ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০২ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

‘এই দুর্দিনে ডাক্তারদের তিরস্কার নয়, উৎসাহ দিন’

ডা. মির্জা মিনহাজুল ইসলাম হৃদয় : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-০৩ ৮:৫৩:১৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-০৪ ১২:১৫:২৯ এএম

সালেকা (ছদ্মনাম), ৩৫ বছর বয়স, পুষ্টিহীনতায় ভোগা ক্ষীণকায় দুর্বল শরীর। হাসপাতালের টিকেটে ঠিকানা গফরগাঁও লেখা থাকলেও, তিনি থাকেন রেল স্টেশনে। কয়েক দিন আগে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনী ওয়ার্ডে তার বাচ্চা হলো। বাচ্চাটা বাঁচেনি। স্বামী ছেড়ে চলে গেছেন, বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন কেউ নেই তার।

সালেকা এই করুণ দশা দেখে ডা. আল আমিন তার দায়িত্ব নিলেন। নিজে গিয়ে তার আল্ট্রা করিয়ে আনলেন, ব্লাড ব্যাংকে দৌড়াদৌড়ি করে দুই ব্যাগ রক্ত ম্যানেজ করে দিলেন, ওষুধ কিনে দিলেন। সুস্থ করে হাসপাতাল থেকে বিদায় দেওয়ার সময় হাতে কিছু টাকাও দিয়ে দিলেন। অসুস্থ মানুষ, খাবে কি?

কী ভাবছেন পাঠক? অনন্য সাধারণ কোনো ঘটনা নয় এটি। সরকারি হাসপাতালগুলোতে যারা ডাক্তারি করেন, বেশির ভাগ ডাক্তারই তাদের দায়িত্বের বাইরে এমন অসংখ্য সেবামূলক কাজ করেন। যে কাজগুলো তাদের দায়িত্বের বাইরে। যে কাজগুলো করার শর্ত কেউ তাকে দেয়নি।

ডা. মেহেদী এবং ডা. স্বাগত রাত ৪টায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছেন এক মরণাপন্ন মহিলার পাশে। ডেলিভারি হওয়ার পর স্রোতের মতো রক্ত যাচ্ছে, ওটি টেবিল রক্তে ভেসে যাচ্ছে। স্বামীকে বলা হলো, ‘আপনার স্ত্রীকে বাঁচাতে চাইলে অতি দ্রুত রক্ত ম্যানেজ করুন।’

স্বামী রক্ত ম্যানেজ না করে, নির্বিকার ভঙ্গিতে হাল ছেড়ে দিয়ে বসে রইলেন। এদিকে ওটিতে রোগীর ব্লিডিং ভেসেল ধরে এই দুই তরুণ ডাক্তার দাঁড়িয়ে আছেন। রাত গড়িয়ে সকাল হলো। উপায় না দেখে ডা. মেহেদী ৪ বার ব্লাড ব্যাংকে দৌড়ে, নানা জনকে ফোন দিয়ে রক্ত ম্যানেজ করলেন। সকাল ১১টায় ডা. আবুল হোসাইন স্যার ঐ রোগীর অপারেশন করলেন। তখনো, নির্ঘুম দাঁড়িয়ে এই দুই তরুণ ডাক্তার। সবাই আশা ছেড়ে দিলেও রোগীটা শেষে প্রাণে বেঁচে গেলো। ডা. মেহেদী নিজের ফেসবুক ওয়ালে লিখলেন-তার ডাক্তার হওয়া স্বার্থক।

ঐদিন সকালে ডা. মেহেদীর ডিউটি ছিল না। নির্ঘুম শ্রান্ত শরীরে ডিউটি করে গেছেন, কারণ তিনি সেবাকে ধর্ম মনে করেন। যমদূতের সাথে লড়ে মৃত্যুশয্যা থেকে যেই মহিলাকে ফিরিয়ে আনলেন, তার স্বামী কৃতজ্ঞতা প্রকাশ দূরে থাক, বরং পেট কেন কাটা হলো এই নিয়ে ডাক্তারদের উপর রাগ হলেন। এই প্রতিদান পেয়েও ডাক্তার মেহেদী হতাশ হয়ে হাল ছাড়েননি।

দীর্ঘদিন ধরে সার্জারি ওয়ার্ডের এক রোগীর অদ্ভুত গন্ধযুক্ত, সিউডোমোনাস ইনফেকশনের ঘন পুঁজ পরিষ্কার করছেন ডা. সুরভী। যেদিন তাকে ছুটি দেওয়া হবে, হঠাৎ করে তিনি ডা. সুরভীর হাত ধরে কেঁদে দিলেন, ‘ম্যাডাম, বাসায় যেতে ইচ্ছে করছে না।’ যেই সেবা, যেই যত্ন তিনি পেয়েছেন, তার কৃতজ্ঞতা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে গেলো এক বাক্যে।

ডা. সুরভী এখনো সেই রোগীর কথা মনে করে অনুপ্রেরণা পান। নতুন উদ্যমে সেবার হাত বাড়িয়ে দেন নতুন কোনো রোগীর দিকে। এই তরুণ ডাক্তাররা রোগীদের কাছে কিছুই চান না। কেউ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুক, আর না করুক তা নিয়ে তারা মাথা ঘামান না। সেবাকেই তারা ধর্ম হিসেবে ধারণ করেন। সেটা সবাইকে বলে বেড়ালে কি হয়? ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। প্রতিদিনের অসংখ্য গল্পই যে ভাইরাল হওয়ার মতো।

করোনা মহামারি নিয়ে সারা বিশ্ব আজ আতঙ্কিত। শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও চলমান মহামারি মোকাবিলায় সম্মুখ যোদ্ধা হিসেবে এই স্বাস্থ্যকর্মীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। আমরা বাসায় বসে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে তাদের তুলোধুনো করছি, কিন্তু এই যোদ্ধারা নিজেদের মূল্যবান জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলে কাজ করে যাচ্ছেন নিরলস।

ইতোমধ্যে দেশে অনেক ডাক্তার করোনা আক্রান্ত হয়েছেন, অনেকে আইসিইউতে লড়াই করছেন মৃত্যুর সঙ্গে, করোনা যুদ্ধে শহীদও হয়েছেন, অনেক নার্স আক্রান্ত হয়েছেন। আমরা কিছু করতে না পারি তাদের জন্য, অন্তত এই মহামারির সময়ে তিরস্কার বাদ দিয়ে, একটু উৎসাহ দিতে পারি তাদের। আমাদের দেওয়া একটু সাহস, একটু উৎসাহ এই সম্মুখ যোদ্ধাদের প্ররণা যোগাবে। জীবন বাজি রেখে অপর্যাপ্ত অস্ত্র নিয়ে যেই অসম লড়াই তারা লড়ছেন, সেই লড়াইয়ে তাদের কর্মস্পৃহা বেড়ে যাবে কয়েকগুণ। তারা জিতলেই তো জিতে যাবে সমগ্র পৃথিবী।

লেখক: ডাক্তার, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ।

 

ময়মনসিংহ/আশিকুর/মাহি