ঢাকা, বুধবার, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৭ মে ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

আমার মা ব্যতিক্রমী মা

সেলিনা হোসেন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-১০ ৭:৪৪:২০ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-১০ ১:০৪:৫৩ পিএম

আমার শৈশবের মাকে খুব মনে পড়ে। স্মৃতিপটে ভাসে মায়ের মায়াবি মুখ। তিনি অন্যরকম একজন মা ছিলেন। তাঁর মাতৃত্বের পরিসর ছিল অনেক বড়। আমরা ছিলাম পাঁচ বোন, চার ভাই। আমার বড় বোন মায়ের সামনেই মারা যায়। তখন বাল্যবিয়ের প্রচলন ছিল; পঞ্চাশের দশকের কথা।

ওই সময়ে আমার বড় আরো দুই বোন ছিল। এরপর মা কখনো তাদের বাল্যবিয়ে দেওয়ার কথা চিন্তাও করতেন না। বরং আমার আব্বা-আম্মা বড় দুই বোনকে টাঙ্গাইলের ভারতেশ্বরী হোমসে ভর্তি করিয়ে দেন। তাঁরা কষ্ট করে বোনদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছিলেন। আমাদের নয় নম্বর ভাইটি জন্মের সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। আমার মা-ও খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ সময় প্রতিবেশীরা বলতো, তোমাদের মা তো মরেই যাবে! ওই সময় বড় দুই বোনের স্কুল ছুটি হওয়ায় তারা বাড়িতে আসে। আমরা তখন বিষয়গুলো সেভাবে বুঝতাম না। ফলে কিছু বলতামও না।

বোনরা হোস্টেল থেকে বাড়ি আসার পর দেখে মা খুব অসুস্থ। তখন তাঁরা মাকে বলে, আপনি সুস্থ না-হওয়া পর্যন্ত আমরা হোস্টেলে ফিরে যাব না। মা বলেন, আমি বাঁচি কি মরি তোমাদের দেখতে হবে না। তোমাদের স্কুল যেদিন খুলবে সেদিনই তোমরা হোস্টেলে ফিরে যাবে। সেই বাল্যবিয়ের যুগে, মা এভাবেই তাঁর মেয়েদের পড়াশোনা ঠিক রেখেছেন। এজন্য আমি বলি- আমার মা ব্যতিক্রমী মা।

আমার নানা রেলওয়ের ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। আমার খালা (কর্নেল তাহেরের মা) এবং মাকে নানা বাল্যবয়সেই বিয়ে দিয়েছিলেন। মায়ের অভিযোগ ছিল, আমার বাবা আমাকে পড়াশোনা না-শিখিয়ে মেয়ের জামাইকে পড়াশোনা শিখিয়েছেন। আমার বাবার তিন বোন ছিল, কোনো ভাই ছিল না। দাদা চাইতেন না তাঁর ছেলে পড়ালেখা শিখুক। কারণ পড়াশোনা করলে ছেলে যদি চাকরি করতে বাইরে চলে যায়, তবে নিজেদের জমিজমা কে দেখবে? এ জন্য দাদা চাইতেন, তাঁর ছেলে (আমার বাবা) জমিজমা দেখাশোনা করুক।

আমার বাবা ভালো ছাত্র ছিলেন। নানাবাড়ি, দাদাবাড়ি কাছাকাছি ছিল। নানা প্রায়ই বলতেন, এতো ভালো স্টুডেন্ট পড়াশোনা করবে না! তারপর নানা অর্থনৈতিক সহযোগিতা করে বাবাকে পড়াশোনা করিয়ে আমার মায়ের সঙ্গে বিয়ে দেন। এজন্য নানাকে মা বলতেন, আমাকে পড়াশোনা না-করিয়ে পরের ছেলেকে পড়াশোনা করালেন!

আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকায় লিখতাম। আমার পড়াশোনার খুব ঝোঁক ছিল। তখন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পুরো উপন্যাসের সেট আমাদের বাড়িতে ছিল। এ সময় আমি লিখে লুকিয়ে রাখতাম; কাউকে দেখাতাম না। একদিন মা দেখলেন ‘বেগম’ পত্রিকায় আমার একটি লেখা ছাপা হয়েছে। দেখে বললেন, এখানে তোর নাম দেখছি। এটা কি তুই? আমি বিষয়টি স্বীকার করলাম। তখন মা বললেন, তুই কীভাবে কী করিস? আমি বললাম, টিফিন খাওয়ার পয়সা বাঁচিয়ে খাম কিনি। এক টাকার খাম কিনলেই আমার হয়ে যায়।

একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য বেরিয়েছি, তখন মা আমাকে টাকা দিয়ে বললেন, এখন থেকে টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে খাম কিনতে হবে না। টিফিন ঠিকমতো খেয়ে নিও। আর খাম যা কিনতে হয় তার ব্যবস্থা আমি করে দেব।

১৯৬৮ সালে আমি মাস্টার্স শেষ করি। তখন আমার শিক্ষক ছিলেন আধ্যাপক আব্দুল হাফিজ। তিনি আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। তখন আমার একটি বই বেরিয়েছে। স্যার একদিন আমাকে বললেন, তোমার চাকরির সুবিধার জন্য আরেকটা বই বের করো। শুনে আমি খুব আবেগী হয়ে পড়েছিলাম। বললাম, আমি এইটুকু মানুষ, আমার বই কে বের করবে? স্যার বললেন, কোনো প্রকাশক করবে না। বাবা-মায়ের কাছে যাও, টাকার ব্যবস্থা করো। ছাপানোর ব্যবস্থা আমি করে দেব।

বাড়ি গিয়ে মাকে বললাম, একটা বই বের করতে পারলে,আমার চাকরি হতে পারে। তাহলে সিভিটা আরো ভালো হবে। মা বললেন, আমার যে সঞ্চয় আছে সেখান থেকে টাকা দেব। তোমার বাবাও টাকা দেবেন। তুমি তোমার স্যারকে বলো, কতো টাকা লাগবে? এরপর ১৯৬৯ সালে বইটি প্রকাশিত হয়।

এভাবে মা-বাবা আমাদের বড় করেছেন। আমাদের বাড়ি থেকে মির্জাপুরের ভারতেশ্বরী হোমস কত দূরে! ওই সময় যানবাহন ঠিকমতো ছিল না, তারপরও কত কষ্ট করে বোনদের সেখানে নিয়ে যেতেন- এই ছিল আমার মা!

প্রতিটি ছেলেমেয়েকে মা সমানভাবে দেখতেন। আগে পরিবারে মেয়েদের ভালো খাবার কম দিতো, ছেলেদের বেশি দিতো। এজন্য মেয়েরা অপুষ্টিতে ভুগতো। আমাদের পরিবারে এটা কখনো দেখিনি। আমার মা ভাই-বোনদের সবার প্লেটে সমান করে মাছ-মাংস যা রান্না হতো তুলে দিতেন। এটাই আমার মায়ের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল। আব্বা চাকরিজীবী ছিলেন। তিনি ভলিবল খেলতেন, দাবা খেলতেন— এসব তাঁর নেশার মতো ছিল। বাবা পুরো মাসের বেতনের টাকা মায়ের হাতে দিয়ে দিতেন। মা সেই টাকায় সংসার চালাতেন। আব্বা কখনো মনেই রাখতেন না, আমরা ভাই-বোনেরা কে কোন ক্লাসে পড়ি। সবকিছু আমার মা ঠিকঠাকমতো পরিচালনা করতেন। এ জন্য বাবার প্রতি আমার অভিমানও ছিল।

শ্রুতিলিখন: আমিনুল ইসলাম শান্ত

** 'মা হারানোর বেদনা, যে হারিয়েছে সেই বুঝবে'

** সবজি বিক্রেতাই আমার মা’

** বিশ্ব মা দিবস আজ


ঢাকা/তারা

     
 

ট্যাগ :