ঢাকা, শনিবার, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ৩০ মে ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

‘গুলি আসলে আসুক, পিছপা হবো না’

এমএম আরিফুল ইসলাম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০২-১৮ ৫:৪৮:২৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০২-১৯ ৬:৪১:৪০ পিএম

১৯৫২ সাল। ২১শে ফেব্রুয়ারির পর ভাষা আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে। তৎকালীন ছোট মহকুমা শহর নাটোরেও লেগেছিল ঢেউয়ের দোলা। স্কুল ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে ক্ষুদে ছাত্ররাও শ্লোগান দিয়েছিল- ‘গুলি আসলে আসুক, পিছপা হবো না’।

মায়ের বকুনি, পুলিশের ভয় উপেক্ষা করে সেদিনের ক্ষুদে ভাষা সৈনিকরা মাইক ও হাতে লেখা পোস্টার নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন রাস্তায়। ঘোষণা করতেন আন্দোলনের কর্মসূচি। নাটোরবাসীকে যথাসময়ে আন্দোলনে অংশ নেয়ার জন‌্য আহ্বান জানাতেন।

তাদের প্রেরণা ছিল রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ। নাটোরের তৎকালীন পার্লামেন্ট সদস্য কাজী আবুল মসউদ, কাজী আবদুল মজিদও ছিলেন ভাষা আন্দোলনের প্রেরণাদাতা। ছোট মফঃস্বল শহর হলেও নাটোর বিচ্ছিন্ন ছিল না ভাষা আন্দোলন থেকে।

১৯৩৮ সালের ২৩ জুলাই সিংড়া উপজেলার দমদমা গ্রামে জন্ম ভাষা সৈনিক আলহাজ ফজলুল হকের। বর্তমানে তিনি নাটোরের একজন স্বনামধন্য ওষুধ ব্যবসায়ী।

১৯৫২ সালে তিনি মোমিরিয়াল হাই স্কুলের (বর্তমান সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়) নবম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। ক্লাস ক্যাপ্টেনদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন স্কুল ক্যাপ্টেন। ভাষা আন্দোলনের ঢেউ যখন নাটোরে গিয়ে আছড়ে পড়ে, তখন তারও তরুণ রক্ত নেচে উঠেছিল। স্মৃতি হাতড়ে তিনি তুলে আনেন সেই আগুন ঝরা দিনের উপাখ‌্যান।

“১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আমাদের কাছে খবর আসে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশ গুলি চালিয়েছে। শহীদ হয়েছেন রফিক, জব্বার, সালাম ও বরকত।

খবরটি শুনে আমাদের রক্ত গরম হয়ে যায়। স্কুল ক্যাপ্টেন হিসেবে সব ছাত্রের নেতা হিসেবে কিছু একটা করার চিন্তা করি। স্কুলের সব ছাত্র বের হয়ে মিছিল সহকারে চলে যাই নাটোর গালর্স হাই স্কুলে (বর্তমানে সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়)। স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছাত্রীদের ছাড়তে রাজি নন। স্কুল ক্যাপ্টেন সামসুন্নাহারের সঙ্গে কথা বলে তাকে রাজি করে ফেলি। এরপর ছাত্রীদের দায়-দায়িত্ব আমরা নিজেরা নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়ি রাস্তায়।

মিছিল করতে করতে চলে যাই মহারাজা জে এন হাইস্কুলে (মহারাজা জগদীন্দ্রনাথ উচ্চ বিদ্যালয়)। তিন স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী মিলে রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে শহরে মিছিল করি। এরপর জড় হই জমিদার বাবু চৌধুরী কামান গেট সংলগ্ন আমতলায়। সেখানে এক বিশাল সমাবেশে আমরা আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদা দানের দাবিতে বক্তব্য রাখি।

আমি ছাড়াও সামসুন্নাহার, ফজলুল হক শাহ, অরুন রায়সহ অনেকেই সেই সমাবেশে বক্তব্য রাখেন- যাদের নাম এখন মনে পড়ছে না। মজার ঘটনা- প্রতিবাদ সমাবেশ শেষে বাড়ি ফিরেই মায়ের বকুনি খেলাম।

খবর পেলাম আমাদের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট হয়ে গেছে। শুনেই আমার গা হিম। পালিয়ে গেলাম বর্তমান নলডাঙ্গা উপজেলার পিপরুল গ্রামের শেখ নজরুল ইসলামের (চিত্র পরিচালক) বাড়িতে। অনেক দিন সেখানে আত্মগোপন করে থাকার পর শুনলাম পুলিশ কাউকে ধরেনি। পরে বাড়ি ফিরে আসি।

এরপর ওভাবে আর রাস্তায় মিছিল করা হয়নি। তবে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে যেসব আন্দোলন-সমাবেশ হয়েছে তার মাইকিংসহ সামগ্রীক প্রচারের কাজগুলো আমরাই মূলত করেছি। নাটোরে রাজনৈতিকভাবে ভাষা আন্দোলনের কর্মসূচি পালিত হয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশে। তৎকালীন আওয়ামী মুসলিম লীগের ব্যানারে পালিত হতো সব কর্মসূচি।

কমিটির সভাপতি করা হয় অ্যাডভোকেট কাচু উদ্দিনকে (প্রয়াত)। আর সেক্রেটারি করা হয় মাইদুল ইসলামকে (তিনিও প্রয়াত হয়েছেন।)

বাবু চৌধুরী কামান গেটসংলগ্ন আমতলাই ছিল তৎকালীন নাটোরের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান স্থান। আমাদের নতুন কমিটিকেই ভাষা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন সোহরাওয়ার্দী সাহেব।

কেন্দ্রের নির্দেশমতো রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আমরা নিয়মিত আমতলায় জড়ো হতাম। ওখান থেকে মিছিল বের করে শহর ঘুরে আবার ওখানে গিয়েই সমাবেশ করতাম। আমাদের সঙ্গে ছিলেন গোলাম ইয়াজদানী মজু, সৈয়দ মোতাহার আলী, মকছেদ আলী, মো.সিরাজুল ইসলামসহ আরো অনেকে।

চলমান ভাষা আন্দোলনকে গতিশীল করতে সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, মানিক পীর সাহেব এলেন নাটোরে। মরহুম মধু চৌধুরীর চেম্বার (কাচারিবাড়ী) সংলগ্ন ফাঁকা জায়গায় সমাবেশ হলো। মওলানা ভাসানী সভাপতিত্ব করেছিলেন সেই সমাবেশ। কাচু উদ্দিন, মাইদুল হকসহ নাটোরের নেতারা জ্বালাময়ী বক্তব্য রেখেছিলেন সেই সমাবেশে। মওলানা ভাসানী সাহেব আমাকে বলেছিলেন, ‘পড়াশোনা বাদ দিয়ে তোমরা এখানে কেন?’

আমাদের চোখেমুখেই তার জবাব ফুটে ছিল মুখে কিছু বলতে হয়নি। ভাসানী সাহেব বুঝে নিয়েছিলেন। মুচকি একটু হেসেছিলেন। অবশেষে বাংলা রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা পেল। এর ধারাবাহিকতায় এলো মুক্তি সংগ্রাম স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশ।”

স্ত্রী গুল আফরোজ বেগম, তিন কন‌্যা- রেজিনা আখতার তুহিন, সাবিনা আখতার, শারমিন আখতার ও ছেলে মো. ওয়াসিফউল হককে নাটোর শহরে থাকেন ভাষা সৈনিক ফজলুল হক।

নাটোরের এই ভাষা সৈনিকের ছেলে মো. ওয়াসিফউল হক তুষার বলেন, ‘মানুষ যখন ভাষা সৈনিকের সন্তান হিসেবে শ্রদ্ধা করে, ভক্তি দেখায়। তখন বাবাকে নিয়ে গর্বে বুকটা ভরে ওঠে।’

ভাষা সৈনিক ফজলুল হক প্রত‌্যাশা নিয়ে বলেন, ‘অনেক রক্ত আর ত্যাগের বিনিময় অর্জিত আমাদের মাতৃভাষা। এ ভাষা সর্বত্র ছড়িয়ে যাক ও সঠিক চর্চা অব্যাহত থাকুক।’


নাটোর/সনি