ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৯ আষাঢ় ১৪২৭, ১৪ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

ছোটগল্প || যে-চোখে আঁধার থাকে ভরে

কুমার দীপ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-২২ ২:৫১:৪৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-২২ ৪:৫৩:৪১ পিএম

এক রবিবার বিকেলে হাটফেরত লোকগুলো যখন দু’চারজন করে সবে চলতে শুরু করেছে; ফিরতে ফিরতে কেউ কেউ জিনিসপত্রের মূল্য দিন দিন নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মৃদু ক্ষোভ প্রকাশ করছে; কেউ আবার তার নিজের বাগানের ঝকঝকে ঢেঁড়শ-বরবটি কিংবা ঝিঙে-কুঁশিগুলো বেচে ‘সেরাম দাম’ না- পাওয়ার আফশোসটা সহযাত্রীর সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিচ্ছে; প্রথম ভাদ্দরের সূর্যটা যখন হাঁসের ডিমের কুসুমের মতো উজ্জ্বল বল হয়ে চুনো নদীর পশ্চিমের পাড়াটির আড়ালে হারিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় ঝুলছে; তখন, প্রায় কোনো কথা না বলেই চলে যাওয়ার জন্য মন্থর পায়ে পা বাড়ালো অনীতা।

ওর অচঞ্চল প্রস্থানের পথে চুম্বকের মতো আটকে রইলো আমার দু’চোখ।

‘কমল, এই কমল!’

পিছনের থেকে একেবারে ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে ডাকতে শুরু করেছে প্রশান্ত। ‘কীরে, তোর হুলোডা কী?’

‘বল।’

‘এ্যাতোক্ষণ ধুরে বাউলে হাঁক দিচ্চি, তোর কানেই গ্যালো না!’

‘একটু অন্যমনস্ক ছিলাম।’

‘এট্টা যুবতী মাইয়ে ওরামভাবে হাটা কল্লি তো অন্যমনস্ক হতিই হবে।’ প্রশান্তর চোখে-মুখে রহস্যমাখা হাসির ছাপ।

‘মানে!’

‘মানে পরে বুজিস্, চল একন হাটেত্তে এট্টু ঘুরে আসি।’

‘চল।’

 

পুরনো ইটের রাস্তা। এমনিতেই বুড়ো মানুষের দাঁতের মতো এবড়ো-থেবড়ো; বর্ষা এলে তো কথাই নেই! ইট-খোয়ার পাশাপাশি জমে ওঠে কাদা-মাটির করুণ রসায়ন! কোনো কোনো জায়গায় গর্ত, কাদা-জলের মাখামাখি; ইটের কোনো অস্তিত্বই চোখে পড়ে না; মাটির বলেও ভ্রম হতে পারে। সতর্ক না থাকলে যে-কোনো সময় বাই-সাইকেল, মটর সাইকেল থেকে শুরু করে পায়ে চলা ভদ্দরলোকেরও সাষ্টাঙ্গে মিলন হতে পারে প্রকৃতির অকৃত্রিম কাদা-জলের সঙ্গে! এ-সড়কের পশ্চিম দিকটা গিয়ে মিলিত হয়েছে শ্যামনগর-মুন্সিগঞ্জ সি.এ্যান্ড.বি রোডে; উপজেলা সদরে যাওয়ার একমাত্র পথ। অন্যদিকের গন্তব্য নওয়াবেঁকী, খোলপেটুয়া নদীতীরের বিরাট হাট। আমরা যাচ্ছি এখান থেকে হাফ মাইল দূরের ‘রাস্তার মুখির হাটে’, চুনা নদীর ব্রিজের কাছে। চুনা এখর আর আগের মতো সেই খরস্রোতা নেই। একসময় এই নদীতে প্রচুর কুমির ছিলো, তারা লাইন ধরে ভাসতো বলেই জানা যায়। এখন কুমির তো দূরে থাক, নদীর স্বাভাবিক চেহারা নেই, কোনো তরঙ্গও নেই। থাকবে কী করে? অনেক আগেই তো বাঁধ দিয়ে সুন্দরবনসংলগ্ন নদীটার সাথে সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বর্ষাকালে চুনা’য় খুব জল জমে গেলে স্লুইচ গেটের সাহায্যে মাঝে-মধ্যে জল কমানোর কাজ করা হয় মাত্র। কিন্তু ‘এমন বিখ্যাত একটি নদীর কোলে গড়ে ওঠা হাটকে চুনোর হাট না বলে, রাস্তার মুখির হাট বলে ক্যানো এই এলাকার লোক?’

