ঢাকা, সোমবার, ১৬ চৈত্র ১৪২৬, ৩০ মার্চ ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

কিশোর মুক্তিযোদ্ধার বিমান বিধ্বংসের কাহিনি (ভিডিও)

রুমন চক্রবর্তী : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-২৬ ৮:১৯:৪০ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-২৭ ৩:২১:৪৫ এএম

মুক্তিযুদ্ধের সময় মো. ইসমাইল দুরন্ত এক কিশোর। জন্ম কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার টামনী নয়াপাড়া গ্রামে। বাবা আব্দুল খালেক, মা নুরজাহান বেগমের আদরের সন্তান। ছোট থেকেই খুব সাহসী এবং স্পষ্টভাষী ছিলেন ইসমাইল। সবে মাধ্যমিক স্কুলের গণ্ডিতে পা রেখেছেন, এমন সময় দেশে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। শুরু হলো স্বাধীনতার সংগ্রাম।

চোখের সামনে দেশের মানুষের উপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্যাতন, হত্যাযজ্ঞ মেনে নিতে পারছিলেন না তিনি। এলাকার তরুণদের সঙ্গে চলে গেলেন ভারতের লাউড়েরগড় গোমাঘাট শিবিরে। সেখান থেকে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে বালাট মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটিং ক্যাম্পে। ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মণ্ডলির সাবেক সদস্য সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত।

রিক্রুুটিং ক্যাম্পে ইসমাইলকে নিয়ে দেখা দিলো বিপত্তি। বয়স (১৩) কম হওয়ায় তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রিক্রুট করতে কেউ রাজি ছিলেন না। কিন্তু ইসমাইলের প্রচণ্ড জেদ আর দৃঢ় প্রত্যয়ের কাছে সবাইকে হার মানতে হলো। ৭৪ জনের একটি দলের সঙ্গে তাকেও পাঠিয়ে দেওয়া হলো, মেঘালয় রাজ্যের ইকো-ওয়ান প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। প্রশিক্ষণ শেষে ইসমাইল ফিরে এলেন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে। বয়সের কারণে এখানেও দেখা দিলো বিপত্তি। অপারেশনে তাকে নেওয়া হতো না। দায়িত্ব ছিল নিচে পাহাড়ি ঝরনা থেকে সবার জন্য খাবার পানি নিয়ে আসা। এদিকে ট্যাংরাটিলায় পাকিস্তানি সেনাক্যাম্পে বারবার আক্রমণ করেও ব্যর্থ হচ্ছিল দল। ফলে মিত্র বাহিনীর সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন রাও দলের ওপর খুব ক্ষিপ্ত হন। তখন ইসমাইল অনুমতি নিয়ে কিশোর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কৌশলে ট্যাংরাটিলায় হামলা করে সফল হয়।

এ ঘটনায় ক্যাপ্টেন রাও খুশি হয়ে ইসমাইলের কিশোর দলকে আসামের শিলং শহরে সংবর্ধনার মাধ্যমে উৎসাহিত করেন। সেখান থেকে ফিরে তিনি সিলেটের তেলিখাল, মোল্লাগাঁও ব্রিজ অপারেশন, উমাইরগাঁও, বল্লি, ছাতক ও হাসনাবাদের রণাঙ্গণে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়ে বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এ সময় তিনি ভোলাগাঁও এলাকায় এলএমজি’র গুলিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি পরিবহন বিমান ভূপাতিত করেন। এরপর থেকে সকলের কাছে তিনি বিমান বিধ্বংসী কিশোর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পান।

মো. ইসমাইল রাইজিংবিডিকে জানিয়েছেন ১৯৭১ এর সেই লোমহর্ষক বিমান বিধ্বংস করার কাহিনি। এর পরিকল্পনা তিনি নিজেই করেছিলেন। ৫ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর মীর শওকত আলী আগে থেকেই হানাদার বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করার পরিকল্পনা করছিলেন। এসময় ইসমাইল তাকে তার পরিকল্পনার কথা বলেন। মেজর শওকত বললেন, তুমি তো ছোট। এ ধরনের অপারেশনে মারা যাবে। ইসমাইল সেদিন দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘স্যার আমরা তো মারতে এসেছি, মেরেই তবে মরব।’

পরদিন কোম্পানি কমান্ডার ইয়ামেনের নেতৃত্বে তাঁরা দলবেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়েন স্পেশাল অপারেশনে। প্রায় পাঁচদিন হাওরে ছোট ছোট নৌকায় ওঁৎ পেতে ছিলেন তারা। হঠাৎ তাদের কানে আসে পাক বাহিনীর বিমানের ভো-ভো শব্দ। খোঁজ নিয়ে জানা যায় হাওরের পশ্চিম পাশে সালুটিকর বিমানবন্দর। ইসমাইল তখন কমান্ডারকে বিমান বিধ্বংসের পরিকল্পনার কথা জানান। অথচ হাতে তখন দুটি এলএমজি, আর সামান্য কিছু ট্রেসার রাউন্ড। তাই নিয়ে প্রস্তুত হন ইসমাইল। পাক বাহিনীর বিমান লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার শুরু করেন। হঠাৎ লক্ষ্য করলেন, বিমানটিতে গুলি লেগে কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে। একটু পরেই বিমানটি হাওরের জমিতে ভূপাতিত হয়। গ্রামবাসী সমস্বরে বলে উঠে, ‘জয় বাংলা’। ১৯৭২ সালের ১৫ জানুয়ারি বীরের বেশে নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন ইসমাইল।

যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে অনেক কষ্টে কেটেছে তাঁর জীবন। দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী। কষ্ট করেই এসসসি পাস করেন। তারপর ব্যক্তি মালিকানাধীন অনেক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন জীবিকার প্রয়োজনে। অনেক সময় পেরিয়ে অবশেষে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ১৯৯১ সালে স্বাস্থ্য বিভাগে তৃতীয় শ্রেণির চাকরি পান। পরে হিসাবরক্ষক হিসেবে তাঁর প্রমোশন হয়।
ইসমাইল এখন ৬১ বছরের প্রবীণ। অবসর জীবনযাপন করছেন। দেশের জন্য অবদান রাখতে পেরেছেন এ জন্য তাঁর গর্বের শেষ নেই। যে কারণে হাসি মুখেই মেনে নিয়েছেন জীবনের না-পাওয়াগুলো।




ঢাকা/তারা

     
 

আরো খবর জানতে ক্লিক করুন : কিশোরগঞ্জ, ঢাকা বিভাগ
ট্যাগ :