ঢাকা, সোমবার, ২৯ আষাঢ় ১৪২৭, ১৩ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:
গল্প

অব্যক্ত ভালোবাসা

আজাহার ইসলাম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-৩১ ৪:২৪:২৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-৩১ ৪:২৪:২৬ পিএম

ঘড়িতে ভোর সাড়ে ৬টা। মোবাইলের রিংটোনে ঘুম ভাঙলো রবিনের (ছদ্মনাম)। সচরাচর ৯টার আগে উঠেনা সে। চোখ কচলাতে কচলাতে আধো ঘুমে ফোন রিসিভ করলো। হ্যালো বলতেই ভেসে উঠলো অতি পরিচিত এক আওয়াজ। চেনা সেই সুর। নম্বর দেখে রীতিমতো চমকে গেছে রবিন।

বহুদিন পর রিয়ার (ছদ্মনাম) ফোন। ওপাশ থেকে আওয়াজ আসলো, ‘কেমন আছ? রবিন।’ হঠাৎই রবিনের চোখের কোণায় দু’ফোটা জল এসে জমা হলো। চোখ মুছে বললো ‘ভালো আছি। তুমি ভালো?’ তারপর বেশ কিছুক্ষণ কথা চললো।

ঘুম পুরোই ভেঙে গেলো রবিনের। ঘুম আসছে না আর। মনে পড়ছে রিয়ার কথা। সেই পুরনো দিনের কথা। রবিন কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে গেলো সোনালি অতীতে। রিয়াকে প্রচণ্ড ভালোবাসতো রবিন, তবে কখনো ভালোবাসি বলা হয়নি।

রবিন আর রিয়া। পরিচয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রায় বছর খানেক পর। কথাবার্তা শুরু ফেসবুক মেসেঞ্জারের সুবাদে। ক্লাস নোট দেওয়া নেওয়ার মাধ্যমে শুরু। এই স্বল্প পরিচয় যে এতদূর নিয়ে যাবে কেউ কখনো ভাবতেই পারেনি। একজনের আরেকজন ছাড়া যেন চলতোই না। কেয়ারিং শেয়ারিংয়ের কোনো কমতি ছিল না তাদের মধ্যে। অনেকে বলে থাকে প্রতিটা ছেলেই নাকি তার মেয়ে বেস্ট ফ্রেন্ডের প্রেমে পড়ে। রবিন কথাটা বিশ্বাস না করলেও পরে মেনে নিয়েছে।

রিয়াকে প্রচণ্ড রকম ভালোবেসে ফেলেছিল রবিন। তবে ভালোবাসাটুকু শুধু মনেই ছিল। প্রকাশ করেনি হারানোর ভয়ে। রবিন শুধু অপলক দৃষ্টিতে চেয়েই থাকতো রিয়ার দিকে।

ডিপার্টমেন্টে রবিন আর রিয়াকে চেনে না এমন কেউ নেই। তাদের সম্পর্ক টম অ্যান্ড জেরির মতো। সারাক্ষণ খোঁচাখুঁচি, ঝগড়া। তাদের দু’জনেরই ক্লাসে ভালো পারফর্মেন্স। বরাবরই সিজিপিএ ভালো। তাই আর শিক্ষকদেরও নজরের বাইরে পড়তো না।

ক্লাসে এক বেঞ্চে বসে মারামারি, খোঁচাখুঁচি। মাঝে মাঝে স্যারের নজরে পড়লে দাঁড় করিয়ে রাখতো পুরো ক্লাস। তবুও ক্লাসে খোঁচাখুঁচি বন্ধ হয় না তাদের। ক্লাস শেষেই আড্ডা ডায়না চত্বরে। বিকেল হলেই মফিজ লেকে ঘুরতে যাওয়া। সন্ধ্যায় রিয়াকে হলে পৌঁছে দিয়ে জিয়া মোড়ে বন্ধুদের সাথে চায়ের আড্ডায় মিলিত হওয়া। এভাবেই কেটে যাচ্ছিল রবিন আর রিয়ার সময়গুলো।

ভালোই চলছিল। হঠাৎ সম্পর্কে নেমে এলো কালো ছায়া। রাকিব সন্দেহ করতো রবিন আর রিয়া প্রেম করে। রাকিব রিয়ার বয়ফ্রেন্ড। সে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তো। রবিন আর রিয়ার এমন সম্পর্ক রাকিব মেনে নিতে পারেনি। সন্দেহ করতো সবসময় ওরা প্রেম করে কি না।

রিয়ার আশেপাশের বন্ধু বান্ধবীদের জিজ্ঞেস করতো ওদের মধ্যে সম্পর্ক কী, প্রেম করে নাকি ইত্যাদি ইত্যাদি। রিয়া কোনো ছেলের সঙ্গে মিশলেই তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠতো রাকিব। ধীরে ধীরে বেড়েই চললো রাকিবের সন্দেহের পাহাড়।

রিয়া শুরুর দিকে তার বয়ফ্রেন্ডের সন্দেহের কথা লুকালেও হঠাৎ একদিন রবিনকে বলেই ফেললো। রিয়া বলল, ‘রবিন শোন, তোর সঙ্গে মনে হয় আর তেমন যোগাযোগ হবে না।’ রবিনের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। সে রিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘কী বলিস তুই! বুঝে বলছিস?’ রিয়া তখন আস্তে আস্তে খুলে বললো সব।

রবিন সেদিন হাসিমুখে রিয়ার থেকে বিদায় নিলেও ধাক্কা সামলাতে পারেনি। রিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছন্ন হওয়ায় ভেঙ্গে পড়েছে। এদিকে সেমিস্টার ফাইনাল দরজায় কড়া নাড়ছে।

ধীরে ধীরে তাদের দূরত্ব বাড়লো। বেশ কিছুদিন পরেই রবিন অসুস্থ হয়ে পড়লো। খাওয়া দাওয়ায় অনিয়ম, অবহেলা। শরীরের প্রতিও যত্ন নেই। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হলো সেমিস্টার ফাইনাল।

পরীক্ষার তেমন কোনো প্রস্তুতিই নেই রবিনের। বাসায় কী জবাব দেবে রেজাল্ট খারাপ হলে। এ চিন্তায় আর পড়াশোনা হচ্ছে না। পরীক্ষা চলছে। চাপ বাড়ছে। মোটামুটি প্রিপারেশন নিয়ে প্রথম পরীক্ষায় অংশ নিল। পরিক্ষা শেষ। পরীক্ষা শেষে সাধারণত সবাই টেনশন ফ্রি হয়। রবিনের ঘটলো উল্টো। পরীক্ষা চরম খারাপ হয়েছে তার। বাড়িতে কী জবাব দেবে?

কথায় আছে সময় ও স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। রবিনের জন্যও সময় থমকে দাঁড়ায়নি। ধীরে ধীরে রবিন সুস্থ্য হয়ে উঠলো। তবে রিয়াকে কোনোভাবেই ভুলতে পারছে না। কেটে গেলো বাকি আরও দুটি বছর। গ্র্যাজুয়েশন শেষ তাদের। এখন দৌড়ানোর পালা চাকরির বাজারে। কয়েকজন বন্ধু মিলে ঢাকা শহরে একটা বাসা ভাড়া নিল রবিন। সেখান থেকেই চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছে।

মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা রবিন। পরিবারের বড় সন্তান। টিউশন করে নিজের খরচ চালায়। দেশে চাকরি সোনার হরিণ। সরকারি চাকরি তো আরও বিশাল ব্যাপার। ভাইভার পর ভাইভা দিয়েই যাচ্ছে। চাকরি হচ্ছে না। টেনশন বাড়ছে। আর কতদিন বাবার টাকায় চলবে।

রবিনের আইটি সেক্টরে হাত পাঁকা। চাকরি না পেয়ে আর সাতপাঁচ না ভেবে আউটসোর্সিং শেখা শুরু করলো। অল্প সময়েই রপ্ত করে ফেললো। শুরুতে বেশি টাকা আয় না হলেও ধীরে ধীরে আয় বাড়লো। আউটসোর্সিংয়ে রবিন এখন মাসপ্রতি প্রায় লাখ খানিক টাকা আয় করে। বাড়িতেও টাকা পাঠায়।

ভাড়া বাসা ছেড়ে ফ্লাটে উঠলো রবিন। এখনো মাঝেমধ্যেই রিয়ার কথা ভাবে। ভাবে সোনালী অতীতের কথা। কোথায় আছে, কেমন আছে। রিয়া শুধু কল্পনায়ই থেকে গেলো। প্রণয় ছিল, পরিণয় আর হয়ে উঠলো না। রবিনের অব্যক্ত ভালোবাসা এভাবেই বেঁচে রইলো তার মনে। রিয়াকে কখনো বলেনি ‘ভালোবাসি’।

লেখক: শিক্ষার্থী, আইন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।


ইবি/হাকিম মাহি