আমার এমন প্রশ্নে প্রশান্তর কাছে নিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো উত্তর থাকে না। বলে, ‘আমি ঠিক বলতি পারবো না। তবে হাটটা যখন চালু হুইয়েলো, তখন ব্রিজডা ছেলো না। ব্রিজের ওপারে শ্যামনগরে যাবার রাস্তাডাও পরে হুয়েচে বুলে মনে হয়। আর এই রাস্তাডার এট্টা মাথা ওকানে শেষ হুয়ে যাবার জন্যি হাটের নাম রাস্তার মাথার হাট বা রাস্তার মুখির হাট হতি পারে।’

এইসব কথা বলতে বলতে হাটের ভেতরে ঢোকার মুখেই অন্যরকম শব্দশ্রবণে মস্তিষ্কও ভিন্নখাতে প্রবাহিত হতে চাইলো।

‘এ ভাই, এই শোরের বাচ্চা আমারে কাইল মাইরেচে। ন্যাংটো কুরে ছাইড়ে দেচে।’

‘কী? খানকির ছাবালরে ধর! ওরে মাইরে, লুঙ্গি খুলে মাথায় বাঁইধে দে এই হাটে ঘোরাবো।’

দেখলাম, তিন-চারজন এগিয়ে যাচ্ছে সতেরো-আঠারোর একটা ছেলের দিকে। ছেলেটি হাতে একটা থলে নিয়ে সবজির দোকানে লাউ-পটল জাতীয় কিছু কেনার জন্যে মাথা নিচু করে দর কশাকশি করছিলো বলে মনে হয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পিঠের উপর কিল-ঘুষি-লাথির বৃষ্টি অনুভব করে ‘আল্লারে’, ‘আল্লারে’ চিৎকার করে উঠলো সে।

ইচ্ছে হলো একটু এগিয়ে যাই। এরকম একপেশে মারামারিটা থামানো চেষ্টা করা দরকার। কিন্তু পা বাড়াতেই হাতটা ধরে ফেল্লো প্রশান্ত- ‘যাসনে। ঝামেলা আচে।’ 

কী ঝামেলা, জানতে চাওয়ার আগেই মুখ থেকে কাঁচা রক্ত ঝরছে যার, সেই সদ্য দাড়ি-গোঁফ গজানো ছেলেটার কণ্ঠ থেকে বের হয়ে এলো: ‘আমারে মাইরো না। আমি ওরে চিন্তি পারিনি। আমি ভাইবেলাম ও মালাউন, ওই মালাউন ডাক্তারের ছাবাল... মালাউনের বাচ্চা মনে কুরেই... আল্লারে... , মাইরে ফিল্লো রে...’

যারা মারছে, তারা হয়তো ওর কোনো কথাই ঠিক মতো শুনতে পাচ্ছে না, কিংবা শুনলেও তাতে গুরুত্ব দেওয়ার মতো মানসিক অবস্থা তাদের নেই। তারা এখন দানবীয় উল্লাসে উন্মত্ত।

 

অল্পক্ষণের মধ্যেই মনে হলো আঘাতকারীরাও আক্রান্ত। তার মানে ঐ ছেলেটির পক্ষেও লোক আছে! হয়তো এই হাটেরই কোথাও ছিলো। কারো কাছে খবর পেয়ে ছুটে এসেছে। স্বজন আক্রান্ত হলে, অনেক সময় ভালো-মন্দ বিবেচনা করবার অবকাশ থাকে না, ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। এই ঝাঁপিয়ে পড়ার স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে পরিণত হলো জায়গাটি। যারা মাটিতে চট বা পলিথিন পেতে আলু-পটল-ঝিঙে-বরবটি-কচু-কলা ইত্যাদির পসরা সাজিয়ে বসেছিলো, তারা সরে যেতে পারলেও তাদের তরকারিগুলো সরবার সুযোগ পেলো না। গৃহিণীদের তেলের কড়াইয়ের পরিবর্তে বাজারের এই এলাকাটিতেই তুমুল গড়াগড়ি দিয়ে, কতগুলি পুরুষবর্গের পদতলে পিষ্ট হয়ে অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিতে থাকলো। কেউ কেউ আবার দু’চারটা নিজেদের ব্যাগে ভরে তরকারিগুলোকে কিছুটা উদ্ধার করবার চেষ্টা করলো। বাজারে আগুন লাগলে আলুপোড়া খেতে অনেকেরই ভালো লাগে।

 

মারামারি করতে থাকা এবং মারামারি থামানোর চেষ্টা করতে থাকা, উভয়শ্রেণির মানুষের হাঁকাহাঁকিতে পৃথিবীটা তখন চিৎকারভূমি। দৃশ্য বলতে মারামারি আর টানা-হেঁচড়া। কখন যে দূর আকাশ থেকে মেঘ ভেসে এলো, কখন যে বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো, তা বুঝতে কিছুটা ভিজে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো। ভিজে গেলেও বৃষ্টির কাছে কৃতজ্ঞ। কারণ বৃষ্টির হস্তক্ষেপেই হয়তো প্রলয়ঙ্করী মারামারিটা আস্তে আস্তে স্তিমিত হতে থাকলো। আহত যোদ্ধাগণের কেউ কেউ রক্তে রঞ্জিত।  কারো কারো রক্তমাখা মুখ থেকেই বের হয়ে আসছে ‘খানকির ছাবাল’, ‘শুয়োরের বাচ্চা’ জাতীয় বহুশ্রুত খিস্তিখেউড়।

অনুভব করলাম: শুধু বৃষ্টিতে নয়, অন্ধকারেও ভিজে যাচ্ছি আমরা। বাজার ক্রেতা-বিক্রেতা শূন্য। মারামারির মূল কেন্দ্র থেকে বেশ দূরে, যে-দিকে আমাদের গন্তব্য, সেদিকের রাস্তাভিমুখেই এসে গেছি আমরা ! গ্রামের আরও অনেক মানুষের মতো প্রশান্তর পিঠের নিচেও, যেখানে লুঙ্গির উপরপ্রান্ত বাধা, সন্ধ্যাপূর্ব বহির্গমনে সেখানে টর্চ লাইট গোঁজা থাকে। ওটা হাতে নিয়ে পথের দিকে মুখ করে প্রশান্ত বললো, ‘হাঁট্, বাড়ি যাই।’ 

নীরবে ওকে অনুসরণ করতে শুরু করলাম। মনে করিয়ে দিতে হলো না। কোনো ভণিতা ছাড়াই শুরু করলো প্রশান্ত।

 

‘ডাক্তার কাকার পুবির বিলির জমিডার পাশে দক্ষিণ চকের মমিন গাজির জমি আচে। মমিনির মাইজে ছাবালের নাম মোন্তেজ। মোন্তেজ কাইল গেইলো জমি দেক্তি। ধান গাচ সব লাইগে গেচে, ঘনো হুয়ে আস্তেচে। কিন্তু ওর মদ্দি এট্টা ঘাসের ঢিবি দিকে রাগে তার গা জ্বলে ওটে। সে বুজদি পারে ঘাসগুলো পাশের জমির। মনে হয়, কেউ ইচ্চে কুরে দেচে। নরেন কাকার জমিতি তখন এট্টা ছাবাল ঘাস বাইছতেছিল। মোন্তেজ তারে ধুরে মাইর লাগিয়ে দ্যায়। সে যতোই বলে যে- সে দ্যায়নি, কীভাবে গেচে তা সে জানে না... ততোই মারে। মারার সাতে সাতে ‘মালাউন’, ‘মালু’, ‘মালুর বাচ্চা’ এইসব গালি দিতে থাকলে ওই ছাবালডা আপত্তি করে। ওই ছাবালের নাম নাসির। সে বারবার বলতি চায়, যে সে মালু না, মোসলামান। মোন্তেজ সে কতা বিশ্বাস না কুরে নাসিরির লুঙ্গি খুলে দ্যাখে। এরপর মারা বন্দ কুরে বাড়ি যায় মোন্তেজ।’

 

প্রশান্তর কথাগুলো শুনতে শুনতে কোথায় য্যানো তলিয়ে যাচ্ছিলাম। মুখ ফস্কেই য্যানো বেরিয়ে এলো, ‘তা নরেন কাকার জমিতি এই নাসির পোলাডা আসলো কোত্থেকে?’ আমার প্রশ্নের উত্তরে প্রশান্ত যা বলতে শুরু করলো, তা আরো বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে ধরা দিতে চাইলো আমার কাছে।

‘কোনো জাগাত্তে ডাক্তারি পুড়োলো কি না তা কেউ জানে না, তবে সেই আমলের মেট্টিক পাশ। তার মতন জানাশোনা লোক এই এলাকায় সেরাম এট্টা দ্যাকা যায় না। গ্রামের ইশকুলি মাস্টারি কত্তি কত্তি একসময় ডাক্তারিও শুরু করে। মাস্টারি কল্লিও মূলত ডাক্তারিতেই নামডাক আসে। কোনো টাকা-পয়সা ছাড়াই কতো লোক তার কাচেত্তে ওষুদ-পত্তর নেচে ! তার বাবা বীরেন মোড়লও নাকি হুমোপাতি ডাক্তার ছেলো। রুগি-টুগি দিক্তো। কিন্তু ডাক্তারি ওগো পেশা না। এমনিতেই ওরা ছেলো বিরাট বড়লোক। বীরেন মোড়লের জাগা-জমি-টাকা-কড়ির কতা একসমায় মানশির মুকি মুকি ছেলো। দান-খয়রাতও কুত্ত খুব। কতো লোক যে মিত্যে কতা বুলে কতো টাকা-পয়সা নেচে, তার ঠিক নি। মানশের বিশ্বাস কুরে ঠুকেচেও কম না। একাত্তরের যুদ্ধর সমায় যাগো পাহারা দিতি রাইখে ইন্ডিয়ায় গেইলো, তারাই লুটে নেচে সব সোনা-দানা, টাকা-পয়সা, এমনকি দু’টো গোলার ধানও! সেই শোকেই তো তাড়াতাড়ি চিতেয় গ্যালো লোকটা। তার চাইর ছাবালের মদ্দি নরেন ডাক্তার বড়ো। মাইজেডা অনেক আগে ইন্ডিয়া গেচে। ছোটডা ওপারেই লেখাপড়া কুরে চাকরি-বাকরি করে। সাইজেডা বড়দার সঙ্গে ছেলো, কিন্তু আগের বছর যখন তার মাইয়েডা ওপাড়ার মহব্বত আলির ছাবাল তুলে নে’ যায়, অনেক চেষ্টা কুরেও মাইয়েডা ফিরে না পাইয়ে সেও কালিন্দী পার হুয়েচে। আশপাশের শরিক-শারাক  যা ছেলো, তারাও প্রায় সব হাঁটা কুরেচে। এখন ঘরের চারদিকি সব মোসলমান। তারা সবাই যে খারাপ- তা না, কেউ কেউ খুব ভালো। কিন্তু তাগোও ভস্যা কী ? তাগো কেউ কেউ ডার্ক্তারে খুব পছন্দ করে। ডাক্তারও তাগো উপর ভর কুরে থাকে। থাক্তি গিলি কারো না করো ওপর তো ভস্যা কত্তিই হবে। কিন্তু কতোদিন? নিজির বাড়ির কেউ না-থাকলি কতো আর ভস্যা করা যায়? এই তো গ্যালো বছর বিরাট ডাকাতি হুলো। পাশের আমিনুদ্দি গাজি আর তার বউই বাঁচিয়েচে, না হলি...।’

‘এক মোসলমান ডাকাতি কত্তি আইলো, আরেক মোসলমান বাঁচালো!’ আমার মুখ থেকে বের হয়ে গেল বাস্তব কথাটি।

‘কিন্তু তারা কি আর সব সমায় বাঁচাবে নাকি?’ প্রশান্ত যে-আমার দিকেই তাকিয়ে বললো কথাটি, অন্ধকারেও অনুমান করতে পারি। প্রশান্ত আবার শুরু করে।

‘বছরখানিক ধুরে ডাক্তারের ছোটো মাইয়েডার পাইছনে লোক লাইগেচে। পুতিমার মতন মাইয়েডা নাকি যে-কোনো সমায় তুলে নে’ যাতি পারে দক্ষিণ চকের মনসুর গাজির ছাবাল। এর আগে সাইজে ভাইর মাইয়েডা ওভাবে গেচে। পুতিবাদ কত্তি যাইয়ে ডাক্তারের বি.এ. পড়া ছাবাল মাইর খাইয়েচে। একেবারে মাইরে ফেলতি পারে বুলে মনোরঞ্জনরে ওপারেই পার কুরে দেচে ডাক্তার। ডাক্তার নিজিই এবার চুলে যাবে। জমি-জাগা বিক্রি পেরায় শেষ। জলের দামে বেচে দেচ্চে সব। খুব গোপনে। জানা-জানি হুয়ে গিলি ঝামেলা হতি পারে।  একেবারে বিশ্বাসের লোক, এক্ষুণি লিখে ন্যাবে না, জমি ভোগ করবে কিন্তু সবাই মনে করবে ভাগে নেচে। পার হবার আগ পয্যন্ত কেউ জানতি পারবে না। পুবির বিলির জমিডা ওইরামই এট্টা ব্যাপার। মোন্তেজও জানে না যে তার বাপ জমিডা কিনেচে, সে জানে তারা ভাগে নেচে। আজগের এই মারামারিডাই হয়তো হুতো না, এসব যদি ওরা জানতো।’

‘কিন্তু এসবের জন্যে কি আইন-আদালত নেই?’

 

