ঢাকা, শুক্রবার, ২০ চৈত্র ১৪২৬, ০৩ এপ্রিল ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

একদিন লালনের খোঁজে

আশরাফি দিবা : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-০২ ৫:৩৩:২৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-০২ ৬:২২:৫৯ পিএম

ক্লাসে কোনো একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেই কুষ্টিয়ার কথা উঠে আসে। আমার বাড়ি কুষ্টিয়া শুনে স্যার আমাকে ডেকে পাঠালেন। ক্লাস শেষে তার সাথে কথা বলতে গেলাম। সেসময় তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন কুষ্টিয়াতে ভালো কোনো হোটেল আছে কিনা, যাতায়াতসহ সার্বিক ব্যবস্থা সম্পর্কে।

যদিও আমি কুষ্টিয়ার বাসিন্দা, কিন্তু আমার নিজের এলাকা সম্পর্কে জ্ঞান খুব কম। যতটুকু জানা ছিল সেটুকু বলতেই স্যার আমাকে বললেন, ‘শোনো আমি এবং তোমাদের হেডস্যার দুজনে মিলে ঠিক করেছি তোমাদের ফিচারের ট্যুর হবে কুষ্টিয়াতে।’ স্যারের সাথে আলোচনা শেষে লালনের তিরোধান উৎসব উপলক্ষে ট্যুরের তারিখ ঠিক হল ১৬ অক্টোবর।

আমাদের ফিচার কোর্সের ব্যবহারিক কাজের অংশ হিসেবে সেমিস্টারের শুরু থেকেই একটি ট্যুরের পরিকল্পনা চলছিল। তখন থেকেই এই ট্যুর নিয়ে অনেক আগ্রহ থাকলেও নিজের এলাকায় ট্যুরের কথা শুনে কিছুটা হতাশ হলাম। মনে মনে কিছুটা রাগও হলো। সেই তো একটা সাদা রং করা মাজার, কয়েকটা দোকান আর ফকিরের গান, আর কী আছে ওখানে! দুঃখের বিষয় হলেও সত্যি, দু’একবার এমনি সময় ঘুরতে গেলেও আগে কখনও লালনের জন্ম উৎসব কিংবা তিরোধান উৎসবে লালন মাজারে ঘুরতে যাওয়া হয়নি আমার। শুধু আমি না, অনেকেই যারা প্রত্যাশা করে ছিল সিলেট কিংবা বান্দরবানে যাবে, তাদেরও আশায় সে গুড়ে বালি পড়ার মতো অবস্থা হলো। সবার একটাই প্রশ্ন, ওখানে গিয়ে শুধু পাগলা ফকিরদের গান শোনা ছাড়া আর কী আছে? কুষ্টিয়া যাওয়ার আগ পর্যন্ত লালন মাজার সম্পর্কে আমাদের ধারণা এতটুকুই ছিলো।

হতাশা আর দূরে কোথাও ঘুরতে না যেতে পারার আক্ষেপ নিয়েই আমরা প্রস্তুতি নিলাম লালনের দেশ কুষ্টিয়ায় যাওয়ার। ১৫ অক্টোবর, রাত তখন ১১টা ৪৫মিনিট। কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্য যাত্রা শুরু হলো আমাদের। কুষ্টিয়ায় এটি আমার কততম যাত্রা-তা বলা সম্ভব নয়। কিন্তু বন্ধুদের সাথে এটিই আমার প্রথম ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। তাই আমার এই ভ্রমণের আনন্দটা উৎসবের সাথে তুলনা করাই যায়।

বাস চলার সাথে সাথে সবার কণ্ঠে লালনের গান অন্য মাত্রার আনন্দের যোগ করল। লালন সাধনা করতে করতে পৌঁছে গেলাম সাঁইজির দেশে। যদিও তখনও ভোরের আলো ফোটেনি, কিন্তু চারপাশে লোকের সমাগমে তা বোঝা যাচ্ছে না। বিভিন্ন জায়গা থেকে গাড়ি এসে থামছে আর যাত্রীরা নামছে। বেশির ভাগ যাত্রীই সাধু। সাদা লুঙ্গি, ফতুয়া আর হাতে গলায় রুদ্রাক্ষের মালাই তা প্রমাণ করে দিচ্ছে। দূর দূর থেকে তারা লালন সাধনা করতে ছুটে এসেছেন সাইজির দেশে।

একটু আলো ফুটতেই শুর হলো হোটেল খোঁজার পালা। কেউ কেউ হোটেলে গেলো আর কেউ কেউ তো বাস থেকে নেমেই লালনের আখড়ায় রওনা দিল। আমি চলে গেলাম আমার বাড়ি। সকালে ঘুম ভাঙল বন্ধুদের ফোনে। বন্ধুরা বিরক্ত হলো, কেন এখনও আখড়ায় পৌঁছাইনি? তড়িঘড়ি করে উঠে চলে গেলাম আখড়ায়।

