ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ চৈত্র ১৪২৬, ৩১ মার্চ ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

বিষিয়ে উঠেছে ‘শিমুলিয়া’

সাভার প্রতিনিধি : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০২-২৬ ৯:০২:১২ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০২-২৬ ১০:২৫:৩৪ এএম

অবৈধভাবে গড়ে উঠা পোশাক কারখানার বর্জ্যের দূষণে বিষিয়ে উঠেছে সাভারের আশুলিয়ার শিমুলিয়া ইউনিয়নের মেশিনপাড় এলাকার মানুষের জীবন।

কৃষিপ্রধান এই এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা নায়াগ্রা গ্রুপের জিটিএ স্পোর্টস লিমিটেডের এ কারখানার কেমিক্যাল মিশ্রিত বিষাক্ত পানি ছড়িয়ে পড়ছে জমিতে জমিতে।

এতে উর্বরতা হারাচ্ছে এসব কৃষি আবাদি জমি। অন্যদিকে জলাবদ্ধ হয়ে থাকা নানা রঙের কেমিক্যাল মিশ্রিত পানি পচা গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি মশা-মাছি উৎপাদনের কারখানায় পরিণত হয়েছে।

বলা যায়, বাতাসে বিষের গন্ধ নিয়ে বসবাস করছেন এই এলাকার মানুষ। স্থানীয় কৃষক ও এলাকাবাসী বারবার প্রতিকার চাইলেও উপজেলা কৃষি বিভাগসহ স্থানীয় প্রশাসন কোন ব্যবস্থা না নেওয়ায় টনক নড়েনি কারখানা কতৃপক্ষের। এই সমস্যার সমাধানে দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

স্থানীয়রা বলছেন, কারখানাটি নিজস্ব ইটিপি পদ্ধতি ছাড়াই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আইন অমান্য করে বছরের পর কেমি‌ক‌্যাল মিশ্রিত পানি ফসলি জমিতে প্রবেশ করায় মাটির উর্বরতা হারিয়ে নষ্ট হচ্ছে ফসল। একই সাথে মারাত্মক দূষণের কবলে খালের মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণি মরে যাওয়ায় হুমকিতে পড়ছে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় জনগণের নিষেধ না মেনে প্রভাব খাটিয়ে আবাসিক এলাকায় কারখানাটি চলছে। এটি গড়ে উঠার পর থেকে কারখানার কেমিক্যাল বর্জ্য পদার্থের সাথে মারাত্মক দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

এবছর বোরো মৌসুমে চার বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছিলেন কৃষক হান্নান বেপারী। তিনি বলেন, ওই কারখানার ডায়িংয়ের ময়লাযুক্ত পানি সরাসরি ক্ষেতে প্রবেশ করায় তাদের ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। জমিতে কেমি‌ক‌্যাল বর্জ‌্যে অধিক পরিমাণ কাঁদা জমে মাটির উর্বরতা হারিয়ে যাচ্ছে। শুরুতে ধানের গোছা মোটা ও সবুজ দেখালেও বৈশাখ- জ‌্যৈষ্ঠ মাসে সামান্য বৃষ্টিতেই ধান ঝরে যায়।

পাশাপাশি ক্ষেতে প্রচুর পোকামাকড়ের আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা। উপজেলা কৃষি অফিস ও বাজার থেকে কেনা কীটনাশক প্রয়োগ করেও কোন ফল মিলছে না। এছাড়াও দূর্গন্ধযুক্ত কাঁদামাটির আধ্যিকের কারণে গবাদি পশু দিয়ে ক্ষেতে হালচাষসহ স্বাভাবিক কাজ করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।'

কারখানা কতৃপক্ষ, উপজেলা কৃষি অফিস ও প্রভাবশালীদের কাছে তারা অনেকবার বলেও কোন প্রতিকার পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

কৃষক আমান উল্লাহ আমান জানান, জিটিএ কারখানা কতৃপক্ষ সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বিষাক্ত কেমি‌ক‌্যাল মিশ্রিত পানি ছেরে দেওয়ায় তাদের শত শত বিঘা কৃষি জমি নষ্ট হচ্ছে। গত ৮-১০ বছর পূর্বেও বোরো মৌসুমে তারা বিঘা প্রতি ৩০-৪০ মণ ধান পেতেন। কিন্তু কয়েক বছর ধরে বিঘা প্রতি তারা মাত্র ৭-৮ মণ ধান পাচ্ছেন। লোকসানের কারণে অনেকেই চাষাবাদ বাদ দিয়ে দিনমজুরের কাজ করছেন।

কিন্তু তার মত অনেকেই অন্য পেশা না জানায় ক্ষতির মুখে বাধ্য হয়েই চাষাবাদ করছেন। এ বিষয়ে কারখানার কর্তৃপক্ষের সাথে দেখা করতে গেলে তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ তার।'

কিন্তু এসব অভিযোগ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জিটিএ স্পোর্টস লিমিটেড কারখানার এইচআর ম্যানেজার মতিউর রহমান।

তিনি দাবি করেন, কারখানার কেমি‌ক‌্যাল মিশ্রিত বর্জ্য ইটিপির মাধ্যমে শোধন করেই নির্গত করা হচ্ছে।

এসময় কারখানার পেছনের অংশে বিরাট একটি পুকুরে জমিয়ে রাখা দূর্গন্ধযুক্ত কালো পানি ও জমিতে ড্রেনের ব্যাপারে জানতে চাইলে এই প্রশ্নের উত্তর তিনি দেবেন না বলে জানান।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শফি মোহাম্মদ তারেক জানান, কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য ফসলি জমি থেকে খাদ্যচক্রের বিষক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগের সৃষ্টি করে।

তাই সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী, কেমি‌ক‌্যাল মিশ্রিত বর্জ্য ইটিপিতে শোধনের পরই যাতে শিল্প কারখানাগুলো তা পরিবেশে ছারে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরকে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে হবে।

তিনি বলেন, যেসব কারখানা তা অমান্য করে পরিবেশ দূষণ করবে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে, সাভার উপজেলা কৃষি অফিসার নাজিয়াত আহমেদ বলেন, শিমুলিয়া ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের পাশে থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে। বিষয়গুলো দেখা হবে।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও আশুলিয়া সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাজওয়ার আকরাম সাকাপি ইবনে সাজ্জাদ বলেন, গার্মেন্টস কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে কৃষি জমি ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার খবর পেয়েছি। পরিবেশ অধিদপ্তরের বিধি অনুযায়ী এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।




সাব্বির/বুলাকী

     
 

আরো খবর জানতে ক্লিক করুন : ঢাকা, ঢাকা বিভাগ
ট্যাগ :