এ্যতোক্ষণ অনর্গল বলে যাচ্ছিলো প্রশান্ত। প্রত্যক্ষদর্শী কোনো গল্পকথকের ন্যায়। আমি নিবিষ্ট মনে শুনছিলাম। মঞ্চের অভিনেতা যখন অভিনয় করতে করতে কাহিনির ভেতরে ঢুকে যান, কাহিনির চরিত্রটির সাথে সমবেদনায় একাত্ম হয়ে যান; তখন সামনের থেকে কোনো শ্রোতা যদি তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করেন, এমনকি অভিনয় শেষ হওয়ার পরমুহূর্তেও; অভিনেতাটির সম্বিৎ ফিরে পেতে, স্বাভাবিক হতে একটু সময় লাগে। প্রশান্তরও প্রায় সেরকম অবস্থা। কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে, নাকের টানেলে মহাপ্রাণ ধ্বনির মতো বাতাসের আদান-প্রদান শেষে বললো, ‘আইন-আদালত! এদেশে আইন-আদালত সবার জন্যি না। যাগো ক্ষমতা আচে তাগো কতায় চলে আইন-আদালত। চ্যারমেনের  কাচে গিলি, চ্যারমেন বলে, এক জাগার লোক, মিটিই-মাটিই ন্যাও। ভোট নষ্ট হুয়ে যাবে বুলে এট্টা গোজামিল দে ছাইড়ে দ্যায়; থানায় গিলি কাজ হয় না, তবু পুলিশ কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা চায়। আর কেচ-কামের দিকি গিলি উল্টো হুমকি আসে, যে-কোনো সমায় আরো বড়ো ক্ষতি হতি পারে... , হিন্দুগো এখানে কোনো স্বস্তি নি।’

‘কেবল হিন্দু না, দুর্বল মানুষদেরই কোনো স্বস্তি নেই। আর কেবল এখানে না, সবখানেই একই অবস্থা, সংখ্যালঘুরা সবখানেই কোণঠাসা। বিশ্বটাই ক্ষমতাবানদের দাপটে অস্থির।’

আমার একথার প্রতিবাদ কিংবা সমর্থন কোনোটাই না-করে, নিজের পূর্বকথারই সূত্র ধরে রেখে প্রশান্ত জানালো, ‘মামলা করার কারণেই তো ডাকাতির নাম কুরে মাইরে ফেল্তি আইয়েলো শত্রুরা।’

আলো থাকলে দেখতে পেতাম, কী গভীর উদ্বেগরাশি জেগে উঠেছে ওর চোখে-মুখে।

হাঁটতে হাঁটতে রাস্তা থেকে নেমে, সরু পথ ধরে, প্রশান্তদের ঘরের পাশের পুকুর পাড়ে এসে গেছি। একটা কাঠের বেঞ্চ পাতা আছে এখানে। বর্ষাও সেই কখন থেমে গেছে। একটু বসে নেওয়া যায়।

প্রশান্ত। আমার কলেজ সহপাঠী। কলেজ শেষে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হয়েছিলাম। উত্তীর্ণ হতে না পেরে, প্রশান্ত সংসারের কাজে লেগে যায়। অবশ্য, সংসারের কাজে সে আগের থেকেই ছিলো; ফেল করবার পর আনুষ্ঠানিকভাবেই য্যানো পিতার জায়গাটা নিয়ে নিলো। ভিটে ছাড়াও যেটুকু ধানের জমি, তা মায়ে-পোয়ের সাদাদিধে মাপের দিনাতিপাতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয় জেনে মা-ই তাকে প্রবোধ দিয়েছিলেন সংসারটাকে আঁকড়ে থাকতে। একই উপজেলার হলেও আমাদের বাড়ি অন্য ইউনিয়নে; অন্তত সাত কিলোমিটার দূরে। দূরে হলেও ওর সাথে গড়ে ওঠা সখ্যটা মিলিয়ে যায়নি কখনও। অবশ্য কাছের করে রাখার প্রায় সবটুকু কৃতিত্ব অবশ্যই প্রশান্তর। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন আমি ওর খবর সেভাবে নিতে না-পারলেও, ও আমার খবর রাখতো নিয়মিতই। আমাদের গ্রামে মামার বাড়ি থাকায় খবরাখবর রাখাটাও প্রশান্তর জন্য কিছুটা সহজ হয়েছিলো। যা-হোক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ পরীক্ষাটা শেষ করে আমি বাড়িতে আসার কয়েকদিন পরে ওর পীড়া-পীড়াতেই এখানে আসা। গত পাঁচদিন যাবৎ প্রশান্ত আর তার নতুন বউ-এর সেবা-যত্নে একেবারে বাবু হয়ে বসে আছি। গা তুলতেই ইচ্ছে হচ্ছে না !

কথাটি কি পূর্ণসত্য? প্রশান্তর বউয়ের নানারকমের সুস্বাদু ব্যঞ্জনমালা নাকি তৃতীয় আরেকজনার ছলাৎ-ছল চলা-বলা আমাকে মোহিত করে রেখেছে ! চুম্বকের মতো টেনে ধরে রেখেছে এই  প্রায় না-চেনা পাড়াগাঁয়ের রাতকানা এই বাড়িটিতে!

‘তুই কি কাইল বাড়ি যাবি, কমল?’

 

প্রশান্তর কথায় ঘোর কাটলো। মনে মনে কোনো এক মধুচন্দ্রিমার কল্পরাজ্য থেকে বঞ্চিত হলাম বুঝি ! কিন্তু আশ্চর্য, প্রশান্ত কী করে আমার মনের অবস্থাটা আঁচ করতে পারলো ! স্বাভাবিক স্বরটা ধরে রাখার চেষ্টা করে বললাম, ‘হঠাৎ এই কথা বলছিস যে!’

