ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ কার্তিক ১৪২৬, ১৫ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

মহানায়কের আরেক নাম বঙ্গবন্ধু

কামাল লোহানী : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৭-০৮-১৩ ৫:২৭:৩৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৮-১৩ ৫:২৭:৩৭ পিএম

|| কামাল লোহানী ||
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক মহানায়কের অভিধা পেয়েছিলেন। আজও পর্যন্ত মানুষ তাঁকেই স্মরণ করে। কারণ বঙ্গবন্ধু যখন শুধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তখন থেকেই যে রাজনৈতিক দীক্ষায় দীক্ষিত হয়েছিলেন সেটি সব সময় ছিল মানুষের পক্ষে। তিনি স্বপ্ন দেখতেন দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর। এই স্বপ্ন দেখতে গিয়ে তিনি বিভিন্ন সময়ে ভেবেছেন। তার মধ্যে একটি একেবারে অবশ্যই অপরিহার্যভাবে ছিল সেটি হলো, পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তানি শোষণ থেকে মুক্তি। প্রথমত যখন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ হয় তখন তিনি জেলে ছিলেন। ১৯৪৯ সাল। এই ঢাকার রোজ গার্ডেনে যখন ঐ বৈঠকটি হয় দলটি প্রতিষ্ঠার জন্য, সেখানে সম্ভবত আতাউর রহমান খান সভাপতিত্ব করেছিলেন এবং আরো যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের মধ্যে আমার যতদূর মনে পড়ে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানি, কামরুদ্দিন আহমেদ, খন্দকার মোশতাক, কুমিল্লার আহমাদ আলী সাহেবও ছিলেন। এবং সেখানে যখন আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তখন খুব সাধারণভাবেই একটি কমিটি গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। প্রস্তাব দেওয়া হয় মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি হবেন। সেক্রেটারি হবেন টাঙ্গাইলের শামসুল হক সাহেব। আর যুগ্ম সম্পাদক হবেন দুজন। যখন এই দুজনের নাম লেখা হচ্ছে, মওলানা ভাসানী নাম লিখছেন, প্রথম নামটি লেখা হলো শেখ মুজিবুর রহমান। সেখানেই উপস্থিত ছিলেন খন্দকার মোশতাক। দ্বিতীয় নামটি তার লেখা হয়। মোশতাক তখন এর বিরোধিতা করলেন। মওলানা ভাসানীকে বললেন, হুজুর আমি আপনার সামনে বসে আছি। আমার নাম আগে না দিয়ে মুজিবের নাম দিলেন এটা কেমন হলো?

মওলানা সাহেব তাকে বললেন, মুজিব জেলে সুতরাং মুজিবুরের নামই আগে থাকবে। আর দুই নাম্বার হলো- তুমি কি মুজিবুরের মতো অরগানাইজার হতে পারবে?’

আমার ধারণা খন্দকার মোশতাক সেই সময় থেকেই প্রতিহিংসাপরায়ণাতায় ভুগছিলেন। যদিও রাজনৈতিক বন্ধু হিসেবে, পারস্পরিক বন্ধু হিসেবে খন্দকার মোশতাক বঙ্গবন্ধুর কাছাকাছি ছিলেন। কিন্তু আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, মুজিবনগর সরকারের সংস্পর্শে ছিলাম তারা জানি যে- খন্দকার মোশতাক কলকাতার  বাংলাদেশ মিশনের তিন তালার গোপন কুঠুরিতে বসে কী করেছিলেন। নয়টি মাস তিনি চক্রান্ত করেছেন। সঙ্গে মাহবুব আলম চাষী, আরেকজন ছিলেন আমাদের এক সাংবাদিক বন্ধু- দৈনিক ইত্তেফাকের রিপোর্টার হিসেবে বেশ সুনাম অর্জন করেছিলেন- তাহেরউদ্দিন ঠাকুর। এই লোকটিকে বঙ্গবন্ধু রাউলপিন্ডির ন্যাশনাল এসেম্বেলির রিপোর্ট করার জন্য ইত্তেফাক থেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই তাহেরউদ্দিন ঠাকুর আর ঐ দুজন মিলে চক্রান্তে মেতেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে।

