ঢাকা, বুধবার, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭, ০৮ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:
গল্প

পুরুষভীতি

জুবায়ের আহমেদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-২৫ ৩:২০:০৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-২৫ ৬:৩৮:১৭ পিএম

রিয়ানার কদিন ধরে মন ভালো নেই। বাড়ির সবাই তার বিয়ে নিয়ে মেতে থাকলেও রিয়ানার মনের অস্থিরতা কিছুতেই শেষ হচ্ছে না। রিয়াজের সঙ্গে বিয়েতে আপত্তি না থাকলেও পুরুষদের প্রতি যে ঘৃণা জন্মেছে, তা কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করলেও কিছুতেই পারছে না রিয়ানা। রিয়াজও যদি অমানবিক আচরণ করে তার সঙ্গে!

সে দু’বছর আগের কথা। রিয়ানার সঙ্গে একটু আধটু কথা হয় মাহিনের। রিয়ানা অল্পতেই মাহিনে মুগ্ধ হয়। দুজন একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হলেও মাহিন তার হিংস্র রূপ দেখাতে সময় নেয়নি। রিয়ানার সরলতার সুযোগে ডিনারের নাম করে সতীত্ব হরণের চেষ্টা করে মাহিন। ঝাঁপিয়ে পড়ে রিয়ানার উপর। রিয়ানা মাহিনের আচরণে স্তব্ধ হয়ে যায়। নারী জীবনের অমূল্য সম্পদ সতীত্ব রক্ষার জন্য প্রাণপণ চেষ্টায় চিৎকার করে মাহিনের কবল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য। হঠাৎ এক ওয়েটার রুমের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রিয়ানার চিৎকার শুনে দরজা ধাক্কা দিলে রিয়ানাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় মাহিন।

রিয়ানা রুম থেকে বের হয়ে সোজা বাসায় চলে আসে। মাহিনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চাইলেও নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবে চুপ থাকে। মাহিন ফোনে যোগাযোগ করতে চাইলেও রিয়ানা সাড়া না দিয়ে নম্বর পরিবর্তন করে ফেলে। বাবাকে রিকুয়েষ্ট করে বাসা ছেড়ে দিয়ে নিজেদের এলাকায় চলে যেতে। রিয়ানা আড্ডাপ্রিয় ও চঞ্চল প্রকৃতির হলেও প্রেমের নামে সতীত্ব বিলিয়ে দেওয়ার মতো মেয়ে নয়। তাই মানতে পারেনি মাহিনের আচরণ। এখনো মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সে। তার কাছে মনে হয় পৃথিবীর সব পুরুষই বুঝি এমন, বন্ধুত্বের মুখোশ পরে অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে মুখিয়ে থাকে।

রিয়াজের সাথে বিয়ে হতে চললেও রিয়ানার ধারণা রিয়াজও মাহিনের মতো তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। ভালো লাগা, খারাপ লাগায় সম্মান দেখাবে না রিয়াজ।

ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেলো রিয়ানা ও রিয়াজের। সারাদিনের ধকল শেষে এক জোড়া নারী পুরুষের জীবনের কাঙ্ক্ষিত ফুলসজ্জার অপেক্ষা। বেনারশী গায়ে মাথায় টিকলি, নাক, কান, গলায় ভারী গহনা এবং হালকা প্রসাধনীতে স্বর্গের অপ্সরীর সাজে বধূবেশে বসে আছে রিয়ানা। গরমে সারা শরীর ঘামলেও এই মুহূর্তে কিছুই করার নেই বসে থাকা ছাড়া। তাছাড়া রিয়ানার মাহিন ভীতি ভর করে আছে মনে। রিয়াজও যদি আচমকা রিয়ানার উপর হামলে পড়ে?

রিয়াজ ফুলসজ্জার রুমে প্রবেশ করতে দেখেই রিয়ানা অভিবাদন জানায়। রিয়াজ বলেন, কেমন আছ তুমি? জ্বি, ভালো আছি। রিয়ানা উত্তর দিলেও ভয়ে কাঁপছে। রিয়ানার শরীরের কাঁপুনি বুঝতে পারে রিয়াজ। রিয়ানার কপালে হাত রেখে দেখতে চায়, শরীর খারাপ কি না। রিয়াজ হাত বাড়ালেই থামিয়ে দেয় রিয়ানা। আমাকে স্পর্শ করবেন না প্লিজ। আপনার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে মাত্র।

রিয়াজ রিয়ানার কথায় অবাক হয়, মনে মনে ভাবে, রিয়ানা বাঁধা দিচ্ছে কেনো। রুমে আসতেই তো কথা বলল। স্বাভাবিক মনে হলো সব। রিয়াজ বলে, তোমাকে স্পর্শ করা আমার উদ্দেশ্য নয়, তোমার শরীর কাঁপছে, শরীর খারাপ কি না দেখতে চেয়েছিলাম। জ্বি, আমি ঠিক আছি, কোনো সমস্যা নেই। উত্তর দেয় রিয়ানা।

রিয়াজ মুহূর্তের মধ্যেই মনমরা হয়ে যায়। ফুলসজ্জার রাতে নববধূকে নিয়ে খোশগল্পে মেতে উঠবে, একে অপরের ভালো লাগা, মন্দ লাগা সব কিছু শেয়ার করবে। মধুময় দাম্পত্য জীবনের শুরুর দিনটা আনন্দঘন করে রাখবে বলে স্বপ্ন থাকলেও রিয়ানার অনিচ্ছা ও রহস্যজনক আরচণে সব ভেস্তে যেতে বসেছে। রিয়াজ মন খারাপ করলেও মানিয়ে নিতে চেষ্টা করে। রিয়ানার সঙ্গে অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ হলেও প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলেছে। রিয়ানা রিয়াজকে এখনো আপন ভাবতে নাম পারলেও রিয়াজ দায়িত্বশীল আচরণ করে। শীতের রাত ছোট। রাত ১২টা বেজে গেছে ইতোমধ্যে।

অনেক রাত হলো, তুমি ঘুমিয়ে পড়ো। আমি সোফায় শুবো। এই বলেই একটা বালিশ নেয় রিয়াজ। আরেকটা বালিশ রিয়ানার দিকে এগিয়ে দেয়। রিয়াজ লাইটের সুইচ অফ করে সোফায় গা এলিয়ে দেয়। এদিকে রিয়ানা ভাবনায় পড়ে যায়। ভীতি কাটিয়ে রিয়াজের কথা ভাবতে থাকে। রিয়াজের সোফায় শোয়ার কথা থেকেই বিশ্বাস জন্মে রিয়ানার। ভাবতে থাকে সব পুরুষ এক নয়। রিয়াজ মাহিনের মতো নয়। মাহিন ছিল সুযোগ সন্ধানী পুরুষ, রিয়াজ নয়। বিবাহিত স্ত্রীর প্রতি অধিকার জন্মালেও রিয়াজের শান্ত আচরণে মুগ্ধ হয় রিয়ানা। নিজেকে বোঝায়, মাহিন নামক  পশুর আচরণের কারণে কেনো নারী জীবনের কাঙ্ক্ষিত পুরুষ স্বামীর সঙ্গে ফুলসজ্জার রাতে অভিমানী আচরণ করবে।

রিয়ানা ভাবতে ভাবতে নিজেকে স্বাভাবিক করে। রিয়াজকে ডেকে তুলবে সিদ্ধান্ত নিয়ে উড়নাটা বিছানায় ফেলে খাট থেকে নিচে নামে। রিয়াজও ভাবনায় ডুবে আছে, সে এখনো বুঝতে পারছে না রিয়ানার এমন আচরণের কারণ কী। আমাকে পছন্দ না হলে কিংবা অন্য কাউকে পছন্দ করলে এটা জানাতে পারতো। মনে মনে ভাবে রিয়াজ।

রিয়ানা সোফার কাছে এসে কপালে হাত রেখে শুয়ে থাকা রিয়াজের কাছে এসে দাঁড়ায়। রিয়াজের মায়া ভরা মুখের দিকে তাকায় রিয়ানা। ভাবতে থাকে, লোকটি আমার কথায় অনেক কষ্ট পেয়েছে নিশ্চয়ই। রিয়ানা রিয়াজের হাতে আলতো করে ছুঁয়ে হাত সরিয়ে ফেলে। হাতে কারো স্পর্শ অনুভব করে রিয়াজ। হঠাৎ চমকে ওঠে। শোয়া থেকে বসে পাশে থাকা সেল ফোন হাতে নিয়ে রিয়ানাকে দেখতে পায়। অবাক হয় কিছুটা।

আপনি এখানে, ঘুমাননি? রিয়ানাকে প্রশ্ন করে রিয়াজ। লজ্জায় লাল হয়ে থাকা রিয়ানা কিছুটা সাহসী হয়েই উত্তর দেয়। আজ আমাদের ফুলসজ্জা, বিবাহিত জীবনের প্রথম কাঙ্ক্ষিত রাত। ঘুমিয়ে এই দিনটাকে মাটি করে দেবো কেনো। আমি দুঃখিত আপনার সঙ্গে তখন ওভাবে কথা বলায়। আমি নার্ভাস ছিলাম। রিয়ানা একবার ভাবে মাহিনের কথা বলে দেবে কি না। পরক্ষণেই ভাবে, পুরুষ মানুষের মন, যদি এটা শুনে মেনে নিতে না পারে। বলবে না বলেই সিদ্ধান্ত নেয় রিয়ানা।

রিয়ানার কথায় আবারও অবাক হয় রিয়াজ। তোমাকে ক্লান্ত ও চিন্তিত দেখাচ্ছিল, সেই সাথে আমার উপস্থিতি ও স্পর্শ করার চেষ্টা তুমি গ্রহণ করতে পারোনি। তাই আমি তোমাকে ডিস্টার্ব না করে নিজের মতো করে থাকতে দিয়েছি।

আর ওসব বলে আমাকে লজ্জা দেবেন না, আসেন একে-অপরের ভালো লাগা, মন্দ লাগা, কার কী পছন্দ, অপছন্দ এসব নিয়ে গল্প করে সারারাত কাটিয়ে দেবো।

রিয়ানা কথাগুলো বলেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। মাথার উপরে থাকা টেনশন কিছুটা দূর হয় রিয়ানার। রিয়াজের প্রতি বিশ্বাস জন্মাতে শুরু করে। রিয়াজও রিয়ানার কথায় মনের মধ্যে যে প্রশ্নের উঁকি দিয়েছিল, তার উত্তর খুঁজে নেয়। রাতটা বিফলে যাবে না ভেবে দুজনেই মুচকি হাসে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ডিপ্লোমা ইন জার্নালিজম, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব জার্নালিজম অ্যান্ড ইলেকট্রনিক মিডিয়া (বিজেম)।

 

বিজেম/হাকিম মাহি