ঢাকা, বুধবার, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৭ মে ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

সর্বংসহা একজন মানুষের গল্প

তাশরিক-ই-হাবিব : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-১৫ ৫:৩৪:৫৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-১৫ ১০:৪৪:৪৭ পিএম

জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান স্যার আর আমাদের মাঝে নেই। করোনাজর্জর এ আপৎকালে তিনি কি শেষ পর্যন্ত করোনা নামক দানবের হাতে পরাস্ত হয়েই আমাদের নীরবে বিদায় জানালেন! যাত্রা করলেন অনন্তলোকে! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বলাকা’ কবিতার সেই পঙ্ক্তি ‘হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোথা, অন্য কোন্ খানে’ বারবার ভেসে আসছে কানে। বুঝি স্যারের তিরোধানই যেন এ পঙ্ক্তিতে বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তিনি বেশ কয়েক বছর যাবত অসুস্থ ছিলেন। মাঝে অবশ্য সুস্থ হলেও তা পূর্ণ সুস্থতা ছিল না। স্যার মূলত ফুসফুস ও কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন। সম্প্রতি হাসপাতালে ভর্তিও হয়েছিলেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে গতকাল বিকেল পাঁচটার আগে ৮৩ বছর বয়সে প্রস্থান করলেন। তবে এর আগে, সম্ভবত ২০১৫ সালে বা ২০১৬ সালে, অসুস্থ হয়ে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করেছিলেন। সেবার বিভাগের সহকর্মী হোসনে আরা ও মুনিরা সুলতানার সঙ্গে স্যারকে দেখতে গিয়েছিলাম। স্যার অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন, আমরা, তাঁর স্নেহভাজন শিক্ষার্থী ও সহকর্মীরা তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম বলে। আমার মনে হয়েছিল, স্যার বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বেশ কাহিল দেখাচ্ছিল তাঁকে। যে কেবিনে তিনি ছিলেন, সেই কেবিনের ধবধবে বিছানায় শোয়া মানুষটি রোগে ভুগে একদমই যেন বদলে গিয়েছিলেন। নাজুক দেহে চুপচাপ শুয়ে থাকা স্যার নিজেও বোধহয় সেবার বুঝতে পেরেছিলেন, শরীর আর তাঁকে সমর্থন দিচ্ছে না! আর সে তো কম ধকল সয়নি এ পর্যন্ত! সেই সময়টাতে দেশে-বিদেশে স্যারের ব্যস্ততা প্রচণ্ড বেড়েছিল। বিশেষ করে, বাংলা সাহিত্যে (গবেষণা) কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য ২০১৪ সালে ভারত সরকার প্রদত্ত ‘পদ্মভূষণ’ খেতাব অর্জন তাঁর এ ব্যস্ততার মূল কারণ হয়ে উঠেছিল বলে মনে হয়। বিভাগে স্যারকে আমরা তখন যদিও নিয়মিতই পেয়েছি, তবু কাজের স্বীকৃতি, গ্রহণযোগ্যতা ও আয়োজন মিলেমিশে তাঁকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিল। তিনি সচরাচর উল্লেখযোগ্য কোনো আয়োজনের ব্যাপারে উদ্যোক্তাদের অসম্মতি জানাতেন না। তাঁকে ভালোবেসে, তাঁর কাজের প্রতি আস্থাশীল মানুষজন এ ধরনের প্রস্তাব দিলে তিনি তাতে বরং সম্মতিই দিতেন। কিন্তু অসুস্থ শরীর তো তা বুঝতে চায় না! সেই বা আর কত সইবে! কথাপ্রসঙ্গে সেদিন কেবিনে ভাবী বলেছিলেন, স্যারের সেবারও ভারতের কোন আয়োজনে যেন বক্তৃতা দেবার আমন্ত্রণ এসেছিল। যদি তিনি অসুস্থ হয়ে না পড়তেন, নির্ঘাত সেখানে যেতেন! এসব ব্যাপারে ভাবীর সঙ্গেও স্যারের কখনো কখনো আলাপ হতো, কখনো বা মতবিরোধ! ভাবীর কথা শুনে মনে হয়েছিল, ভেতরে ভেতরে তিনি ভীষণ পরিশ্রান্ত। তাঁরও বয়স হয়েছে। এত বড় সংসারের কর্ত্রী তিনি। নিজের জন্য তিনিও কিছুটা স্বস্তি, অবকাশ প্রত্যাশা করেন! স্যারের সামনে আমরা তাঁর অসুস্থতা সম্পর্কিত কোনো আলাপ করিনি। কিন্তু ভাবীকে দেখে সেই অল্প সময়েই বুঝেছিলাম- কতটা মমতা, আন্তরিকতা দিয়ে তিনি এতগুলো বছর ধরে স্যারের পাশে আছেন! স্যারকে তিনি স্বামী ও প্রিয়জন হিসেবে সব সময় সমর্থন দিয়েছেন, উৎসাহ যুগিয়ে সাহায্য করেছেন। তাঁর জন্য উদ্বেগ ও আশঙ্কায় উদ্বেলিত সেই মহিয়সী নারীর ক্লান্তিভরা মুখ, চোখের চশমা ও খানিকটা এলোমেলো চুলের মিলিত রেখাচিত্র আজ আবার মনে পড়ছে! একেকটি দৃশ্য খণ্ডখণ্ডভাবে চোখের সামনে ভাসছে। এতগুলো বছর পাশে থাকা মানুষটি আর নেই, আর কখনো তিনি আসবেন না, কথা বলবেন না, কিছু জানতে চাইবেন না, নিজে থেকে কিছু জানাবেনও না, এই অপার শূন্যতা সহ্য করার শক্তি ভাবী যেন অর্জন করেন!

ব্যক্তিগতভাবে স্যারের সঙ্গে বা তাঁর পরিবারের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আগে ছিল না। কিন্তু তবু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের ছাত্র ও সহকর্মী হিসেবে স্যারের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা একেবারে অন্য ধরনের ছিল। বিভাগের অনেক শিক্ষকই আমার শ্রদ্ধাভাজন, কিন্তু সবার সঙ্গে একই সম্পর্ক বজায় থাকে না, বজায় রাখা যায় না, রাখতে গেলে দুইপক্ষেই হিতে বিপরীত ঘটে। কাজেই তেমন সঙ্গ পরিহার করাই তখন সময়ের দাবি হয়ে ওঠে। এবার ব্যক্তিগত কিছু ঘটনার সঙ্গে স্যারের সম্পৃক্ততা নিয়ে কিছু স্মৃতিচারণ করি। কারণ আমি জানি, এ লেখাটি এখন না লিখলে এরপর আর কখনো লেখা হবে না। কারণ মনের ভেতরে এত বড় শোকের অভিঘাতে যে সংবেদনা জেগে উঠেছে, তা লেখায় ধারণ না করলে বুদবুদের মতো আবার অবচেতনলোকে তলিয়ে যাবে। বিস্মৃতিরূপ সমুদ্রের তলদেশ থেকে তুলে আনা মহার্ঘ্য রত্নরাজি, মণিমুক্তার চেয়েও আমার কাছে শতগুণে মূল্যবান স্যারের সঙ্গে সম্পর্কিত একেকটি স্মৃতি। এগুলো এখন লিখে না রাখলে একসময় নিজেকে রিক্ত, অপরাধী মনে হবে।