খন্দকার মোশতাক প্রথম থেকেই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন। কীভাবে করেছেন- তিনি এবং তাজউদ্দীন আহমদ যখন ইন্দিরা গান্ধীর সাথে দেখা করে বাংলাদেশের জন্য কিছু আদায়ের দেনদরবার করে আসলেন সেখানে তাজউদ্দীন আহমদ ইন্দিরা গান্ধীকে পরিচয় দিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন যে সরকার হবে তার প্রধানমন্ত্রী বলে। এই পরিচয়টা যখন তিনি দিয়ে এলেন তখন  মোশতাক ক্ষেপে গেলেন। তিনি বললেন, আমি মোস্ট সিনিয়র থাকতে তুমি কিভাবে প্রধানমন্ত্রী হবে?’

এখানে দুঃখজনক ঘটনা হলো, মোশতাক যে বিরক্তি এবং বিরোধিতা প্রকাশ করলো বিষয়টিকে আবার ক্যাশ করলো তরুণ আওয়ামী লীগ নেতারা। ফলে আওয়ামী লীগের একটি বিশেষ কাউন্সিল আগরতলায় ডাকা হলো। এবং দুঃখজনকভাবে এটা সত্যি যে, তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধে একটি অনাস্থা প্রস্তাবও আনা হয়েছিল। কিন্তু সেই অনাস্থা প্রস্তাব পাস হয়নি। কারণ কাউন্সিলররা জানতেন যে, তাজউদ্দীন যোগ্য। কেননা তিনি সংগঠন করেছেন বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে। এবং যুদ্ধের যা কিছু আয়োজন সবকিছুই তাজউদ্দীন সাহেব করছেন। সুতরাং তার বিরুদ্ধে অনাস্থা কিছুতেই তারা মেনে নিতে পারেননি। ওটা পাস হয়নি।

যাই হোক, আমার কাছে মনে হয়েছে বঙ্গবন্ধুর নাম এবং ৭ মার্চে যে কথাটা বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’- এই যে বাক্যটি তিনি উচ্চারণ করেছিলেন, এই বাক্যের পর আর কোনো ভিন্ন ঘোষণার দরকার হয় না। এবং তাঁর এই উনিশ মিনিটের বক্তৃতার মধ্যে কী করতে হবে, কোথায় যেতে হবে, কী দিয়ে লড়াই করতে হবে- সবই তো বলে দিয়েছিলেন। স্পষ্ট বলে দিলেন, ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল’, ‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে’, ‘পাড়ায় মহল্লায় প্রতিরোধ কমিটি গঠন করো’। এই যে কথাগুলো তিনি বললেন, কেন বললেন সেটি আমাদের ভাবতে হবে। এই কথাগুলোর মধ্যেই তো সব কথা বলা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণের পর সমস্ত মানুষ যেভাবে ময়দানে নেমে গেলো আসলে মুক্তিযুদ্ধের জন্য সবাই মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেই ছিল।

সত্তরে যখন নির্বাচন হয়, সেই নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ যে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল জাতীয় পরিষদে এবং পূর্ব পাকিস্তানে তো বটেই, কিন্তু ওরা মানলো না। দেখা গেলো আইয়ুব খানকে সরিয়ে ইয়াহিয়া খান এলো। এর ফল হলো উল্টো। পশ্চিমা রাজনীতিবিদরা চেয়েছিল এই নির্বাচনটা দিয়ে বাঙালিরা যে হইচই করছে তা ঠান্ডা করে দিতে। এগুলো ছিল জুলফিকার আলী ভুট্টোদের মাথার বুদ্ধি। এবং সে অনুযায়ী ইয়াহিয়া খান একটি লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার করলেন। সেই অর্ডারের মাধ্যমেই নির্বাচন করার ঘোষণা দিলেন। সেই ঘোষণা মওলানা ভাসানী প্রত্যাখ্যান করলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ একে গ্রহণ করলো, এবং বঙ্গবন্ধু যে ৬ দফা দিয়েছিলেন ১৯৬৬ সালে সেই ৬ দফার ভিত্তিতে যে বিভিন্ন জায়গায় সমাবেশ করেছেন, বিকালে বক্তৃতা করছেন সন্ধ্যায় গ্রেফতার হচ্ছেন, পরদিন আবার আইনজীবীরা লড়াই করে তাকে জামিনে মুক্ত করে নিয়ে এসেছে। তিনি আরেক জায়গায় বক্তৃতা করতে গিয়ে আবার এরেস্ট হচ্ছেন। মানে বারবার তাকে এরেস্ট করা এবং ছেড়ে দেওয়া- এই ঘটনা চলতে থাকে। তখন এই ৬ দফা এবং বঙ্গবন্ধুর যে জনপ্রিয়তা এটা ক্রমশ তুঙ্গে উঠতে থাকে। এবং সেই অবস্থায় যখন সত্তরের নির্বাচন হলো; আরেকটা কথা মাঝখানে বলে রাখি, সত্তরের নির্বাচনের আগ দিয়ে আমাদের দেশে একটি রাক্ষুসে ঘূর্ণিঝড় হয়। লক্ষ লক্ষ লোক মারা গিয়েছিল। দক্ষিণ বাংলা একটি বিরাণ প্রান্তরে রূপান্তিত হয়েছিল। মওলানা ভাসানী এবং শেখ মুজিবুর রহমান দুজনেই সাহায্য নিয়ে সেই দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াবার জন্য চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু জাহাজ ম্যানেজ করতে পারছিলেন না। জাহাজ যাদের ছিল তারা কেউই দিতে রাজি হচ্ছিল না, ঐ সামরিক জান্তার ভয়ে। যাই হোক পরবর্তীকালে দুজনেই সেখানে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিলেন। ঐ ঘূর্ণিঝড়ে দুর্গত মানুষের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানিদের যে অবহেলা, অবজ্ঞা ছিল এবং আমাদের পূর্ব পাকিস্তানের যে পাঁচজন মন্ত্রী ছিলেন তারাও একবার দুর্গত মানুষকে দেখতে আসেননি। ইয়াহিয়া খান শুধুমাত্র একবার হেলিকপ্টারে করে কয়েক মিনিটের একটি চক্কর দিয়েছিলেন আকাশে থেকেই। তাও মদ্যপ অবস্থায়। এই বিষয়টি কিন্তু সাংঘাতিকভাবে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে গেছে। এবং তাতে করে জাতীয় পরিষদে একেবারে এককভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যায় আওয়ামী লীগ। ওরা ভেবেছিল ৬ দফা তো বিচ্ছিন্ন দাবি- এটা লোকে পছন্দ করবে না।

পরবর্তী কালে দেখা গেল, সত্তরের নির্বাচনে সমস্ত মানুষ শেখ মুজিবুর রহমানকে ভোট দিয়েছে এবং তার দলকে জয়যুক্ত করেছে, ফলে বঙ্গবন্ধু দাবি করেছিলেন যে, এর প্রথম অধিবেশন ঢাকায় হতে হবে। জনসংখ্যায় যেহেতু আমরা বেশি এবং এখান থেকে মেম্বারও বেশি। জেনারেল ইয়াহিয়া তখন প্রেসিডেন্ট। তিনি রাজিও হয়েছিলেন এবং বলেছিলেন- ইউ উইল বি দ্য নেক্সট প্রাইমমিনিস্টার অব পাকিস্তান। এটা বলে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানে যাওয়ার পরে মজার ব্যাপার হলো এই যে, জুলফিকার আলীগণ যারা, পশ্চিম পাকিস্তানের যে রাজনৈতিক কুচক্র সেই কুচক্র ইয়াহিয়া খানকে গ্রাস করে ফেললো। এবং আসলে তো অসৎ চরিত্রের মানুষ নানা অছিলাতেই প্রলুব্ধ করতে পারে। ইয়াহিয়া খানকে বুঝিয়ে বলা হলো ঢাকায় যদি অধিবেশন করো তাহলে পশ্চিম পাকিস্তানের যে মেম্বাররা যাবে তাদের জবাই করা হবে। তখন ১৯৭১ সালের ১ মার্চ দুপুর বেলা রেডিওর মাধ্যমে ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করলেন যে, ঢাকা অধিবেশন বাতিল। এই ঘোষণা যখন হলো তখন হোটেল পূর্বানীতে বসে বঙ্গবন্ধু জাতীয় পরিষদ এবং পূর্ব পাকিস্তান পরিষদের নির্বাচিত সকল সদস্যদের নিয়ে কর্মকৌশল ঠিক করার জন্য একটি যৌথ বৈঠক করছিলেন। সমস্ত লোক তখন ছুটে গেলো পূর্বানী হোটেলে। ঢাকা স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ডের সাথে পাকিস্তানের ক্রিকেট খেলা হচ্ছিল। এবং সেই খেলায় গ্যালারি ভর্তি লোক তাদের হাতে যে খবরের কাগজ ছিল এই কাগজে আগুন জ্বেলে মশাল তৈরি করে দুপুরের পরপরই সেই সময়টাতে ছুটে চললো পূর্বানী হোটেলে। খবর পেয়ে বঙ্গবন্ধু নিচে নামলেন। তিনি এ ঘটনার নিন্দা জানালেন, প্রতিবাদ করলেন, এবং ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলেন। তারপর তিনি বললেন, এই বিষয়ে আমি আমার বক্তব্য ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ভাষণের মাধ্যমে দেব। সেই বক্তৃতাই তিনি ৭ তারিখে করলেন। কিন্তু এর মধ্যে তিনি অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিভিন্ন জেলায় জেলায় বাঙালি হত্যা করতে আরম্ভ করলো। তিনি এর বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন। এরপর থেকে অসহযোগ আন্দোলন চলতে লাগলো। আন্দোলন চলতে চলতে দেখা গেলো যে বহু লোক গুলিতে নিহত হচ্ছেন। এই অবস্থার মধ্যে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ তার বক্তৃতার মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা ঘোষণা করলেন। তিনি স্পষ্টভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে থাকতে বললেন। তবে এটাও বললেন, যদি পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাঙালি হত্যা করে তার উত্তর দেওয়া হবে। ইত্যাদি যে সমস্ত কথাগুলো তিনি বললেন, বলার পরে বক্তব্যের শেষে এসে যখন বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এটা বলার পর মানুষ, এই যে জনসমুদ্র রেসকোর্স ময়দানে হয়েছিল, যাদের লাখ দিয়ে হিসাব করা যাবে না, সেই জনসমুদ্র চতুর্দিক থেকে এতোটাই উদ্বেলিত হয়ে উঠলো যে এই কথাটির জন্যই তারা অপেক্ষা করছিলো। সুতরাং বঙ্গবন্ধুর এই ঘোষণা স্বাধীনতার ঘোষণার চেয়েও বড়। এই ঘোষণার পর মানুষের মনে আর কোনো দ্বিধা রইল না। তারা স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত হয়ে গেলো।