‘শালিডা তো হঠাৎ-ই হাঁটা কুল্ল। ভাবলাম, তুইও হয়তো থাকপিনে।’

প্রশান্তর কণ্ঠে যে রহস্যময়তার ছোঁয়া, তা অন্ধকারে না-দেখতে পেলেও অনুমান করতে আমার ভুল হলো না। কিন্তু কিছুই না-বোঝার ভঙ্গিতে বললাম, ‘শালি তোর, অথচ সে চলে গেলেই আমি চলে যাবো, এমন ভাবনা তোর মনে কী জন্যে এলো রে?’

‘শালি আমার, তা সত্যি, কিন্তু এদ্দিন আমার সামনে যাকে ফুল বলেই মনে হয়নি, সে হঠাৎ ক্যামন মাতাল করা গন্ধ ছিটোচ্ছে, সে কি আমার জন্যি?’

কী আশ্চর্য! কৃত্রিম গাম্ভীর্যের আড়ালে আমার ভেতরের আনন্দময় সময়টাকে এইভাবে আয়ত্ত করেছে প্রশান্ত! সত্যি, বাইরে শ্রাবণের শ্যামল প্রকৃতি থাকলেও আমার ভেতরে বিরাজ করছিলো জ্যৈষ্ঠের খররৌদ্র। সেখানে গত কয়েক দিনে আষাঢ়ের ঝর্ণাধারা হয়ে ধরা দিয়েছে ওর শ্যালিকা। কোনো পূর্ব-পরিচিতি ছিলো না। নামটাও শুনিনি। প্রশান্তও জানায়নি যে, অমন ছবির মতন একটা শালি আছে ওর। অথচ গত চারদিনের অধিকাংশ জাগ্রত সময়গুলো কেটেছে সেই অজ্ঞাতপূর্ব মেয়েটির সাথে! প্রশান্ত বাইরে গেছে, নানারকমের কাজে ব্যস্ত থেকেছে; বৌদি ঘরকন্নার কাজে নিয়োজিত থেকেছে; মাঝে-মধ্যে এসে আম-জাম-জামরুল-কাঁঠালের পসরা নিয়ে একগাল অমলিন সরল হাসি মিশিয়ে বলেছে, ‘দাদা, নানা কাজে সমায় দিতি পাত্তিছিনে বুলে বুন্ডিরে বসিয়ে রাখিচি। রাগ করবা না কিন্তু।’

 

আমিও অট্টহাসির ঢঙে উচ্চারণ করেছি, ‘বৌদি অপেক্ষা বৌদির কুমারী ভগিনীর সংস্পর্শ মধুরতর নয় কি?’

আমার কথায় উচ্চস্বরে হাসির ফোয়ারা ছুটিয়ে চলে গেছে বৌদি। পাশে উপবিষ্ট সপ্তদর্শীর আপেল-রাঙা মুখে তখন আলতার রঙ ধরেছে লজ্জায়। পরমুহূর্তেই অবশ্য অন্য প্রসঙ্গে কথা পেড়ে সহজ করে নিয়েছি তাকে। কতো কথা হয়েছে তার সঙ্গে ! বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি, অথচ কারো সঙ্গে সেরকম কোনো সম্পর্ক হয়নি, একথা বিশ্বাসই করতে চাইনি সে। বলেছি, ‘এই অসামান্য সৌন্দর্য নিয়ে তুমি যদি প্রেমিকশূন্য থাকতে পারো সতেরো বছর, আমি ছেলে হয়ে তবে প্রেমশূন্য থাকতে পারবো না ক্যানো? সত্যি বলতে কী, ঢাকায় মেয়ের অভাব কখনও ছিলো না, আমিও যে প্রস্তাব পাইনি তা নয়। আসলে প্রেম জিনিসটাকে সযত্নে এড়িয়ে চলবার কারণেই হোক, আর অনিবার্য কোনো পরিস্থিতি তৈরি না-হওয়ার কারণেই হোক, অভিজ্ঞতাটা অর্জন করা হয়নি। এখন মনে হচ্ছে, হাজার হাজার ফুল সেখানে থাকলেও সুবাসিত গোলাপের সন্ধান মেলেনি।’

আমার মুখের দিকে মুগ্ধচোখে তাকিয়েছিলো সে। মুগ্ধতা জন্মাতে পারে। কিন্তু প্রেম? এই ক’টি শ্রাবণদিনের সামর্থ্য কী, প্রেম জমিয়ে তুলবার? কিন্তু সে যাই হোক, প্রশান্ত কি তবে আমার উপরে অখুশি হয়েছে? একটু শুকনো স্বরেই জিজ্ঞাসা করি, ‘বৌদি কি তোকে কিছু বলেছে?’

‘বৌদিই সব বলবে, আর আমি কি ঘাস খাই, বন্ধু?’

ওর হাস্যরসে আমি ঠিক বুঝতে পারি না মনের কথাটা। আলো থাকলে হয়তো ওর চোখে-মুখেই পড়ে নিতে পারতাম কিছু। অবশ্য আমার ভেতরেও এক ধরনের অন্ধকার অনুভব করতে শুরু করলাম সহসা। শঙ্কা নিয়েই বললাম, ‘স্যরি বন্ধু, আমাকে মাফ করে দিস। আমি কালই বাড়ি যাবো।’

‘তোর বাড়ি তুই যাবি। সেডা তোর নিজির ব্যাপার। কিন্তু মাফ-টাফ কত্তি পারবো না। অপরের দুটো সোমত্ত ছাবাল-মাইয়ে কদিন এট্টু ফষ্টি-নষ্টি কুরেচে, তাতে আমি মাফ করার কেডা?’

‘হেঁয়ালি করিস নে প্রশান্ত। অনীতা খুব ভালো মেয়ে। যে কারোরই ভালো লাগতে পারে ওকে।’

‘তা, ওই ভালো মাইয়েডারে তুই কি বে’ কত্তি চাস্, কমল?’

‘বলিস কী? এইসব শুনলি অনীতা যে রাগ করবে! বৌদিও কষ্ট পাবে!’

‘পাবে না। তোর মতন বর পালি ভারতেই যাবে না অনীতা। ও আসলে এই মাটি ছাইড়ে যাতি চায় না। তুই রাজি থাকলি বল। আমিই সব ব্যবস্তা কুরে দ্যাবো।’

বলে কী প্রশান্ত! আমার মুখে কোনো কথা এলো না। প্রশান্তর দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে পুব আকাশের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধবাক বসে রইলাম। ওর কথাগুলো আমার হৃদয় স্পর্শ করলো। ওকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু আমাকে কোনো দুর্বলতা প্রকাশ করবার সুযোগ না-দিয়ে দ্রুতপায়ে ঘরের দিকে গ্যালো। হয়তো অন্য কোনো কাজ আছে ওর।

 

সপ্তর্ষী নামে পরিচিত তারাগুলোর দিকে তাকিয়ে অন্যরকম আনন্দে ভেসে যেতে চাইলো মনটা। গত সন্ধ্যাতেই এইখানে বসে, ওই দিকে চোখ রেখে নীতা বলেছিলো, ‘আকাশের বুকে ওরা ক্যামন স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে, মানুষের জীবনে এরকম কোনো অক্ষয় স্মৃতি কি থাকে, কমলদা?’

‘নিশ্চয়ই থাকে। কিন্তু কোন স্মৃতি যে অক্ষয় হবে, তা তো আগের থেকে অনুমান করা যায় না, নীতা।’

‘যায় না বলেই হয়তো মূল্যবান স্মৃতিটুকুও মানুষ মনে রাখতে চায় না।’

‘যা মূল্যবান, তা নিজের যোগ্যতার গুণেই মূল্য আদায় করে ন্যায়।’

‘কিন্তু কখনও কখনও সময় এ্যাতো অল্প থাকে যে, খুব দ্রুতই বুঝে নিতে না-পারলে, সম্ভাবনাময় মহামূল্যবান স্মৃতিও ভবিষ্যতে মূল্যহীন হয়ে যায়।’

 

একথার পরই ওর দিদির ডাকে চলে গিয়েছিলো। কিন্তু কী আশ্চর্য! ওর এই কথার মধ্যে কি তবে অন্য কোনো ইঙ্গিত ছিলো!

থাকতে পারে। কিন্তু ঠিক ওভাবে আমি ভাবিনি। ভাববার অবকাশ কোথায়? মাস্টার্সের রেজাল্ট হবে। যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা ভদ্রগোছের চাকর হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। বাবা-মায়ের কষ্টের রশিটা টেনে ধরতে হবে। দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারের একমাত্র ভরসা হিসেবে বিয়ে তো আমার নিকট খুব কাছের কোনো জিনিস নয়। নাহ্ প্রশান্তর প্রস্তাবে সম্মত হওয়ার কোনো সুযোগ আপাতত নেই।