২০০৬ সালের কথা। তখন সম্ভবত জুলাই-আগস্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ের গরমের ছুটির পর এমএ’র ক্লাশ শুরু হয়েছে। নিশ্চিত হবার জন্য সেসময়ের লেখা পুরনো ডায়েরির পাতা ওল্টাতে হবে। এখন তা সম্ভব নয়। আগামীতে কোনো লেখা লিখলে যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়েই লিখব, নিজেকে আপাতত এভাবেই প্রবোধ দিচ্ছি। স্যার ৫০২ নয় কোর্সের ক্লাস নিতেন। এটি ছিল বাংলা গদ্যের কোর্স। উনিশ শতকের দুজন গদ্যশিল্পী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিশ শতকের দুজন গদ্যশিল্পী প্রমথ চৌধুরী ও কাজী আবদুল ওদুদের নির্বাচিত প্রবন্ধ ও প্রবন্ধসংকলন পাঠ্য ছিল। স্যার বেশ কয়েক বছর ধরেই কোর্সটি পড়াতেন। তিনি ক্লাস নিতেন দুপুর আড়াইটায়, কলাভবনের দোতলার ২০১৭ নং রুমে। সপ্তাহে দুদিন স্যারের ক্লাস হতো, রবিবার ও বুধবার। তিনি কখনো ক্লাসে দেরি করে আসতেন না। আমরা, ছেলেমেয়েরা বরং কখনো কখনো ফাঁকি দিতাম, এটা সেটার অজুহাতে। কিন্তু তিনি সেসব ব্যাপারে মাথা ঘামাতেন না। পড়ালেখা, ক্লাস নেয়া, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রাসঙ্গিকভাবে সে সম্পর্কিত আলাপে তিনি খুব আগ্রহী ছিলেন। আমরা স্যারকে অত্যন্ত সমীহ করতাম। এত বড়মাপের অধ্যাপকের বক্তৃতা শুনছি, খাতায় লিখছি, তিনি নিয়মিত সময় মেনে ক্লাস নিচ্ছেন, এসব ব্যাপার আসলে আমাদের মনোযোগকে তাঁর প্রতি আরো ঘনীভূত করত। প্রতি ক্লাসেই বক্তৃতা শেষ হলে তিনি নিজে থেকে জানতে চাইতেন, আমাদের কারো কোনো প্রশ্ন আছে কি না! দিব্যি দিয়ে বলতে পারি, একাধিক শিক্ষকই ভয়ঙ্কর রেগে যেতেন, যদি ক্লাসে কেউ তাঁকে কোনো প্রশ্ন করত। ব্যতিক্রম ছিলেন আনিসুজ্জামান স্যার ও হুমায়ুন আজাদ স্যার। তারা বরং প্রশ্নই শুনতে চাইতেন আমাদের কাছ থেকে। আর আমরা ফিসফাস করতাম, স্যার কখন আমাদের ছেড়ে দেবেন ক্লাস শেষ করে! সাড়ে তিনটার বাসটা মিস হলো বলে!

দোতলার নিজের রুমটিতে তিনি ক্লাসের আগে খানিকটা সময় নিয়ে বসতেন। ক্লাসে যা পড়াবেন, তখন সেটাই চোখ বুলাতেন, সম্ভবত। পড়ালেখার প্রয়োজনে ক্লাসের আগে, কখনো বা পরে স্যারের রুমে গেছি বলেই ব্যাপারটা জানি। তিনি কখনো বিরক্ত হননি বা অন্যদিন আসতে বলেননি। তখনই সে ব্যাপারে অভিমত জানাতেন। স্যারের বক্তৃতা শুনতে আমাদের খানিকটা সমস্যা হতো। তবে সেটা স্যারের বয়সজনিত উচ্চারণের পাশাপাশি ঐ শ্রেণিকক্ষের বিশাল আয়তন ও মাইকবিহীন পাঠপদ্ধতি, বৈদ্যুতিক পাখার বিচিত্র শব্দজনিত ত্রুটির কারণেও বটে! এমএ পরীক্ষায় ফল ভালো করতে টিউটোরিয়াল পরীক্ষাগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। স্যারের একটা টিউটোরিয়াল পরীক্ষার প্রশ্ন এখনো মনে আছে। ‘ভাব অনুযায়ী ভাষা ব্যবহার গদ্যশিল্পী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের লেখনীর বিশেষ কৃতিত্ব’- এ অভিমতের যাথার্থ্য বিচার করো। প্রশ্নটি কেন এখনো প্রায় হুবহু মনে আছে? কারণ এর উত্তর লিখতে গিয়ে স্যারের লেকচারগুলো খাতা থেকে প্রয়োজনমাফিক নেয়ার পাশাপাশি বিদ্যাসাগরের রচনাবলীর বিভিন্ন অংশ থেকে অজস্র উদ্ধৃতি গ্রহণ করে নোট করতে হতো। সংস্কৃত গদ্যের প্রবল প্রভাবযুক্ত ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’, ‘শকুন্তলা’, ‘সীতার বনবাস’, ‘ভ্রান্তিবিলাস’, ‘অতি অল্পে হইল’, ‘আবার অতি অল্পে হইল’, ‘প্রভাবতী সম্ভাষণ’ ... আহা, আমি যেন আবার স্যারের ক্লাসে ফিরে গেলাম সেই নির্জন শুনশান ভরদুপুরে! স্যার বই দেখে দেখে কালো বোর্ডে চক দিয়ে লিখে চলেছেন- ‘বারাণসী নগরীতে প্রবলপ্রতাপ নামে এক নৃপতি ছিলেন। তাহার মহাদেবী নামে প্রেয়সী মহিষী ও বজ্রমুকুট নামে হৃদয়নন্দন নন্দ ছিল।’ তিনি এ গদ্যাংশের অন্তর্নিহিত গদ্য ছন্দ বোঝাতে গিয়ে পদগুলোকে কবিতার পর্বের মতো বিভক্ত করছেন, আর আমরা তা দেখে দেখে খাতায় তুলছি। দৃশ্যগুলো চলচ্চিত্রের মতো প্রভাববিস্তারী, বেদনার হাহাকারে অশ্রুপ্লাবী।

