ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ আষাঢ় ১৪২৭, ০৯ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

পোনা সংকটে চিংড়ি চাষিরা দিশেহারা

আলী আকবর টুটুল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-০৬ ১:৩১:৪৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-০৬ ৪:০৭:৫৬ পিএম

করোনা পরিস্থিতিতে নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চিংড়ি চাষিরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

হ্যাচারির পোনা উৎপাদন ব্যহত, প্রাকৃতিক উৎস থেকে পোনা আহরণ নিষিদ্ধ ও পরিবহন ব্যবস্থা অচল থাকায় চাহিদার তুলনায় খুব বেশিই পোনা সংকটে পড়েছেন এই অঞ্চলের চিংড়ি চাষিরা।

চিংড়ি চাষি ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বাগেরহাট জেলায় ২‘শ ৫০ কোটি বাগদা ও ২ কোটি গলদা চিংড়ির রেনুর চাহিদা রয়েছে। কিন্তু এ বছর বাগদা চিংড়ির হ্যাচারিতে উৎপাদন সীমিত হওয়ায় সব চাষি তার চাহিদা অনুযায়ী মাছ ছাড়তে পারছেন না। অন্যদিকে বাগেরহাটে থাকা ১৪টি গলদা চিংড়ি হ্যাচারির সবগুলোতেই উৎপাদন বন্ধ থাকায় প্রাকৃতিক উৎসের উপর নির্ভর করতে হবে গলদা চাষিদের। যার ফলে গলদা চিংড়ি চাষিরাও পোনা সংকটে ভুগছেন।

বাগেরহাট জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বাগেরহাট জেলায় ৬৬ হাজার ৭‘শ ১৩ হেক্টর জমিতে ৭৮ হাজার ৬শ ৮৫টি বাগদা ও গলদা চিংড়ির ঘের রয়েছে। এসব ঘেরে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে ১৬ হাজার ৫‘শ ৭৫ মে.টন বাগদা ও ১৫ হাজার ৪‘শ ১৩ মে.টন গলদা উৎপাদন হয়েছে। বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে সিংহভাগ উৎপাদন না হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যার ফলে জেলার হাজার হাজার কোটি টাকা আয় কমে যাবে।

বাগেরহাট সদর উপজেলার ডেম ইউনিয়নের চিংড়ি চাষি মো. মহিবুল্লাহ মিন্টু বলেন, ‘আমার ১২শ বিঘা জমির ৩টি ঘেরে গেল বছর প্রায় ৯০ লক্ষ বাগদার পোনা ছেড়েছিলাম। এ বছর মাত্র ১৫ লক্ষ পোনা ছাড়া হয়েছে। এবার পোনা সংকটের কারণে গত বছরের তুলনায় হাজার প্রতি ৬ শ টাকা বেশি দিয়ে পোনা কিনতে হচ্ছে। যার ফলে চাহিদা অনুযায়ী পোনা ছাড়া সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া রপ্তানি বন্ধ থাকায় স্থানীয় বাজারে কম মূল্যে বাগদা চিংড়ি বিক্রি করতে হচ্ছে।'

বাগেরহাট সদর উপজেলার বেমরতা ইউনিয়নের চিংড়ি চাষি আব্দুস সোবহান বলেন, ‘প্রতিবছর চৈত্র মাসের প্রথম দিক থেকেই আমরা ঘেরে পোনা ছাড়ি। কিন্তু এবছর সময়মতো পানি ও পোনা না পাওয়ার কারণে ঘেরে পোনা ছাড়তে পারিনি। পোনা ছাড়ার মৌসুমের শেষ পর্যায়ে এসে অতিরিক্ত দামে পোনা ছাড়তে হচ্ছে। তাও চাহিদা অনুযায়ী পোনা ব্যবসায়ীরা পোনা দিতে পারছেন না আমাদের। গত বছর এই দিনে যে গলদা রেনুর হাজার ছিল ১৬-১৭ শ টাকা, সেই রেনু পোনা এখন ক্রয় করতে হচ্ছে ২৫-২৬শ টাকা করে। এত দামের পোনা ছেড়ে বেশি দামের খাবার খাইয়ে পুঁজি উঠবে কিনা তা নিয়ে সংশয়ে আছি।'

বাগেরহাট জেলা চিংড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ফকির মহিতুল ইসলাম সুমন বলেন, ‘গেল দুই-তিন বছর বৈরী আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে জেলায় মোট চিংড়ির উৎপাদন ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমেছে। বর্তমানে কোভিড-১৯ আরো বড় দুর্যোগ হয়ে দেখা দিয়েছে। এর ফলে চাষিরা ঘেরে থাকা বিক্রির উপযোগী মাছও উপযুক্ত দামে বিক্রি করতে পারছেন না। আবার পোনার অভাবে নতুন মৌসুমে মাছও ছাড়তে পারছেন না। বাগেরহাট জেলায় প্রায় আড়াই থেকে তিনশ কোটি বাগদার পোনা ও দেড় থেকে দুই কোটি গলদা চিংড়ি পোনার চাহিদা রয়েছে। কিন্তু এবছর নানা কারণে তিন ভাগের একভাগ পোনাও পাওয়া যাচ্ছে না।'

যতদিন পর্যন্ত হ্যাচারিগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণ গলদা ও বাগদা চিংড়ির পোনা উৎপাদন করতে না পারবে, ততদিন পর্যন্ত প্রাকৃতিক উৎস থেকে পোনা আহরণের অনুমতি দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান মৎস্যচাষিদের এই নেতা।

রামপাল উপজেলার ফয়লাহাট চিংড়িপোনা মৎস্য আড়তদার সমিতির সভাপতি কাজী রাশেদুল ইসলাম ডালিম বলেন,  ‘দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সব থেকে বড় পোনা বিক্রির মোকাম ফয়লাহাট। ঘেরে চিংড়ির পোনা ছাড়ার মৌসুমে প্রতিদিন এখানে কোটি কোটি টাকার পোনা বিক্রি হয়। কিন্তু এবছর পোনার সরবরাহ কম থাকায় বাজার জৌলুশ হারিয়ে ফেলেছে।'

চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্র, বাগেরহাটের উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এইচ এম রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতির কারণে শুধু চিংড়ি সেক্টর নয় সকল সেক্টরেই একটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে আমরা আশা করছি করোনা পরবর্তী সময়ে আমাদের মৎস্য সেক্টর একটি বড় সম্ভাবনার খাতে পরিনত হবে।'

বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. খালেদ কনক বলেন, ‘খাল খননের ফলে ঘেরে পানি নেই। বিক্রয়যোগ্য মাছের দাম নেই। বাজারে পোনা সংকট। বাগেরহাটে প্রায় দেড় কোটির মত গলদা পোনার চাহিদা রয়েছে। এ বছর  ২৫ থেকে ৩০ লক্ষ পোনা বাজারে পাওয়া যাবে। কোন ভাবেই পোনার চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়।'

তবে মহামারি থেকে দেশ পরিত্রাণ পেলে চাষিদের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

 

বাগেরহাট/টিপু

       
 

আরো খবর জানতে ক্লিক করুন : বাগেরহাট, খুলনা বিভাগ