শেষ পর্যন্ত আলোচনা যখন ব্যর্থ হলো তার একদিন কি দুদিন পর পঁচিশে মার্চ রাতে ট্যাঙ্ক নেমে গেলো ঢাকা শহরে। আমি তখন দৈনিক পূর্বদেশে চাকরি করি। রাস্তার ধারেই আমাদের অফিস। আমরা দেখলাম দৈনিক পাকিস্তানের সামনে ট্যাঙ্ক এসেছে। কিন্তু রাস্তাঘাট বন্ধ। ঐ যে ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘তোমরা সব রাস্তাঘাট বন্ধ করে দেবে’। রাস্তাঘাট বন্ধ করে দেওয়ার যে হুকুম বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন প্রত্যেক মানুষ পাড়া-মহল্লায়, গ্রামে-গঞ্জে সেটি পালন করেছে। রাস্তায় বিশাল বিশাল পাথর, খাম্বা, গাছের গুড়ি মানুষ ফেলে রেখেছে। ট্যাঙ্ক যেতে পারছে না। তো এগুলো দেখলে বোঝা যায় মানুষ বঙ্গবন্ধুর উপর কতটা নির্ভর করেছিল। কতটা আস্থা ছিল তার উপর যে কারণে জীবনে ঝুঁকি নিয়েও তারা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল এবং বঙ্গবন্ধুর যে নির্দেশ সেটি পালন করেছিল। তারপর থেকে তো মুক্তিযুদ্ধই শুরু হয়ে গেলো।

পঁচিশে মার্চ রাতে কত হাজার মানুষ মারা হয়েছিল এই ঢাকাতে তা এখনো পর্যন্ত পরিসংখ্যানের বাইরে। বস্তির পর বস্তি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ওই রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হলো। এরপর কিন্তু আমাদের মধ্যে আকস্মিক হতাশা দেখা দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু দেশে নেই, তাহলে কী হবে! কিন্তু তারপর দেখা গেলো ঐ যে বঙ্গবন্ধুর যে আহবান সে আহবানই কিন্তু সমস্ত মানুষকে সশস্ত্র করে তুললো। এবং তার যে যোগ্য সহকারী তাজউদ্দীন আহমদ, তিনি নেতৃত্ব গ্রহণ করলেন। এবং তিনি এই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য মন্ত্রীসভা গঠন করলেন, ভারতের সহযোগিতা নিলেন, পরবর্তীকালে মুক্তিফৌজ যে বিচ্ছিন্নভাবে ছিল সেগুলোকে একত্র করলেন, একটি ডিসিপ্লিনের মধ্যে তিনি সব নিয়ে এলেন। তাজউদ্দীন আহমদ এবং তার সহযোগীরা এই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করলেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে।