টিউটোরিয়ালের ফল এমএ পরীক্ষার চূড়ান্ত নম্বরপত্রে ছিল। সেটি যথাসময়ে তোলার পর খেয়াল করেছিলাম, স্যারের সঙ্গে দুটো টিউটোরিয়ালেই খুব ভালো নম্বর পেয়েছিলাম; যা ছিল আমার ব্যাচের সর্বোচ্চ। কিন্তু আমার বিস্ময় চরমে পৌঁছেছিল। কেননা, চূড়ান্ত পরীক্ষায় আমি এ কোর্সে ৬৫% নম্বর পেয়েছিলাম। আমার পরীক্ষা দুর্দান্ত ভালো হয়েছিল। পরীক্ষার হলে বসে চার ঘণ্টায় চারজন গদ্যশিল্পীর ওপর চারটি প্রবন্ধ লিখতে আমি ভারসাম্য রক্ষা করতে পেরেছিলাম। কোনো প্রবন্ধই কম বা বেশি লেখিনি। একেবারে মেপে মেপে, ১০ পৃষ্ঠা করে। আসলে কোর্স শিক্ষকের ওপরই তো শিক্ষার্থীর পড়ালেখা ও ফলের সিংহভাগ নির্ভর করে! তিনি আমাকে কোর্সের প্রতি আগ্রহী করে তুলেছিলেন বলেই আমিও চেষ্টা করেছিলাম, নিজের সর্বোচ্চটুকু দিতে। এ ফল ছিল সেবছর সেই কোর্সের রেকর্ড! এমএ’র ফল প্রকাশিত হবার পর ভয়ে ভয়ে স্যারের সঙ্গে টিএনটির ফোনে এ ঘটনা জানাই। তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন। বলেছিলেন, যেন একদিন সময় করে তাঁর বাসায় গিয়ে দেখা করে আসি। আমি মনে করি, আমার এমএ পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জনের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি ও পুরস্কার ছিল এটি। শিক্ষার্থী অবস্থায় বিভাগের কোনো শিক্ষকের বাসায় যে কোনো কারণেই হোক, যাবার ব্যাপারটিকে কখনোই ভালো চোখে দেখার নিয়ম নেই, সম্ভবত। এমনকি বিভাগের রুমে যাওয়াটাও নানা গুজব, রটনার জন্ম দেয়। তাই এ ঘটনা আমার জন্য অত্যন্ত বিস্ময়কর ও আনন্দের ছিল। স্যারের গুলশান-১ এর সেই বাসায় গিয়েছিলাম পরবর্তী শুক্রবার, তাঁর সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে। মনে আছে, লিফট থেকে নেমেই সাদা পাঞ্জাবী পায়জামা পরিহিত স্যারের প্রশান্ত মুখটি দেখে একইসঙ্গে সমীহ ও আন্তরিকতায় বিমোহিত হয়েছিলাম। স্যার প্রথমেই বলেছিলেন, ‘তোমার বাসা চিনতে সমস্যা হয়নি তো!’ আহা! এমন মানুষ রতনকে আর কোথায় পাব! ভাবীর সঙ্গে সেই প্রথমবার দেখা। স্যার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁদের একসঙ্গে দেখে কেন যেন মনে হয়েছিল, অন্য ধরনের দুজন মানুষের সঙ্গে আলাপ হলো। কিছুক্ষণ আলাপের পর ভাবী উঠে গেলেন কাজে। স্যারকে পরীক্ষার রেজাল্টের ব্যাপারে, ভবিষ্যতে গবেষণার ব্যাপারে নিজের আগ্রহ ও ভালোলাগার কথা বলেছিলাম। তিনি খুশি হয়েছিলেন। বিদায় নেবার সময় তাঁরা লিফটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। চোখ কি ভেজে যাচ্ছে, সেসব দৃশ্য মনের ক্যানভাসে আবার উঁকি দিচ্ছে বলে!

