ঢাকা, শনিবার, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ধানে কারেন্ট পোকার আক্রমণে দিশেহারা কৃষক

নোয়াখালী প্রতিনিধি : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-০৮ ১০:২৫:২৫ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-০৮ ৭:৫৭:০০ পিএম

নোয়াখালীর সুবর্ণচর ও দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় ‘বিপিএইচ’ বা ‘কারেন্ট’ পোকার আক্রমণে রোপা আমন ধানের ব‌্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। ধান ঘরে তোলার দুই-তিন সপ্তাহ আগে এ পোকার ভয়াবহ আক্রমণে দিশেহারা কৃষক।

সুবর্ণচরের চর ওয়াপদা গ্রামের কৃষক মো. শাহজাহান জানান, তিনি এবছর ৬ একর জমিতে রোপা আমন আবাদ করেছেন। আর মাত্র ১৫-২০ দিন পরেই এ ধান ঘরে তোলার কথা। হঠাৎ গত শনিবার ধানখেতে গিয়ে দেখতে পান, কিছু কিছু অংশের ধানগাছ ঝলসে গেছে। কিছু কীটনাশক ব্যবহার করেছেন, কিন্তু কোনো সুফল মেলেনি। তার ৩০ শতাংশ জমির ধানই ক্ষতিগ্রস্ত।

চরজুবলি গ্রামের কৃষক সিরাজ মিয়া জানান, আট একর জমিতে ধান চাষ করতে এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে প্রায় দেড় লাখ টাকা। বর্তমানে তার দুটি জমিতে পোকার আক্রমণে ধান শেষ হয়ে গেছে। এ বছরই এ ধরনের পোকা তারা প্রথম দেখতে পেয়েছেন।

শুধু ওয়াপদা বা চর জুবলী নয়, এমন ভয়াবহ অবস্থা সুবর্ণচর উপজেলার মোহম্মদপুর, চর জব্বর, চর আমান উল্যাহ্, চর ক্লার্ক, চর আক্রাম উদ্দিন ও চর বাটাসহ পুরো উপজেলায়। পাশের হাতিয়া উপজেলার চানন্দী ও হরণি ইউনিয়নেও এ উপদ্রব দেখা দিয়েছে।

জেলার বেশিরভাগ জমির আমন ধান ঘরে তোলার অপেক্ষায় রয়েছেন কৃষকরা। ধানে সোনালি রঙ ধরেছে। আর কয়েকদিন পরেই এসব ধান কৃষকের ঘরে ওঠার কথা। তাই ধানখেতের আইলে আনাগোনাও বেড়েছে কৃষকের। ধান নিয়ে স্বপ্নও বুনতে শুরু করেছেন তারা। কিন্তু এক সপ্তাহ ধরে ধান ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখা যাচ্ছে। ঝলসে গিয়ে মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ধানগাছ। এর সঙ্গে কৃষকের সোনালি স্বপ্নেরও যেন সমাধি হচ্ছে। একরের পর একর জমির ধান এক সপ্তাহের মাথায় ঝলসে যাওয়ার দৃশ্য দেখে কৃষকের স্বপ্নও ঝলসে যাচ্ছে যেন।

এ বিষয়ে কথা হয় একাধিক কৃষিবিদের সঙ্গে। স্থানীয় সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থার কৃষি কর্মকর্তা শিবব্রত ভৌমিক বলেন, এটি মূলত ‘বিপিএইচ’ বা ‘কারেন্ট’ পোকার আক্রমণ। যেসব উর্বর জমিতে একাধিকবার ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয়েছে, পাশাপাশি বৃষ্টির পানি জমে স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ তৈরি হয়েছে- সেসব জমিতেই মূলত এ পোকা সহজে বংশবিস্তার করে এবং খুব দ্রুত আক্রমণ করে। পোকাগুলো সাধারণত ধানের কাইচথোড় থেকে দুধ গঠন অবস্থায় গাছের গোড়ায় আক্রমণ করে কাণ্ডের রস চুষে নেয়। এতে জমির ধান মুহূর্তের মধ্যে ঝলসে যায়।

এ কৃষিবিদের মতে, কৃষক যদি উর্বর জমিতে ইউরিয়া সার একবারের বেশি ব্যবহার না করেন এবং জমে থাকা পানি দ্রুত নিষ্কাকশনের ব্যবস্থা করেন তাহলে এ পোকার আক্রমণ থেকে রেহাই পেতে পারেন। পাশাপাশি জৈবিক দমন ব‌্যবস্থা, যেমন: আলোক ফাঁদ ব্যবহারের মাধ্যমে আক্রমণ ঠেকানো যায়। একই সঙ্গে জমিতে পোকার আক্রমণ দেখার সঙ্গে সঙ্গে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শক্রমে অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে।

কৃষকরা আক্ষেপ করে জানান, এ মুহূর্তে তারা কী করবেন তা বুঝছেন না। কীটনাশক কোম্পানির লোকদের কথামতো অনেক কীটনাশকও ব্যবহার করেছেন, কিন্তু তাতে কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। ক্ষেতের আইলে মাঝে মধ্যে সরকারি কৃষি কর্মকর্তাদের দেখা গেলেও তাদের কাছ থেকে মিলছে না সুপরামর্শ কিংবা সহযোগিতা।

কৃষকদের অভিযোগ, কৃষি কর্মকর্তারা দক্ষ নন। ফলে ভালো পরামর্শও পাওয়া যাচ্ছে না তাদের কাছ থেকে।

গণমাধ্যমকর্মী এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কারেন্ট পোকার এ আক্রমণের তথ্য পেয়ে টনক নড়েছে সরকারি কৃষি বিভাগের। ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। কৃষকদের সচেতন করতে মাইকিং শুরু করেছেন তারা।

তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. আবুল হোসেন। উল্টো তিনি ক্ষেপে গিয়ে বলেন, গণমাধ‌্যমকর্মীরা নেগেটিভ নিউজ বেশি প্রচার করেন। তাই আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।

এ প্রতিবেদকে তিনি বলেন, তিনি বক্তব্য দিতে রাজি হননি, এমন কথাই লিখে দিন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসের শেষ থেকেই মূলত রোপা আমন আবাদ শুরু হয়। কৃষকের ঘরে ধান ওঠে নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরের ১৫ তারিখের মধ্যে।

চলতি বছরে নোয়াখালীতে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৭৯৯ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে আমন ধান।

 

নোয়াখালী/মাওলা সুজন/রফিক

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন