ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৪ আশ্বিন ১৪২৬, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

শৈশবের হাতছানি…

আবিরুল ইসলাম আজম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৯-১২ ৯:৪১:৪১ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৯-১২ ১০:২৬:২৫ এএম
শৈশবের হাতছানি…

আবিরুল ইসলাম আজম, ববি : আমাদের প্রতিটি মানুষের জীবনে কিছু না কিছু শৈশবের স্মৃতি রয়েছে। আর থাকবেই না কেন! সবাই তো শৈশবকে পার করে আসে। আর সেই সময় এমন কিছু স্মৃতি থাকে, যা কখনোই ভুলে যাবার নয়। আর যারা গ্রামের পরিবেশে বেড়ে ওঠে তাদের স্মৃতির পাতাটা অনেক বিস্তৃত হয়। আর আমার বেড়ে ওঠা গ্রামে।

শৈশবের সবচেয়ে মজার স্মৃতিটি ছিল স্কুল পালানো। আমার প্রাথমিক শিক্ষা জীবনের পাঁচ বছরে স্কুল ছিল এক আতঙ্কের নাম। স্কুলে যাওয়া মানেই ছিল খেলা থেকে দূরে থাকা আর স্যারের কাছে পড়া দেবার ভয় তো ছিলই।

ওই সময়ের খেলার সাথী ছিল আমার চাচাতো ভাই জামাল। জামালের জীবনে লেখাপড়া বলতে কিছুই ছিল না। আমার অবশ্য আফসোসটা সেখানেই। আমার জীবনে লেখাপড়া কেন?

তাইতো স্কুল পালানোটা হয়ে উঠেছিল দৈনন্দিন জীবনের বড় অংশ। এজন্য অবশ্য প্রতিদিন প্রচুর মার খেতাম বাবার হাতে।

প্রতিদিন স্কুলে দিয়ে আসার জন্য পরিবারের একজন সদস্য নিয়োজিত থাকতো। কখনো বাবা, আবার কখনো দাদি, আবার কখনো দাদা। তবে দাদি যেদিন স্কুলে দিয়ে আসতো সেদিন অবশ্য কোনো প্রকার ভয় থাকত না। কারণ দাদি যেদিন স্কুলে দিয়ে আসার জন্য যেতেন, সেদিন কোনো একটা কারণ দেখিয়ে স্কুলে যাওয়া থেকে বাঁচা যেত। আর তার একটা বড় কারণ ছিল দাদি আমাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে।

আর স্কুলে না যাওয়া মানে ছিল প্রিয় বন্ধু বা চাচাতো ভাই জামালের সাথে এলাকায় ঘুরে বেড়ানো। আমের দিনে অন‌্য মানুষের গাছ থেকে আম চুরি করে খাওয়া। আর হাতিয়ার হিসেবে ছিল ঝিনুক পাথরের সাথে ঘষে তৈরি করা এক ধরনের হাতিয়ার।

মাঝে মাঝে কাঁঠাল খেতাম নিজেদের গাছ থেকে চুরি করে। তবে জামের দিনে জাম খাওয়াটা ছিল অনেক মজার। কারণ বড় বড় গাছে ওঠে জাম খেতে হত। আর জাম খাবার জন্যও অনেক মার খেতে হয়েছে। জাম খাবার জন্য মরিচ চুরি করতাম রান্নাঘর থেকে, সেজন্য মা প্রচুর মারতেন।

তবে জামাল ছিল প্রচুর স্বাধীন চেতা মানুষ। ওর কোনো প্রকার বাধা ছিলো না। আর মারও খেতে হত না। শৈশবে শামুক দিয়ে চিংড়ি মাছ ধরাটা ছিলো একটা মহা আনন্দের ব্যাপার। আর সঙ্গী থাকত জামাল। তবে মাছ শুধু বর্ষাকালেই ধরা যেত। মাছ ধরার সময় প্রতিযোগিতা ছিল প্রচুর। আমাদের গ্রামের অন্য ছেলেরা মাছ ধরতো আর তাদের সাথেই প্রতিযোগিতাটা হত। আমার এই মাছ ধরার জন্য মার খেতে হত বাবার হাতে। কারণ বাবা চাইতেন না আমি স্কুল বাদ দিয়ে মাছ ধরি।

শৈশবে বক শিকার ছিলো আমার আর জামালের একটা বড় শখ। আমরা দু’জন বক ধরে পিকনিক করতাম। গাছ থেকে পাখির ছানা এনে খাঁচায় রেখে পালন করা আরেকটা মজার ব্যাপার ছিল। এলাকার ঝোপঝাড় ঘুরে ঘুরে পাখির বাসা থেকে বাচ্চা নিয়ে আসতাম। আর দিনের অর্ধেক অংশ এগুলো করেই কেটে যেত।

গোসল করা নিয়েও আছে প্রচুর মজার স্মৃতি। আর থাকবেই না কেন! বাড়ির পাশ দিয়ে যে বয়ে গেছে শ্রীমন্ত নদ। প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা যেত গোসল করার নাম করে খেলায়। নদের চরে ছেচরি খাওয়া, নই নই খেলানো, কলা কাছের ভেলা বানিয়ে নদ ঘুরে বেড়ানো ইত্যাদি ছিল এর একটা অংশ। আর জামালদের নৌকায় নদের এপার থেকে ওপার ঘুরে বেড়ানো হত প্রচুর।

শৈশবের পুরো সময়টা জুড়েই খেলাধুলা ছিল। ফুটবল, ক্রিকেট, হাডুডু, বৌছি, লুকোচুরি, মারবেল, ক্যারাম ইত্যাদি খেলা গুলো ছিলো খুব প্রিয়। তবে আমি কোনো খেলায় তেমন ভালো ছিলাম না।

তবে এত সবকিছুর মাঝে ছাত্র হিসেবে ছিলেম অনেক ভালো। ক্লাসে কখনো দুইয়ের নিচে বা উপরে রোল নম্বর হতো না। স্কুলজীবনের প্রথম দিনটি ছিল খুবই ভয়াবহ। স্যারকে দেখে এমন ভয় পেছিলাম, যে ক্লাসে বসেই কান্না শুরু করেছিলাম আর তা দুই দিন স্থায়ী হয়েছিল। সেটাও ছিল স্কুল পালানোর আরেকটা কারণ।

বাড়িতে প্রচুর মজা করে করে দিন কেটে যেত। বাড়িতে আমার খেলার জন্য ছিল আরেক চাচাতো ভাই রমজান। তবে ওর সাথে আমার সম্পর্ক ছিল ঝগড়ার। ও সারা দিনই বাড়িতে থাকতো আর আমি বাড়ির বাইরে। তাই বাড়িতে ঢুকলেই ওর বিচার দেবার পর্ব শুরু হয়ে যেত, আর এজন্য দিনে অন্তত দুয়েক বার ওর সাথে ঝগড়া লেগেই থাকত।

আমার বাবা যে আমাকে শুধু মারতেন তা নয়, প্রচুর ভালোবাসতেন । তবে বাবার একটাই আদেশ ছিল বাড়ির বাইরে যাওয়া যাবে না। আর গেলেই মার খেতে হবে। বাবার মারের মধ্যে সবচেয়ে বড় মারটা খেয়েছিলাম কবিতা পড়ার জন্য। তার এক ধমকেই প্রথম শ্রেণির সবচাইতে কঠিন কবিতাটি মুখস্থ করেছিলাম।

অষ্টম শ্রেণিতে উঠার আগ পর্যন্ত এভাবেই কেটেছে জীবনের প্রতিটি দিন। লেখাপড়ায় অবশ্য মনযোগটা এসেছিল অষ্টম শ্রেণি থেকে। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত জীবনটা একাডেমিক পড়ালেখায় বন্দি হয়ে গেছে। তার মধ্যেও অনেক মজার স্মৃতিময় ঘটনা রয়েছে। যেগুলো আসলেই সবসময় মনে পড়ে। তবে অষ্টম শ্রেণির আগের মুহূর্তগুলো খুব বেশি অনুভব করি। কারণ, এ সময়ই যে শৈশবের সোনালী মুহূর্তগুলো কাটিয়েছি।

 

রাইজিংবিডি/ববি/১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯/আবিরুল ইসলাম/জেনিস

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন