ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ কার্তিক ১৪২৬, ১৭ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ওয়েস্ট ইন্ডিজে রঙিনে রঙিন বাংলাদেশ, সাদায় আক্ষেপ

ইয়াসিন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৮-০৭ ৬:৫০:২৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৮-০৮ ১০:৩৩:২৬ এএম

ইয়াসিন হাসান : সাদা পোশাকে সফর শুরু হয়েছিল ৪৩ রানে অলআউট হয়ে। সেই সফর রঙিন পোশাকে শেষ হয়েছে ১৯ রানের জয়ে। মাঝে ছিল পতনের দুঃস্মৃতি, উত্থানের দারুণ গল্প। সাদা পোশাকে ব্যর্থতায় আর রঙিন পোশাকে সাফল্যে বাংলাদেশ ইতি টেনেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের। টেস্টে হোয়াইটওয়াশ হওয়ার পর ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি সিরিজ- দুটোই জিতেছে বাংলাদেশ। দেশের বাইরে এত বড় সাফল্য খুব কমই আছে বাংলাদেশের। অরাধ্য অনেক সাফল্য এবার ধরা দিয়েছে। আবার হাত ফসকে বেরিয়ে গেছে নিশ্চিত অর্জন। দুইয়ে মিলিয়ে এবারের ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ এবং আমেরিকা সফর অম্লমধুর। 



সাদায় হোয়াইটওয়াশ-রঙিনে উজ্জ্বল
৪৩ ও ১৪৪। ব্যক্তিগত কোনো রান নয়। পুরো দলের পারফরম্যান্স এটি! প্রথম টেস্টে কেমার রোচ ও শ্যানন গ্যাব্রিয়েলের তোপে বাংলাদেশের ইনিংস শেষে এই দুটি স্কোর। মাথা তুলে পারফরম্যান্স করতে পারেনি কোনো ক্রিকেটার। বাংলাদেশ যেখানে ৪৩ রানে অলআউট হয়েছিল, সেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের রান ৪০৬। বাংলাদেশ ম্যাচ হারে ইনিংস ও ২১৯ রানে। দ্বিতীয় ম্যাচেও একই পারফরম্যান্স। এবার প্রথম ইনিংসে ১৪৯, দ্বিতীয় ইনিংসে ১৬৮। আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের রান ৩৫৪ ও ১২৯। বোলাররা খানিকটা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত দিলেও ব্যাটসম্যানরা আবারো ব্যর্থ। ২-০ ব্যবধানে হেরে শেষ টেস্ট সিরিজ। রঙিন পোশাক গায়ে জড়াতেই পাল্টে গেল চিত্র। মাশরাফির নেতৃত্বে প্রথম ওয়ানডেতে ৪৮ রানের জয়। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে আবারো পুরোনো রোগে আক্রান্ত বাংলাদেশ। হাতের মুঠোয় থাকা ম্যাচ হেরে বসে মাত্র ৩ রানে। শেষ ওয়ানডেতে মাশরাফির দল ১৮ রানে জয় তুলে পুরো বাংলাদেশকে সিরিজ জয়ের আনন্দে ভাসায়। টি-টোয়েন্টির শুরুটা ওয়ানডের মতো ভালো হয়নি। ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে নিজেদের শেষ ম্যাচে হেরে বসে ৭ উইকেটে। তবে মার্কিন মুলুকে শেষ দুই ম্যাচ জিতে বাংলাদেশ ২-১ ব্যবধানে জিতে নেয় টি-টোয়েন্টি সিরিজ। রঙিন পোশাকে দুই সিরিজেই সিরিজসেরা বাংলাদেশের দুই পারফরমার তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসান।



স্বস্তি

পুরো সিরিজে সিনিয়রদের পারফরম্যান্স নিয়ে যত স্বস্তি বাংলাদেশ শিবিরে। তামিম, সাকিব, মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ- এ চার ক্রিকেটার যেন পুরো দলের নিউক্লিয়াস। বিশেষ করে রঙিন পোশাকে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন তাদের ব্যতিত পুরো দলই ছন্নছড়া! এ তালিকায় আসবে মাশরাফি বিন মুর্তজার নামও। সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যের ফরম্যাট ওয়ানডেতে মাশরাফির থাকা মানেই দলের বাড়তি পাওয়া। পুরো দলকে চাঙ্গা রাখা আর এক সুতোয় গেঁথে রাখার কাজটা মাশরাফির কাঁধে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে বাংলাদেশ যে রান করেছে, তার ৭১ ভাগ রান এসেছে তামিম, সাকিব, মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহর ব্যাট থেকে। তামিম হাঁকিয়েছেন দুটি সেঞ্চুরি। এ ছাড়া ১০ হাফ সেঞ্চুরির ৮টিই তাদের ব্যাট থেকে। ব্যাটিংয়ের মতো বোলিংয়েও একই অবস্থা। সাকিব ও মাশরাফি এখনো দলের সেরা বোলার। বিশেষ করে সাকিব টেস্টে এবং মাশরাফি ওয়ানডেতে। সফরে তারাই দলকে বোলিংয়ে লিড দিয়েছেন।

তরুণদের মধ্যে ব্যাটসম্যানরা কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারলেও বোলাররা চ্যালেঞ্জ দিচ্ছেন সিনিয়রদের। বোলিংয়ে দুই তরুণ মুস্তাফিজ ও মিরাজ আশা দেখাচ্ছে বাংলাদেশকে। সফরে ভালো বোলিং করেছেন তারাও। তাদের উজ্জ্বল পারফরম্যান্সে সীমিত পরিসরে ভালো করেছে বাংলাদেশ। মিরাজ ডান হাতে অফস্পিন ভেলকিতে সাদা পোশাকে পেয়েছিলেন  পাঁচ উইকেট। নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে বারবারই বাংলাদেশকে দিয়েছেন সাফল্য। সীমিত পরিসরেও তাই। পাওয়ার প্লে’তে গেইল-লুইসদের আটকে রাখার কাজটা ভালোভাবেই করেছেন মিরাজ। মুস্তাফিজ রান খরচে মিতব্যয়ী হতে না পারলেও দলের প্রয়োজন মিটিয়েছেন। যখন উইকেট নেওয়ার তখন উইকেট নিয়েছেন।  পিছিয়ে নেই আরেক পেসার রুবেল হোসেনও। শেষ দিকে নিজের স্নায়ু ধরে রাখতে না পারা রুবেল এবার দুইবার পরীক্ষার সফল। শেষ দিকে দুই ম্যাচে তাকে বল দেন অধিনায়ক। দুবারই নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে রানের চাকায় লাগাম টানেন রুবেল।



অস্বস্তি

দলের সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয়টা হচ্ছে তরুণদের পারফরম্যান্স। বিশেষ করে তরুণ ব্যাটসম্যানদের পারফরম্যান্স একেবারেই ছন্নছাড়া। পুরো সফরে দলের আট তরুণ ব্যাটসম্যান মাত্র দুটি হাফ সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন। ২৯ ইনিংসে মোট রান করেছেন ৩৬৯। লিটন কুমার দাস, এনামুল হক বিজয়, সৌম্য সরকার, সাব্বির রহমান, মোসাদ্দেক হোসেন, মুমিনুল হক, আরিফুল হক এবং কাজী নুরুল হাসান সোহান আছেন এ তালিকায়। এর মধ্যে দুটি হাফ সেঞ্চুরির একটি এসেছে লিটন ও সোহানের ব্যাট থেকে। বলার অপেক্ষা রাখে না এ আট তরুণের মূল ভরসাই ছিলেন তামিম, সাকিব, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহ। তরুণদের এমন পারফরম্যান্সে চিন্তিত দেশের ক্রিকেটের সর্বমহল। কারণ এদের নিয়ে হবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ। তাই তাদের ফর্মে ফেরা জরুরি, অত্যাবশ্যকীয়।  টেকনিক্যালি পিছিয়ে রয়েছেন তরুণরা, এমনটা মানতে নারাজ অনেকেই। স্থানীয় কোচদের দাবি, সঠিক পরিকল্পনা এবং মানসিক দক্ষতায় কমতি থাকায় তরুণরা পারফর্ম করতে পারছেন না। এ ছাড়া মাঠের থেকে মাঠের বাইরের বিষয়াদি নিয়ে বেশি মনোযোগী হওয়ায় তরুণরা পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারছেন না বলে মত দিয়েছেন ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা।



