ঢাকা, বুধবার, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭, ০৮ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

‘গণিতপ্রেম আমাকে দেশসেরা বানিয়েছে’

আরাফাত বিন হাসান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-২৯ ১:২৭:০০ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-২৯ ৪:১৪:৩৪ পিএম

‘স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করা। তাই এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করেই চেয়েছিলাম মেডিক্যালে ভর্তি পরীক্ষার জন্য কোচিং করব। কিন্তু স্বপ্নের পথে বাঁধা হলো পরিবার। সম্ভবত মেয়ে বলেই পরিবার থেকে সাফ জানিয়ে দিলেন লেখাপড়ার জন্য বাসার বাইরে দূরে কোথাও যাওয়া যাবে না।’ কথাগুলো বলছিলেন কক্সবাজারের মেয়ে গণিতকন্যা খ্যাত হোসনে আরা।জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১২-২০১৩ সেশনে গণিতে দেশসেরা হয়েছেন হোসনে আরা। সম্প্রতি তার সঙ্গে কথা বলেছেন পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী আরাফাত বিন হাসান।

আরাফাত: আপনার জন্ম ও বেড়ে ওঠা সম্পর্কে যদি জানাতেন।

হোসনে আরা: আমার জন্ম কক্সবাজার জেলার মহেশখালীতে। সাত ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট আমি। শৈশব আর কৈশোর কেটেছে সেখানেই। লেখাপড়ার শুরুও হয়েছে গ্রামের বিদ্যালয়ে। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় আমার বাবা মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের হাল ধরেন বড় ভাইয়েরা।

আরাফাত: আপনার মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক সম্পর্কে একটু বলুন।

হোসনে আরা: আমি মাধ্যমিক শেষ করেছি স্থানীয় ইউনুছ খালী নাছির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। ২০১০ সালে এই বিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জিপিএ-৫ পাওয়া দু’জন শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন ছিলাম আমি। এসএসসির পর এইচএসসিতে ভর্তি হই কক্সবাজার সরকারি কলেজে। এইচএসসিতেও বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করি।

আরাফাত: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েই কেন ভর্তি হতে হলো?

হোসনে আরা: স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করা। তাই এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করেই চেয়েছিলাম মেডিক্যালে ভর্তি পরীক্ষার জন্য কোচিং করব। কিন্তু স্বপ্নের পথে বাঁধা হলো পরিবার। সম্ভবত মেয়ে বলেই পরিবার থেকে সাফ জানিয়ে দিলেন লেখাপড়ার জন্য বাসার বাইরে দূরে কোথাও যাওয়া যাবে না।

তাই পরিবারের ইচ্ছায় মেডিক্যাল ভর্তি কোচিংও আর করা হয়নি। তবে, এইচএসসি পরীক্ষার কয়েক মাসের মধ্যে রেজাল্ট প্রকাশিত হলে ভালো রেজাল্টে খুশি হন পরিবারের সবাই। আর তাই মেডিক্যাল ভর্তি কোচিংয়ে আগ্রহ দেখান তারা।

তখন মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার আর মাত্র দু’মাস বাকি। তবে, সুযোগটি কাজে লাগানোর যথেষ্ট চেষ্টা করেছি। সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করার। কিন্তু ভাগ্য আমার সহায় ছিল না, ব্যর্থ হই সেখানে।

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায়ও বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো পরিবার। আবারো তাদের সেই একই যুক্তি, ‘বাসা থেকে দূরে গিয়ে স্টাডি করা যাবে না’। বাধ্য হয়ে আমিও মেনে নিলাম সব। মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করতে না পারায় হতাশ হয়ে গিয়েছিলাম খুব।

অন্যদিকে পরিবারের বাঁধার মুখে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায়ও অংশগ্রহণ করতে পারিনি। তাই বাধ্য হয়ে ভর্তি হই কক্সবাজার সরকারি কলেজে। তবে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি, এর জবাব লেখাপড়ার মাধ্যমেই দেবো।

আরাফাত: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত পছন্দ করার কারণ?

হোসনে আরা: কক্সবাজার সরকারি কলেজে বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর মধ্যে আছে শুধু গণিত আর উদ্ভিদবিজ্ঞান। উদ্ভিদবিজ্ঞান ভালো লাগে না আমার। তাই পড়ার বিষয় হিসেবে গণিতকেই পছন্দ করি।

আরাফাত: স্বপ্ন ভেঙে গেলো, তারপর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনায় মন বসাতে পেরেছিলেন?

হোসনে আরা: ছোট থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলাম আমি। সেই মনোযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করেছি অনার্সেও। অনার্স প্রথম বর্ষের পরীক্ষাতে আমার ব্যাচে সেরা হই। এবার আমার রেজাল্ট ছিল এসজিপিএ ৪.০০ এর মধ্যে ৩.৮২।  আগে গণিতকে আর ১০টা নরমাল বিষয়ের মতো মনে হলেও ধীরে ধীরে গণিতের প্রেমে পড়তে শুরু করি। একই সময়ে গণিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে ভালো রেজাল্ট করা তাছলিমা সিরাজ আপুর সান্নিধ্য পাই। তাসলিমা সিরাজ আপু তখন থেকেই প্রতিবর্ষে পুরো বাংলাদেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সেরা রেজাল্ট করে আসছিলেন। তার অনুপ্রেরণায় আমিও চেষ্টা করেছিলাম ভালো কিছু করার।

আরাফাত: অনার্স দ্বিতীয় আর তৃতীয় বর্ষের রেজাল্ট কেমন হলো?

হোসনে আরা: অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে তাছলিমা আপুর রেজাল্ট ছিল এসজিপিএ ৪.০০ এর মধ্যে ৩.৯৪। এর পরের বছর, অর্থাৎ তৃতীয় বর্ষে আমার রেজাল্ট ছিল এসজিপিএ ৪.০০ এর মধ্যে ৩.৯৭, সেইবার আমি দেশসেরা হয়েছিলাম।

আরাফাত: অনার্স শেষ বর্ষের রেজাল্ট?

হোসনে আরা: আমার অনার্স শেষ হয় ২০১৮ সালে। শেষ বর্ষে রেজাল্ট দেখে আমার নিজেরই চোখ কপালে ওঠার মতো অবস্থা! এসজিপিএ ৪.০০ এর মধ্যে ৪.০০ পেয়েছিলাম। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এমন রেজাল্ট বলতে গেলে প্রায় অসম্ভবই ছিল। তবে, সব মিলিয়ে অনার্সে আমার সিজিপিএ ৪.০০ এর মধ্যে ৩.৯৪ ছিল, যা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এবং আমার সেশনে সর্বোচ্চ।

আরাফাত: মাস্টার্সের রেজাল্ট কেমন হলো?

হোসনে আরা: মাস্টার্সের রেজাল্ট ছিল সিজিপিএ ৩.৯৪।

আরাফাত: এখন আপনার পরিকল্পনা কী?

হোসনে আরা: আমি এখন একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছি। পাশাপাশি ৪০তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার রেজাল্টের অপেক্ষায় আছি।

আরাফাত: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

হোসনে আরা: আপনাকে এবং রাইজিংবিডিকেও অনেক ধন্যবাদ।


চট্টগ্রাম/হাকিম মাহি