ঢাকা, শুক্রবার, ৪ আশ্বিন ১৪২৬, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

পাকিস্তানের ‘মিশন ইম্পসিবল’!

মানজুর মাহমুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৫-২৪ ৯:১৮:৪৮ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৫-২৪ ১১:৪৩:৫৯ এএম
পাকিস্তানের ‘মিশন ইম্পসিবল’!

মানজুর মাহমুদ: ২০১৫ সালের ২৯ মার্চ থেকে নতুন অপেক্ষার শুরু। একটি একটি করে দিনের অবসান। এরপর এক, দুই, তিন বছর শেষে অপেক্ষা মাত্র কয়েকটা দিনের।

২০১৫ ক্রিকেট বিশ্বকাপের সেই ফাইনাল ম্যাচের পর থেকে যে অপেক্ষার শুরু হয়েছিল, আর কয়েকদিন পরই সেটা ফুরিয়ে যাবে।  আগামী ৩০ মে থেকে শুরু হয়ে যাবে ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় আসরের ব্যাট-বলের লড়াই।

ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বসতে যাচ্ছে দ্বাদশ ওয়ানডে বিশ্বকাপের আসর। ক্রিকেটের এ মহাজজ্ঞের দামামা বেজেছে আগেই। অপেক্ষা কেবল মাঠে গড়ানোর। এমন সময় প্রতিটা দল ব্যস্ত তাদের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিয়ে। কোনো দল ম্যাচ খেলছে, কোনো দল আবার অনুশীলনে ঘাম ঝরিয়ে সেরে নিচ্ছে প্রস্তুতিপর্ব।

আর সব দলের মতো উপমহাদেশের ক্রিকেট পরাশক্তি পাকিস্তানও ব্যস্ত একই কাজে। বিশ্বকাপের আগে শেষবারের মতো ঝালিয়ে নিতে আয়োজক দেশেই ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছিল তারা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একটি টি-টোয়েন্টি ও পাঁচটি ওয়ানডে দিয়ে বিশ্বকাপ প্রস্তুতি সারার মিশন নিয়ে বিমানে চড়েন পাকিস্তানের ক্রিকেটাররা।

এই সিরিজের প্রস্তুতি ম্যাচগুলোই কেবল সুখস্মৃতি হয়ে আছে পাকিস্তানের কাছে। তিনটি প্রস্তুতি ম্যাচেই জয় পায় পাকিস্তান। এরপর কেবল হারের মুখই দেখতে হয়েছে তাদের। একটি ওয়ানডেতে হারতে হয়নি, কারণ ওই ম্যাচটি বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত হয়েছিল। অবশ্য তাদের এই হারের গাড়ি চলতে শুরু করেছে সেই জানুয়ারি থেকে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজ খোয়ানোর পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হোয়াইটওয়াশ হয় তারা। সর্বশেষ ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও জয়হীন থেকেছে পাকিস্তান। সবমিলিয়ে শেষ ১০ ম্যাচের সবকটি ম্যাচেই (একটি পরিত্যক্ত) হেরেছে পাকিস্তান। আর যদি চলতি বছরের হিসাব করা হয়, তাহলে ১৪ ম্যাচে মাত্র দুটি ম্যাচে জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছে ১৯৯২ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়নরা।
 


রেকর্ড বিপক্ষে বললেও পারফরম্যান্স অবশ্য পাকিস্তানকে পিছিয়ে রাখছে না। কারণ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিনটি ম্যাচে রানের পাহাড় গড়েও হারতে হয়েছে তাদের। তৃতীয় ওয়ানডেতে ৩৫৮ ও চতুর্থ ওয়ানডেতে ৩৪০ রান করেও হার মানে সরফরাজের দল। এর আগে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ৩৭৩ রান তাড়া করতে নেমে ৩৬১ রানে থামে পাকিস্তান। শেষ ওয়ানডে তিনশো ছুঁইছুঁই রান করে হেরেছে তারা।

ব্যাটে-বলে দারুণ লড়াই করেও জয় নিয়ে মাঠ ছাড়া হয়নি তাদের। যে কারণে ইংল্যান্ডের মাটিতে বিশ্বকাপ বলে পাকিস্তানের ভালো করার যে সম্ভাবনা ছিল, সেই সম্ভাবনার সূচক নিচুর দিকে নামতে শুরু করেছে। কারণ দিনশেষে হার যোগ হয়েছে পাকিস্তানের নামের পাশে। আর এত বড় আসরের আগে এমন টানা হার তাদের আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরাতে পারে, সেটা বলাই বাহুল্য।

২০১৭ সালে ইংল্যান্ডের মাটিতে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জিতেছে পাকিস্তান। এছাড়া ক্রিকেটের জনক দেশটিতে পাকিস্তানের জয়ের গড় বলার মতোই। কিন্তু সব যেন বিবর্ণ হয়ে উঠেছে একটি সিরিজের কারণে। তবু আশার আলো দেখছে তারা, কারণ পাকিস্তানের বিশ্বকাপ স্কোয়োডে থাকা ক্রিকেটাররা বেশ ছন্দেই আছেন। যে কারণেই বিশ্বকাপে নতুন করে শুরু করতে চায় ইমরান খান, ওয়াসিম আকরাম, শোয়েব আক্তারদের অনুজরা।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ব্যাট হাতে দারুণ করেছেন পাকিস্তানের বেশ কয়েকজন ব্যাটসম্যান। টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান বাবর আজম রীতিমতো শাসন করেছেন। ৫ ম্যাচে একটি সেঞ্চুরি ও দুটি হাফ সেঞ্চুরিসহ ৫৫.৪০ গড়ে ২৭৭ রান করেছেন ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান। ওপেনার ইমাম-ইল-হকও বেশ ছন্দে ছিলেন। এই সিরিজের তৃতীয় সর্বোচ্চ রান করা ইমাম একটি সেঞ্চুরিসহ ১১৭ গড়ে ২৩৪ রান করেছেন। এ ছাড়া ফখর জামান, অধিনায়ক সরফরাজ আহমেদরাও রানের দেখা পেয়েছেন।

তবে বল হাতে হতাশ করেছেন পাকিস্তানের বোলাররা। প্রায় প্রতিটা ম্যাচেই ইংলিশ ব্যাটসম্যানরা তাদের শাসন করেছেন।  ইমাদ ওয়াসিমের পারফরম্যান্সের দিকে তাকালেই সেটা বোঝা যাবে। এই সিরিজে পাকিস্তানের সেরা বোলার তিনিই। অথচ ৫ ম্যাচে মাত্র ৬টি উইকেট নিয়েছেন বাঁহাতি এই স্পিনার। আর শাহীন শাহ আফ্রিদির শিকার ৫ উইকেট।

বোলিং তাদের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বোলিং আক্রমণ শক্ত করতে অবশেষে ১৫ সদস্যের স্কোয়াডে মোহাম্মদ আমির ও ওয়াহাব রিয়াজকে নিয়েছে পাকিস্তান। এ ছাড়া পাকিস্তানের পেস আক্রমণে হাসান আলী, শাহীন শাহ আফ্রিদির সঙ্গে আছেন গতির ঝড় তুলে রাতারাতি তারকা হয়ে যাওয়া ১৯ বছর বয়সি মোহাম্মদ হাসনাইন। ১৫১ কি.মি বেগে বল করে হইচই ফেলে দেওয়া হাসনাইনের দিকে তাকিয়ে থাকবে পাকিস্তান।
 


এবারের বিশ্বকাপে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হতে পারে তাদের অলরাউন্ডাররা। তাদের ১৫ সদস্যের দলের মধ্যে ছয়জনই অলরাউন্ডার। ফিটনেস সমস্যায় থাকা মোহাম্মদ হাফিজ ছাড়া সবাই বেশ ছন্দে আছেন। এখানে তাদের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম শোয়েব মালিক। এছাড়া শাদাব খান, আসিফ আলী, হারিস সোহেল, ইমাদ ওয়াসিমরাও পাকিস্তানের মূল ভরসা।

বিশ্বকাপে পাকিস্তান

বিশ্বকাপ ইতিহাসে পাকিস্তান অতি চেনা ও পুরনো নাম। বিশ্বকাপের প্রথম আসর থেকেই অংশ নিয়ে আসছে তারা। আগের ১১টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে ছয়বার সেমিফাইনাল খেলেছে উপমহাদেশের ক্রিকেট পাগল এই দেশটি। দুইবার ফাইনাল খেললেও একবার শিরোপা ছুঁয়ে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে তাদের। ১৯৯২ বিশ্বকাপে কিংবদন্তি অলরাউন্ডার ইমরান খানের নেতৃত্বে প্রথম বারের মতো শিরোপার স্বাদ নেয় পাকিস্তান।

দুই আসর পর (১৯৯৯ বিশ্বকাপ) ফাইনালে উঠলেও অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে রানার্সআপ হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাদের। প্রথম আসরের মতো ২০০৩ ও ২০০৭ বিশ্বকাপে কিছুই করে দেখাতে পারেনি পাকিস্তান। এই তিন আসরের প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয় তারা। এ ছাড়া ১৯৯৬ ও ২০১৫ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলে পাকিস্তান।

২০১৫ বিশ্বকাপের পর ওয়ানডেতে পাকিস্তান

২০১৫ বিশ্বকাপের পর পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় সাফল্য চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে। ২০১৭ সালে এই ইংল্যান্ডেই অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে শাসন করেছিল সরফরাজ আহমেদের দল। দাপটের সঙ্গে ফাইনালে উঠে যাওয়া পাকিস্তানই হেসেছিল শেষ হাসি। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল ৯২’র বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জিতলেও ২০১৫ বিশ্বকাপের পর ওয়ানডেতে পাকিস্তানের জয়ের গড় সুখকর নয়। ৮০ ম্যাচ খেলে ৪২টি ম্যাচেই হারতে হয়েছে তাদের। জয় মিলেছে ৩৫টি ম্যাচে (৩টি ম্যাচ পরিত্যক্ত)। সবচেয়ে বড় দুর্দশা গেছে গত কয়েক মাসে। তবু সব ঝেরে নতুন শুরুর অপেক্ষায় পাকিস্তান। এ ছাড়া তাদেরকে তো আনপ্রেডিক্টেবল দল বলাই হয়। দেখা গেছে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এমন একটি সিরিজ খেলার পরও বিশ্বকাপে দাপট দেখাচ্ছে পাকিস্তানই।  তাইতো তাদের জন্য এ লড়াইয়ের কেতাবি নাম ‘মিশন ইম্পসিবল’!

পাকিস্তানের বিশ্বকাপ স্কোয়াড : সরফরাজ আহমেদ (অধিনায়ক), ফকর জামান, ইমাম-উল-হক, বাবর আজম, হারিস সোহেল, আসিফ আলী, শোয়েব মালিক, মোহাম্মদ হাফিজ, ইমাদ ওয়াসিম, শাদাব খান, হাসান আলী, শাহেন শাহ আফ্রিদি, মোহাম্মদ আমির, ওয়াহাব রিয়াজ ও মোহাম্মদ হাসনাইন।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৪ মে ২০১৯/ মানজুর মাহমুদ/ইয়াসিন

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন