ঢাকা, শনিবার, ৯ ফাল্গুন ১৪২৬, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

চার খুনে এখনো স্তব্ধ বড়লেখাবাসী: চা বাগানেও নিস্তব্ধতা

মৌলভীবাজার সংবাদদাতা : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-২১ ৬:১৮:৩৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০১-২১ ৬:১৮:৩৯ পিএম

মৌলভীবাজারের বড়লেখায় স্ত্রী-শাশুড়িসহ চারজনকে খুন করে ঘাতকের আত্মহত‌্যার ঘটনার রেশ কাটেনি এখনো। পরিবারের বেঁচে যাওয়া সদস‌্যরা অজানা ভয়ে ছেড়েছেন বাড়ি, প্রতিবেশীরা যাচ্ছেন না রক্তের দাগ লেগে থাকা উঠোনে, দুর্গম পাল্লাথল চা বাগানের শ্রমিকরা কাজও বন্ধ রেখেছেন। মানুষের আনাগোনায় মুখরিত বাড়ি আজ নীরব-নিস্তব্ধ।

এমন দৃশ্য লক্ষ্য করা গেছে উপজেলার উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের পাল্লাথল চা বাগানের নিহত লক্ষ্মী বুনার্জির বাড়িতে।

রোববার ভোর রাতে নিজ বাড়িতেই মেয়ে জলি বুনার্জির স্বামী ঘাতক নির্মল কর্মকারের হাতে মেয়েসহ প্রাণ হারাণ লক্ষ্মী বুনার্জি। স্ত্রী ও শ্বাশুড়িকে হত্যা করেও ক্ষান্ত হয়নি ঘাতক নির্মল। তাদের বাঁচাতে এসে প্রাণ দিতে হয়েছে প্রতিবেশি বসন্ত ভৌমিক এবং বসন্তের মেয়ে শিউলী ভৌমিককে। এসময় আহত হয়েছেন বসন্তের স্ত্রী কানন ভৌমিক। ভাগ্য ভালো থাকায় পালিয়ে বেঁচে গেছে জলির নয় বছরের শিশুকন্যা চন্দনা বুনার্জি। একে একে সবাইকে হত্যার পর নিজেকেও শেষ করে দেন নির্মল। প্রথমে নিজেই নিজের মাথায় দা দিয়ে কোপ দেয়। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে সে।

মঙ্গলবার সকালে ঐ এলাকায় খোজ নিয়ে জানা যায়, ঘটনার পর থেকে বাড়িটিতে কেউ নেই। লক্ষ্মী বুনার্জির ঘরের পাশেই প্রতিবেশী বসন্ত ভৌমিকের ঘর। ঘরগুলোর দরজা-জানালা বন্ধ। সেই বাড়িটিতে প্রয়োজনে পুলিশ ছাড়া কেউই যাচ্ছেন না। ঘাতক নির্মলের দায়ের কোপ থেকে বেঁচে যাওয়া জলির মেয়ে চন্দনাও এখন অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। আর ওই বাড়ির বসন্ত ভৌমিকের স্ত্রীও এখন হাসপাতালে। বাগানে নেই কোনো কর্মচাঞ্চল্য। প্রতিদিনের মত কেউ আর যার যার কাজে যাচ্ছে না। চায়ের ফ্যাক্টরিও বন্ধ। এই ঘটনায় হতবাক স্থানীয় চা শ্রমিকরা।  অতীতে কোনোদিন এমন নৃসংশতা দেখেনি তারা।

কথা হয় নিহত জলি বুনার্জির বাবা বিষ্ণু বুনার্জীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি অন্য একটা চা বাগানে আমার আরেক মেয়ের সাথে থাকি। সকালে খবর পাই, আমার স্ত্রী ও মেয়েসহ পাশের ঘরের আরও দুজনকে আমার মেয়ের জামাই কুপিয়ে হত্যা করেছে। পরে সে নিজে আত্মহত্যা করেছে। ’

তিনি বলেন, ‘প্রায় একবছর আগে নির্মলের সাথে আমার মেয়ে জলির বিয়ে হয়। বিয়ের পর তাদের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। আমি তাদের অনেক বুঝানোর চেষ্টা করতাম। কিন্তু তারা আমার কথা শোনেনি।

