ঢাকা, বুধবার, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৩ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

‘দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না’

সাইফুর রহমান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-২৭ ২:৪৪:২৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-২৭ ২:৪৪:২৯ পিএম

বছরের শেষ মাস চৈত্র। সকালের তপ্ত সূর্য যখন দুপুরে উত্তপ্ত হয়, সে সময় রোদ যেন আগুনের ফুলকি হয়ে ঝরে। এ ফুলকিতে ঘাস পুড়ে, মাঠ ফেটে চৌচির হয়ে যায়। খাল-বিল ও নদী-নালাসহ সব জলাশয় শুকিয়ে একেবারেই তৃষ্ণার্ত।

চৈত্রের এ রোদে কাঠ ফাটে বলে একে কাঠফাটা রোদ্দুর বলা হয়। সূর্যের এ আলো পৃথিবীকে স্পর্শ করে বহুরূপে। শীতে সে কোমল, হেমন্তে আর্দ্রতায় স্নেহময়, বসন্তে স্নিগ্ধ ও মধুর, আর বর্ষায় তাকে খুঁজে পাওয়া দুঃসাধ্য।

চৈত্র সংক্রান্তি যত ঘনিয়ে আসছে, প্রকৃতি নিজেকে বদলে নিচ্ছে এক অন্যরূপে। গাছে গাছে নতুন কচি পাতা, ছোট ছোট আম-কাঁঠাল, শিশির ভেজা ঘাস, আর গাছের এডাল-ওডালে পাখিদের নাচ-গানে এক মোহনীয় দৃশ্য কার না নজর কাড়ে। গাছে গাছে আম দেখে কালবৈশাখী ঝড়ের কথা বড্ড মনে পড়ছে।

মনে পড়ছে, সেই ঝড়ের মধ্যে ভিজে ভিজে আম কুড়ানোর প্রতিযোগিতা, ঘরবন্দী হয়ে বাদাম, মুড়ি আর চাল ভাজা খাওয়া, সবাই মিলে লুডু খেলাসহ নানা মধুময় স্মৃতি।

ছোটবেলায় ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নেই, এমন লোক পৃথিবীতে খুব কমই আছে। কী দারুণ ছিল সেই ছোটবেলা! শৈশবের কথা মনে পড়লে হারিয়ে যাই এক কল্পনার জগতে। কল্পনা করতে থাকি, একসাথে দল বেঁধে খেলতে যেতাম। যাওয়ার পথে একজন আরেক জনের মাথায় টোকা দিয়ে অন্যের ওপর দোষ চাপানো, কারো প্যান্ট ধরে টান মেরে ভোঁ-দৌড় দেওয়া যেন নিত্য দিনের কাজ ছিল। এই সময়টাই যে আমাদের সোনালি সময় এবং তা একসময় হারিয়ে যাবে হয়তো, তখন জানতামই না। সময় গড়িয়ে স্মৃতিমাখা অতীত হয়েছে সব কিছুই।

সেই স্মৃতিগুলো আমাদের প্রতিটি ক্ষেত্রেই মনে পড়ে। অনেক কিছুই আমরা তুলনা করি শৈশবে কাটানো সময়গুলোর সাথে। সেই কালবৈশাখী ঝড়ে আম কুড়ানো, মায়ের বকুনি খেয়েও বৃষ্টিতে ফুটবল খেলতে যাওয়া, স্কুল ফাঁকি দিয়ে ঘুরে বেড়ানো, মাঠে ঘুড়ি উড়ানো, চোর-পুলিশ সাজা, লাঠিম ও মার্বেল খেলা, কাগজ দিয়ে অ্যারোপ্লেন বানানো, গায়ে কাঁদা মাখামাখি, জাল টেনে মাছ ধরা, গাছে গাছে চড়ে বেড়ানো, কলা চুরি করে কলা পাতায় ভর্তা খাওয়া, গরমের দিনে দীর্ঘক্ষণ পানিতে সাঁতার কাটাসহ হাজারো স্মৃতি টেনে নিয়ে যায় সেই শৈশবে। ওই সময়টাই তো ভালো ছিল। সময়গুলো কেন হারিয়ে গেলো সময়ের অগোচরে? কেনই বা বড় হলাম? এ ধরনের হাজারো প্রশ্ন এখনো নিজেকে ভাবিয়ে তোলে।

প্রতিটি মানুষের জীবনের সোনালি যুগ এ শৈশব। এ যুগে জীবনের কিছু আনন্দঘন মূহুর্ত ফেলে আসি আমরা। যেই জায়গাগুলোতে শৈশবে পদচারণা ছিল, সেখানে গেলে মনে পড়ে এখানে আমরা এটা করেছি, ওটা করেছি, ঠিক এই জায়গাটিতে মার্বেল খেলার সময় মায়ের দৌড়ানি খেয়েছিলাম ইত্যাদি নানা কথা। ভাবি, বেশি দিন হয়নি শৈশব অতিক্রম করেছি এবং সে সময়গুলো আর কোনো দিন ফিরে পাবো না। তাই তো কবি বলেছেন,

‘দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না

সেই-যে আমার নানা রঙের দিনগুলি।

কান্না-হাসির বাঁধন তারা সইল না-

সেই-যে আমার নানা রঙের দিনগুলি।’

 

প্রকৃতি বদলে গেছে। সেই সাথে বদলে গেছে দিনগুলোও। এখন আর মার্বেল ও লাটিম হাতে দেখা যায় না শিশুদের। গাছে চড়া, পানিতে ডুবানো, আম-জাম চুরি করা ও কালবৈশাখী ঝড়ে আম কুড়ানোর চিত্র হারিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। কারণ, তথ্য প্রযুক্তির যুগে তারাও হয়েছে প্রযুক্তি নির্ভর। তাদের হাতে হাতে প্রযুক্তির হাতিয়ার। মাঠে খেলাধুলা করতে দেখা না গেলেও ঘরে বসে ঠিকই গেইমিং করছে এখনকার শিশুরা। জানিনা, তারা যখন শিশু থেকে কিশোর, কিশোর থেকে যুবক, যুবক থেকে ধীরে ধীরে বৃদ্ধ হবে, তখন তাদের কাছে শৈশবকাল কেমন মনে হবে!

লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

 

রাবি/হাকিম মাহি