২০১০ সালের আগস্টের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগদান করি। এর মাঝে একবার শুনেছিলাম, আমাদের পরের ব্যাচ, মানে সহকর্মী মোমেনুর রসুলদের ব্যাচেই স্যার শেষবার পড়িয়েছেন এমএ’র ঐ কোর্সটি। তারপর থেকে স্যার এটি আর পড়াননি। এমএ পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হওয়ার আগেই উত্তরার মাইলস্টোন কলেজে, এরপর ময়মনসিংহের (ত্রিশাল) জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করার ফলে বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগটি সরাসরি আর সেভাবে ছিল না। যদিও একাডেমিক পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছিলাম গবেষণামূলক পত্রিকায় প্রবন্ধ লেখার প্রচেষ্টা ও এমফিল গবেষণা সম্পন্ন করার তাগিদে। তবে তা পূর্ণতা পায় নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর। স্যার পুরো বিষয়ই জানতেন। কখনো কখনো তাঁর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ হতো। কিন্তু তা নিছক কালেভদ্রে।

বিভাগে যোগদানের পর আমরা চারজন প্রভাষক- সোহানা মাহবুব, মুনিরা সুলতানা, মোমেনুর রসুল ও আমি গিয়েছিলাম স্যারের সঙ্গে দেখা করতে। স্যার অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন। তিনি অভিভাবক ও সহকর্মী হিসেবে পরামর্শ দিয়েছিলেন মন দিয়ে পড়ালেখা করে তবেই যেন বক্তৃতা দিতে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার্থীদের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। কারণ ক্লাসের সবচেয়ে দুর্বল শিক্ষার্থীও বুঝতে পারে, কোন শিক্ষক কেমন পড়ান! এ কথা যেহেতু গত দশ বছর যাবত কানে লেগে আছে, আমৃত্যু তা ভুলব না!

বিভাগের বিভিন্ন আয়োজনে স্যারকে পেয়েছি নিয়মিতভাবে। তিনি ইমেরিটাস প্রফেসর হিসেবে নিযুক্ত হলে আমরা গিয়েছিলাম স্যারকে শুভেচ্ছা জানাতে। বিভিন্ন সেমিনারে, বিভাগের বর্ষপূর্তির আয়োজনে, পহেলা বৈশাখ বা অন্য আয়োজন উপলক্ষে নিমন্ত্রণে, শিক্ষকদের পদোন্নতি পালনের আনন্দ উদ্যাপনে স্যারকে পাশে পেয়েছি নিয়মিতভাবেই। বিভাগে প্রতি মঙ্গলবার বেলা বারোটায় তিনি আসতেন। লকার খুলে প্রয়োজনীয়, চিঠি, আমন্ত্রণপত্র, কাগজাদি আনতে পিয়নের কাছে চাবি পাঠিয়ে দিতেন। নিজের রুমে ঘণ্টাখানেক বসতেন। কখনো কখনো বিভাগের সভাপতির কক্ষে এসে সহকর্মীদের সঙ্গে চা পান করতেন, আলাপে অংশ নিতেন। বিভিন্ন গল্প তাঁর কাছ থেকে শুনেছি। বেশির ভাগই তাঁর ক্লাসে, কঠিন পড়াকে সহজ করার সময়। একটা বলে ফেলি।

তিনি ভারত সরকারের প্রদত্ত ‘পদ্মভূষণ’ পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু তিনি আমাদের বলেছিলেন যে এটার উল্লেখ অফিসিয়ালি করা যাবে না। এমনকি অন্যদের বলাও যাবে না যে তিনি এ খেতাবপ্রাপ্ত। তাহলে তা আবার কেড়ে নেয়া হবে! এ নিয়ে কিছুটা হাসি-ঠাট্টাও হয়েছিল। বাঙালি অতি সামান্য প্রাপ্তিতেই যখন ঢোল বাজাতে ব্যতিব্যস্ত থাকে, তখন এত বড় অর্জনের জন্য ঢোল বাজানোর দশাসই অবকাশ হাতছাড়া হলে সে তো মুখকালো করবেই। কিন্তু স্যারের মুখ কখনো মলিন হয়নি।

তবে হ্যাঁ, কোনো কোনো ঘটনায় তিনি মর্মাহত হয়েছেন। আমার সঙ্গে ঘটে চলা কিছু ঘটনা তাঁকে জানাতে বাধ্য হয়েছিলাম। এতে প্রতিকার হয়নি। কিন্তু সেসব প্রতিবন্ধকতা আর বাড়েনি। সেক্ষেত্রে স্যারের ভূমিকা ছিল কিনা, আমি জানি না। আমাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের যে প্রচেষ্টা কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে করা হয়েছে, তার ফল আখেরে ফলেনি। কেননা, জগতে মিথ্যার মোহ ও চাকচিক্য একসময় ফাঁস হয়েই যায়। শাক দিয়ে মাছ  ক’দিন ঢাকা যায়! দল, মত, পদ, পদাবি সবই নির্দিষ্ট মেয়াদের ভিত্তিতে বিন্যস্ত। একদিন সবাইকেই পদের মোহ ছাড়তে হয়। তারপর শুরু হয় কৃতকর্মের দায় ও পরিণাম হিসাব-নিকাশের পালা। যে যোগ্যতম, তাকে আটকাতে না পারলে একসময় তো সে অন্যদের আরো পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে! কতটা হীনমন্য ধারণা আমরা কতভাবে পোষণ করি! তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতাকেও চ্যালেঞ্জ করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা যায়। এ জগতে কে কাকে দাবিয়ে রাখে? ক’দিন? আমি যদি কোনো ভুল করতাম, স্যার তা নিশ্চয়ই শুধরে দিতেন। কিছু ব্যাপারে স্যারের পরামর্শ মেনে খুব ভালো ফল পেয়েছি। স্যারকে নিজের মনের কথাগুলো বলার সুযোগ আর কখনো পাব না, ভেবে এখন মনটা ভারাক্রান্ত হচ্ছে।

স্যারের সঙ্গে অফিসিয়ালি প্রথমবার ও শেষবার মাত্র একবারই মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতিলাভের আবেদনপত্র বিবেচনার কমিটিতে স্যার ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ বিচারক। নির্ধারিত সময়ে এ পদে আমার পদোন্নতি অর্জনের ক্ষেত্রে স্যারের অভিমত ও সিদ্ধান্তকে আমি সশ্রদ্ধ প্রশংসা করি।

‘পরানকথা’র সঙ্গে স্যারের সহযোগ একেবারে শুরু থেকেই ছিল। তিনি আমার এ পরিকল্পনার প্রতি আস্থাশীল ছিলেন। এর সূত্রপাত ঘটেছিল আরো আগে। ২০১৪ সালে ‘ভরদুপুরে’ গল্প লিখে আমার গল্পকার পরিচিতি সম্পর্কে বিভাগের শিক্ষক ও সহকর্মীদের পাশাপাশি তিনিও জানতেন। ২০১৫ সালে প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘ভরদুপুরে ও অন্যান্য গল্প’ ও প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ ‘গল্পকার শহীদুল জহির’ বই দুটোর মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করি। আমি চেয়েছিলাম, স্যারের হাত দিয়ে মোড়ক উন্মোচিত হোক। বিভাগের স্নেহভাজন শিক্ষার্থী, সহকর্মী, শিক্ষক ও সহপাঠীদের অংশগ্রহণে এ অনুষ্ঠানটি করতে চেয়ছিলাম। জানতাম, স্যার অত্যন্ত ব্যস্ত মানুষ, বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্বে আছেন, তবু আমার একান্ত ইচ্ছা তেমনটিই ছিল। আবারো অবাক হয়েছিলাম, স্যার এতে সানন্দে সম্মতি দেয়ায়। মোবাইলে ফোন করে স্যারকে এ পরিকল্পনা জানিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, অ্যাপয়েন্টমেন্ট ডায়েরি দেখে আগামী সপ্তাহের কোনো একটি দিন নির্ধারণ করতে হবে। সেই অনুযায়ী দারুণ সফলভাবে এ আয়োজন করা সম্ভব হয়েছিল। এজন্য আমি স্যারসহ আমার প্রিয়জন ও এতে অংশগ্রহণকারী ও শুভাকাঙ্ক্ষী সকলের প্রতি আবারো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এ আয়োজনের দেখভাল করতে গিয়ে নজরুল মঞ্চে উপস্থিত হতে আমি বরং কিছুটা দেরি করে ফেলেছিলাম। অথচ স্যার একেবারে বিকাল ৫টায় সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন, শাহেদ স্যারের সঙ্গে। তিনি বলেছিলেন, ‘তোমার বই নিয়ে আয়োজন, আর তোমারই দেখা পাচ্ছিলাম না যে!’ সেই একবারই এ মৃদু তিরস্কার স্যারের কণ্ঠে শুনেছিলাম। তিনি কখুনো উঁচু কণ্ঠে কথা বলেননি। কিন্তু দৃঢ়ভাবে অভিমত জানাতে তাঁর বিনীত, মার্জিত, স্থির কণ্ঠই যথেষ্ট ছিল। এরপরও যখন স্যারের সঙ্গে কিছু কাজ করেছি ‘পরানকথা’র জন্য, এ তিরস্কারই ছিল আমার জন্য দশ নম্বর সতর্ক সংকেত। ফলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর হয়নি।

‘পরানকথা’র পরিকল্পনা করেছিলাম ২০১৭ সালের জুন-জুলাইতে। দুই বাংলার কথাসাহিত্য চর্চাকে গ্রন্থিবদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তা কী, তা স্যারের মুখ থেকে শুনতে চেয়েছিলাম। তিনি পুরো আয়োজন সম্পর্কে জেনে আমাকে তাঁর মুখোমুখি বসার সুযোগ দিয়েছিলেন সানন্দে। দ্বিতীয়বার স্যারের বাসায় যাওয়ার অবকাশ এভাবেই এলো। মনে পড়ছে, কতটা আন্তরিকভাবে তিনি এ সাক্ষাৎকারের কম্পোজ কপি দেখে এর প্রতিটি বানান নিজে সংশোধন করে দিয়েছেন। তিনি নিজে থেকেই বলেছিলেন, দেখিয়ে নিতে। এ কাজটা করতে পেরে বুক থেকে অর্ধেক ভার নেমে গিয়েছিল যখন এর ‘উদ্বোধনী সংখ্যা-২০১৭’ প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথম বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে তিনি এসেছিলেন। তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলাম এটি। বিপুলভাবে সমাদৃত এ সাময়িকীর একটানা পথচলায় তেরোটি সংখ্যা নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এর আগামী সংখ্যাটি স্যারের পুণ্যস্মৃতিতে নিবেদিত হবে।

শিক্ষক, গবেষক, সমালোচক, প্রাবন্ধিক হিসেবে স্যারের মূল্যায়নের কাজ এর আগে কতটা হয়েছে, আমি তেমনভাবে খোঁজ করে উঠতে পারিনি। কিন্তু এবার সে খোঁজকে সশ্রম গবেষণাকর্ম হিসেবে বিবেচনার সুযোগ ও প্রয়োজন রয়েছে। তাঁর লেখার প্রধান অবলম্বন দুর্দান্ত গতিময় ও ঋজু গদ্যশৈলী। গদ্যসাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে এর প্রতি তাঁর সচেতন অভিনিবেশ ছিল। মনে পড়ে ‘প্রথম আলো’তে প্রকাশিত ‘বিপুলা পুথিবী’র একেকটি কিস্তি পড়ার জন্য সেই সময়টাতে, ২০০৯-২০১০ এ, বোধহয়, তৃষ্ণার্ত চাতকের মতো শুক্রবারের প্রতীক্ষায় থাকতাম। ছোট ছোট বাক্যের বুনোটে ভাবকে খণ্ড খণ্ডভাবে প্রকাশের মাধ্যমে ক্লান্তিহীন গতিময় ক্যানভাস তিনি গড়ে তোলেন, স্বাদু ভাষার আশ্রয়ে। এ ভাষায় ভার বহনের ক্লান্তি, পাণ্ডিত্য প্রকাশের দায় নেই। বরং রয়েছে ভাষার জগতে পথিকের অনায়াস প্রবেশজনিত পথ চলার আনন্দ। তাঁর ‘মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য’ না পড়লে আমি উনিশ শতকের বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায়ের ভাবচেতনার জগত সম্পর্কে অন্ধকারেই হয়ত থাকতাম। একটি পিএইচডি থিসিস লিখেই তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, ইতিহাস-সমাজ-রাজনীতি-সংস্কৃতির বিশাল বলয়ের আন্তঃসমর্কের স্বরূপ।

২০১৬-২০১৭ এর অসুস্থতার পর থেকেই স্যার কিছুটা নুয়ে হাঁটতেন। তারপর থেকে খানিকটা চুপচাপ, বিষণ্নও বুঝি হয়ে পড়েছিলেন। আগের সেই খোলামেলা, স্বতঃস্ফূর্ত ভাবটি ধীরে ধীরে বোধহয় আড়ালে চলে যাচ্ছিল। কথাও তেমন বলতেন না, অপ্রয়োজনে। একটা সময় বই পড়ার প্রচণ্ড নেশা নাকি ছিল। কিন্তু বার্ধক্য ও অসুস্থতার পাশাপাশি অজস্র কাজের চাপ, বিভিন্ন আয়োজনের পৌরোহিত্য করার দায়বোধ তাঁকে ক্রমশই আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলছিল, সম্ভবত! নিজের মতো করে সময় কাটানোর অবকাশ তো আগে থেকেই কমছিল! এভাবেই কি তিনি ধীরে ধীরে পরিচিত গণ্ডির মায়া কাটাচ্ছিলেন! ওপারের ডাক তিনি শুনেছিলেন! কবে, কে জানে! আমরা তো সেই খোঁজ রাখিনি! তিনিও তো জীবনের পথচলার ভারে পরিশ্রান্ত ছিলেন। এখন তিনি অপার শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকুন। নিজের জন্য তাঁর কিছু সময় প্রয়োজন, বড় প্রয়োজন। তাঁর ভাবনা, আদর্শকে লেখা ও কাজে তো ছড়িয়েই দিয়েছেন। যদি আলোকিত সমাজ গড়ার পাথেয় হিসেবে এ রসদকে তরুণ প্রজন্ম গ্রহণ করে, তাতে তাদেরই মঙ্গল! তিনি ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়ের ঘেরাটোপমুক্ত বিশ্বমানবের কল্যাণকেই জগতের শ্রেয়বোধের অবলম্বন করে তুলেছেন।

আগের মতো টানটান, সবল ভঙ্গিতে বাংলা বিভাগের করিডোরে হেঁটে যাওয়া ঢোলা সাদা পায়জামা ও রুচিশীল একরঙা পাঞ্জাবী পরিহিত সর্বংস মানুষটিকে আর কখনো দেখতে পাবো না! কে বলেছে? মনের ভুবনে তিনি রয়ে যাবেন অনন্তকাল।

 

ঢাকা/তারা