তিনি আরও বলেন, ‘জলির আগে এক বিয়ে হয়েছিল। আগের পরিবারে তার এক মেয়ে সন্তান রয়েছে। তার নাম চন্দনা। ঘটনার সময় সে ঘরে ছিল। পরে ভয়ে পালিয়ে প্রতিবেশী এক বাড়িতে সে আশ্রয় নেয়। ’

পাল্লাথল চা-বাগানের হ্যাড ফ্যাক্টরি ক্লার্ক অঞ্জন দাস বলেন, ‘এই ঘটনায় পুরো বাগানবাসী স্তব্ধ। এটি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। বেশি খারাপ লাগছে, জলিকে বাঁচাতে গিয়ে দুজন প্রতিবেশী নির্মমভাবে খুন হয়েছেন।

উত্তর শাহবাজপুর ইউপি চেয়ারম্যান আহমদ জুবায়ের লিটন বলেন, ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। একসাথে এত মানুষ খুন হয়েছে। এতে পুরো বাগানবাসী ও উপজেরার মানুষ স্তব্ধ-বাকরুদ্ধ।

বেঁচে যাওয়া নিহত জলি বুনার্জির মেয়ে চন্দনা বুনার্জির লেখাপড়াসহ যাবতীয় সব কিছুর দায়িত্ব চেয়ারম্যান নেবেন বলে জানান।

এদিকে সোমবার বিকেলে পাঁচজনের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে বাগান পঞ্চায়েত কমিটির কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। এরপর বাগানের শ্মশান ঘাটে তাদের সৎকার সম্পন্ন হয়। এর আগে উপজেলার পাল্লাথল চা বাগানের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি কামরুল আহসান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন মৌলভীবাজার পুলিশ সুপার মো. ফারুক আহমদ, সিলেটের সহকারী পুলিশ সুপার গৌতম দেব, উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান আহমদ জুবায়ের লিটন প্রমুখ ।

এদিকে, রোববার (১৯ জানুয়ারি) রাতে উপজেলার উত্তর শাহবাজপুর ইউপির পাল্লাথল চা বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক জাকির হোসেন বাদি হয়ে মামলা করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করে বড়লেখা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জসীম জানান, মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায় পারিবারিক কলহের জের ধরে স্ত্রী-শাশুড়িসহ দুই প্রতিবেশীকে হত্যার পর এক যুবকের আত্মহত্যার ঘটনায় থানায় দুটি মামলা হয়েছে। এরমধ্যে একটি হত্যা মামলা এবং অপরটি অপমৃত্যু মামলা। তবে হত্যা মামলায় কাউকে আসামি করা হয়নি।

ডিআইজি কামরুল আহসান গণমাধ্যমকে বলেন, একই সাথে পাঁচজন মানুষের মৃত্যু, খুবই মর্মান্তিক একটি ঘটনা। নিহত জলি বুনার্জির মেয়ে চন্দনা বুনার্জির ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে সে যাতে শিক্ষিত ও ভালো মানুষ হিসেবে সমাজে বেড়ে উঠতে পারে, এজন্য আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।’ ‘

উল্লেখ্য, রোববার (১৯ জানুয়ারি) ভোররাতে নির্মল কর্মকারের সঙ্গে তার স্ত্রী জলি বুনার্জির (৩০) ঝগড়া হয়। এরই জের ধরে নির্মল জলিকে দা দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে। এসময় জলিকে বাঁচাতে তার মা লক্ষ্মী (৬০) ও পাশের বাড়ির বসন্ত ভৌমিক (৬০) এবং বসন্তের মেয়ে শিউলী (১৪) এগিয়ে আসে। নির্মল তাদেরও কুপিয়ে হত্যা করে। ঘটনার সময় বেঁচে যাওয়া ঘাতকের সৎ মেয়ে চন্দনা বুনাজি (৯) চিৎকার দিলে আশাপাশের শ্রমিকরা বাড়ি ঘেরাও করে। এ অবস্থায় নির্মল ঘরের দরজা লাগিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন।


মৌলভীবাজার/সাইফুল্লাহ হাসান/সাজেদ

     
 

আরো খবর জানতে ক্লিক করুন : মৌলভীবাজার, সিলেট বিভাগ
ট্যাগ :