কিন্তু নীতার মতো একটি মেয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্বদেশ ছেড়ে চলে যাবে! কালকেই না গুণগুণ করে গাইছিলো, ‘জন্ম আমার ধন্য হলো, মাগো, তোমায় ভালোবেসে...’। আচ্ছা, নীতা কি সত্যি সত্যিই আমাকে ভালোবেসেছে? কিন্তু কিছুই তো বলেনি সে! নাকি শুনতে চেয়েছিলো আমার মুখের থেকেই! বিদায়ের সময়েও কি এজন্যেই অপেক্ষা করে ছিলো? কিছুক্ষণ নখ খোঁটাখুঁটি করে, কী য্যানো বলি বলি করে,  কিছু না-বলেই, কিংবা শুনতে চেয়ে কিছু না-শুনেই মন্থর পায়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করেছিলো সে! চলতে শুরু করেও য্যানো কিছু শোনার জন্য কান দুটোকে সতর্ক রেখেছিলো পিছনের দিকে! আশ্চর্য, আরও একটা দৃশ্য আমার দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে তখন! নীতার ডান হাতটা ওড়নার একটা প্রান্তসহ বারবার চোখ বরাবর উঠছিলো!  বলতে না-পারার অশ্রু, নাকি আহ্বান না-শোনার কান্না?

আমি তুচ্ছ। দেশ অসামান্য। অথচ তুচ্ছটির দ্বারাই কেউ রক্ষা পেতে পারে অসামান্যকে হারানোর বেদনা থেকে! অতএব, অনীতার পানেই ছুটে যেতে চাইলো শ্রাবণসিক্ত মনটা।

প্রশান্তকে কিছু না-বললেও স্বপ্নময় একটি আগামীর জাল বুনতে বুনতে রাতে বিছানায় গেলাম। অবশ্য প্রশান্ত যে আমার মনের অবস্থা অনুমান করতে পারে, সে প্রমাণ তো পেয়েই গেছি। কখন ঘুম এসেছিলো, জানিনে, তবে দীর্ঘরাত্রি পর্যন্ত যে তীব্র অস্থিরতায় কেটেছে, সেকথা বলাবাহুল্য। বৌদির ডাকে যখন চোখ মেললাম, সূর্য তখন পুব আকাশে নাক বরাবর দাঁড়িয়ে আছে। লজ্জিত দ্রুততায় হাত-মুখ ধুয়ে দু’মুঠো খেয়ে শার্ট-প্যান্ট পরে যখন প্রস্থানোদ্যত হলাম, হাসির অপরূপ সৌন্দর্য ঠোঁটের কার্নিশে ঝুলিয়ে দিয়ে মিতা বৌদি সামনে এসে দাঁড়ালো।

‘নীতাকে দ্যাখার জন্যি বাড়ি গিয়েই তবে কাকা-দাদাকে পাঠিয়ে দেচ্চো, কমল দা?’

‘অনীতার মতো মেয়েকে দেখতে পাঠানোর কিছু নেই, বৌদি।’

‘তালি কি একেবারেই পাকা কথা হবে?’

‘তা হতে পারে, কিন্তু...’

‘কিন্তু কী মশাই?’

 

অন্যসময় হলে সুন্দরী রমণীকণ্ঠে মশাই শব্দ শুনে বর্তে যেতাম, অথচ আজ একেবার অসহ্য মনে হলো। বুকের ভেতরটা উচ্চমাত্রার ভূমিকম্পাহত অট্টালিকার ন্যায় কাঁপতে থাকলো। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে মাথা নিচু করে জানালাম, ‘আমার মতো সামান্য ছেলেকে আপনারা অনেক সম্মান দেখিয়েছেন, বৌদি। নীতার কোনো তুলনা হয় না। ওর মতো মেয়েকে জীবনসঙ্গিনী করতে পারলে আমার মতো কমল, শতদল হয়ে ফুটে উঠবে। কিন্তু একটা অনীতার মনে হাসি ফোটাতে পারলেও এদেশের আরও অনেক অনীতার কাছে যাবে কোন কমলেরা? আমাদের পরবর্তী কমলেরা কি পারবে, তাদের অনীতাকে ধরে রাখতে? নাকি কমলেরা নিজেরাই পারবে বাপ-দাদার এই শ্যামল ভিটেমাটিটুকু আঁকড়ে ধরে থাকতে! মাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইলেও মা যদি তার সন্তানকে ধরে না-রাখতে পারে, তাহলে সন্তানের কী-ইবা করার আছে, বৌদি!’

‘সেসব কথা তোমরাই ভালো জানো, ভাই। আমরা মুর্খ মানুষ। যা ভালো বোঝো, তাই করো...’ বলতে বলতে শাড়ির আঁচলে চোখ-মুখ ঢেকে প্রায় হাউ-মাউ করে কাঁদতে কাঁদতে ঘরের ভেতরে চলে গ্যালো, প্রশান্তর বৌ।

আরও কিছুক্ষণ স্থাপত্যের ন্যায় দাঁড়িয়ে থেকে আমিও পা বাড়ালাম রাস্তার দিকে। আকাশে আলোর কমতি নেই, অথচ আমার চোখের কন্দরে আঁধারের রেখারা এসে ভিড় জমাতে শুরু করলো।

 

ঢাকা/তারা