ভাবনায়
বিশ্বকাপ
২০১৯ বিশ্বকাপ দরজায় কড়া নাড়ছে। আগামী বছরের বিশ্বকাপকে ঘিরেই এখন সব পরিকল্পনা হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন ক্রিকেটবোদ্ধারা। অন্য দলগুলো যেখানে নিজেদের সেরা দল বাছাই করে চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়ার অপেক্ষায়, সেখানে বাংলাদেশ পিছিয়ে নিজেদের সেরা কম্বিনেশন খুঁজে পেতে। দলের পাঁচ সিনিয়র ক্রিকেটারসহ রুবেল ও মুস্তাফিজের জায়গা মোটামুটি নিশ্চিত। কিন্তু বাকিদের নিয়ে চিন্তিত বিসিবি। বিশেষ করে তামিমের ওপেনিং পার্টনার কে হবেন, তা নিয়ে ভাবনার শেষ নেই। সৌম্য, লিটন, বিজয়কে দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু তিনজনই নিজেদের জায়গা তৈরি করতে ব্যর্থ। তবে লিটনকে এই মুহূর্তে আরেকবার সুযোগ দেওয়ার পক্ষে অনেকেই। ওয়েস্ট ইন্ডিজে টেস্টে এবং টি-টোয়েন্টিতে দ্যুতি ছড়ানোয় তাকে আগামী এশিয়া কাপে দেখার পক্ষে টিম ম্যানেজমেন্ট। তিনে সাকিব থিতু হয়েছেন ভালোভাবেই। চারে মুশফিক, পাঁচে মাহমুদউল্লাহ। ছয়ে এবং সাতে কে ব্যাটিং করবেন, তা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে টিম ম্যানেজমেন্টকে। সাব্বির ছিলেন অটোমেটিক চয়েজ। কিন্তু শেষ এক বছরে বলার মতো সাব্বিরের পারফরম্যান্স মাত্র একটি। সেটাও টি-টোয়েন্টিতে। আরেক ক্রিকেটার মোসাদ্দেক হোসেন নিজেকে হারিয়ে খুঁজছেন। সুস্থ হয়ে ফেরার পর নিজেকে এখনো মেলে ধরতে পারেননি মোসাদ্দেক। মিরাজ জায়গা পাবেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়।  মাশরাফি, রুবেল ও মুস্তাফিজের সঙ্গে চতুর্থ পেসার কে হবেনম, তা নিয়েই রয়েছে ভাবনা। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে টি-টোয়েন্টিতে আবু হায়দার রনি শেষ দুই ম্যাচে আলো কেড়েছেন। তাকে ওয়ানডেতে জায়গা দেওয়ার সুযোগ আছে বলে করছেন অনেকেই। এ ছাড়া নাজমুল হোসেন শান্ত, আবু জায়েদ রাহী, ইমরুল কায়েস এবং কাজী নুরুল হাসান সোহানকে নিয়ে বড় পরিকল্পনা টিম ম্যানেজমেন্টের। ঘরোয়া ক্রিকেটে এবং ‘এ’ দলের সফরে তারা ভালো করলেই মিলতে পারে জাতীয় দলে জায়গা। মূলত ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধ কন্ডিশনের কথা চিন্তা করে বাংলাদেশ আগেভাগে নিজেদের পরিকল্পনা সেট করছে। একটি কম্বিনেশন তৈরি করে আট-নয় মাস পুরো দলকে ঝালাই করার পরিকল্পনা বিসিবির।



নির্বাচকদের
ভাবনা
প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন নান্নু মনে করেন, ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলেছে, সেটা টেস্টে ছিল না! তাই রঙিন পোশাকে পারফরম্যান্স ছিল উজ্জ্বল। তার ভাষ্য, ‘আমরা টি-টোয়েন্টিতে কিছুদিন আগেও হেরেছিলাম আফগানিস্তানের বিপক্ষে। কিন্তু ওখানে (উইন্ডিজ) আমরা দারুণ খেলেছি। আমি মনে করি, আমরা টি-টোয়েন্টি দলটা পেয়ে গেছি যেটার খোঁজে আমরা ছিলাম। এভাবেই আমাদের সামনে খেলতে হবে। ওয়ানডেতেও তাই। মাশরাফি দারুণ নেতৃত্ব দিচ্ছে। দলটাকে গুছিয়েছে। ওয়ানডেতে আমরা সিরিজ জিতেছি। টেস্টে আমাদের আরো উন্নতি করতে হবে। খেলোয়াড়দের সময় দিতে হবে।’

তরুণদের নিয়ে প্রধান নির্বাচকের মন্তব্য, ‘তরুণদের নিয়ে আমরা আশাবাদী। ওরা পারফর্ম আগে করেছে বলেই ওদের রাখা হয়েছে। আমাদের ‘এ’ দলের সিরিজ হচ্ছে। যদি ওখানে কেউ ভালো করে তাহলে এখানে নিয়ে আসা হবে। আশা করছি যারা অফ ফর্মে আছে তারা শিগগিরই ফিরে আসবে।’

সৌম্য সরকারকে নিয়ে তিনি বলেন, ‘ওকে নিয়ে আমাদের অনেক পরিকল্পনা। বয়স কম। প্রতিভাবান। আগে পারফর্ম করেছে। তাই ওকে আমরা দলের সঙ্গে রেখেছি, খেলাচ্ছি। এখন ওকে একধাপ এগিয়ে এসে ভালো করতে হবে।’

শুরুর ধাক্কা সামলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় টিম বাংলাদেশ। এবার সেই ধারা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ। সিনিয়রদের পাশাপাশি এগিয়ে আসতে হবে তরুণদেরও। মুমিনুল, সাব্বির, সৌম্য, মোসাদ্দেক দ্রুত ফর্মে ফিরলেই দলটা নিজেদের গুছিয়ে নিতে পারবে ভালোভাবে। সামনেই ঘরের মাঠে একাধিক সিরিজ। দ্বিপক্ষীয় সিরিজগুলোতে তাদের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
 



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৭ আগস্ট ২০১৮/ইয়াসিন/পরাগ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন