ঢাকা, সোমবার, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০১ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

জয়নুলের শিল্পকর্মে মহামারির ভবিষ্যৎ

এমদাদুল হক সরকার : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৪-৩০ ৩:১১:২৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৪-৩০ ৪:২৫:২৫ পিএম

শিল্পের মধ্যে যদি ক্ষুধা, দারিদ্র ও বিদ্রোহের  ইতিহাস খুঁজতে যাই বেশিদূর যেতে হবে না। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা গান ও কবিতার মধ্যেই দেখতে পাওয়া যায়। ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে অনেক কবিতা ও গান লিখেছেন। তেমনি ১৯৪৩ সালে বাংলার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের সকরুণ চিত্র এঁকে বিশ্ববাসীর বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়া এক বিদ্রোহী শিল্পী জয়নুল আবেদিনকেও দেখতে পাওয়া যায়। সেই সময় তিনি মূলত দুটি চরিত্র মা ও শিশুকে উপজীব্য করে সৃষ্টি করেছেন কালজয়ী চিত্রকর্ম ‘দুর্ভিক্ষ-চিত্রমালা’।  তার আরেকটি বিখ্যাত চিত্রকর্ম মনপুরা-৭০।  সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এসব চিত্রকর্ম অঙ্কিত হলেও এর মধ্যে রয়েছে যেকোনো মহামারির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে।

দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আঁকা দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা পৃথিবীখ্যাত একটি চিত্রকর্মের সিরিজ। দুর্ভিক্ষের চিত্রমালার পটভূমি ১৯৪৩ সালে অবিভক্ত বাংলায়, বর্তমান বাংলাদেশ ও ভারতের বেঙ্গল প্রদেশে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, যা তেতাল্লিশের মন্বন্তর এবং বাংলা ১৩৫০ সালের হিসাবে পঞ্চাশের মন্বন্তর নামে পরিচিত ভয়ংকর দুর্যোগ। এতে প্রদেশের প্রায় ৭ লাখ পরিবারের অথবা ৩৮ লাখ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা ও সামাজিক মর্যাদার লক্ষণীয় অবনতি ঘটে।

একটি হিসাব অনুযায়ী দেখা যায়, ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৬ সালব্যাপী দুর্ভিক্ষ এবং এর ফলে সৃষ্ট মহামারিতে ৩৫ থেকে ৩৮ লাখ লোক মারা যায়। প্রকৃত পক্ষে, এ উপমহাদেশের যেকোনো অংশে ১৭৭০ সালের পর যেসব দুর্ভিক্ষ আঘাত হানে তার মধ্যে এটি ছিল চরমতম।

জয়নুল আবেদিন সেই দুর্ভিক্ষের মর্মান্তিকতাকে তার সুবিখ্যাত চিত্রকর্মে তুলে ধরেছেন। তার তুলির টানে সেসব ছবিতে ফুটে উঠেছে দুর্ভিক্ষের বিভীষিকায় আক্রান্ত হয়ে মানুষ নোংরা নর্দমা-ডাস্টবিন থেকে খুঁজে খুঁজে খাবার খাওয়ার দৃশ্য কিংবা মা তার সন্তানদের নিয়ে খালি প্লেট সামনে নিয়ে অনাহারে বসে থাকার দৃশ্য অথবা প্রিয়জনদের লাশের পাশে বেঁচে যাওয়া একমাত্র শিশুর আর্তনাদ।

বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ এর আক্রমণেও একই চিত্র বিদ্যমান। লকডাউনে  মানুষ গৃহবন্দি হয়ে পড়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে খাদ্য উৎপাদনে। পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকটের কারণে দুর্ভিক্ষ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। করোনায় সৃষ্ট ভয়ঙ্কর মহামারি রুখতে বিশ্বজুড়ে যেভাবে লকডাউন জারি করা হয়েছে, এর জেরেই অনভিপ্রেত খাদ্য সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক সংস্থা এফএও।

আন্তর্জাতিক এ সংস্থাটি জানায়, খাবারের অভাব এখন বোঝা না গেলেও লকডাউনের পর খাদ্যে প্রকট অভাব দেখা দিতে পারে। একটি সমীক্ষা বলছে, বিশ্বব্যপী প্রায় ৮০ কোটি মানুষ ইতোমধ্যে খাদ্য সংকটে ভুগছেন। জাতিসংঘের খাদ্য সুরক্ষা সংক্রান্ত কমিটির আশঙ্কা, খাদ্যের এই সংকটে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হবেন গরিব ও প্রান্তিক শ্রেণির মানুষ।

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) বিশ্ব অর্থনীতিতে যে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে, এতে ৩৩০ কোটি কর্মক্ষম মানুষের আংশিক বা পুরোপুরি বেকার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। ফলে, চিত্রটা তখন দাঁড়াবে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষের চিত্রমালার ন্যায়। তখন শুধু গরিব ও প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ নয় মধ্যবিত্তরাও ক্ষুধায় ভুগবেন। তখন হয়তো ডাস্টবিন থেকে খাবার তুলে খাওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে।

মনপুরা-৭০

১৯৭৪ সালে আঁকা সারি সারি লাশের পাশে স্বজন হারা এক মানুষের বিলাপের ছবি ‘মনপুরা-৭০’। ছবিটি ১৯৭০ সালের দুর্যোগের ওপর অঙ্কিত। ১৯৭০-এর ১২ নভেম্বর আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলে ভয়াল ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসে ১০ লক্ষাধিক মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল। ১৯৭০ সালে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে মহাপ্রলয়ের পর বঙ্গবন্ধু যেমন ছুটে গিয়েছিলেন দুর্গত মানুষের পাশে, শিল্পী জয়নুল আবেদিনও সেদিন ঘরে বসে থাকতে পারেননি। তিনিও ত্রাণসামগ্রী নিয়ে দুর্গত এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। সেখান থেকে ফিরে শিল্পী আঁকলেন তার বিখ্যাত ছবি ‘মনপুরা-৭০’।

মহামারি কোভিড-১৯ এর সংক্রমণে স্থবির পুরো বিশ্ব। সর্বত্র চলছে মৃত্যুর মিছিল। আকাশ-বাতাস লাশের গন্ধে ভারি হয়ে গেছে। মাঠ, ঘাট, সড়ক, পর্যটন নগরীগুলো জনশূন্য। ইতোমধ্যে প্রায় ২ লাখ ২৯ হাজারের মতো মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। মৃত্যুর এ মিছিল কোথায় গিয়ে থামবে তা সময়ই বলে দেবে। এ রোগের প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ রোগের প্রতিষেধক বাজারে আসতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে। অতএব করোনা উত্তর পৃথিবীতে যারা বেঁচে থাকবেন তাদের অবস্থা হবে মনপুরা-৭০ এর ন্যায়। সারি সারি লাশ, স্বজন হারানোর বেদনা, শূন্যতার হাহাকার।

তাহলে এসব থেকে মুক্তির উপায় কি? সময় এখন ধান কাটার। ক্ষেতে দোলছে সোনালী ধান অথচ কৃষক উদ্বিগ্ন। মোড়ল শ্রেণীর মানুষ কৃষকের ধান কাটতে যান, আর সেখানে গিয়ে কিছু ছবি তুলে চলে আসেন, এটি মরার উপর খাড়ার ঘা এর মতো। তবে, কেউ কেউ কৃষককে সহযোগিতা করছেন, সেটি প্রয়োজনের কম। করোনার সর্বগ্রাসী থাবায় থমথমে চারিদিক। কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ কীভাবে ঘরে তুলবে তার সোনালী ফসল।

যারা গ্রামে আছে, তারা জয়নুলের নবান্ন চিত্রকর্মের ন্যায় এ সময়টাতে কৃষক হয়ে কৃষকদের ফসল ঘরে তুলতে সাহায্য করতে পারেন। এতে কৃষকের মনে যেমন খুশির ঢেউ নামবে, তেমনি দেশও উপকৃত হবে। তাছাড়া বাড়িতে বা পতিত জমিতে সবজি চাষ করতে পারেন। পরিশেষে জনমনে প্রত্যাশা একটাই, আসন্ন ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে মুক্তিপাক মানবজাতি।  পৃথিবী আবার তার প্রাণস্পন্দন ফিরে পাক।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।


কুবি/হাকিম মাহি