এরপর যুদ্ধ শেষ হলো। আমরা জয়লাভ করলাম। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে এলেন। তখন তেজগাঁয়ে বিমানবন্দর  ছিল এবং মুক্তিযুদ্ধের কারণে সেটি ছিল বিধ্বস্ত। সেই বিমানবন্দরে ব্রিটিশ এয়ার ফোর্সের একটি সাদা উড়োজাহাজ এসে নামলো। আমি তখন তেজগাঁ বিমানবন্দরসংলগ্ন একটি বিল্ডিংয়ের ছাদে দাঁড়িয়ে। এখনো সম্ভবত ঐ বিল্ডিংটা এক তালেই আছে। আমি আর আশফাক ঐ বিল্ডিঙের ছাঁদের উপরে দাঁড়িয়ে অলইন্ডিয়া রেডিও, আকাশবাণী কলকাতার দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির সুরঞ্জিত সেন (ইংরেজি), আর উর্দুতে কে কে নায়ার বলে একজন ছিল, এই কজন ওখানে উপস্থিত হয়েছি রিপোর্টের জন্য। এবং সরাসরি সম্প্রচার আমরা করে যাচ্ছি। কথা ছিল ওখান থেকে আমরা যাবো রেসকোর্স ময়দানে যেখানে বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা করবেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানানো হলো যখন তখন তার চারপাশে যখন তাকালাম, তাতে চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। সেদিন ঢাকা শহরে কোনো লোক বোধহয় ঘরে ছিল না। সমস্ত মানুষ রাস্তায়। গাছে, ছাদে, গাড়ির উপরে বিভিন্ন জায়গায় শুধু জনস্রোত। মানুষের মাথা ছাড়া আর কিছুই তখন চোখে পড়ছে না। সেদিন সকল রকমের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আজ যে সাধারণ মানুষ ভালোবাসার টানে আমার কাছে এসেছে, আজকে আমি তাদের ভেতর দিয়ে যাবো। বদ্ধ গাড়ির মধ্যে নয়, আমি খোলা ট্রাকে যেতে চাই। তখন ঐ খোলা ট্রাকে তাঁকে নেওয়া হলো। এবং দুপাশে থাকলেন তাজউদ্দীন আহমদ, খন্দকার মোশতাক, আসম আব্দুর রব, তোফায়েল আহমেদ, নুরে আলম সিদ্দিকিসহ আরও অনেকে। এরা সবাই বঙ্গবন্ধুর সাথে একসাথে থাকলেন। তো এই যে ট্রাকটা যাচ্ছে, আমরা দূরে অসহায়ের মতো তাকিয়ে দেখছি, কারণ যে পরিমাণ ভিড়, কাছে যাওয়ার উপায় নেই। আমি দেখছি যে ট্রাকটা একটি ভাসমান নৌকার মতো জনসমুদ্রের উপর দিয়ে ভেসে ভেসে যাচ্ছে। তবে আমরা কেউ যেতে না পারলেও আশরাফুল ওখান থেকে হেঁটে রেসকোর্স ময়দানে চলে গেলেন। সেদিন বঙ্গবন্ধু বক্তৃতার মধ্যে বারবার চোখের পানি মুছছেন। তার চোখে তখন কৃতজ্ঞতার পানি। তিনি বক্তৃতায় ভারতের কৃতজ্ঞতার কথাও বললেন। এই যে বঙ্গবন্ধু ভাষণ অনুযায়ী সাধারণ মানুষের কাজ করা, মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন এবং বিজয়ের পর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন মানুষের ঢল সবকিছু বঙ্গবন্ধুর অসীম শক্তির প্রমাণ দেয়।

বঙ্গবন্ধু অসম্ভব জনসম্পৃক্ত রাজনীতিবিদ ছিলেন। মানুষের স্পন্দন বুঝতে পারতেন। তিনি ছিলেন অসাধারণ বাগ্মী। মানুষকে প্রভাবিত করবার মতো তার গুণাবলী ছিল। তার কথা এবং বক্তৃতায় তা প্রকাশিত হতো। এবং সেই কারণেই বঙ্গবন্ধুর দক্ষ রাজনৈতিক চরিত্র ছিল অনন্য। তিনিই তো প্রথম জাতিসংঘে গিয়ে বাংলায় বক্তৃতা করলেন। অসাধারণ বাগ্মিতায় তার যে উচ্চারণ, সেই উচ্চারণের সাথে তার মুখভঙ্গি, তার ভোকাল কর্ডের উত্থান-পতন, এগুলো দেখে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়ক যারা সেদিন এসেছিলেন তারা অভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন। এবং সেজন্যই ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মতো লোক বলেছিলেন, ‘আই হ্যাভেন্ট সিন হিমালয়া, বাট আই হ্যাভ সিন শেখ মুজিব।’ এতো বড় প্রশংসা, বঙ্গবন্ধুকে দেখে ক্যাস্ট্রোর এই যে উপলব্ধি এটা অনেক বড় ব্যাপার। ভিন্নধর্মী মতাদর্শের রাজনীতি করেছি বলে তার প্রতি এতটুকু শ্রদ্ধাবোধ কমেনি। সবসময় তিনি যেমন আমাদের ভালোবাসতেন আমরাও তাঁকে শ্রদ্ধা করতাম। সেই শ্রদ্ধা পাওয়ার যোগ্য তিনি ছিলেন। সব মিলিয়ে একজন পরিপূর্ণ নেতা বলতে যা বোঝায় সেটিই ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমরা তাকে যেভাবে দেখেছি এবং তার জীবনের প্রতিটি ঘটনা তা  প্রমাণ করে।

অনুলিখন : অহ নওরোজ



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ আগস্ট ২০১৭/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন