ঢাকা, সোমবার, ৩ ভাদ্র ১৪২৬, ১৯ আগস্ট ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ব্যাংকার থেকে কৃষক

শাহরিয়ার সিফাত : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৬-২৪ ৪:৩২:০৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৭-১৫ ৪:০৫:০১ পিএম
ব্যাংকার থেকে কৃষক
নিজ বাগানে শামসুল আলম
Walton E-plaza

নিজস্ব প্রতিবেদক, টাঙ্গাইল: দিগন্তজুড়ে লেবু গাছ। বাতাসের সঙ্গে একটু একটু দুলছে গাছের সবুজ পাতা। গাছে অসংখ্য লেবু। বেশ কয়েকজন শ্রমিক বাগানে কাজ করছেন। কেউ লেবু তুলছেন, কেউ গাছের বাড়তি ডাল ছেঁটে দিচ্ছেন, কেউ কাটা অংশ টেনে নিয়ে অদূরে জমা করে তাতে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছেন। পাশেই লেবু জমা করে বস্তায় ভরছেন কেউ কেউ। লেবুর সাথে ড্রাগন গাছে পেঁকে আছে ফল। সেগুলো অপেক্ষা করছে বাজারে তোলার।

লেবু আর ড্রাগন ফলের এমনই এক বিশাল বাগান চোখে পড়লো টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে। হরিপুর গ্রামের মধুপুরচালায় বাগান গড়ে তুলেছেন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা এসএম শামসুল আলম। শুধু লেবু-ড্রাগন ফলই নয়, এই বাগানে তিনি চাষ করেছেন পেয়ারা, আম, লিচু, কুল, পেঁপে, মালটা, কফিসহ আরও নানা ধরনের ফল। শামসুল আলম জানালেন চাকরি জীবন থেকে কৃষিজীবী হয়ে ওঠার গল্প।

বাগানের ড্রাগন ফল

স্কুলজীবনেই শামসুল আলম কৃষির প্রতি আকৃষ্ট হন। স্কুলে যাওয়ায় পথে দুইপাশে কৃষি জমি দেখে তার ভালো লাগত। মনে মনে ভাবতেন, বড় হয়ে সুযোগ পেলে কৃষিকাজ করবেন। কিন্তু ক্যারিয়ার গড়লেন ব্যাংকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে ব্যাংকে চাকরি হলো। পেশাজীবনে বিভিন্ন ব্যাংকে উচ্চপদে চাকরি করেছেন। ন্যাশনাল ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাজশাহীর বরেন্দ্র এলাকায় চাকরির অভিজ্ঞতাও হয়েছে। তখন তিনি সেখানে ধান আবাদের জন্য কৃষিঋণ দেয়া শুরু করেন। এই কাজ করতে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সুযোগে ছোটবেলার কৃষিপ্রেম আরো গভীর হয়। অফিসে বসেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, ভবিষ্যতে তিনি কৃষির সঙ্গে যুক্ত হবেন।

২০০৮ সালের দিকে শামসুল আলম সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ঘাটাইলের মধুপুরচালা এলাকায় একটু একটু করে জায়গা কিনতে শুরু করেন। ২০১৪ সালের ৩০ জুন তিনি চাকরি থেকে অবসর নেন। তারপর তিনি যোগাযোগ করেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কী ধরনের গাছ, কীভাবে লাগালে ভালো ফলন পাওয়া যাবে তা নিয়ে পরামর্শ করেন। ২০১৫ সাল তিনি আরো ছয়শ শতাংশ জায়গা কিনে নেন। তারও আগে আরো চারশ শতাংশ জায়গা তার কেনা ছিল। সেখানে তিনি শুরু করেন লেবু, ড্রাগন, পেয়ারা, লিচু, আম, কুল চাষ। পরবর্তীতে ঘাটাইলের মুরাইদ এলাকায় আরো আটশ শতাংশ জায়গা কিনে নেন। সেখানে তিনি বেশির ভাগ জায়গায় লেবু চাষ করেন। এরপর ২০১৯ সাল পর্যন্ত পার্শ্ববর্তী ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া ও সাপমারা এলাকায় পর্যাক্রমে আরো দুই হাজার দুইশ শতাংশ জায়গা লিজ নেন শামসুল আলম। সেখানেও তিনি লেবু চাষ করেন। বাণিজ্যিকভাবে সুবিধা ও লাভবান হতে তিনি লেবুর প্রতি আগ্রহী হন। কারণ সারা বছর কম-বেশি লেবু উৎপাদন করা যায়। শামসুল আলমের বাগানে সব সময় প্রায় ৪০ জন শ্রমিক কাজ করেন। বিশেষ সময় আরো অন্তত ৫০ জন শ্রমিক নিয়ে কাজ করতে হয়। তিনি নিজেই সব কিছু তদারকি করেন।

শামসুল আলমের লেবু বাগান

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত প্রতি বিঘায় ৪০ হাজার লেবু তার বাগান থেকে উত্তোলন করা হয়েছে। বিক্রি হয়েছে প্রায় এক লাখ টাকা। খরচ বাদে অর্ধলক্ষাধিক টাকা লাভ হয়েছে। খুব শীঘ্রই তার বাগানের ড্রাগনও বাজারে তোলা হবে। শামসুল আলম মনে করেন, কৃষিচাষ করে মানুষের জীবনের পরিবর্তন সম্ভব। তার মতে, জীবনে অবসর বলতে কিছু নেই। জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কোন না কোন কাজ মানুষকে করতেই হয়, সেটা পেশা থেকে হোক, নেশা থেকে হোক অথবা শখের বশে। যে কারণে চাকরি শেষে বেছে নিয়েছেন কৃষিকাজ। মন আর শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন কৃষির জন্য। সফলতাও পাচ্ছেন। 

তিনি জানান, তার দুই মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে বড় মেয়ে বুয়েট থেকে পাস করে আমেরিকা প্রবাসী। অপর মেয়ে শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে ঢাকায় কর্মরত এবং ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। তার নিজের অর্থের চাহিদা নেই। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তিনি দৃষ্টান্ত রেখে যেতে চান। শামসুল আলমের মতে, আমদানি নির্ভর ফল বাদ দিয়ে দেশিয় ফল আবাদ করলে আমদানি নির্ভরতা কমে যাবে। নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে শামসুল আলম বলেন, চাকরি নির্ভর মনোবৃত্তি থেকে নিজেকে সরিয়ে আত্মনির্ভর হতে হবে। এজন্য কৃষি সবচেয়ে উপযুক্ত।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৪ জুন ২০১৯/তারা

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       

Walton AC
Marcel Fridge