আখড়ায় পৌঁছানোর পর লালন মেলা সম্পর্কে আমার ধারণা বদলে গেল। আমার দেখা সেই সময়ের আখড়াবাড়ীর চিত্র আর এই মেলার সময়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। চারপাশে লালনের শুধু অসংখ্য ভক্ত। কী তাদের ভক্তি! কী তাদের শ্রদ্ধা। ক্লান্তিহীনভাবে সকলেই লালনের আরাধনায় ব্যস্ত। আখড়ার ভেতরে চলছে একের পর এক লালনের সৃষ্ট সব মরমি গান। কখনও শোনা যায়,

বেঁধেছে এমন ঘর

শূন্যের উপর পোস্তা করে

ধন্য ধন্য বলি তারে।

আবার কখনও কানে ভেসে আসছে...

খাঁচার ভিতর অচিন পাখি

কেমনে আসে যায়।

আমি ধরতে পারলে মন বেড়ি

দিতাম পাখির পায়

কেমনে আসে যায়।

এইসব গান টেলিভিশনে, মুঠোফোনে বিখ্যাত অনেক শিল্পীর গলাতেই শুনেছি, কিন্তু গানগুলোর গভীরতা উপলব্ধি করতে পারতাম না, যদি না এই লালন মেলায় আসতাম। সত্যি বলতে লালনের গান শোনার আগ্রহও আমার কখনই ছিলো না, কিন্তু এই পরিবেশে এসে এখানকার সাধুদের গান আমাকে লালন দর্শন সম্পর্কে ভাবতে বাধ্য করেছে। শুধু আমার মধ্যেই নয়, ঘুরতে আসা প্রতিটি মানুষের মাঝেই যেন সাঁইজির সাধনা বিরাজমান ছিলো।

মেলাতে পরিচয় হলো এক সাধুর সাথে। তার নাম পাগল নজরুল ইসলাম। তার দাবি তিনি লালনের বংশধর অর্থাৎ যে লালনকে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন সেই মলম শাহ্ নাতি তিনি। তার কাছ থেকে লালনের লালন হয়ে উঠার গল্প জানতে পারলাম।

‘চার ভাইয়ের মধ্যে বড় ছিলেন মলম শাহ্। কোনো সন্তান না হওয়ায় তাকে সবাই আঁটকুড়ে বলেই ডাকত। তাই সব ছেড়ে স্ত্রী মতিজানকে নিয়ে আলাদা ঘর বাঁধেন, যে ঘরে এখন শায়িত আছেন সাইজি। ফাল্গুন মাসের দোল পূর্ণিমাতে কালিগঙ্গা নদীতে একটা ছেলেকে কুড়িয়ে পান মলম শাহ্। যার সারা শরীরে ছিল বসন্ত। মলম শাহ্ ছেলেটিকে উঠানোর চেষ্টা করেও তুলতে পারলেন না। হঠাৎ তিনি শুনতে পান ছেলেটি বলছে, ‘আমি মার কাছে যাবো।’ সেসময় মতিজান এসে তাকে পানি থেকে তুলে নিয়ে আসেন এবং তাকে সুস্থ করে তোলেন।

একদিন অনেকগুলো বই নিয়ে মলম শাহ্ কী যেন খুঁজছিলেন। মতিজান তাকে প্রশ্ন করলেন কী খুঁজছেন আপনি? মলম শাহ্ বলেন, ছেলেটির জন্য একটি নাম খুঁজছি। তখন মতিজান বলেন, ওর জন্য কোনো নাম খুঁজতে হবে না, ওকে আমি লালন-পালন করেছি তাই ওর নাম হবে লালন। এভাবেই তিনি লালন নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

লালন শাহ ছিলেন মানবধর্মে বিশ্বাসী। তার কাছে মানুষ আর মানবধর্মই ছিল সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তার প্রতিটি গানের কথা, সুরে তিনি মানবতাবাদের জয়গানই গেয়েছেন জীবনভর। তার এই ‘মানবতাবাদী মহাত্মা' হয়ে ওঠার পেছনেও রয়েছে বড় একটি ঘটনা।

লালনের জন্ম নদীয়া জেলার কুষ্টিয়ার মহাকুমার কুমারখালি ইউনিয়নের ভায়ারা গ্রামের এক হিন্দু পরিবারে। ছোটকাল থেকেই গানের প্রতি ভক্তি ছিলো লালনের। নিজ গ্রামের বিভিন্ন কবিগান, যাত্রা, পালাগানে গায়ক হিসেবে অংশ নিতেন তিনি।

যৌবনের সূচনালগ্নে পুণ্যলাভের জন্য নিজ গ্রামের সঙ্গী-সাথীসহ গঙ্গা স্নানে যাত্রা করেন লালন। কিন্তু স্নান-কর্ম সেরে ফেরার পথে লালন সাঁই বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। একসময় জ্ঞান হারালে সঙ্গীরা তাকে মৃত ভেবে মুখাগ্নি করে নদীতে ফেলে যায় এবং ধর্ম মতে গায়েবি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করে। কিন্তু লালন মতিজানের সেবা যত্নে সুস্থ হয়ে যখন তার পরিবারের কাছে ফিরে আসেন, তখনই শুরু হয় ঘটনার ঘনঘটা। ফুটে ওঠে ধর্মীয় কুসংস্কারের রূঢ় প্রথা । লালন বাড়ি ফিরেছে শুনে এলাকার লোকজনের সঙ্গে স্থানীয় সমাজপতিরাও দেখতে আসে তাকে। তারা দৃঢ়ভাবে জানায়, ধর্ম মতে লালনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া সে মুসলিম বাড়ির জল-খাবার খেয়েছে, তাই তাকে আর এ সমাজে আশ্রয় দেয়া যাবে না। ফলে ঘর-সংসার, মা, ছেড়ে লালন গৃহত্যাগী হতে বাধ্য হন। ধর্মীয় গোঁড়ামীর ফাঁদে পড়ে সমাজচ্যুত হন তিনি। তার মা, স্ত্রী সহযোগী হতে চাইলেও সমাজপ্রথা তাদেরকে আবদ্ধ করে রাখে। পতিব্রতা লালনের স্ত্রী এই শোক সইতে না পেরে কিছুকাল পরেই পরপারে পাড়ি জমান। যে ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি দেখানোর অভিপ্রায়ে লালন গঙ্গা স্নানে গিয়ে নিজের জীবন হারাতে বসেছিলেন, পরবর্তী সময়ে সেই ধর্মই যখন তাকে গৃহত্যাগে বাধ্য করে, তখনই লালনের মানব আত্মা ধর্মের নামে মানুষকে কৃতদাস করে রাখার ঘৃণ্য প্রথার বিরুদ্ধাচারণ করে।

তাই যখন লালনের ভক্ত অনুরাগীরা তাকে প্রশ্ন করতেন, সাঁইজি আপনি কোন জাতের ছেলে? লালন তখন গানে গানে বলতেন…

‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে

লালন বলে জাতের কি রূপ

দেখলাম না এই নজরে’

লালন সাঁইজি যে একটি জাত-পাত, ধর্ম, গোত্রের ভেদাভেদহীন সমাজের প্রত্যাশা করেছিলেন, তা তার অসংখ্য মরমি গানের মাঝেই বোঝা যায়। জাত-পাতের ভেদাভেদহীন সমাজের প্রত্যাশা করে তিনি গেয়েছিলেন…

‘যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান

জাতি গোত্র ভেদ নাহি রবে-

এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে’

সাঁইজির এসব আধ্যাত্মিক আর বাস্তবিক গানের মর্ম কেবল তার ভক্তরাই মন-প্রাণ দিয়ে উপলব্ধি করতে পারেন। তাইতো লালন ভক্ত ও শিষ্যদের কাছে ‘লালনমাজার’ তাদের আত্মা ও পরিশুদ্ধির সাধনাস্থল। লালন মাজারে সাঁইজির আরাধনা করতে আজ শতবর্ষ পরেও তার জন্মবর্ষ ও মৃত্যুবার্ষিকীতে দেশ-বিদেশ থেকে বিভিন্ন ধারার মানুষ তার আখড়ায় আসেন এবং তার সৃষ্ট মরমি গান গেয়ে, আধ্যাত্মিক আলোচনা করে ও মেলার মাধ্যমে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে লালন দর্শনকে।

এতদিন শুধু তার ভক্ত অনুরাগীদের সাজ-পোশাক, জীবনযাপন আমার কাছে ছিল অদ্ভুত এবং কিছুটা হাসিরও বিষয়ও বটে। কিন্তু লালনের মেলার একদিনের অভিজ্ঞতা আমার ধারণার পরিবর্তন করেছে। লালনের এই মেলায় এসেছিলাম সাঁইজি সম্পর্কে শুন্য জ্ঞান নিয়ে। কিন্তু লালনের ভক্তদের সাধনা, লালনের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা আমাকে শিখিয়েছে অনেক কিছু। আমার শুন্য জ্ঞানভাণ্ডারে এই একদিনের অভিজ্ঞতা কিছুটা হলেও জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছে।

লেখক: শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।


ডিআইইউ/মাহি