আরো বিস্তর রূপ দিয়েছি। এর মধ্যে ‘আঁধারে রঙিন রাখাল’ উপন্যাসটা লিখেছিলাম নিজেরই লেখা একটা গল্পকে প্রেক্ষাপট করে। মানে ক্যানভাসটাকে বড় করে ফেলার মতো। আমি কখনো ছবি আঁকি না, তবে ছবি থেকে পাঠ গ্রহণ করি। ছবিকেও আমার পাঠ্য মনে হয়। আমার লেখায় প্রচুর পেইন্টিংয়ের উপাদান থাকে। অনেক পেইন্টারের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপ-সখ্যও আছে।

‘স্থবির যৌবন’ প্রথম গল্পের বই। এর আগে অনেক লম্বা জার্নি আছে। এখন তো কোনো কোনো লেখক লেখে আর বই বের করে ফেলে। আমি যখন লিখতে শুরু করি, জাতীয় দৈনিকগুলোতে মহিলাদের জন্য আলাদা-আলাদা পাতা ছিল। আমি মহিলাদের পাতায় কোনোদিন লেখা প্রকাশ করিনি। আমি বলতাম, মহিলাদের পাতায় যারা লেখে তারা সারাজীবন মহিলা হয়েই থাকে। তারা ‘মহিলা সাহিত্যিক’ হয়, সাহিত্যিক হয় না।

আমি নারী এই সত্য অস্বীকার করার কিছু নেই। আবার দুর্বল ভাবারও কিছু নেই। ধরা যাক ঐশ্বরিকভাবে নারীর গায়ের শক্তি কম। মেনে নিচ্ছি, পুরুষেরও তো আলাদা আলাদা দুর্বলতা আছে। সে তো মা হতে পারছে না, এটা তার দুবর্লতা নয়?

নারীর মধ্যে একটা অপরূপ মায়া আছে। মাটির মায়ার সঙ্গে মিল আছে নারীর অবয়বের। নারী নান্দনিক। সুতরাং নারী বলে নিজেকে ঐশ্বর্যহীন-দুর্বল মনে করার কোনো কারণ নেই। আর যদি বুঝতেই হয়, নিজের দুর্বলতা বোঝার সঙ্গে সঙ্গে শক্তির জায়গাও বুঝতে হবে।

পৃথিবীটা পুরুষশাসিত। শাসক যখন শোষক হয়, তখন শোষিত যে সে প্রতিবাদ করবে। প্রতিবাদ না করলে সে তো মেরুদণ্ডহীন বলে বিবেচিত হবে। শোষণ করলে নারী হোক, পুরুষ হোক এক সময় সে প্রতিবাদ করবেই।

সঠিক প্রতিবাদ করেছিলেন বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামাল। কিন্তু তসলিমা নাসরীন কী করলো, যার সঙ্গে প্রেম করেছে, বিছানায় গিয়েছে। তাকে নিয়েই বই লিখে ফেলল। সে তো এক সময়ের প্রেমিকের প্রাইভেসি নষ্ট করেছে। এটাকে সাহস বলে না। সাহস এতো সস্তা জিনিস না। এই করে ‘নারীবাদ’ শব্দটা নষ্ট হয়েছে। সবাই মনে করে নারীবাদী মানেই তসলিমা নাসরীন। আমি বলি, নারী-পুরুষ একজন আরেকজনকে ভালোবেসে, শ্রদ্ধা করে পাশাপাশি থাকো। এজন্য ঢাকঢোল পিটিয়ে নারীবাদী হওয়া লাগে না, নিজের জায়গা থেকে লড়াইটা জারি রাখলেই চলে। আমি তো লেখায় আপস করিনি।

আমার মধ্যে আব্বার একটা বৈশিষ্ট্য আছে, মায়ের আর একটা বৈশিষ্ট্য আছে। তাদের বৈশিষ্ট্য আমাকে প্রভাবিত করেছে, আমার মনোভাব গঠন করে দিয়েছে। সেজন্যই নারীবাদ বলতে; তুমি আমাকে ইট মারলে আমি তোমাকে পাটকেল মারব- এই তত্ত্ব আমি বিশ্বাস করি না। আমার বিশ্বাস আমার লেখায় প্রতিফলিত। প্রতিটি বাক্যই কেবল নয়, দায়িত্বশীলতা-সচেতনতা থেকে লেখার চেষ্টা করি প্রতিটি শব্দ। শিল্প নির্মাণের যে শব্দ তা যেন শিল্পই হয়ে ওঠে, বিশ্বাস্য হয়ে ওঠে- কোনো শব্দ বা বাক্যকে হঠাৎ একটি যুক্তি এনেই যেন উড়িয়ে দেওয়া না যায়, এটুকু তো খেয়াল রাখতেই হয়।

‘উড়ে যায় নিশিপক্ষী’ উপন্যাসে ভাই আর বোনের যে সম্পর্ক বর্ণনা করা হয়েছে তা আপাতদৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু যে পরিস্থিতি তৈরি হয় তাকে উড়িয়ে দেয়া প্রায় অসম্ভব। একটা ভাই আর একটা ওই মেয়ে কোচরে সাপ নিয়ে ঘোরে, যাকে-তাকে মেরে বসে। একদিন সে ভাইয়ের টাকা চুরি করে। রাতে সে যখন ঘুমাতে যায়, ভাইটি তখন বোনের কোচর থেকে টাকা আনতে গিয়ে অন্য রকম একটা সম্পর্কে লিপ্ত হয়, কিছু সময়ের জন্য। মেয়েটির ভালোলাগা ছিল ওসমান নামের একটি ছেলের প্রতি। সে যখন শরীরে ভাইয়ের স্পর্শ পায় মনে করে ওসমান। বুকের কাছে ভাইকে টানতে থাকে।

এই সময়ের যে বর্ণনা- চারদিকে ঘোর বর্ষা, অন্ধকার ঘনায়মান,  ধোঁয়ার কুণ্ডলি- এই সব। বলতে গেলে কাব্যিক বর্ণনা। রূপক। কিংবা এই বর্ণনা অনিবার্য। তাছাড়া ওই সম্পর্ক যে কারণেই হোক মেনে নেয়া যায় না। মেয়েটা অচেতন কিন্তু আরেক সত্তা। বিশেষ মুহূর্তগুলো চলে যাওয়ার পর বোনটি যখন পুরোপুরি জ্ঞানে ফেরে- চিৎকার করে কাঁদতে থাকে।

লিখতে গিয়ে যা লেখা প্রয়োজন মনে হয়েছে আমি লিখেছি, পরিস্থিতি তৈরি করে তবেই লিখেছি। এজন্য আমার লেখার কাউন্টার নেই। শিল্প উচ্চমার্গীয় ব্যাপার, তাকে উচ্চতায় নিয়ে তবেই খেলতে হয়। একটা শব্দ, বাক্য কিংবা পরিস্থিতি পাঠক আসলে কীভাবে নেবে এটা তার  মেধার উচ্চতারও ব্যাপার।

আমি যন্ত্রণা লিখেছি। প্রত্যেকটি লেখার ভেতর যন্ত্রণা রোপিত, শোভিত এমনকি প্লাবিত। মধ্যবিত্তের যন্ত্রণা প্রাধান্য দিয়েছি, আসলে ভাবনার জগতে সেসবের আনাগোনা বেশি। কিশোর উপন্যাসেও যন্ত্রণা প্রধান হয়ে উঠেছে।

যুদ্ধের আগে, আব্বার তখন চাকরি ছিল। আমরা নানা বাড়িতে থাকতাম। বলতে গেলে সেখানে বিশাল রাজত্ব ছিল আমাদের। শৈশবে ছিল রাজকন্যার মতো জীবন। যুদ্ধ এসে সব লণ্ডভণ্ড করে দিল। আব্বা-মা আলাদা আলাদা জায়গায় চলে গেলেন। সবদিকে অভাব তৈরি হয়ে গেল। তখন অনাদর কাকে বলে চিনলাম, ক্ষুধা কাকে বলে জানলাম। তখন ভালোবাসার মূল উৎসগুলো সরে গিয়েছিল। নিজের কাছে নিজে যাওয়ার সেই সময় এলো।

শৈশবেই বাংলাদেশের বিজয় দেখলাম। আবার পরিবারের সবাই এক জায়গায় এলাম। আব্বা শেখ মুজিব সম্পর্কে অনেক গল্প শোনাতেন। মুজিবের সরলতা সম্পর্কে শোনাতেন- মানে ছোট্ট একটা বাচ্চার সঙ্গে যেসব গল্প করা যায়। বর্ণনা শুনে শুনে সেসময় শেখ মুজিব সম্পর্কে সাংঘাতিক ভক্তি তৈরি হয়ে গেল। ১৯৭৫-এ যখন শেখ মুজিবকে মেরে ফেলা হয়, আমি তখন গ্রামে ছিলাম। মনে আছে আমি হাউ-মাউ করে কেঁদেছিলাম। মনে হয়েছিল আমার একান্ত আপন কেউ মরে গিয়েছে।  শেখ মুজিব এক জিনিস আর এখনকার আওয়ামী লীগ আরেক জিনিস। অবশ্য শেখ মুজিবকে ছাড়া আওয়ামী লীগ হবে না।

যাইহোক, রাজনীতির অনেক পরিবর্তন, বাঁক বদল দেখেছি। দেশের পরিবর্তন মানে মানুষের পরিবর্তন- সেই পরিবর্তনও অবধারিতভাবেই একজন লেখকের লেখাকে প্রভাবিত করে। আমার লেখার ক্ষেত্রেও তা হয়েছে।

মানুষ, জনপদ, সম্পর্ক, ফসল, সুন্দর কিংবা সুন্দর নয় আমি আসলে সব কিছুর ভেতরে ভ্রমণ করতে চেয়েছি। ভ্রমণ আমার প্রিয়। যেতে যেতে এমন কোথাও পৌঁছেছি মাঝে-মধ্যে মনে হয়েছে সেখানে আমি আগে থেকেই ছিলাম। এও কি কম আনন্দের!

 

ঢাকা/তারা